ঘুরতে ভালবাসি - একটি বাংলা ভ্রমন বৃত্তান্ত ।

Friday, September 30, 2022

দুর্বার মাটি বুরান ঘাটি

 ভূমিকা : এবারের লক্ষ্য বুরানঘাটি। ২০২২ এর জুন মাস । কিন্তু এই ঘাটি আমাদের জন্য যেনো শক্ত মাটি হয়ে উঠেছিল । তাহলে শুরু থেকেই শুরু করা যাক।


 ২০১৯ সালের গ্রীষ্মে মান্দানী ভ্যালি যাবার অনুমতি না পেয়ে পঞ্চকেদার দর্শন করে ফিরে আসতে হয় । সেটাও একটা অনন্য অভিজ্ঞতা । যদিও এখনকার ট্রেকাররা খুব কমই একত্রে পঞ্চকেদার দর্শনের পরিকল্পনা করে। টিআরপি কম! প্রথম পছন্দের ট্রেকে না যেতে পারার জন্য মনের মধ্যে একটা খিদে রয়েই যায়। কিন্তু লাগাতার হাওড়া হরিদ্বার করতে করতে উত্তরাখণ্ড একঘেঁয়ে হয়ে ওঠে। তাই ২০২০ র গ্রীষ্মে কোনো ট্রেক প্ল্যান করা হয়নি , পরে গেলেও অন্য রাজ্যে যাবার কথাই ভাবা হয়। এমথবস্থায় মার্চ মাসে বাংলা সিকিম বর্ডারে মুলখারকা লেকে ফ্যামিলি ট্রেক এর প্ল্যান করি। কিন্তু তার আগেই আমরা মুখোমুখি হই করোনা নামক এক অতিমারীর। ট্রেক স্থগিত রাখতে বাধ্য হই আমরা।


করোনা ভাইরাস চীন থেকে আগত এক নতুন আপদ। সারা বিশ্ব ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গৃহবন্দী হয়ে পড়ে। বাইরে প্রায় সবকিছু বন্ধ থাকে মাসের পর মাস , যার পোশাকি নাম লকডাউন।  মুখে মাস্ক , হাতে স্যানিটাইজার নিত্য সঙ্গী হয়ে ওঠে। সে এক নতুন অভিজ্ঞতা। স্বাভাবিক জীবন যাপন যেখানে "রাম ভরসায়" পরিণত হয়ে যায় , সেখানে বেড়ানো বিলাসিতা । করোনাও আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলতে থাকে, কখনো মনে হয় যে আপদ গেছে তো পরক্ষণেই আবার চোখ রাঙিয়ে ফিরে এসেছে। সেগুলো নাকি করোনার ঢেউ। ভ্রমন প্রিয় বাঙালি ঘরে বসে সেই ঢেউ গুনতে গুনতে সুযোগ বুঝে বড়জোর দিপুদার স্মরণাপন্ন হতে পেরেছে। কিন্তু বড় বেড়ানো বা ট্রেক তখনও চিন্তার বাইরে। ২০২০ এইভাবেই কেটে যায়। ২০২১ এর শুরুতেই চলে আসে করোনা ভ্যাকসিন । অত্যন্ত গর্বের যে ভারতে দুটি ভ্যাকসিন তৈরী হয় , যার একটি বিদেশী ফর্মুলায় কোভিশিল্ড , অন্যটি সম্পূর্ণ দেশজ কোভ্যাক্সিন। সেই ভ্যাকসিন এর সার্টিফিকেট দেখালে দেশে বিদেশে যাতায়াতের কিছু ছাড় পাওয়া যাচ্ছিল , কখনোও তার সাথে নতুন RTPCR টেস্ট রিপোর্টও নিতে হচ্ছিল । তখন বাইরে বেড়াতে যাওয়া মানে বেশ হ্যাপা । তারমধ্যে আবার আমাদের রাজ্যে দিদির ছবি নাকি মোদীর ছবি লাগানো সার্টিফিকেট, কোনটা বৈধ তা নিয়েও টানাপোড়েন চলে। যারা বাইরে যাবে তারা মোদীর ছবিকেই গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়! শুরু হয় নিউ নর্মাল লাইফ । তো, সুযোগ বুঝে আমরাও ২০২১ এর গ্রীষ্মে হিমাচলের বুরানঘাটি যাবার প্ল্যান করি। যোগাযোগ করা হয় রহরু - চিরগাঁও - জাংলিক এলাকার গাইড লাকি আর ছোটুর সাথে। এদের এজেন্সি নর্দার্ন ট্রেলস এর সাথে আমাদের কথা হয়। ৬ দিনের জনপ্রতি ট্রেক খরচ ১১০০০/-, ফুল প্যাকেজ। এদের ২৫০০০/- আর শিমলার এক গাড়ি এজেন্সি কে ৫০০০/- অগ্রিমও দেওয়া হয়। আমি , সুব্রত, কৌশিক আর ৮ জন নতুন সঙ্গী নিয়ে মোট ১২ জনের দলও তৈরী হয়ে যায়। সাথে ছিল পুরোনো ট্রেক সঙ্গী জয়দীপ, যে তিনবছর অন্তর ফোটে, থুড়ি হাঁটে ! যাইহোক, করোনা কাঁটায় আমাদের এই যাত্রাও স্থগিত করতে হয়। তখন আমাদের পাগলপ্রায় অবস্থা। লাকি জানায় অক্টোবরে ট্রেক করিয়ে দেবে অথবা ডিসেম্বরে টাকা ফেরত দিয়ে দেবে । অক্টোবরে আমাদের দলের সবাই যেতে পারতো না তাই টাকাই ফেরত চাওয়া হয় আর সুযোগ হলে ২০২২ এ এদের সাথেই ওই ট্রেকে যাবো ঠিক করা হয় । কিন্তু লাকির আর পাত্তা পাওয়া যায়নি , টাকারও না !


 করোনা কালে আমরা অনেক প্রিয়জন আত্মীয় স্বজন পরিচিত বন্ধু বান্ধব দের হারিয়েছি। চলে গেছে অনেক বিখ্যাত মানুষও।  আমরা বাঙালি হিসেবে যাদের চলে যাওয়াতে উদ্বেলিত হয়ে পড়ি তাদের মধ্যে অন্যতম মারাদোনা, প্রণব মুখোপাধ্যায় , পিকে , সৌমিত্র, লতা, সন্ধ্যা হয়ত আরও অনেকে। আরও দুঃসংবাদ ট্রেকার দের জন্য অপেক্ষা করে ছিল , ২০২১ অক্টোবরের আগে পরে বেশ কয়েকজন বাঙালি ট্রেকার ট্রেকে গিয়ে প্রাণ হারায়। যাদের মধ্যে চ্যাটালাপে সামান্য পরিচয় হয়েছিল অভিজ্ঞ সন্দীপ গুহ ঠাকুরতা আর সদ্যযুবা সাগর দে'র সাথে। এই দুর্ঘটনায় বাঙালি ট্রেকাররা কয়েক পা পিছিয়ে পড়ে। কারণ এর আগে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু পর্বতারোহীও প্রাণ হারিয়েছে। তার ছাপ পড়ে আমাদের দলেও। তাছাড়া কাছা খোলা হয়ে নতুন দের টিমে নেওয়াটাও বোকামি হয়ে যাচ্ছে। কোনো টিমেই এমন যে কাউকে ঢুকিয়ে নেয়না। ট্রেকে উৎসাহ দেবার লক্ষ্যে সবার জন্যই আমাদের টিমের দরজা খোলা। কিন্তু মনে হচ্ছে এবার আমাদের আরও বেশি চুজি হতে হবে। উদ্যোগ ও আগ্রহহীন ট্রেকার দের এড়িয়ে চলতে হবে। এই ক' বছরের অভিজ্ঞতায় আরও একটা উপলব্ধি হয়েছে , কাউকে তেল মেরে দলে ঢোকানো উচিৎ না , বিশেষ করে ট্রেক টিমে। তুমি না গেলে টিম জমবে না , তোমাকে খুব মিস করবো , প্লিজ চল ইত্যাদি নেকুপুষু ( শ্রীলেখা মিত্র থেকে ধার নেওয়া ) মার্কা চিন্তা ভাবনা ট্রেক টিম তৈরীর সময় সরিয়ে রাখা উচিৎ। উদ্যোগী এবং আগ্রহী সদস্য কেই প্রাধান্য দিতে হবে। সাত কাণ্ড রামায়ণের শেষে সীতা কার মাসী সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা না থাকলেও আমাদের ১২ জনের টিম দাঁড়ালো ৮ জন এ , নতুন ঢুকলো পুরোনো দেবু !  


আমি পারিবারিক কারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ার জন্য ২০২২ এর শুরুতে জয়দীপকে দায়িত্ব দেওয়া হয় লাকি ছোটু দের সাথে কথা চালানোর , টিকিট কাটার। এর আগে ও রুপিন পাস ট্রেকের ব্যবস্থা করেছিল। অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু পিকচারে লাকি ছিলনা। ছোটুর সাথেই কথা হচ্ছিল। আগের বারের অগ্রিম এডজাস্ট করবে আর আগের বারের রেটেই নিয়ে যাবে। কিন্তু ৮ জন হতে হবে, কম হলেই অন্য রেট, যেটা গতবারেই জানা ছিল আমাদের। নিউ নর্মালে আমরা আরও একটা ব্যাপারে সড়গড় হই , সেটা হলো অন লাইন ক্লাস বা মিটিং। আমাদেরও বেশ কয়েকবার অন লাইন মিটিং হয়। এবং প্রথামত নন্দনে সাক্ষাৎ মিটিংও হয় একটা। কিন্তু তারপরে আরও দুজন নাম কাটায়। এতো দিনের অনিশ্চয়তাটাই বাস্তবিত হয়ে যায়। বেশি খরচের কাঁটাটা বিধতে শুরু করে। আমি, জয়দীপ, কৌশিক, সুব্রত , রাহুল , সানি ও দেবু মিলে আমাদের ৭ জনের দল যাবার জন্য তৈরী হতে শুরু করে দিই । জয়দীপ ভালোভাবেই সব সামলাচ্ছিল,  ও রেগুলার ট্রেকার হলে নিশ্চিত একটা ট্রেক এজেন্সি খুলে ফেলতে পারতো ! যদিও কলকাতায় এমন বাণিজ্যিক ট্রেকিং গ্রুপ এর বাড়বাড়ন্ত নবিশ ট্রেকার দের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতে। যাইহোক, আমাদের যাত্রা শুরু হবে ২৭ মে হাওড়া স্টেশন থেকে  নেতাজী এক্সপ্রেসে, প্রথম গন্তব্য কালকা। করোনা তখনও পিছু ছাড়েনি কিন্তু আমরাও আর করোনা কে মাথায় তুলে রাখিনি ! মানুষ তখন দু বছরের বন্দিদশার ভয় কাটিয়ে স্বাধীনতার রসাস্বাদনে মত্ত হয়ে পড়েছে।



২৭/০৫/২০২২ , শুক্রবার - দেখতে দেখতে শুভ যাত্রার দিনটা চলেই আসে। আমি মসলন্দ্পুর থেকে বাড়িতে বানানো ঘী দিয়ে ভাজা লুচি - টুচি নিয়ে চলে আসি হাওড়া স্টেশন , সাথে মধ্যমগ্রাম থেকে দেবু। করোনা কালের দু বছর টানা গ্রামের বাড়িতেই থেকেছি। আর সব থেকে আনন্দের খবর করোনা এবার আর আমাদের আটকাতে পারলো না। আমরা সত্যি সত্যিই যাচ্ছি। যদিও আমাকে একটু রিস্ক নিয়েই যেতে হচ্ছে। সপ্তাহ তিনেক আগে স্কুটার উল্টে আমি দুর্ঘটনা ঘটাই যাতে ডান পায়ের বুড়ো আঙুল জখম হয়, হালকা চির ধরে। পুরো ফিট হবার জন্য যতটা সময়ের এবং বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল দিতে পারিনি। তবুও যাবার সিদ্ধান্ত নিতেই হয় , মেঘ ও অভয় দেয় এই বলে যে যতদূর পারবে যাবে অসুবিধা হলে ফিরে আসবে। এই দুর্ঘটনায় আর একটা সমস্যা যেটা হয় সেটা হলো আমার শারীরিক প্রস্তুতিতে ছেদ পড়ে । দিন কুড়ি কোনো হাঁটাহাঁটি করা সম্ভব হয়নি । শুধু আসার আগে এক দুদিন হেঁটে পরখ করে নিই যে আমি একটানা আধ ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা হাঁটার মত জায়গায় আছি কিনা।  যাইহোক, একে একে ৭ জনেই হাজির হয়ে যাই বড় ঘড়ির নিচে। জয়দীপ কিছুদিন হলো ছোট ক্যামেরা কিনে ভিডিও ব্লগ বানানো শুরু করেছে। এখানেও ও শুরু থেকেই ভিডিও শুরু করে দিয়েছে। এবার জয়দীপ এর ব্লগে আমাদের ট্রেক এর ছবি ভিডিও থাকবে ভেবে বেশ আনন্দ হচ্ছে। এর আগে আমি বা আমরা কখনো এই ভাবে ভাবিনি। রীতেশ একবার শুট করেছিল বাগিনী গ্লেসিয়ার ট্রেক এর সময় , কিন্তু সে ছবি আর হলে রিলিজ করেনি! এবারে বলার মত ঘটনা হলো , এই প্রথম আমাদের কাউকেই সি অফ্ করতে কেউ হাওড়া স্টেশনে আসেনি! রাত ৯-৫৫ র কালকা মেল , অধুনা নেতাজী এক্সপ্রেস , নেতাজীর ১২৫ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে নামকরণ। একই ট্রেনে উঠলেও আমরা চারজন ঠান্ডা বগির আরামে , বাকি তিনজন টগবগে গরমে। মনে পড়ে গেলো আমাদের বালি পাস ট্রেকে যাবার সময়ের ট্রেন যাত্রার দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা।


২৯/০৫/২০২২ , রবিবার - মধ্যের শনিবার দিনটা পুরোই ট্রেনে কাটাই। বলোতব্য তেমন কিছু ঘটেনি। শুধু জয়দীপ রেলফ্যান হিসেবে সারাদিন ধরে আমাদের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দিলেও আমরা ওর উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আর ও নিজের খাবার ফুড অন হুইলসে অর্ডার করেও পায়নি , অথচ কমপ্লেন করে ম্যা ম্যা করে কথা বলেছে ! অনুব্রত যদি খাবার না পেত, শুঁটিয়ে লাল করে দিত না ! আর সবথেকে বড় অভিযোগ , একজন রেলফ্যান হয়েও আমাদের সমস্যার কমপ্লেন করে দিতে চায়নি।


খুব ভোরে কালকা পৌঁছানোর কথা ছিল কিন্তু ঘণ্টা তিনেক দেরী হয়। সুব্রতর ঠিক করা আমাদের টেম্পো ট্রাভেলার গাড়ি অবশ্য স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করছিল। আমরা দেরী না করে দ্রুত যাত্রা শুরু করে দিই আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য ২৩০ কিমি দূরের জাংলিক গ্রামের উদ্দেশ্যে। তখন সকাল প্রায় ৭ টা বাজে। আমাদের গাড়ি এগিয়ে যাবে শিমলা , রোহরু, চিরগাঁও হয়ে। কুফরী পেরিয়ে ফাগু তে আমরা প্রাতঃরাশ সেরে নিই। এই এলাকায় সবুজ পাহাড়ের ঢালে শুধুই আপেল গাছ , সেও বেশ মনোরম দৃশ্য। বাকি পথটাও টুকটাক খেতে খেতে যাই , সেই অর্থে আর লাঞ্চ করা হয়নি। রোহরুর পরে পথের সৌন্দর্য্য আরও বেশি। উচ্ছ্বল যৌবনা পাব্বার নদীর কোমর ছুঁতে ছুঁতে অনেকটা পথ যাবার সৌভাগ্য হয় , অপূর্ব সে অনুভূতি। এইভাবে পৌঁছে যাই চিরগাঁওতে , সেখানে আমাদের অর্গানাইজার গাইড ছোটুর সাথে দেখা হয়। এই পর্যন্ত রাস্তা বেশ ভালই ছিল। এখান থেকে একটা পথ গেছে দোদরা - কাওয়ার , রুপিন পাস ট্রেকে সেবা থেকে জিসকুন যাবার সময় এই বাস রুটকে আমরা ক্রস করেছিলাম । এখন আমাদের পথ বাঁ দিকে। 


তাগনু বলে একটি জায়গা পর্যন্ত আমাদের বড় গাড়ি যায়। সে পথ বড়ই দুর্গম আর বিপদজনক তার উপর বৃষ্টিভেজা কর্দমাক্ত। তারপর পাব্বার নদীর উপর ভাঙ্গা ব্রিজ পেরিয়ে আমরা ছোট গাড়ি করে যেতে হবে , সে পথ আবার চড়াই। ব্রিজ পর্যন্ত যেতেই আমাদের ড্রাইভারের মাথা গরম হয়ে যায় কারণ সে এদিকে কখনো আসেনি , জানেওনা রাস্তা কেমন ! ড্রাইভারের সাথে তর্কাতর্কিতে শেষটুকু একটু তিক্ত হয়ে যায়। তাছাড়া বাকি যাত্রা ভালই ছিল , আমরাও চাইছিলাম ফেরার দিন এই গাড়িই আমাদের শিমলা ফেরত নিয়ে যাক। যাইহোক, এখান থেকে আমরা একটা বোলেরো পিক আপ ভ্যানের সামনে পিছনে উঠে বাকি ৪ কিমি পথ পাড়ি দিই। ঘণ্টা দশেকের যাত্রা শেষে বিকাল ৫ টায় আমরা পৌঁছে যাই ৯০০০ ফিট উচ্চতায় ছবির মত সুন্দর জাংলিক গ্রামের হালকা ঠান্ডায়। আমরা একটা বড় বাংলো টাইপের বাড়িতে উঠি। এর পর থেকে আমাদের খাওয়া বা যত্নের কোনো অভাব হয়নি। কারণ জাংলিক পৌঁছানোর পর থেকে আমাদের প্যাকেজ চালু হয়ে যায়। 


এই গ্রামে তখন ট্রেকার আর অর্গানাইজার দের ভিড়। আমরাও গ্রামটা ঘুরে দেখতে থাকি , হিমাচলি স্টাইলের কাঠের মন্দির , সেবা গ্রামে যেমন দেখেছিলাম , ছাড়াও আরও একটি কাঠের মন্দির দেখি। দেখা হয়ে গেলো আর একজন অর্গানাইজার সঞ্জয় নেগীর সাথে। গত বছর থেকে এর সাথেও আমি কথা চালিয়ে গেছি। গ্রাম, গ্রামের মানুষ আর ট্রেকার দের দেখতে দেখতে আমাদের অনেকের মনেই একটা গান চাপা দুঃখ হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিলো ....

" বাজালে বাজে না আর,

পুরনো সুরে এই মনের সেতার।।

সেই তানপুরা আছে

ছিঁড়ে গেছে তার। "


তানপুরা ছিল কিন্তু বাজানোর উপায় ছিলনা ! 


রাত্রে ছোটু এলে তাকে আরও কিছু টাকা দেওয়া হয়। মাত্র একজন কম হবার জন্য আমাদের ১১০০০/- এর পরিবর্তে ১২৫০০/- টাকা করে  দিতে হবে। কোনও অনুরোধ উপরোধে চিঁড়ে ভিজলো না। সবাই মিলে ঠিক করা হলো , গতবারের ২৫০০০/- এডজাস্ট করার পরে বাকি টাকাটা আমরা ৬ জনে ভাগ করে দেবো , দেবু পুরো টাকাটাই দেবে। পুরো টিম না আসায় এর পরেও গাড়ি আর ট্রেক মিলিয়ে আমাদের ১৫০০/- করে অতিরিক্ত খরচ হবে।


৩০/০৫/২০২২ , সোমবার - নির্ধারিত দিনেই আমাদের ট্রেক শুরু হয়। সকালের দিকে আবহাওয়া ভালই  জাংলিকে। আমাদের খাওয়া দাওয়াও দিলখুস করে দেবার মত। রাস্তার জন্যেও দিয়ে দেয় কিছু। ব্যবস্থাপনায় এখনও কোনো ত্রুটি চোখে পড়েনি। শুধু ছোটু আমাদের সাথে যাবেনা , ও হলো বেস ক্যাম্প ম্যানেজার। ছোটুকে অনুরোধ করি পাস ক্রসের দিন ও যেনো অবশ্যই যায়। আমাদের গাইড এর নাম দীক্ষিত। সাথে আর মাত্র তিনজন , তাদের পোর্টার , কুক, হেল্পার যা খুশি বলা যেতে পারে। আর দুটো খচ্চর। দুটো স্যাক অফলোড এ দেওয়া হয়, একটা জয়দীপের, অন্যটা সানি আর রাহুল দুই ভাইয়ের মিলিয়ে। বাকিরা স্যাক ক্যারি করবো। এর আগে বক্সা আর চিন্তাফু রুটে নিজে স্যাক ক্যারি করে কিছুটা সাহস পেয়েছি , সেগুলো কম উচ্চতার ট্রেক হলেও চড়াই ভালই , তাই প্র্যাকটিস টা ভালই হয়ে গেছে। তখনই ঠিক করি বেশি উচ্চতার ট্রেকেও স্যাক ক্যারি করার চেষ্টা করবো। কিন্তু ভার লাঘব করার সুযোগ থাকলে কেউ ছাড়েনা , জয়দীপের স্যাকের খালি জায়গায় আমার জামা কাপড়ের একটা কিলো দুয়েকের পুঁটলি ঢুকিয়ে দিই। এর পরেও আমার স্যাকের ওজন কিছু অতিরিক্ত জিনিসের জন্য কমবেশী ১০ কেজি। যেটা আমার জন্য যথেষ্ট। 


সকাল ৮ টায় ট্রেক শুরু হয়। গন্তব্য ৮ কিমি দূরের ১১০০০ ফিট উচ্চতার দায়রা থচ বা বুগীয়াল। প্রায় ২০০০ ফিট উচ্চতা চড়তে হবে। প্রথম দিনের জন্য বেশ কঠিন। গ্রাম ছাড়িয়ে নির্জনতায় পৌঁছাতে আধ ঘন্টা কেটে গেলো। ঘণ্টা খানেক বাদে একটা টেবিল টপে পৌঁছাই। একটু বিশ্রাম। নীলাকাশ , সবুজ ঘাস , জঙ্গল পাহাড় মিলিয়ে মন ভালো করা ছবি ।


চলার পথে ভিড় না থাকলেও ট্রেকার দের সাথে যে দেখা হচ্ছিল না তা নয় । তবে সব ছোট গ্রুপ । বড় এজেন্সি গুলোর ভিড় তখনও পাইনি। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সবুজ উপত্যকা আর পাইন গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ, উপত্যকায় কোথাও কোথাও হলুদ বুনো ফুলের ডালি , নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেসে বেড়ানো। এক অপরূপ শান্ত নির্জন পরিবেশের মধ্যে দিয়ে আমাদের চলার পথ। মাঝে মাঝে সামান্য চড়াই। মোটেই কষ্টদায়ক মনে হচ্ছে না। প্রথম ঘণ্টার গণনা শেষে বলা যেতেই পারে আমরা বিপুল ভালোলাগায় এগিয়ে আছি। ঘণ্টা তিনেক বাদে , তখন বেলা ১১ টা, আমরা পৌঁছাই একটা ফরেস্ট হল্টে , যেখানে একটা স্থানীয় ঝুপড়ি দোকানও আছে । আমরা চা বিরতি নিলাম। আগেও সেখানে কিছু ট্রেকার ছিল, পরেও একটা বড় দল আসল। অন্য দলের মানুষগুলো , সুন্দরী যুবতী হলে তো কথাই নেই, আসলে আমাদের চোখের আরাম , পথের ক্লান্তি দুর করার মহৌষধ।


এর পরে কিছুটা বড় বড় বোল্ডার পার করে, কিছুটা জঙ্গলের পথ পেরিয়ে একটা ছোট রঙিন কাঠের ব্রিজের কাছে পৌঁছাই। এই পাহাড়ি ঝোড়া গুলো সবই পাব্বার নদীর উপধারা , একটু নিচে খাদের মধ্যে গিয়ে মূল নদীতে মিশেছে। আমরা নদীর ধার দিয়েই হাঁটছি কিন্তু নদী সবসময় দৃশ্যমান নয় , অনেক নিচে খাদের মধ্যে।ব্রিজ পার করে উপরে উঠতেই আমরা সামনের পথ বরাবর তুষারাবৃত পাহাড়ের দেখা পাই। সৌন্দর্যের মাত্রা হটাৎ করেই বেড়ে যায়। আর একটু এগোতেই আমরা অদূরে দেখা পাই আজকের ক্যাম্প সাইটের, তখন ১২ টা বেজে গেছে , আমাদের নয় ঘড়িতে! দুপুর ১ টায় আমরা পৌঁছে যাই আজকের গন্তব্য দায়রা থচে।


ক্যাম্প সাইটে এবং আজকের ট্রেকের শুরুতে দূরত্ব ও উচ্চতা লেখা দুটো বোর্ড ছিল। তার সাথে অন্য লেখার বা তথ্যের বা আমাদের অনুভূতির বেশ ফারাক। তাই এই লেখায় উল্লেখিত দূরত্ব বা উচ্চতা নিয়ে কেউ ভুল ধরতে আসবেন না। সবই দীপানুমানিক ! যেমন সুব্রতর স্মার্ট ঘড়িতে দূরত্ব প্রায় 11 কিমি দেখিয়েছে আবার ২০০০ ফিট উচ্চতা ওঠাটা কখনোই কষ্টদায়ক মনে হয়নি, হয়ত সেটা কমই হবে। দায়রা থাচ একটা বিশাল সবুজ বুগীয়াল , চতুর্দিকে পাহাড়ে ঘেরা যার বেশ কিছুটা তুষারাবৃত। আমাদের ক্যাম্পটা হলো বেশ খানিকটা নিচের দিকে , অন্য ক্যাম্পের সুন্দরী দের দেখতে গেলে দূরবীন লাগবে ! উপরের দিকে পাহাড়ের ঢালে যেনো একটা গ্রাম বসে গেছে ! আমাদের ক্যাম্পের শেষেই খাদের মধ্যে পাব্বার নদী , দেখা না গেলেও তার গর্জন শোনা যাচ্ছে । দূরে আমাদের আসার পথে পাইন গাছ গুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। এরকম একটা পরিবেশে আমাদের কাঁচা হলুদ রঙের তিনটে তাঁবু আর জলপাই রঙের রান্নাঘর ! হাতে গরম গরম চা। এমন ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে দাঁড়ালে মানুষ তার সমতলের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা কষ্ট সাময়িক ভুলে যেতে বাধ্য। লেজের দৈর্ঘ্য বড় করতে নয় , এই জন্যেই আমাদের পাহাড়ে আসা , অন্তত আমি নিজে সেটাই মনে করি। তবুও এই সবুজ প্রান্তর আমাদের নয়, এগুলো সবই গোচারণ ভূমি। সেখানে প্রায় আস্ত একটা গ্রাম বসে যাওয়ায় দূরে দাঁড়িয়ে গরু গুলোও হয়ত ভেবেছে এই গাধা গুলো কোত্থেকে কি জন্য আসল, ঘাস তো কিছুই খাচ্ছেনা!


হট লাঞ্চ খেয়ে আমরা তাঁবুর মধ্যে সিধিয়ে যাই। একটাই বিরক্তির ব্যাপার , এখানে এক ধরনের মাছি এবং প্রচুর পরিমাণে। তাদের কয়েকটা তাঁবুর মধ্যেও ঢুকে পড়েছে! হটাৎ মনে হলো বাইরে গরুগুলো বিভ্রান্তের মত তীব্র গতিতে ছুটোছুটি করছে। ভয়ে সিঁটিয়ে আছি আমরা। কারণ গাই আমাদের মাতা সেসব বাড়ি গিয়ে হবে, এখন বোঝার চেষ্টা করছি আমাদের ত্রাতা কে হবে।  বাইরে গাইড পোর্টাররা তাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু বাই চান্স তাঁবুর উপর দিয়ে খান দুয়েক গরুও যদি অতিক্রম করে তাহলে তাদের চার জোড়া খুড়ের আঘাতে তাঁবুও যাবে আমরাও যাবো , পুরো না গেলেও খানিকটা তো যেতেই হবে ! একা রামে রক্ষে নেই সুগ্রীব দোসর। এমন সময় শুরু হলো হটাৎ বৃষ্টি! তাহলে কি ওরা ঘরপোড়া গরু ছিল , সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরিয়েছিল ? বৃষ্টির সাথে মুহুর্মুহু বজ্রপাত। যেটাকে আমি বেশ ভয় পাই এই কারণেই যে মাথার উপর পড়লে পালাবার কোনো পথ থাকেনা, বেঘোরেই প্রাণটা কাঠি হয়ে যায়। বজ্রপাতে ট্রেকারদের মৃত্যুর সংখ্যাও নেহাত কম নয়, তার বেশিরভাগ চলার পথেই। কিন্তু ক্যাম্পের উপর বজ্রপাত হলে তো ঝাঁকে ঝাঁকে কই মারা পড়বে। হ্যাঁ, ট্রেকারদের হলো কই মাছের প্রাণ। আমার মনে হলো বড় এজেন্সি গুলোই বা কেনো কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি! তাদের তো প্রায় স্থায়ী কায়দায় অস্থায়ী ক্যাম্প! একটা লম্বা পোলের মাধ্যমে আর্থিং এর ব্যবস্থা কি করা যায়না ? বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন সেটা কার্যকরী হবে কিনা। আমি আর জয়দীপ এক তাঁবুতে। ওর ভিডিওতে একটু বাইট দিই। এক্সপার্ট কমেন্ট আর কি! নতুন অভিজ্ঞতা। সুব্রত আর তার দুই সঙ্গী এক তাঁবুতে। দেবু আর কৌশিক এক আস্তাবলে। ওরা ঘোড়াই তবে সাত্বিক। যদিও আজ লাগামহীন ভাবে ছোটেনি। আমার গালি শোনার ভয়ে কিনা জানা নেই! আমরা প্রায় একসাথেই হেঁটেছি বা একটা সময়ের পরে আবার সবাই মিলিত হয়ে বিশ্রাম নিয়েছি। একটা বড় টিমের সবার যেমন একসাথে হাঁটা সম্ভব নয় তেমন বিশেষ কারণ ছাড়া সঙ্গীকে পিছনে ফেলে তরতর করে এগিয়ে যাওয়াটাও ভালো টিম মেটের পরিচয় নয়। একটা বড় দলের বিভিন্ন সক্ষমতার ট্রেকারদের মধ্যে একটা যোগসূত্র বজায় রেখেই এগোনো উচিত। সেই হিসেবে আজকের টিম অ্যাকটিভিটি একদম পারফেক্ট ছিল। বৃষ্টি থামলে বাইরে বেরিয়ে একটু চক্কর মারি , পাশের পাড়ায় যাই , লক্ষ্য একটাই বা অনেকে কিন্তু বেশি সাহস দেখানো গেলনা , অঞ্জন দত্তের অনুপ্রেরণায় যদি কেউ ঠ্যাং ভেঙে দেয়! ক্যাম্পে তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলে আর বিশেষ কিছু করার থাকেনা , খাওয়া , ঘুমানো আর গেঁজানো ছাড়া। এদের খাওয়া দাওয়ায় কোনো কমতি নেই , চা পাকোড়া , সুপ, ডিনার পর পর চলছে। প্রথম দুদিন ডিমও থাকার কথা। আর খুব বেশি হলে রাত নটার মধ্যে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে একা হয়ে যাওয়া। তখন আপনা হাত জগন্নাথ!


৩১/০৫/২০২২, মঙ্গলবার - ভিনদেশী তারারা যত আলোকবর্ষ দূরেই থাক মাঝরাতে এসে সস্নেহে আমাদের স্লিপিং ব্যাগের চেন আটকে দিয়ে গেছে। তাই সকালটা বেশ ফুরফুরে। আজ আমাদের গন্তব্য 6 কিমি দূরের ১১৫০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত লিথাম। রাজকীয় প্রাতঃরাশ আর একের পর এক ফটোসেশন সেরে যখন হাঁটা শুরু করি তখন ঘড়ির ডিজিটে পৌনে ন'টা। আসলে জায়গাটা ছেড়ে  কারোই যেতে ইচ্ছে করেনি। 


আমাদের পথ ওই বরফে ঢাকা পাহাড়ের দিকেই। যেনো ধীরে ধীরে আমরা সেই বরফের চাদরের তলায় আশ্রয় খুঁজতে যাচ্ছি। আজকের পথও অনেকটা কালকের মতই। পাহাড়ের ঢাল চিরে সবুজ ঘাসের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলার সরু রাস্তা , কখনো পাইন গাছের জঙ্গল। এইভাবেই এগোতে এগোতে এক ঘণ্টা পরে পৌঁছে যাই একটা বিস্তীর্ণ সবুজ ঢালে , যেখানে হলুদ ফুলের প্রাধান্যও চোখে পড়ার মত। সিংহমুখী কল থেকে পড়ছে পাহাড়ি ঝোরার জল। তার পাশেই বিশ্রাম আর ছবি তোলার হিড়িক। 


মোটামুটি আরামদায়ক পথ। যখনই কোনো পাহাড়ি ঝোরা আসছে তখনই কেবল চড়াই উৎরাই। আরও আধ ঘণ্টা হাঁটার পর এরকমই একটা ভাঙ্গা ব্রিজ পার করে চড়াই ওঠার পথে পাথরের খাঁজে একদল পাহাড়ি মানুষের অস্থায়ী আস্তানা চোখে পড়ে। পাথরের দেওয়ালের সাথে একটা ত্রিপল টাঙানো। হয়ত পাহাড়ে গবাদি পশু চরায় বা জরিবুটি তোলে। এরাই পাহাড়িয়া, আমরা তো সখ পূরণ করতে পাহাড়ে আসি। বছরভর পাহাড়ে থাকার যে কষ্ট সেটা টের পাওয়ার আগেই সমতলের বিলাসিতায় নেমে আসি। এদের কাছে গেলে হয়ত চা পাওয়া যেত। সানি আর রাহুল অবশ্য সেই শুরু থেকেই অন্য কিছু খুঁজে যাচ্ছে , দুজনে যেনো নন্দী ভৃঙ্গী ,আর তাদের নাটের গুরু মহাদেবের নেশার জন্য জান লড়িয়ে দিতে পারে! আর একটু এগোতেই আমরা দেখা পাই একদল মহিলার, রঙিন পোশাক পরা স্থানীয় হিমাচলী। নীল সবুজ সাদার প্রেক্ষাপটে এই রঙিন পোশাক যেনো লাল নীল সবুজের মেলা বসিয়ে দিয়েছে। ছবি তো বানতা হ্যায় দোস্ত। তারাও সাগ্রহে ছবি তুলিয়ে বেশ মজা পেয়েছে।


আরও আধ ঘণ্টা হাঁটার পর পাহাড়ের ঢাল থেকে কয়েকজন মহিলা চলে আসে আমাদের কাছ থেকে জল নিতে। এরা সবাই পাহাড়ের ঢালে জড়িবুটি তোলে। আমরাও তখন দূরে আমাদের ক্যাম্প দেখতে পাচ্ছি। তাই বোতলের জল খালি করতে অসুবিধা নেই। এরাও সেটা জেনেই জল নিতে আসে। সুব্রতর অবাক জলদান ছবি হয়ে যায়। পথ মোটেই বিপদজনক নয়, কিন্তু পাহাড়ের একদিকের ঢাল নেমে গেছে চোখের আড়ালে থাকা পাব্বার নদীর কোলে। তাই গড়িয়ে পড়লে বিপদ যে ঘটবে না তা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়না। নিদেন পক্ষে ব্যাগ বা জলের বোতল তো গড়িয়ে যেতেই পারে। ট্রেল সাধারণত একটাই কিন্তু কিছু জায়গায় উপরে নিচে স্থানীয় দের কল্যাণে আরও কয়েকটা ট্রেল তৈরী হয়ে গেছে। কিছু জায়গায় বোঝা মুশকিল হয় কোনটা দিয়ে এগোলে সহজে পৌঁছানো যায়। এরকমই একবার দেখি সানি নিচের দিকের একটা ট্রেল ধরে এগোচ্ছে এবং জায়গাটা কিঞ্চিৎ কঠিন। ওকে মুখ দিয়ে টেনে লাইন আনি। এই সানি চলনে বলনে চেহারায় টাল খাওয়ায় অনেকটাই আমাদের হেলিকপ্টার সব্যর মত। এ যেনো হাঁটেনা, শুধু বডি টাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ওর প্রথম ট্রেক এটা যদি ভাবনা হয়, ওর কম বয়স সেটা ভরসা! তো সেই ভরসার উপর ভর করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এই বিশ্বাসে যে সানিও ঠিক পারবেই। এইভাবে আমরা দুপুর ১২ টায় তাঁবুর জগতে প্রবেশ করে যাই। কিন্তু এই ক্যাম্প সাইট টা বেশ বিস্তীর্ণ। আমাদের ক্যাম্প আরও এগিয়ে।


আবার নিচে নেমে এবার পাব্বার নদী পার হতে হলো অস্থায়ী ব্রিজ দিয়ে। বাঁদিকের পাহাড়ের মাথায় দৃশ্যমান ঝর্না থেকেই নেমে এসেছে নদী , যেদিকে আমাদের আগামীকালের গন্তব্য চন্দ্রনাহান লেক, পাব্বার নদীর উৎস। ডানদিকে কিছুটা নেমে পাব্বার নদী মিশেছে ধুন্দার দিক থেকে নেমে আসা এক অনামী ঝোরায়, যেটাও নদীর মতই চেহারা। আর একটু এগিয়ে গিয়ে সেই অনামী নদীর ধারেই আমাদের তাঁবু পড়েছে। ১২:৩০ এ আমরা আজকের গন্তব্যে পৌঁছাই। কিন্তু আমরা যেনো পাড়ার একঘরে করে দেওয়া পরিবারের মত, সব ক্যাম্পেই কেনো যেনো পাড়াছাড়া অবস্থা । সব থেকে বাজে জায়গায় আমাদের ক্যাম্প। এখানে তো আবার কিচেন টেন্ট আর থাকার টেন্ট এর মধ্যে বেশ কিছুটা ব্যবধান , মধ্যে আবার একটা নালা ! অদূরে বড় বড় এজেন্সির ক্যাম্পের টয়লেট গুলো আমাদের দিকে। আমরা কিচেন টেন্ট এর পাশেই ঘাঁটি গাঁড়ি। এই পথে দিয়ে আমাদের সামনে দিয়েই সবাই যাচ্ছে। চা হাতে নিয়ে আমরা প্রকৃতি ও প্রাণের রূপ রস গন্ধ উপভোগ করতে থাকি। কয়েকজনের সাথে সামান্য হয় আমাদের। গড়িয়া বাসী এক ব্লগার নজর কারলো আমাদের। পথেও এর সাথে দেখা হয়েছে। স্ট্যান্ডে ক্যামেরা লাগিয়ে নিজের হাঁটার ছবি তোলার জন্য অনেকটা রাস্তাই তাকে দুবার করে হাঁটতে হয়েছে! আজ টেন্ট সঙ্গী কিছুটা পাল্টে গেলো। সবারই সবার সাথে থাকার অভ্যাস থাকা উচিত। লিথাম ক্যাম্প থেকে দূরের বরফাবৃত পাহাড় যেনো আরও কাছে , চারিদিকে পাহাড় ঘেরা সবুজ ঘাসে ঢাকা উঁচু নিচু উপত্যকা, পাশে নদীও সশব্দে দৃশ্যমান , দৃশ্যে পাইন গাছের সারি বিরাজ না করলেও, আজকের সৌন্দর্য্য যেনো গতকালের সৌন্দর্য্যকে ছাপিয়ে যেতে চাইছে। আবহাওয়া তখনও ঝকঝকে।


অল্প অল্প হাঁটা, তাই ক্যাম্পে এসে হট লাঞ্চ। সব ট্রেকে এই সৌভাগ্য হয়না। কিন্তু টেন্টের মধ্যে বেশ গরম, একটানা বেশিক্ষণ থাকা যাচ্ছেনা। বিকালের দিকে আমরা ক্যাম্পের চারিদিকে ইতস্তত বিচরণ করতে থাকি।  উদ্দেশ্য শরীর ও মন কে তরতাজা রাখা। বড় টিমগুলো দেখছি পিটি করছে, একে অপরের পিঠ টিপে দিচ্ছে, আহা ! এই জন্যেই মনে হচ্ছে ওদের সাথে একবার ট্রেকে যেতে হবে। আমি আর জয়দীপ নদী ধরে অনেকটা এগিয়ে যাই, আমাদের মূল গন্তব্য ওই দিকেই। একটা স্নো ব্রিজ পাই অনেক দূরে, কিন্তু পার হবার সাহস পাইনা, যদি ভেঙে যায়! নিচে খরস্রোতা শীতল জলধারা। দুজনে মিলে পাথর সাজিয়ে চূড়া বানাই, এগুলো প্রার্থনা করা জন্যেও তৈরী করে কেউ, আবার পাহাড়ি পথে দিক নির্দেশের জন্যও বানিয়ে রাখে গাইডরা। তাঁবুতে ফিরে এসে এক তাঁবুতে আড্ডা , আর সবার আনা নানা খাবার টেস্ট করা। কোম্পানি যে খেতে দিচ্ছেনা তা নয়, যথেষ্ট দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের বোয়ে আনা খাবার গুলোও তো পাসে ওঠার আগে হালকা করতে হবে। যাইহোক, আগামীকাল আমাদের এই ক্যাম্পেই থাকার প্ল্যান। তাই আজকের মত শুভরাত্রি।


০১/০৬/২০২২, বুধবার - মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা। যদিও আজ আমাদের কোথাও চলে যাবার কথা নেই , লিথামেই বিশ্রাম নেবার দিন। তবে এই বিশ্রাম ল্যাদ খাওয়ার বিশ্রাম নয়। ট্রেকারদের বিশ্রামেও শ্রম থাকে!  তাঁবুর বাইরে জয়দীপের উল্লাস শুনে ঘুমটা ভাঙাতেই হলো, বাইরে নাকি বরফ পাওয়া গেছে । উঁকি মেরে দেখি ঘাসের উপরে পাতলা সাদা আস্তরণ। শিশির গুলো জমে গেছে মনে হয়। তুষারপাত হয়নি নিশ্চিত। দারিংবাড়ির বরফের মত ব্যাপার আর কি। খুব যে ঠান্ডা লাগছে তা নয়, খাওয়া বা হাতমুখ ধোয়ার জন্য সবসময় যে গরম জল পাচ্ছি তাও নয়, গরম জল দিচ্ছে কিন্তু কখনো কখনো ঠান্ডা জলেও কাজ সেরে নিচ্ছি। আমরা পাঁচজন এক তাঁবুতে ঢুকে সকালের চা পান করি। দুই ভাই তখনও নিজেদের তাঁবুতে ল্যাদ খাচ্ছে আর পুরিয়ার স্বপ্ন দেখছে। 


আমাদেরও টয়লেট টেন্ট আছে। যতদূর মনে পড়ছে সেই বালি পাস ট্রেক থেকে আমরা টয়লেট টেন্ট পাচ্ছি। ট্রেকার হিসেবে মনে হচ্ছে আমরাও জাতে উঠে গেছি। আমরাও এখন টেন্টের মধ্যে বসে হাগি। তবে আমরা হলাম গিয়ে বিদ্যাসাগরের উত্তরসূরি, তাই নুন ভাত খাওয়ার অভ্যাস পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারিনি, স্বেচ্ছায় হোক বা বিপাকে পড়ে টেন্টের বাইরেও হাগতে পারি আমরা!  তবে এই পাহাড়ে হাগার কিছু নিয়ম কানুন আছে , নতুনদের সেগুলো জানা উচিত আর নতুন পুরোনো সবার সেগুলো মেনে চলা উচিত। মোদ্দা কথা হলো কখনোই তোমার ছেড়ে আসা নমুনা উন্মুক্ত না রাখা , পরের জন সেটা দেখে মোটেই উল্লসিত হয়না। যাইহোক, এইসব গন্ধকাতর বিষয় ছেড়ে খাওয়ায় ফেরা যাক। নদী পার করে কিচেনে খেতে যাই। এক একদিন এক এক রকম ব্রেকফাস্ট। মুখে না দিতে পারার মত এখনও কিছু বানায়নি এরা। তাই খাওয়া দাওয়া বেশ ভালই হচ্ছে। শুধু সুব্রতকে কখনও ঠিকঠাক খেতে দেখছিনা , কেসটা কি সেটাও বুঝতে পারছি না। তবে যা চেহারা বানিয়েছে শুধু  স্যান্ডউইচ আর চকোলেট খেয়েই পাহাড়ে ২৬ দিন হেঁটে দেবে!


আমরা তাড়াতাড়ি শুরু করতে চাইলেও, আমাদের সাপোর্টিং টিমের তেমন কোনো তাড়া নেই। তাই আজকে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেবার জন্য হাঁটা শুরু করতে ৮ টা বেজে গেলো। ঠিকই আছে, দেরী হয়নি। ছোট স্যাক নিয়ে আমরা সবাই বেরিয়ে পড়ি, গাইড দীক্ষিত পথে আমাদের ধরে নেবে। আমাদের আজকের গন্তব্য ৩ কিমি দূরে প্রায় ১৪০০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত চন্দ্রনাহান লেক। প্রচুর ট্রেকার শুধু এই পর্যন্ত ঘুরে দেখে আবার জাংলিক ফিরে যায়। সাধারণ ট্রেকারদের জন্য একটি জনপ্রিয় ট্রেক রুট। প্রথমেই আমাদের কালকের পথে নদী পার করে প্রথম ক্যাম্প সাইটে যেতে হলো। প্রাথমিক লক্ষ্য পাহাড়ের মাথায় সেই ঝর্নার উপরে যাওয়া, তারপর আরও হেঁটে সাতটি লেকের যত গুলো সম্ভব এক্সপ্লোর করা। এরপরে বেশ কিছুটা চড়াই ওঠার পর আমরা পৌঁছে যায় নদীর পার্শ্ববর্তী বোল্ডার জোনে। আমাদের আগে ইসকা ফৌজ উসকা ফৌজ যাচ্ছে তবুও রাস্তা যে খুব একটা বোঝা যাচ্ছে তা নয়। এখানেই আমরা যত মত তত পথ ফর্মুলা অ্যাপ্লাই করে নিজেদের পথ নিজেরাই খুঁজে নেই। গাইড তখনও আমাদের সাথে যোগ দেয়নি। এখানে আবার নিজেদের উদ্যোগে ব্রিজ ছাড়াই নদী পার করে আমরা উঠতে থাকি। একটা সময় যেনো বড় বড় বোল্ডার এর মধ্যে হারিয়ে যাই। তবুও এগোতে থাকি আর কিছুক্ষণ দুর থেকে দেখা সবুজ ঢালে পৌঁছে যাই এক ঘণ্টায়। সামনে একটা মারাত্মক চড়াই উঠে গেছে ঝর্ণার মাথায়। আরও এক ঘন্টা চড়ার পরে আমরা পৌঁছেও যাই উপরে ঝর্নার পাশে। অনেকটা সেই রূপিন ঝর্ণার মতই ব্যাপার আর কি। এখানে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই সবাই মিলে। নদীখাতে নেমে আমি আর জয়দীপ একটু ছবি তুলে আসি। 


পুরোটাই রুক্ষ এলাকা , সবুজের স' নেই, বরফের ব'ও নেই! কোথাও কোথাও সামান্য ঘাসের আভাস আছে মাত্র। আসলে আমরা এই এলাকার এই সময়ের যে ছবি দেখেছি তা সবই বরফাবৃত। হিট ওয়েভের জন্য , সূত্র জয়দীপ, এবার বরফ গলে জল হয়ে গেছে। আমরা ছোট বড় বোল্ডার বিছানো চড়াই উৎরাই পথ পেরোতে থাকি। একে একে প্রথম, দ্বিতীয় লেক পার করে আমরা তৃতীয় লেকের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাই, তখন সকাল ১১টা। জয়দীপ শুরুর দিকের প্রান্তেই বসে থাকে একা একা। আমরা প্রথম লক্ষ্যে পৌঁছানোর আনন্দে এখানেও জাতীয় পতাকা তুলে জাতীয় সঙ্গীত গাই। আমাদের গাইড সেই ভিডিও করতে গিয়ে কেটেকুটে একাকার করে দিয়েছে। এই প্রান্তে গেরুয়া পতাকা লাগানো একটা ছোট মন্দির আছে। অধিক উচ্চতায় হিমালয়ের কোলে প্রায় সব লেকই পবিত্র এবং পৌরাণিক গল্পের অঙ্গ। স্থানীয়দের বিশ্বাস তাদের আরাধ্য দেবতা শিক্রু মহারাজ  এর এলাকা এটি, এবং এখনও বছরে একবার পবিত্র চন্দ্রনাহান হৃদে স্নান করতে আসেন। বাকি দিনগুলো কোথায় স্নান করেন জানা যায়নি! খুব বেশি ট্রেকার এইদিকে আর আসেনি। আর হাতে গোনা দু একজন কে আরও এগিয়ে যেতে দেখি। সামনেই বোল্ডারে বিস্তীর্ণ একটা চড়াই, তার উপরে কি বোঝা যাচ্ছেনা। আমার পক্ষে যাওয়া কষ্টকর হয়ে যেত, বাকিরাও কেউ যেতে আগ্রহ দেখালো না। উপরে আরও চারটি লেক থাকার কথা এবং পাব্বার নদী উৎসমুখ , স্নাউট থাকার কথা। কিন্তু মনে হয়নি উপরের দৃশ্য এখানের থেকে আলাদা কিছু হবে। আবহাওয়া খুব একটা পরিষ্কার নয়, সব কিছু কেমন ঝাপসা, ঘোলাটে মেঘে ঢাকা।  এই জায়গাটায় বিচ্ছিন্ন ভাবে হলেও মিষ্টি বেগুনি রঙের ছোট ছোট ফুল দেখি। লেক গুলো যে কাঁচের মত জলে টলমল করছে তা নয়। সত্যি কথা বলতে কি মনে গেঁথে যাবার মত কোনো সৌন্দর্য্য চোখে পড়েনি তবে জার্নিটা নিশ্চয় মনে থাকবে। তবে বর্ষায় যখন লেকের দুদিকের পাহাড়ের ঢাল সবুজে ঢাকা  পড়ে বা অন্য সময় বরাফাবৃত হয়ে পড়ে তখন নিশ্চিত অপরূপ হয়ে ওঠে এখানকার পরিবেশ। আসলে পাব্বার নদীর ধারা নানা জায়গায় নানা ভাবে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে এমন লেকের আকার ধারণ করেছে। হর কি দুন উপত্যকায় মিরিন্ডা তাল যেমন দেখেছিলাম। যাইহোক আমরা অধরা স্বর্গ থেকে ফেরার পথ ধরি।


দ্বিতীয় লেকের ধারে সবাই মিলিত হই বিশ্রাম নেবার জন্য। নানা জনের নানা ড্রাই ফ্রুটস্, কখন যে কার টা খাচ্ছি খেয়াল থাকছে না। নিজেরটা খোলার সুযোগই পাচ্ছিনা, ড্রাই ফ্রুটসের ঠোঙ্গা!  আমি এবার একটু ক্যারামালাইজড নারকেল এনেছি, কিন্তু শেষ মুহূর্তের ভুলে একটু বেশি পাক হয়ে গেছে, তাই কেউ খেতে চাইছে না। নিজের কর্মফল নিজেই খাচ্ছি! ফেরার পথে প্রায় শেষদিকে, প্রথম ক্যাম্পে নামার সময় দূরে দেখি দেবু আর কৌশিক কাকে যেনো হাত ধরে নামাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখি একজন মধ্যবয়সী মহিলাকে নামতে সাহায্য করছে। এটাই তো আমাদের মানে ট্রেকমেট দের মোটো! আমাদের ব্যানার না থাকলেও, ব্যানারের ডিজাইনে আছে , তোমার সহ পদযাত্রীর দিকে প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও। শুধু অকারণে সুস্থ কাউকে ট্রেক পথে নিজের মাপের জল দিওনা। ওটা সাহায্য করা নয়। নিজের প্রয়োজনীয় জল বহন করার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। জল না দিয়ে সেই শিক্ষাটা তাকে দাও। বিশেষ পরিস্থিতিতে অবশ্যই জলদান করতে হবে, কিন্তু সর্বক্ষেত্রে কখনোই নয়।


দুপুর দুটোর মধ্যে আমরা সবাই ক্যাম্পে ফিরে আসি। ওয়েদার এই সময় দারুন। সকালের সেই ঝাপসা ভাব কেটে গিয়ে ঝকঝকে। লিথাম ক্যাম্প সাইট যেনো স্বর্গ। সামনে অন্য টিমের পিটি আর টেপাটিপি দেখতে দেখতে , ঘাড়-পিঠ, আমরা দুপুরের গরমাগরম খিচুড়ি খেতে থাকি। এখনও পর্যন্ত বেশ আরামদায়ক ট্রেক ও খাওয়া দাওয়া হচ্ছে। এতদিন সহজ পথে হেঁটেছি তাই আমার আহত পা'কে তেমন পরীক্ষার মধ্যে পড়তে হয়নি। আজই প্রথম টের পেলাম অসুবিধাটা, বোল্ডার জোনে পা ফেলার সময়। বুড়ো আঙুলের ব্যথা বাঁচিয়ে পা ফেলতে হয়েছে, সব সময় যে পেরেছি তা নয়। স্বাভাবিক গতি শ্লথ হয়েছে তার জন্য। বিপদ কিছু ঘটেনি। আমি এবং আমরা সবাই আগামীকাল বুরান ঘাটির পথে এগিয়ে যাবার জন্য শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত।


০২/০৬/২০২২ , বৃহস্পতিবার - লিথামেয়ারির দু রাত্তির। বুদ্ধদেব গুহর অনুপ্রেরণায় বাংরিপোশির মত কিছু এখানে ঘটেনি। ঘটতেই পারতো। মনে লাড্ডু ফোটার মত অনেক কিছুই হাজির ছিল। ট্রেকারদেরতো এমন আনরোমান্টিক হবার কথা নয়। তাই যেকোনো নদীখাতে বা পাহাড়চূড়ায় সেই অ্যাডভেঞ্চার হতেই পারে। আমরা সকাল সকাল উঠে তৈরী হলেও গাইড পোর্টার দের আজও কোন হেলদোল নেই তাড়াতাড়ি বেরোবার। শুধুই বলছে , থোড়া সা তো হ্যায়, দো ঘন্টেমে আরামসে পৌঁছ যাওগে। তা আরাম তো আমরা গত তিনদিনেই টের পেয়ে গেছি । আজ তো পাহাড়ের আরও গহনে গভীরে ঢুকতে যাচ্ছি! পাহাড়ে হাঁটতে গিয়ে আরাম আর মদ্যপান হারাম এমন কোনো কথা ব্যাদে লেখা নাই। তাই এর কোনো মানেই নেই! তবে বেদে লেখা থাকুক বা না থাকুক অধিক উচ্চতার ট্রেকে ধুম্রপান ও মদ্যপান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, অন্য কিছু পানে কোনো বাঁধা নেই! তো, নদী পার করে টিফিন খেতে যাওয়া আবার ফিরে এসে স্যাক গোছানো এইসব করতে করতে ৮:৩০ বেজে যায়। আজ আমাদের গন্তব্য ৫ কিমি দূরে ১৩৫০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত ঢুন্ডা।


আমাদের আজকের পথ সামনের বরাফাবৃত পাহাড়চূড়াকে লক্ষ্য করে , কিন্তু ক্যাম্প সাইট সেদিকে নয় , শেষে বাঁদিকে বেকে গেছে, যেটা শুরুতেই বোঝা যাচ্ছেনা। প্রথমেই চড়াই ভাঙতে হলো। যে পথ উঠতে সবসময়েই আমাকে অনেক হিসেব নিকেশ করতে হয়। হাঁফ লেগে যায় দশ পা উঠতেই। এবার আবার পিঠে ভারী বোঝা যদিও তার জন্য অতিরিক্ত কোনো কষ্ট অনুভূত হচ্ছেনা। আজকের পথে আর মালবহক ঘোড়া খচ্চর নেই, এরাই নিয়ে যাবে নিজেরা । এক ঘন্টা হাঁটার পর আমরা আবার নদীখাতের বোল্ডার জোনে নেমে আসি। এটা সেই নদী যেটা লিথামে আমাদের ক্যাম্পের পাশে দেখেছি , আর পাব্বারের সাথে মিশেছে। নামটা জানা নেই , তবে এটাই বুরানঘাটি পাসের দিক থেকে নেমে এসেছে। আপাতত এইখানে আমরা বেশ কয়েকবার নদীটা পারাপার করেছি , কঠিন কিছু নয়। উঁচু নিচু বোল্ডার ঢাকা পথে এগিয়ে যেতে থাকি। পথে অন্য দলের অনেকের সাথে দেখা হয়েছে। ওয়াকি টকি হাতে এমনই কোনো দলের  টিম লিডার একটি মিষ্টি মেয়ে বারবার নজর কেড়ে নিয়েছে।  যেতে যেতে হটাৎ চোখে পড়ে একজন মহিলা আর হাঁটতে পারছে না , বিদ্ধস্ত, হাঁফাচ্ছে, বারবার বসে পড়ছে। যা অবস্থা ফিরে যাওয়াটাই সমীচীন। এ এম এস এর লক্ষণ হলেও হতে পারে। সাথে তার পুরুষ সঙ্গী আছে। তবুও এড়িয়ে চলে যাই কি করে? কথা বলে বোঝার চেষ্টা করি কতটা গুরুতর। কোকা ৩০ ওষুধ দেওয়া ছাড়া আমারও আর বিশেষ কিছু করার নেই। কারণ আমার কথায় সে ফিরে যাবেনা। ভয়ে ভয়ে ওষুধ টা খেলো। এদের মনে হয় টিম থেকে বারণ করে দেওয়া হয় , পথে অচেনা কারও কোনো নির্দেশ না শুনতে, কিছু খাওয়া তো দূর। যাইহোক, এই পথে আরও ঘণ্টা খানেক চলার পরে আমরা একটা বড় স্নো ব্রিজের সামনে পৌঁছাই। এখানেই আমাদের পথ টা কিছু বাঁদিকে বেঁকে পাহাড়ের মাথায় উঠে গেছে। স্নো ব্রিজটা পার করার সময় আমরা সবাই আবার একসাথে হয়ে আগে পরে পার হয়েছি। শুরু হয় আবার চড়াই। একা রাম রক্ষে নেই সুগ্রীব দোসর ! কোম্পানি আমাদের আরও কিছু দিতে চায়। সামনে আরও কঠিন চড়াই। এই চড়াইটা আমরা যে যার মত আগে পরে চড়তে থাকি। পাশ দিয়ে একটা হালকা জলধারা নেমে গিয়ে নিচের নদীতে মিশেছে। ১২ টা নাগাদ এক এক করে আমরা চড়াই টা অতিক্রম করে উপরে সেই ঝোড়ার পাশে পৌঁছে বাকিদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। কারণ আমরা ঢুন্ডা ক্যাম্পে পৌঁছে গেছি। সামনে ভি আকৃতির পাহাড় খাঁজের মধ্যেই আমাদের অভীষ্ট বুরান পাস। আর বরফে ঢাকা পাহাড় গুলো ডান দিকে বা পিছন দিকে। পথে দু একবার সেই অসুস্থ মেয়েটিকে দেখে আগের থেকে বেটার লেগেছে। এখানেই অনেক্ষন কেটে যায়, কারণ আমাদের ক্যাম্প একদম উপরের দিকে, পাসে যাবার পথের দিকে। আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছতে দুপুর ১ টা বেজে যায়।


আমাদের ক্যাম্পটা একটা ছোট টিলার উপরে, নিচে বাকি দলের ক্যাম্প গুলো ছবির মত দেখাচ্ছে। আর সেই সবের ব্যকগ্রাউন্ডে বরফাবৃত পাহাড়। পুরো ক্যাম্পিং এলাকাটা উঁচু নিচু হালকা সবুজ ঘাসে ঢাকা জমিতে। মধ্যে সরু জলের ধারা নেমে গেছে ক্যাম্পের বুক চিরে। আগের দুদিনের ক্যাম্প সাইটের থেকে আজকের সৌন্দর্য্য একেবারেই অন্যরকম। আমরা যেনো একেবারে পাহাড়ের কোলে উঠে পড়েছি। সামান্য দূরে বোল্ডার জোন পেরিয়ে সেই ভি আকৃতির পাহাড়ের খাঁজের মধ্যে বুরান ঘাটির আভাস পাওয়া যাচ্ছে , পুরোটা বোঝা যাচ্ছেনা কারণ উপরে ওঠার পরে পথ একটু বেঁকে গেছে।এই সুন্দরের মধ্যে এসে ছবি তুলে কারোরই যেনো মন ভরছে না। পাব্বার ভ্যালি আর বসপা ভ্যালির সংযোগ রক্ষাকারী এই  বুরান পাস।  হিমাচল মানেই ধৌলাধার পর্বতশ্রেণী, আর তার দক্ষিণ পূর্ব দিকের ঢালে এই পাস। এই ট্রেক রুট শেষ হয় করছাম এর কাছে বড়ুয়া গ্রামে, যেখান থেকে সাংলাও বেশি দূর নয়। এই এলাকায় উত্তরাখণ্ড আর হিমাচল প্রদেশের মধ্যে একাধিক পাস আছে , যার বেশিরভাগই ব্যাবহার করা হয় ভেড়া পারাপার করার জন্য। এর ডান দিকে কয়েক কিমি এগিয়ে গেলেই রুপিন পাস , যে ট্রেক রুট শেষ হয় সাংলাতে গিয়ে, যেখানে ২০১৫ সালে আমি আর জয়দীপ গেছিলাম। আরও ডানদিকে পরপর আছে খিমলোগা পাস, বোরাসু পাস আর লামখাগা পাস যেগুলো বেশ নামকরা এবং শেষ বা শুরু হয় ছিটকুল থেকে।  এ ছাড়াও আরও কয়েকটা পাস আছে এই এলাকায়। রতনলাল বিশ্বাস বা তপন পণ্ডিত কে যেনো এই এলাকার প্রধান পাঁচটি পাসই অতিক্রম করেছেন, পড়েছিলাম, ঠিক মনে নেই। ছিঁছোড়ে সিনেমার সেই ডায়লগ টা মনে আছে ? "আবে ও লোগ কোচ লেকে আয়া!" আমরাও তেমন একটা দৃশ্য দেখি নিচের ক্যাম্পে, ট্রেকাররা সবাই জড়ো হয়ে বসেছে , আর দু একজন দাঁড়িয়ে হাত পা নেড়ে তাদের ভাষণ দিচ্ছে, শুনতে তো পাচ্ছিনা কিছুই ! বোঝা গেলো ওদের টিম মিটিং এ আগামী কালের পরিকল্পনার ব্রিফিং চলছে। আমাদের একটাই প্ল্যান, ভোর রাতে উঠে রেডী হয়ে বেরোতে হবে। আমরা কয়েকজন কালকের পথের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে রেইকি করে আসি। ছোটু কথা রেখেছে, সন্ধ্যার মধ্যেই চলে এসেছে ক্যাম্পে। কাল আমাদের পাস ক্রস করিয়ে দিয়ে ফিরে যাবে।


০৩/০৬/২০২২, শুক্রবার - আজ আমাদের সামিট ডে। যদিও সামিট লিখলে ছ'হাজারীরা খিল্লি করে। তাই সোজা করে বলি, আজ আমাদের ট্রেকের মূল দিন, পাস ক্রস করার দিন। ১৩৫০০ ফিট উচ্চতার ঢুন্ডা থেকে ১৫০০০ ফিট উচ্চতার বুরান পাসে উঠে নেমে যেতে হবে ১০৫০০ ফিট উচ্চতার মুনিরাং বা রিভার সাইড ক্যাম্পে , প্রায় ৮ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে। বোঝাই যাচ্ছে , ওঠার থেকে নামা টাই কঠিন হতে চলেছে।


ভোর ৩ টের সময় ঘুম থেকে উঠে যে যার মত তৈরী হতে থাকি। যদিও এবার সাজগোজের বহর কম, সামনের রাস্তা বরফ হীন, তাই গেইটার বা ক্রাম্পন ইত্যাদি পড়ার কোনো ব্যাপার নেই, তবে হেড ল্যাম্প জরুরী। আজই প্রথম ঠান্ডাটা টের পাওয়া যাচ্ছে। কাল রাত থেকেই আমি সখের পাহাড়ি ঘড়িটা খুঁজে পাচ্ছিনা , বেল্ট ছেঁড়া, তাই ছোট ব্যাগের মধ্যেই তার জায়গা হচ্ছিল। প্রচুর খুঁজেও পাইনি আর মনেও করতে পারিনি কোথায় কখন ভুলে রেখে দিয়েছি। ৪ টে নাগাদ আমরা ট্রেক শুরু করি।


ক্যাম্প সাইট পার করে প্রথমেই একটু নেমে যেতে হচ্ছে। উপর থেকে দূরের পায়ে চলার রাস্তার হালকা দাগ কাল দেখেছি। ওই টুকু দাগ বাদে বাকি জায়গাটা পুরোটাই বোল্ডার জোন। এই সময় যেখানে বরফে ঢাকা থাকার কথা , অন্তত বিভিন্ন ভিডিও বা ব্লগে তেমনই দেখেছি। ছোটু কাল বলেছে আমাদের উঠতে ঘণ্টা চারেক লাগবে। ক্যাম্প থেকে পাসে ওঠার দূরত্ব টা বালি বেস ক্যাম্প থেকে পাসে ওঠার মতই, দুটো পার্থক্য, সেখানে আমরা পুরো বরফে ঢাকা সারফেস পেয়েছি এখানে ছোট বড় বোল্ডারে ঢাকা এলাকা, আর সেখানে আমাদের চোখের সামনে টার্গেটটা দেখা গেছে এখানে পাস এর মাথাটা দেখা যাচ্ছে না তবে আন্দাজ করা যাচ্ছে। কিন্তু প্রথমেই আমরা বিরক্তিকর পরিস্থিতির স্বীকার হই, গাইড পোর্টাররা যারা আছে তারা নিজেদের মর্জি মত নিয়ে যাচ্ছে , আমাদের দেখা সেই ট্রেল টা দিয়ে যাচ্ছেনা। হেড ল্যাম্পের আলোয় বুঝতে পারছি সেই পথে অন্য ট্রেকাররা যাচ্ছে, বিকট কা ফৌজ। আমাদের মনে হচ্ছে আমরা অকারণে কঠিন পথ অতিক্রম করছি। ঘণ্টা খানেক চলার পরে আমরা একই রুটে পৌঁছাই। 


ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটছে। যদিও হিমাচলের এই ট্রেক গুলোয় সেই অর্থে সানরাইজ দেখার ব্যাপার নেই , এই রুটে এমন কোনো পর্বতশৃঙ্গ নেই যার মাথার সোনালী মুকুট দেখার জন্য আমাদের তাড়াহুড়ো করতে হবে। যে যার মত এগোচ্ছি। তবে মাঝপথে সবাই একবার মিলিত হয়েছি। আমার যথারীতি পটি পায় , আর বোল্ডারের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে কাজ সেরে আসি। আবার রেডী হয়ে বেরোতে সময় লাগে। ততক্ষণে বাকিরা এগোতে শুরু করেছে। ঘণ্টা দুয়েক চলার পরে পথে বিক্ষিপ্ত ভাবে বরফ পেতে থাকি। আমাদের পথও বাঁদিকে বেঁকে গেছে , যার জন্য নিচে থেকে পাস দেখা যায়নি।


আরও আধ ঘণ্টা পর একটা শক্ত বরফের ঢাল পাই। এর মধ্যে আমায় আরও একবার পটিতে বসতে হয়েছে! তখন আমার সঙ্গীরা তো দুর অন্য ট্রেকার দেরও দেখতে পাওয়া যাচ্ছেনা।  শুধু আমার কয়েক কদম আগে দুটি মেয়ে উঠছে, একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা ট্রেকার অন্য জন তার গাইড তাকে এসকর্ট করে নিয়ে যাচ্ছে। আমিও হাঁফাচ্ছি , তার থেকেও বেশি ভয় লাগছে। কারণ আমি বিপদের গন্ধ পাচ্ছি, মনে হচ্ছে কোনো কারণে যদি গ্রিপ বিট্রে করে তাহলে স্লিপ করে গড়িয়ে যাবো, নিজেকে আরেস্ট করার কোনো সুযোগ পাবনা , ভালো রকম আহত হতে হবে। আমার ভয় বা দ্বিধা মনে হয় ওই গাইড টের পেয়েছে,  আমার সাহায্য লাগবে কিনা জানতে চেয়েছে। যখন বুঝলাম আমার পা স্লিপ করলে ওই মেয়েটি সাহায্য করতে আসবে, আমিও বুকে বল পাই, নিজের চেষ্টাতেই ধীরে ধীরে উঠতে থাকি। বরফের ঢালটা ওঠার পরে আর কিছুটা এগোতেই উপরে জন অরণ্য চোখে পড়ে, বুঝি অভীষ্ট লক্ষ্যের কাছে পৌঁছে গেছি। আমিই মনে হয় শেষে পৌঁছাই, তখন ৭ টা বাজে। বাকিরা ৬ টা থেকে পৌঁছে গেছে এক এক করে। পাসের মাথায় অবশ্য ভরপুর বরফ। পাসের মাথাটা অনেকটা রুপিন পাসের মত, রুপিন পাস এর থেকে বেশি দূরেও নয়। প্রথম দিকে আবহাওয়া একটু কুয়াশা মাখা ছিল। ছোটুকে ফোন করতে দেখে , আগেই বলেছিল পাসের মাথায় লাইন পাওয়া যায়, আমিও মেঘকে পেয়ে গেলাম লাইনে, পাসের মাথা থেকে আপনজনের সাথে কথা বলার অনুভূতি অন্য রকম। এটা ভালো কি খারাপ জানিনা, যদিও ট্রেক পথের অন্য দিন গুলোয় আমি ফোন করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠিনা। কিন্তু এই পাসের মাথায় নেটওয়ার্ক পাওয়া ডিজিটাল ইন্ডিয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া। এর পর প্রথামত এবং আমার নিয়ম মত পাসের মন্দিরে ক্যাডবেরি সহযোগে পুজো করি। সব শেষে তিরঙ্গা নিয়ে আমাদের গ্রুপ ছবি আর জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া। ততক্ষণে আমরা সবাই নিচে নামার ঢাল দেখে নিয়েছি। কারও অজানাও নয় সেটা। ছোটু এখানে একজন ফ্রিল্যান্স এক্সপার্টকে ভাড়া করেছে , যে দড়ি , হার্নেস ইত্যাদি জিনিসপত্র সহ আমাদের নিচে নামিয়ে দেবার দায়িত্বে আছে। ৭:৩০ থেকে নিচে নামার পালা শুরু হলো। পাশে তখন বিকট এর দল ছিল, তাদের ট্রেক লিডার নীরাজের সাথেও আলাপ হলো। দু দলেরই ট্রেকার রা পাশাপাশি দড়ি খাটিয়ে নামছে। আমাদের দলের প্রথম নামছে দেবু। ওদের নিয়মিত নির্দেশ আসছে, সেগুলো ঠিকঠাক করতে পারলে ব্যাপারটা খুব একটা কঠিন কিছু নয়। ভালো করে লক্ষ্য করে যা বুঝি, নিরাপত্তার কোনো অভাব নেই, দুর্ঘটনা ঘটতে গেলে দড়ি ছিঁড়তে হবে বা হারনেস খুলে বা ছিঁড়ে যেতে হবে অথবা যে অ্যাঙ্গেল টা বরফের মধ্যে ফুট চারেক ঢোকানো আছে সেটা যদি বরফের চাঙ্গ ভেঙে বেরিয়ে আসে, তবেই ট্রেকার দড়ির সাথে আলাদা হয়ে গিয়ে অনেকটা গড়িয়ে পড়বে, তবে চোখের সামনেই থাকবে , খাদের আড়ালে পড়ে যাবার মত জায়গা নয়। ট্রেকার নিজে যদি নামার সময় টুকটাক ভুল করে তাহলে খুব একটা বিপদজনক কিছু ঘটবে না , ব্যালান্স হারিয়ে দড়িতেই লটকে থাকবে, মালের বস্তার মত দড়ি ছেড়ে ছেড়ে নামিয়ে দিতে হবে! যাইহোক, এক এক করে সবাই নামার জন্য রেডি হচ্ছে। মজা যেমন আছে তেমনি একটা চাপা ভয় বা দুশ্চিন্তাও নিচয় কাজ করছে সবার মধ্যে। আমার টার্ন ৩/৪ জন পরে এলো, ততক্ষণে বাকিদের নামা দেখে নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলেছি। আমাদের স্টার্টিং এর জায়গাটাই একটু গড়বড়ে, সেটা পার হয়ে যাবার পর আর অসুবিধা হয়নি। স্পিডেই নামতে চাইছি, কিন্তু উপর থেকে দড়ি অত তাড়াতাড়ি ছাড়ছে না। যাইহোক ১০০ মিটার মত নামার পর দড়ি শেষ। সেখানে সামান্য দঁড়ানোর জায়গা, কিন্তু ঢাল কিছু কম নয়। সেফ জোন আরও খানিকটা নিচে। নিজে নামার বা স্লাইড করার সাহস পাচ্ছিনা। আমাদের স্টাফ কেউ নেই, একজন নিচ থেকে উঠছে। অন্য একজন আমাকে কিছুটা নামিয়ে দিয়ে  আমাদের স্টাফ এর কাছে সঁপে দেয়। সেও আমাকে কিছুটা নামিয়ে দেয়। একটা সময় পরে একাই স্লাইড করি। এই পুরো পথে স্যাক কিন্তু আমাদের পিঠেই আছে। স্লাইড করে নামার সময় প্রথমে আমার জলের বোতলটা গড়িয়ে পড়লো, একসময় টের পাই আমার রেন প্যান্ট ( বাইক চালানোর সময় পরে যেগুলো ) ভিতর থেকে ফরফর করে ছিঁড়ে যাচ্ছে। পুরো ব্যাপারটায় মজাও যেমন পেয়েছি ভয়ও তেমন পেয়েছি। মুহুর্তের ভুলে আহত হতে হত। ৮:৩০ এর মধ্যে আমরা সবাই নিচের সেফ জোনের একটা রকের কাছে পৌঁছে যাই। একটা মহিলা দল সেখানে জড়ো হয়েছে আগেই। সানি নামার সময় শেষদিকে একটু গড়িয়ে চোট পেয়েছে, হাত পা কোমর ছ'ড়ে গেছে। মারাত্মক চোট কিছু পায়নি। এই দিক থেকে পাসের মাথা আর নেমে আসার ঢালটা খুব সুন্দর লাগছে, ততক্ষণে রোদ উঠে গেছে , সাদা বরফের মাথায় নীলাকাশ। অপূর্ব  ভয়ংকর সে সৌন্দর্য্য। ভেবে ভালো লাগছে যে আমরা সবাই পাস অতিক্রম করে ভালো ভাবে নেমে এসেছি।


বরফের মধ্যে দিয়েই আরও ঘণ্টা খানেক নামার পর আমরা এক জায়গায় পাথরের উপর বসে টিফিন করি। শুকনো পরোটা আর আলু চোখা। খুব একটা খাওয়া গেলনা। ১০ টা বেজে গেছে। আমরা এগোতে থাকি, বরফ যেনো আর শেষ হয়না , পিছনে তাকালে তখনও পাস দেখা যাচ্ছে। একটানা বরফ শেষ হবার পরেও মাঝে মধ্যেই বিশাল বিশাল বরফের ঢাল পাচ্ছি। তবুও খুব একটা অসুবিধা হচ্ছেনা , সবাই নেমেই যাচ্ছি এক এক করে। ১০:৩০ নাগাদ আমরা একটা জায়গায় সবাই মিলে বসে বিশ্রাম নিই , যেখানে পিছনে বরফাবৃত পথ , কিন্তু পাস দেখা যাচ্ছেনা আর সামনের পথ বরফহীন। সামনের এই বরফহীন ঝুড়ো পাথুরে এলাকার সরু পথ টাই বেশি কঠিন ঠেকছে। ১১:৩০ নাগাদ আমরা নেমে এলাম একটা নদী খাতের মধ্যে, তারই একপারে একটি ঝুপড়ি দোকান! এখানেও সবাই মিলিত হয়ে চা - ওমলেট বিরতি নিই। বিশাল নদী খাত পেরিয়ে আবার উপরে উঠতে হলো। এই এলাকা হালকা সবুজ , পাথুরে এলাকা। হয়ত বরফেই ঢাকা থাকে, বরফ গলে গেলেও এখনও ঘন সবুজ ঘাস গজায়নি। এরকমই একটা পাহাড়ি ঢালের নুড়ি ধুলো মেশানো সরু পথ পার হতে গিয়ে আমি থেমে গেছি , বুঝতে পারছিনা সামনের দু চারটে স্টেপ নিশ্চিতে নিতে পারবো কিনা , আবার মনে হচ্ছে জুতোর গ্রিপ বিট্রে করে পাশে গড়িয়ে পড়লে সরাসরি উপরে না গেলেও ভায়া হাসপাতাল যেতে হতেই পারে! কিন্তু উদ্ধার করে নিয়ে যাবে কে! কোনো রিস্ক নেওয়া যাবেনা , বাড়িতে মেঘ - বৃষ্টি অপেক্ষা করে আছে , আমাকে সুস্থ শরীরেই ফিরতে হবে। তাই আমি বেশ কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়েই থাকি, কারণ কাছে কাউকে সাহায্য করার মতো দেখছিও না। হটাৎ পিছন থেকে কেউ আমায় হালকা সরিয়ে আমার ডান দিকে খাদের দিক দিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে আমি কোনরকমে বাঁদিকের পাহাড়ের ঢালে হেলে খামচে ধরি। কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। তাকিয়ে দেখি সুব্রত। আমার মুখ থেকে এ কে ফর্টি সেভেনের গতিতে গুলি বর্ষণ হচ্ছে তখন। বাঁদিকে না হেলে আমি ডান দিকে হেলে গেলেই দুজনেই গড়িয়ে পড়তাম। যাইহোক ঘোর কাটার পরে কারও হাত ধরে জায়গাটা পার হই। পাসে ওঠার মুখে আর এই জায়গাটা, হয়ত মারাত্মক বিপদজনক কিছু নয় কিন্তু আমি ভয় পেয়েছি, সতর্ক হয়েছি। তাড়াহুড়ো করে পার হবার চেষ্টা করিনি। ১২:৩০ এর আশেপাশে সময়ে আমরা প্রবেশ করি গ্রীন জোনে। চলার পথের ঘাস তখন সত্যিই সবুজ। ধীরে ধীরে চলার পথে গাছও পাচ্ছি। দূরে দেখা যাচ্ছে আমাদের আজকের ক্যাম্প সাইট। 


আরও এক ঘন্টা চলার পরে আমি যখন ক্যাম্পে পৌঁছাই তখন সময় ১:৩০ । নদীর ধারেই ক্যাম্প, গর্জন শোনা গেলেও নদী কিঞ্চিৎ নিচে চোখের আড়ালে যদিও দূরে নদীর নেমে আসাটা চোখের সামনে।  সবুজ ঘাস, পাইন গাছের সারি , সবুজ বা সাদা পাহাড় চূড়া, সব মিলিয়ে অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ। একটু পরে যা বুঝি, এটা একটা ফ্রিল্যান্স ক্যাম্প, একরাতের জন্য আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে এখানে। মানে ঢুন্ডা থেকে আমাদের ক্যাম্প গুটিয়ে নীচে ফেরত চলে গেছে , পোর্টাররা আমাদের স্যাক দুটো নিজেরাই বয়ে নিয়ে এসেছে। মেক শিফট ব্যবস্থা।  আমরা নিজেরা আসলে এই ব্যবস্থা গুলো করে উঠতে পারতাম না। আমাদের ক্যাম্পে আর কোনো দল নেই , প্রচুর টেন্ট। জয়দীপ প্রথমেই একটা টেন্টে ঢুকে বলে ও সেটায় একাই থাকবে! ওকে এই কদিনে প্রায়ই লক্ষ্য করেছি এমন একা হয়ে যেতে চেয়েছে। টিমের সাথে এসে এমন একা হবার ইচ্ছা গ্রহণযোগ্য নয়, বরং কখনো কখনো দুশ্চিন্তার কারণও হয়ে ওঠে। আমাদের আগে পরেও দুটো ক্যাম্প আছে। উপরে একটা ঝুপড়ি দোকান চোখে পড়ায়, আমি আর সুব্রত সেখানে যাই। সেদ্ধ ডিমের অর্ডার দিই। উপরেও ক্যাম্প নজরে পরে। একজন মহিলার সংসার এটি, সাথে স্থানীয় আর ট্রেকার দের ভরসায় ছোট দোকানও চালান। ২০/- করে সেদ্ধ ডিম। উপরে সামান্য নেটওয়ার্ক পাওয়া গেছে , বাড়িতে ফোন করে জানাই আমরা সেফ জোনে নেমে এসেছি। ক্যাম্পে ফিরে টাটকা ডিম সেদ্ধ খাওয়া হলো, শুধু তাই নয় কৌশিকের কাছে একটা সেদ্ধ ডিম ছিল জাংলিকের টিফিনে পাওয়া , সেটাও খেয়ে নিল ! যাইহোক, আমরা ট্রেকের কঠিনতম দিনটা মোটামুটি ভালোভাবেই পার করে সবাই সুস্থ ভাবে তাঁবুর আরামেঢুকে পড়েছি। কাল আমাদের ট্রেকের বিজয়া দশমী।



০৪/০৬/২০২২ , শনিবার - আজ আমাদের ট্রেক এর শেষ দিন,  বিসর্জন। আমাদের এতদিনের কষ্ট, বিরক্তি, খারাপ লাগা , মন কষাকষি ইত্যাদি এই বসপা ভ্যালি তেই বিসর্জন দিয়ে আমরা নিয়ে যাবো অভিজ্ঞতা , ভালোলাগা আর সুন্দর স্মৃতি। আমাদের নির্ধারিত সূচী অনুযায়ীই আমাদের ট্রেক শুরু হয়েছে , শেষও হচ্ছে। আবহাওয়া বা অন্য কোনো অনভিপ্রেত ঘটনা আমাদের সূচিতে ব্যাঘাত ঘটায়নি। আজ আমরা ১০৫০০ ফিট উচ্চতার মুনিরাং থেকে নেমে যাবো ৮ কিমি দূরে ৭৫০০ ফিট উচ্চতার বড়ুয়া গ্রামে। সেখানে সুব্রতর ঠিক করা সানি ট্রাভেলসের গাড়ি অপেক্ষা করবে। কাছেই করছাম , শিমলা কল্পা রাস্তায় , যেখান থেকে সাংলা ছিটকুলের রাস্তা আলাদা হয়েছে। আমাদের প্ল্যান সরাসরি শিমলা না ফিরে , কারণ ফিরতে অনেক রাত হত, সাংলা ছিটকুল ঘুরে রাত্রে ট্রাভেল করে পরদিন ভোরে শিমলা ঢোকা , সেভাবেই হোটেল বুক করা আছে। আজ রাতেও শিমলার হোটেল বুক করে ফেরা যেত, কিন্তু সেটাতে অনিশ্চয়তা থাকতো, মানসিক চাপ বাড়ত। 


আমাদের সকালে উঠে হাঁটা শুরু করে দেবার তাড়া থাকলেও , গাইড যেনো প্রথম দিন থেকেই গা ছাড়া মনোভাব। উদ্যোগের অভাব। একটা কথা লেখা হয়নি , প্রতিদিন ট্রেক শুরুর আগে আমরা নিজেদের চিয়ার আপ করার জন্য নাড়া লাগাতাম। টিম ইন্ডিয়া এক কালে যেমন করতো আর কি। আইডিয়া টা আসে, প্রথম দিন ক্যাম্পে আসার পর দেখি অন্য দল গুলো নানা কিছু করছে বা ট্রেক লিডার তাদের দিয়ে করাচ্ছে, আমাদেরও কিছু একটা করা দরকার। ওই "হাউ ইস দ জোশ" টাইপের আর কি। চিৎকার করে জয়ধ্বনি দেওয়া। আজও শেষ বারের মত বুরানঘাটি কি জয় , ট্রেক মেট কি জয় টয় বলে আমরা ৮ টার কিছু আগে ক্যাম্প ছাড়ি। সেই উপরেই উঠতে হচ্ছে , দোকান টার ঐদিকে। উপরে উঠে আমাদের অনেক্ষন অপেক্ষা করতে হলো গাইডের জন্য। অন্য দিকে সামান্য নিচে তখন বিকট এর ক্যাম্পের ফটোসেশন চলছে। আধ ঘন্টা হাঁটার পরেই বোঝা গেলো আমরা সবাই নবকুমার হয়ে গেছি , আর আমাদের প্রয়াত বাংলা শিক্ষক অবনী স্যার স্বর্গ থেকেও সুর করে জিজ্ঞেস করছেন , পথিক তোমরা কি পথ হারাইয়াছো?! তিনটের কেউ পথ জানে বলে মনে হলোনা , এতদিন পথ হারানোর মত পথ ছিলনা , আজ যেনো পথ হারাবে বলেই তারা পথে নেমেছে, চোরা পথের ধাঁধায় তারা অনেক ঘুরেছে! আধ ঘন্টা সময় শুধু নষ্ট হলোনা, সেই জায়গাটা থেকে নিচের পায়ে চলার পথের দাগে পৌঁছতে বেশ মেহনত করতে হলো, দুর্ঘটনাও ঘটতে পারতো। তার পর আমরা ক্রমশ দ্রুত নিচে নামতে থাকি। কোথাও মনে হয়েছে এটা সঠিক রাস্তা নয় , কোনো চিহ্ন নেই, আবার কখনো মনে হয়েছে এরকম বাজে রাস্তাই হবে হয়ত। আমরা একদম নিচে নদীতে নেমে যাচ্ছি ধীরে ধীরে। আর নামার সে রাস্তা বড়ই বিপদজনক। আছাড় খেয়ে পড়লে, যার প্রবল সম্ভাবনা, পচা শামুকে পা কাটিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। এই ভাবেই ৯:৩০ নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই পাহাড়ি ঝোড়ার উপর রাখা দুটি লগের কাছে। খুব একটা কঠিন না হলেও ভয়ে ভয়ে পার হয়েই গেলো সবাই। এটা আর একটু নিচে মূল নদীতে গিয়ে মিশেছে প্রবল গর্জন তুলে। কিছুক্ষণ সময় কাটাই ছবি তুলে। নামা মানেই ওঠা, আর ফেরার সময় উঠতে বড়ই অনীহা আমার। কিন্তু নামা তো শেষ হয়নি , আবার দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু হলো ভয়ংকর নামা। ততক্ষণে আমরা নিশ্চিত হয়ে গেছি যে ভুল পথে না আসলেও সঠিক পথেও আমরা আসিনি। কোনো ট্রেকার বা স্থানীয় কারও সাথেই এই পথে সাক্ষাৎ হয়নি। আমাদের বিশ্বাস ট্রেকার দের জন্য অন্য ভালো পথ নিশ্চই আছে। সানির কালকের চোটের পর আজ আরও কাহিল অবস্থা। তার উপর এমন বিপদজনক উৎরাই। ওর মুখ দেখে মনে হয়নি ও নিজে ব্যাপারটা এনজয় করছে। ওকে মানসিক ও শারীরিক ভাবে আরও ফিট হয়ে উঠতে হবে। নতুন ট্রেকার দের বলতে চাই , আগে মানসিক ভাবে পাহাড়ে হাঁটার জন্য প্রস্তুত হও। প্যাশন থাকতে হবে , আগ্রহ থাকতে হবে , ভালোবাসা থাকতে হবে , সব গুলোর অর্থ হয়ত একই কিন্তু থাকতে হবে। নিজের কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে তুমি এত কষ্ট করে খরচ করে কোথায় যাচ্ছ আর কেনই বা যাচ্ছ। অন্য যেকোনো কারও অনুরোধে উপরোধে বা উস্কানি তে কিংবা সোশ্যাল সাইটের দুর্দান্ত সব ছবি দেখে নেচে ট্রেক করতে চলে আসলে হবেনা। আগে মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে হবে। নাহলে পুরোটাই মাটি। এর পর দরকার প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা। এটা একটু কম থাকলেও তোমার যদি মানসিক প্রস্তুতি ঠিক থাকে তাহলে মেক আপ দেওয়া সম্ভব একটা পর্যায় পর্যন্ত। কিন্তু ধরো তুমি চূড়ান্ত ভাবে ফিট , এইসব পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটা তোমার কাছে কোনো ব্যাপার না কিন্তু তোমার মন সাথ দিচ্ছে না , তুমি কিছুই উপভোগ করতে পারবে না। তাই ঠ্যাং ছাড়া পাহাড়ে হাঁটা সম্ভব হলেও মন ছাড়া একেবারেই উচিৎ নয়। নাহলে আবার কখনো শুনতে হতে পারে , সোনালী আবহাওয়ায় নীলাকাশে সাদা পেঁজা তুলোর মেঘের চতুর্দিকে এক সে বারকার এক পর্বত শৃঙ্গেকে সাক্ষী রেখে সম্পূর্ণ রূপে বরফাবৃত তপোবনের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আকাশগঙ্গার পাশে দাঁড়িয়ে , " দীপুদা , এখানে আর কিছু দেখার নেই ?" ! এই প্রশ্ন যতটা না অজ্ঞানতা থেকে তার থেকে বেশি হতাশা থেকে। কারণ সেই প্রকৃতি পরিবেশ তার মনের খিদে মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। 


১০:৩০ নাগাদ আমরা সভ্য জগতে ঢুকতে শুরু করি। জলের পাইপ দেখা যায়, কচি সবুজ আপেল বাগান , পাহারাদারের ঘড়, পঞ্চায়েতের কাজের নিশানা ইত্যাদি। কিন্তু গ্রাম তখনও অনেক দূর। ১১:৩০ নাগাদ আমরা গ্রামের ঘর বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করতে শুরু করি। দুপুর ১২ টার মধ্যে আমরা সবাই বড়ুয়া গ্রামের শেষ প্রান্তে , বা শুরুতে, পার্কিং এলাকায় পৌঁছে যাই। 

অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে , বিভিন্ন দলের জন্য অপেক্ষা করছে। এই গাড়ি গুলো মূলত গাইড এজেন্সি ঠিক করে দেয়, ফলে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে পারে সহজে। কিন্তু আমাদের গাড়ির আর দেখা নেই।আমাদের তো শিমলার ট্রাভেল এজেন্সির গাড়ি, যারা শুধু টুরিস্ট স্পট ঘুরিয়ে দেখায়, এইসব প্রান্তিক জায়গা গুলোর সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণা নেই , আর আমরাও প্রথম। ফলে ড্রাইভারের সাথে ফোনে কথা বলে তাকে বোঝানোই দুঃসাধ্য যে আমরা কোথায় আছি। স্থানীয় একজন বলে দেবার পরেও গাড়ি পৌঁছালো প্রায় এক ঘন্টা পরে। একটা শিক্ষা হলো যে , ট্রেক শেষে গাড়ির দরকার হলে সেটা গাইড এজেন্সির মাধ্যমে নেওয়াই ভালো। কারণ তারা এমন গাড়ির ব্যবস্থাই করবে যারা সেই জায়গা গুলো চেনে,  তাদের সাথে যোগাযোগও রাখবে আর সবথেকে বড় সুবিধা , নির্ধারিত দিনে ট্রেক শেষ না করতে পারলেও কোনো চাপ নেই। 


বিসর্জন শেষ, এবার ঢাকি বিদায়ের পালা। ঢাক যে এরা খুব তালে বাজিয়েছে তা নয়, তবুও এই কদিন এরাই আমাদের দেখ ভালো করেছে , আমাদের সখ পূরণ করতে প্রাণপাত করেছে। তাই এই গাইড পোর্টাররা যেমনই হোক না কেনো , সুষ্ঠ ভাবে ট্রেক শেষ হলে তাদের সম্মান জানানোটা আমাদের কর্তব্য। কিন্তু এটাও বলতে হবে আর এর থেকে বাঁচার উপায়ও খুঁজতে হবে , দুটো ট্রেকে আমরা অনভিজ্ঞ গাইড বা সাপোর্টিং স্টাফ পেলাম, ছোট এজেন্সির মাধ্যমে গিয়ে। যাদের নাম শুনে আমরা এদের সাথে কথা শুরু করি , তারাই আসলে এজেন্সি চালায় , বলাই বাহুল্য  নিজেরা সব সময় সাথে যেতে পারেনা। যাদের আমাদের সাথে পাঠায় তারাও যথেষ্ট অভিজ্ঞ হচ্ছেনা, যদিও তাদের সাহায্য করার চেষ্টা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই , তবুও কোথাও একটা খামতি থেকে যাচ্ছে। যেকোনো দিন যেকোনো দল এই অনভিজ্ঞ সাপোর্টিং স্টাফ দের জন্য বিপদে পড়তে পারে। আর এবারে তো মাত্র তিনজনেই আমাদের সাতজনকে সালটে দিলো পুরো ট্রেক, বালি পাসের সময় ১০ জনের জন্য ১০ জন ছিল, রুপিন পাসে ৪ জনের জন্য ৬ জন, বাসুকি তালে ৯ জনের জন্য ১০ জন ছিল, এতো কম স্টাফ কখনোই ছিল না। ভালো গাইডরা সব বড় এজেন্সির সাথেই চলে যাচ্ছে। আমরা যদি মনে করি নিজেরা অ্যারেঞ্জ করে যাবো, গাইড পোর্টার নিয়ে , আমরাও কিন্তু ভালো অভিজ্ঞ স্টাফ জোগাড় করতে পারবো না। এটা একটা ক্রাইসিস। ধীরে ধীরে নিরাপত্তার কারণেই ট্রেক বড় এজেন্সি নির্ভর হয়ে পড়বে। মনে পড়ে যাচ্ছে কখনো আমি গাইড হিসেবে উমেদ রানা বা মোহন সিং বা জর্জ নেগী কে পেয়েছি। এদেরও আর ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে কিনা নিশ্চিত নই।


দুপুর ১ টার পর আমাদের গাড়ি ছাড়লো। প্রথমেই খানিকটা তর্কাতর্কি। সে রাস্তা চিনতে পারেনি আর এতো দূর আসতে হয়েছে বলে আর আমরা দেরি হয়েছে বলে। তার উপর ছোট গাড়ি, টেম্পো ট্রাভেলার বা ফোর্স পাঠায়নি। দোষটা যে কার মীমাংসা হলোনা! ২:৩০ এ আমরা সাংলা ঢুকে পড়ি। বাংলায় লেখা খাবার হোটেল দেখে নেমেও যাই। মাছ ভাত হবেনা, ডিম ভাতও দেরি হবে। বাঙালি পর্যটন ব্যবসায়ী তখন তাদের সাইট সিন সেরে ফেরা এক গাড়ি বাঙালি নিয়ে ব্যস্ত। আমরা এগিয়ে চলি আমাদের চেনা জায়গার খোঁজে। ২০১৫ সালে রুপিন পাস থেকে ফিরে যেখানে খেয়েছিলাম। খুঁজেও পাই সেই আশিয়ানা, কিন্তু থালি ছাড়া কিছু নেই। আমরা অন্য একটা একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে কেউ ভাত কেউ নুডুলস অর্ডার করি। তখন ৩ টে বাজে। ছিটকুল রিভার ভিউ পয়েন্টে পৌঁছাই, গাড়ি থেকে নেমে অনেকটা হেঁটে, যদিও ওই দিকেও গাড়ি যাচ্ছে , প্রায় ৫ টা। নদী খাতে আর নামার ইচ্ছে হয়নি। কারণ দৃশ্যটা মনোমুগ্ধকর নয়, আবহাওয়াও ভালো নয় , না বরফ না সবুজ উপত্যকা। অন্য সময় নিশ্চই এই জায়গা খুবই সুন্দর , কিন্তু আমাদের লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট হলোনা। ছিটকুল ক্যাফেতে বসে চা ওমলেট খেয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটাই। এখানেও নানা জায়গায় "ভারত কা অন্তিম" মার্কা লেখা চোখে পরে। সন্ধ্যার মুখে আমরা শিমলা ফেরার জন্য গাড়িতে উঠি।


০৫/০৬/২০২২, রবিবার - সারারাত গাড়ি চলেছে। এর আগে সারারাত গাড়িতে বা বাসে যাইনি তা নয় , কিন্তু এমন আতঙ্ক আগে হয়নি। হিমাচলে এখন টুরিস্ট দের পিক সিজন চলছে। গাড়ি আর ড্রাইভার প্রয়োজনীয় বিশ্রামের সময় পাচ্ছেনা , একটা ডিউটি শেষ করে আর একটায় ঢুকে পড়ছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে এইভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে কাজ করতে হয়। আমরাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যাচ্ছি। কিন্তু মনে হলো ওই দশ বিশ মিনিটের চা ব্রেক দিকে হবে না। বড় ব্রেক দরকার। রাত তিনটের পরে আমরা ড্রাইভার কে বলি একটু শুয়ে নিতে, ভোরের আলো ফুটলে আমার আবার বেরোবো। মাঝ রাতে আমরা একটু খাওয়া দাওয়া করলাম। কিন্তু সময় কাটানো বড়ই দুষ্কর। ঘুম চোখে মশার কামড় খেয়ে ঘণ্টা খানেক কাটানো বেশ কঠিন ব্যাপার। ৫ টার সময় আমরা গাড়িতে উঠলাম। এবার আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ছি , ড্রাইভারকে পাহারা দিয়ে জাগিয়ে রাখার কেউ নেই। আমি সামনে বসে চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু কখন যে চোখের পাতা জুড়ে যাচ্ছে নিজেও বুঝতে পারছি না। রাত্রিকালীন সফরে চোখ লেগে আসার কারণে সব থেকে দুর্ঘটনা ঘটে এই ভোর ,৪ টে থেকে ৬ টার মধ্যে। এই ভাবেই আমরা শিমলা পৌঁছে যাই ৭:৩০ নাগাদ। আমরা অকল্যান্ড টানেলের মুখে নেমে যাই। তারপর উপরে উঠে , চড়াই রাস্তা দিয়ে লক্কর বাজার এলাকা পার করে আরও উপরে উঠে পৌঁছে যাই ম্যালে আর চার্চের পিছন দিকে। সেখান থেকে পিছন দিকে আরও চড়াই ভেঙে খুঁজে পেতে পৌঁছাই আমাদের বুকিং করা অশোকা হোটেলে।  ম্যাল থেকে কাছেই, কিন্তু খুব ভালো জায়গায় তা বলা যাবেনা। সিমলায় রুম দেয় সব দুপুর ১২ টার পর। আমাদের একটা রুম দিয়ে দেয় ফ্রেশ হবার জন্য। সেখানে ব্রেক ফার্স্ট করে নিই ফ্রেশ হয়ে। পরে আমাদের বড় রুমটা দেয়। দোনোমনা করেও শেষ পর্যন্ত সবাই শিমলা কালি বাড়িতেই মাছ ভাত খেতে আসে, জয়দীপ ছাড়া। সস্তায় বাঙালি খাবার। কালি বাড়িতে রুম পাইনি কারণ , পরদিন থেকেই ওদের ড্যান্স ড্রামা ফেস্টিভ্যাল শুরু হবে। ২০১৫ সালেও আমরা এটা দেখেছিলাম। রেল স্টেশন এইদিকে থেকেই যাওয়া সম্ভব , তাই আমরা আগামী কালের লাঞ্চ কুপনও কেটে নিই, ডিম মাছ দুটো মিলিয়ে, তাতেও ১১০/- পেট ভরা খাবার। ম্যালের উপর বিরাট সঙ্গীতানুষ্ঠান চলছে কদিন ধরেই। প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন এই মঞ্চে দুদিন আগেই। তাই ম্যাল পুরো হাওড়া স্টেশন। আমরা সন্ধ্যা বেলায় একটু এদিক সেদিক ঘুরে, মেয়ের জন্য কিছু খেলনা কিনে হোটেলে ঢুকে যাই। রাতের আলোকোজ্জ্বল শিমলা বিশেষ করে ম্যাল সংলগ্ন এলাকা, লাইব্রেরী, চার্চ অসম্ভব সুন্দর লাগছে। ম্যাল তখন নাচছে গানের তালে তালে। শিমলা পুলিশের একটা দলকে পারফর্ম করতে দেখে দারুণ লাগলো। অনুষ্ঠান এলাকার পাশে মেলাও বসেছে নানা দোকানের। যাইহোক, আমাদের আজ সাকসেস পার্টি ফলোড বাই ডিনার ! থ্রি চিয়ার্স ফর ট্রেকমেট। আমি ট্রেকমেট দের অনুভূতি ভিডিও করি, সেই বালি পাস থেকে ফিরে আসার পরে যেমন করেছিলাম। এবার আমাদের আসরের পর্দা টানতে হবে কারণ বাকিটা ব্যক্তিগত।


০৬/০৬/২০২২ , সোমবার - সক্কাল সক্কাল উঠে আমরা হেঁটে পৌঁছে যাই ঝাখু পাহাড়ের হনুমান মূর্তির পাদদেশে। আমাদের হোটেলের পিছনের পাহাড়েই এটি, এক দেড় কিমি মত চড়াই রাস্তা। দুই ভাই আসেনি, আগে এসেছে বলে কিন্তু জয়দীপও এলোনা ! সেই একলা হবার রোগ। আমি, দেবু, কৌশিক আর সুব্রত জায়গাটা ঘুরে দেখি এক ঘন্টা ধরে। ছবি তোলার ভালো জায়গা। সুন্দর করে সাজানো বাগান চত্বরের মধ্যে বিশাল হনুমান মূর্তি, যেটা শিমলা শহর, ম্যাল থেকে দৃশ্যমান , একটা শিব মন্দির, অনেক খাবার জায়গা নিয়ে ভালো টুরিস্ট স্পট। কিন্তু খাবার দোকান গুলো তখনও না খোলায় আমরা লক্কর বাজারে এসে টিফিন করি। একটু কেনাকাটা করাও হয়। আমরা হোটেল ছাড়ি দুপুর ১২ টায়। সবাই মিলে হাঁটা লাগাই শিমলা কালি বাড়ির উদ্দেশ্যে। হোটেল থেকে ম্যাল ৫ মিনিট, ম্যাল থেকে কালীবাড়ি আরও ১০ মিনিট। কাল আমাদের সাঁটিয়ে খেতে দেখে আজ মনে হচ্ছে একটু টেনে পরিবেশন করছে। আজ ডিম মাছ দুটো থাকা সত্বেও কালকের মত গোগ্রাসে খাওয়া গেলনা। বিকাল ৪ টের টয় ট্রেন ধরার জন্য আমরা হেঁটেই যেতে থাকি স্টেশনের দিকে। কালি বাড়ি থেকে ১৫ মিনিটের রাস্তা। জেনারেল টিকিট কেটে বসার জায়গা দখল করার জন্য আগেই পৌঁছতে হচ্ছে। তবে এতে মাত্র ৫০/- তে টয় ট্রেন সফর করা যাচ্ছে , শিমলা থেকে কালকা পর্যন্ত। এই ভাবে সস্তায় যে যাওয়া যেতে পারে, এটা আমাদের বলেছে দুই ভাই সানি আর রাহুল। ওরা এর আগে গেছে এই ভাবে। এই রেল পথের বিশেষত্ব প্রচুর টানেল। তবে এই সময় পথের সৌন্দর্য্য আহামরি কিছু মনে হলনা। এই পথে বরফ থাকে যখন , তখন অসাধারণ লাগে। আবার সবুজ থাকলেও ভালো লাগে। কিন্তু এই সময়টায় সবকিছুই কেমন যেনো ফ্যাকাশে। মাঝপথে সোলাং ভ্যালি দেখতে ভালই লেগেছে। সময়মত কালকা পৌঁছে যাই, আমাদের ট্রেন ছাড়ার আগে ঘণ্টা দুয়েক সময় আছে। সানির শরীরটা ভালো না থাকায় ও আমাদের স্যাক গুলো নিয়ে টিকিট কেটে ওয়েটিং রুমে থেকে যায়। বাকিরা যে যার মত খাওয়ার জন্য বেরিয়ে পরে। আমি সুব্রত রাহুল গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে হাঁটতে থাকি। কোথাও কিছু নেই। কাউন্টার আছে একটা কিন্তু বসার জায়গা কই ! খুঁজতে খুঁজতে জুগার একটা হয়েই গেলো, একটা এমন রেস্টুরেন্ট পাওয়া গেলো। সেখানেই খানাপিনা সেরে আমরা ট্রেনে উঠি। সবারই এসি বগিতে এবার, কিন্তু জায়গা কারও একত্রে নয়। পরের দিন পুরো ট্রেনে কাটিয়ে তারপর দিন সক্কাল সক্কাল আমরা হাওড়া স্টেশন পৌঁছে যাই। মেঘ মসলন্দপুর থেকে গাড়ি ভাড়া করে আমাকে নিয়ে যেতে এসেছে। মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। বিবি হো তো অ্যায়সি! মনে পড়ে যায় , মুঘলে আজমের সেই বিখ্যাত ডায়লগ, " বাখুদা, হাম মহব্বত কে খিলাফ নেহি , আপনে উসুলো কে গুলাম হ্যায় " ! আমার বউ যেনো সেই সুরেই বলতে চায় , " হাম ট্রেকিং কে খিলাফ নেহি ,  আপনে কর্তব্য কে গুলাম হ্যায় " !!!

Thursday, August 27, 2015

অমরনাথের পথে

অমরনাথের পথে 


ভূমিকা :- কালকূট কে শ্রদ্ধা না জানিয়ে এই লেখা শুরু করা উচিত হবেনা কারণ আমার শৈশব ওনার ধর্মীয় ভ্রমন কাহিনী পরে সমৃদ্ধ হয়েছিল। 

সব ট্রেক বারবার অমরনাথ শেষবার , এই ছিল আমার স্লোগান ! কারণ এই ট্রেকের জন্য ব্যবস্থাপনা লাগেনা , খরচও যত্সামান্য , তাই বেশী বয়েসেই এটা যাবার ইচ্ছে ছিল।  এই ট্রেকটার কাঠিন্য সম্বন্ধেও তেমন কোন ধারণা ছিলনা , কারণ বুড়ো-বুড়ি সবাই যায় শুনেছি। তাছাড়া অমরনাথ যাত্রার জন্য অনুমতি বার করাটাও আমার কাছে বেশ বিরক্তিকর ব্যাপার তাই অতি সম্প্রতি এই ট্রেক টায় যাবার কোন পরিকল্পনা ছিলনা।  সময়টা এপ্রিল মাস '২০১৫ , আমাদের রুপিন পাস ট্রেকের পরিকল্পনা তুঙ্গে কিন্তু কিছুতেই ৪ জন যোগার হচ্ছিলনা ওদিকে নেপালে আবার ভয়াবহ ভূমিকম্প , ফলে ট্রেকটা হবে কিনা আমি নিশ্চিত ছিলাম না।  ততদিনে নিলাব্জ তার কযেকজন কাছের মানুষদের নিয়ে অমরনাথ যাবার ১৪ জুলাইয়ের পারমিট বের করেছে জানতাম।  অবশেষে একদিন নিলাব্জকে ফোন করলাম আর পরদিন মানে ৬ই মে ওর সাহায্যে চুঁচুঁড়া হাসপাতাল থেকে মেডিকেল সার্টিফিকেট বের করে চন্দননগরের পি এন বি থেকে ১৪ই জুলাইয়ের পরে থাকা দুটির মধ্যে একটি পারমিট আমি পেয়ে গেলাম।  ব্যাঙ্কের কাজটা প্রথামত হল , ৫০/- জমা দিয়ে একটা ফর্ম পূরণ করে মেডিকেল সার্টিফিকেট ও আইডেন্টিটি কার্ডের কপি সহ জমা দেবার পরে , খালি পরে থাকা তারিখ আমার সাথে কথা বলে পাকা করে দিল। পুরোটাই অনলাইন ব্যবস্থাপনা।  আপনার এলাকায় কোন হাসপাতাল বা ব্যাঙ্ক থেকে এইকাজ গুলো করা যাবে সেটাও অনলাইন এ অমরনাথ শ্রাইন বোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়।   আমি ছবি সহ পারমিটের তিনটি পার্ট একত্রে পেলাম।  কিন্তু হাসপাতাল থেকে মেডিকেল সার্টিফিকেট বের করার ব্যাপারটা বেশ জটিল ও বিরক্তিকর।  আমি যে সব নিয়ম মেনে করেছি তা নয় , তাই তার বিবরণ এখানে দিলাম না ।  শুধু এটুকু পরামর্শ দিতে পারি 'যে যার সরু লাইন , মোটা লাইন , পরিচিতি কাজে লাগিয়ে এই ব্যাপারটা যত সংক্ষেপে সারতে পারবেন সেরে ফেলুন। এখানে নিলাব্জই আমাকে সে ব্যাপারে সাহায্য করেছে , নইলে এমনিতেই সরকারী হাসপাতালে যাওয়া হয়না , একা একা গেলে ২/৩ দিন লেগে যেত মনে হয় !  তবে জটিল অসুস্থতা লুকিয়ে কেও অমরনাথে যাবেন না। পারমিট হাতে পাবার পরে মৈত্রেয়ীদি , সুখেন্দুদের বাড়ি যাবার পথে স্বাস্থ্য দপ্তরে রুপাদির সাথেও দেখা করলাম , এরা সবাই অমরনাথ যাবে।  ইতিমধ্যে আমাদের রুপিন পাস ট্রেকও নির্ধারিত সময়েই ( ২৭ মে থেকে ৯ জুন ) সম্পন্ন হয়।  রুপিন পাস যেতেই অনেক কাঠখড়  পোড়াতে হয়েছিল মেঘের কাছে তারপর পরের মাসেই আবার অমরনাথ , সে এক চরম অশান্তি ! তিনমাসের গুড়গুড়িকে রেখে কোন বাবাকেই বা যেতে দিতে চাইবে। তবুও আমার বিশ্বাস ছিল মেঘ আমাকে যেতে দেবেই ! যাবার আগে আমার শ্বশুর-শাশুড়ীর কাছেও তথ্য যোগার করেছি , ওনারা ২০১১ তে গেছিলেন। কথা বলেছিলাম মুম্বাইবাসী রুদ্রদার সাথেও , সম্ভবত দুবার গেছিলেন আর প্রথমবারে কাছ থেকেই দর্শন করেছিলেন, ছবিও তুলেছিলেন , এখন যেটা অসম্ভব।  ইতিমধ্যে সুখেন্দুর হাত ভেঙ্গে যাওয়ায় ওরা তিনজন যেতে পারবেনা জানিয়ে দেয়। আমাদের দল হয় ৬ জনের। 

১১/০৭/১৫ - অফিসের কাজে আটকে যাওয়ায় শেষ মুহুর্তে সূচী বদল করে আমাকে একাই যেতে হচ্ছে। ওরা সবাই কালকেই হিমগিরিতে রওনা দিয়েছে।  আমি যুভা তে দিল্লী গিয়ে শ্রী শক্তিতে জম্মু পৌঁছাব ১৩ ই জুলাই ভোর রাতে , সেখানে ওদের সাথে মিলিত হয়ে পহেলগাম যাব একসাথে।  আমি রওনা হবার আগেই জেনে গেছিলাম ওদিককার আবহাওয়া পরিস্থিতি খারাপ। যাত্রা বন্ধ , জম্মু থেকে রাস্তাও বন্ধ ইত্যাদি নানা খবর পাওয়া যাচ্ছিল।  পার্থদা , রনিতদা , মেঘ এরা আমায় ফোন করে খবর দিচ্ছিলেন । আমিও আমার ভাগ্নি - জামাই শোভনকে ফোন করে রাখলাম , যদি জম্মু থেকে এগোতে না পারি তাহলে অমৃতসরে ওর ওখানে চলে যাব , ওদিক টাও আমার ঘোরা নেই। আমার সহযাত্রী ছিল দুটি মেয়ে ও তাদের বাবা , তারাও অমরনাথ যাবে। 

১২/০৭/১৫ - সকালেই যোগাযোগ করলাম ফেবুতে পরিচয় হওয়া হীরক সিনহার সাথে , ওনারা আমাদের একদিন আগেই যাচ্ছেন জানতাম।  জানতে পারলাম মূল রাস্তা বন্ধ ওনারা নিজেদের গাড়িতে মুঘল রোড হয়ে অনেক ঘুরে পহেলগাম যাচ্ছেন। হটাত মনে পড়ল আমার বাল্যবন্ধু মিঠু এখন দিল্লীতেই আছে।  ট্রেন ঘন্টা খানেক দেরী করালো।  মিঠুর সাথে যোগাযোগ করে ওর নেতাজিনগরের বাসাতেই দুপুরের স্নান খাওয়া সারলাম। রবিবারের  ছুটির দিনের মাংস  ভাত ! বিকালের ট্রেনে উঠে দেখি আগের তিনজন এখানেও আমার সহযাত্রী ! কথায় কথায় জানা গেল মেয়ে দুজন ঘোড়ায় দর্শন করে আসবে , বয়েস্ক বাবা পহেলগাম তেই অপেক্ষা করবে।  এদিকে আবার পহেলগাম তে মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টির খবর পাওয়া গেল।  হীরক বাবুকে ফোন করে জানালাম , ওনারা তখনো পহেলগাম পৌঁছাননি , রাত ১০ টা তখন , কিন্তু ওনাদের কাছে দুর্যোগের কোনো খবর ছিলনা।  বিকালেই নিলাব্জ ফোন করে জানিয়েছিল ওরা কোথায় আছে।  

১৩/০৭/১৫ - নিলাব্জর বলে দেওয়া ভগবতিনগর যাত্রী নিবাসে পৌঁছানোর আগে আমি বাস স্টান্ডে পৌঁছে গেছিলাম , দুটো ভিন্ন জায়গায়। ভোর রাতে বৃষ্টির মধ্যে আমাকে হয়রানি হতে হল।  যাইহোক ৪-৩০ নাগাদ যখন প্রচুর চেকিং এর পরে যাত্রী নিবাসের দরজায় পৌঁছলাম তখন নিলাব্জকে দেখে ভরসা পেলাম। ওর সাহায্যেই ভিতরে ঢুকতে পারলাম , তখন কাওকে ঢুকতে দিচ্ছিলনা ।  বিরাট একটা হল ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখি হাওড়া স্টেশনের ভিড় , সবাই মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে আছে।  তার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের এলাকায় যেখানে বাকি ৪ জন আছেন। রুপাদির একদা সহকর্মি ডা: শৈবাল ব্যানার্জীর সাথে আলাপ হল , ইনি এখন স্বাস্থভবনেই আছেন। আরো দুজন ছিলেন মুকুল বাবু ও তার স্ত্রী।  ততক্ষণে ভোরের চা বিস্কুট পাউরুটি দেওয়া শুরু হয়ে গেছে , সব ফ্রী ! জানা গেল ১২ তারিখ থেকে বাস ছাড়েনি , কবে ছাড়বে কেও বলতে পারছেনা।  অনেকেই ছোট গাড়ি করে পহলগাম রওনা দিচ্ছে।  আমিও হীরক বাবুকে আবার ফোন করে জানলাম ওনারা আজই যাত্রা শুরু করার জন্য চন্দনবাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছেন। আমাদের প্রি পেইড ফোন এখানে অচল , পোস্ট পেইড ফোন কাজ করছে। বুথ থেকে ফোন করার খরচ মিনিটে ৫/- ! মোবাইল কানেকশন দেবার জন্যও সব কোম্পানি হাজির , বি এস এন এল দেবে পহলগাম থেকে , সেটা অমরনাথের পুরো রাস্তাতেই পাওয়া যাবে। অনেকেই সে কানেকশন নিচ্ছে , আমাদের প্রয়োজন মনে হয়নি। সকালে টিফিন কিছু দিলনা , নিজেদের আনা খাবার ভাগ করে খাওয়া হল।  ৮ টার পরে আমরাও একটু বাইরে বেরোলাম খোঁজ খবর নিতে।  বাসের ব্যবস্থা ভিতরেই ছিল। বাইরে বেরিয়ে অনেকেই ছোট গাড়িতে রওনা দিচ্ছিল। ইনোভা , ট্রাভেরা ইত্যাদি গাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল ৮০০/- জনপ্রতি , ৮ জনের জায়গা , পুরো গাড়ি ৬৪০০/- । ৯ টা বেজে যাওয়ায় আমরা তখনি আর বেরোলাম না , ঠিক হল কালকেও বাস না ছাড়লে আমরা ছোট গাড়িতে বেরিয়ে যাব সক্কাল বেলাতেই। যাত্রী নিবাসে ঢোকাটা বেশ হ্যাপা , প্রচুর চেকিং।  সকাল থেকে আরো লোক ঢুকেছে , চাতাল গুলোও সব মানুষে কিলবিল করছে। বৃষ্টি আর খুব একটা না হলেও মেঘাছন্ন আবহাওয়া। ভিতরে অবশ্য সব ব্যবস্থাই আছে।  বিশাল তিনতলা বাড়িতে বড় বড় হল ঘর , যাত্রীদের থাকার জন্য।  স্নান করে গেলাম খাবার লাইনে , সেখানে হটাত দেখতে পেলাম সভ্যদাকে , আমার পাড়ার পরমাত্মীয়। বিদেশ - বিভূঁইয়ে চেনা কাওকে ওরা ১০ জনে মিলে এসেছে।  ফ্রী তে এখানে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ভালই , শুধু ৩/৪ দিনের যাত্রী এক হয়ে যাওয়ায় ভিড়টা বেশী হয়ে গেছিল। খাবার পরেই আরো অনেকের মতই আমরাও বাসের টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ালাম  , যদিও টিকিট দেবার কোনো খবর ছিলনা। ঘন্টা খানেক পরে লাইন ছত্রভঙ্গ হয়ে হালকা হয়ে গেল। বিশ্বাসীরা কাউন্টার এর সামনেই বসে গেল , তার মধ্যে আমরাও ছিলাম , যদি টিকিট দেয় তাহলে আমরাই প্রথমদিকে থাকব এই আশায় , পাশে  আলাপ হল বলিয়া থেকে আসা একজনের সাথে। আলাপ হল দমদমের একটি মেয়ের সাথে সে নাকি ১৭ বার এসেছে। উদ্যোগী মেয়ে , এবার একা আসলেও পথে আরো ৪ বাঙালী যুবককে জুটিয়ে ৫ জন হয়ে গেছে। সে তার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়ে বলল সব বাস একই , কোনও ফারাক নেই , তার কথা শুনে  আমরাও কমদামের টিকিট কাটার ভরসা পেলাম।  ৩ রকম দামের বাস আছে , যেগুলোর টিকিট যাত্রী নিবাসের মধ্যে থেকেই দেবে , আর ঠিক পাশেই বাস দাঁড়িয়ে  আছে। এমন সময় একটি ছেলে ১৯ টা টিকিট ফেরত দিতে এসেছিল , আমরা  আর ওই মেয়েটি সঙ্গীতা তাকে পাকড়াও করলাম।  কিন্তু আমরা মোট ১১ জন , আরও ৮ জন দরকার , পাশের  বালিয়ার দুজন , আরও দুটো দলের ৬ জন লোক জুটে মোট ১৯ জন হয়েই গেল , সঙ্গীতা ই বাকি ডিল টা কমপ্লিট করে টিকিট গুলো নিয়ে নিল , ৩১৪/- ( বাকি দুটো ৪৫০/- আর ৫২৫/- ) দামের সবথেকে কমা বাসের টিকিট।  ১২ তারিখের জন্য ওরা কেটেছিল , তারপর থেকে আর বাস ছাড়েনি। এরকম অজানা টিকিট কাটা নিয়ে একটু সন্দেহ বা ভয় ছিলই , সেটাও কাউন্টার এর লোকেদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া হয়েছিল।  বিকালে চা খাবার আগে আমরা ম্যাট্রেস নিলাম ১০০/- জমা দিয়ে , যেটা ফেরত পাওয়া যাবে, মানে ফ্রী ম্যাট সার্ভিস ! যাত্রী নিবাসের ভিতরে এগুলো সব দেখভাল করছে শিবসেনা কোম্পানির বিশাল ভান্ডার , ওদের এবার ২০ বছর হল এই সেবায়। বাইরেও এমন গোটাকতক বিশাল ভান্ডার আছে , চলতি কথায় লঙ্গর , ফ্রী তে নানা খাবার সরবরাহ করে যাত্রীদেরকে।  পাশেই প্রচুর বাস দাঁড়িয়ে আছে , আমাদের ৫৯ নম্বর বাসটাও দেখে নিলাম। ততক্ষণে বাসের টিকিট দেওয়া শুরু হয়েছে, লম্বা লাইন , অনন্ত অপেক্ষা। আমরা ভাগ্যবান। আশেপাশে আমি আর নিলাব্জ একটু ঘুরে দেখলাম।  বাইরেও খোলা আস্তানায় থাকার ব্যবস্থা আছে , সেখানেও প্রচুর মানুষ , ভক্তিমূলক নাচ গানে মেতে আছে।  সব মিলিয়ে পুরো জায়গাটা সরগরম , মাঝে মধ্যেই বোম বোম ভোলে ধ্বনি , হর হর মহাদেব টা কমই শোনা যাচ্ছে। আমরা সন্ধ্যা বেলায় খাবার জন্য বাইরের একটা লঙ্গরে লাইন লাগাই , কিন্তু তারাও খাবার দেবার আগে মিনিট ২০ ভজনের সাথে হাত তালি দিইয়ে নিল ! ওখানে রুটি পায়েস খেয়ে আমরা ভিতরে ঢুকি ৮ টা  নাগাদ।  ভিতরের খাবার খাই ১০ টার পরে। তারপরে আমি রাতেই আর একবার চান করে নিয়ে শুয়ে পরি , ওই হাটের মধ্যে যেটুকু বিশ্রাম নেওয়া সম্ভব আর কি !


জম্মু যাত্রী নিবাসে 
জম্মু যাত্রী নিবাসে 
জম্মু যাত্রী নিবাসে চায়ের লাইনে 
জম্মু যাত্রী নিবাসের বাইরের আস্তানায় 

১৪/০৭/১৫ - রাত ৩ টের সময় উঠেই আমরা তৈরী হতে থাকলাম।  ম্যাট ফেরত নিতে ৪ টে বাজিয়ে দিল।  চা-বিস্কুট অবশ্য পাওয়া গেল যাবার আগে।  কিন্তু বাস ছাড়ার কোনো ঘোষণা হচ্ছিলনা , তার অপেক্ষায় না থেকে অনেকের মত আমরাও বেরিয়ে গিয়ে ৫৯ নম্বর বাসে চলে গেলাম। একদল বাঙালী যাত্রী আমাদের আসনে বসেছিল , বয়স্ক গ্রাম্য লোকজন। তাদের পিছনে নিজেদের আসনে সরিয়ে আমাদের আসনে ( ১-১৯ ) বসতে অনেকটা সময় গেল , যদিও আমাদের ১৯ জনের আমরাই প্রথমে আসায় পছন্দ মত জায়গায় বসে গেলাম , একধারের তিনটে টু -সিটার আমরা নিয়ে বসে যাই।  তারপরে বাকিরাও এসে বসে যায়। সব শেষে সেই সঙ্গীতা দলবল সহ এসে পছন্দমত সিট না পেয়ে খুব হম্বিতম্বি দেখায়। একটু গরম হয় আবহাওয়া। কিন্তু যারা আগে এসেছে তারা আগে পছন্দের জায়গায় বসেছে এতে তো দোষের কিছু ছিলনা। ১৯ টা টিকিটের মালিক আমরা সবাইই ছিলাম , নামে নামে তো আর টিকিট কাটা হয়নি , যে আগে আসবে সে আগে সুযোগ পাবে সেটাই স্বাভাবিক। ফলে তার চ্যাঁচানটাই সার হল , যে জায়গা পরে ছিল তাতেই তাদের বসতে হল , শুধু শুধু সম্পর্ক টা তিক্ত হল। এক সময় বোম  বোম ভোলে রব তুলে বাস ছাড়ল প্রায় ৬ টা নাগাদ । আজকেই আমাদের পারমিট ছিল , কিন্তু আমরা জেনে গেছি আগে ঢোকা না গেলেও পরে যবে খুশী ঢোকা যেতে পারে , আর এই ক্ষেত্রে তো যাত্রাই বন্ধ ছিল , তাই ১৪ তারিখের পারমিট এ ১৫ বা ১৬ তারিখে ঢুকতে কোনো অসুবিধা হবেনা। যত সময় পার হল তত আমরা তিনরকম বাসের ফারাকটা বুঝতে থাকলাম যেটা ওই সঙ্গীতা ১৭ বারেও কেন বুঝতে পারেনি বুঝলাম না ! বাস প্রথম দাঁড়ালো রেস্তোরা দেখেই , যেখানে কিনে খেতে হবে।  তারপর অবশ্য লঙ্গরেই দাঁড়াতে শুরু করলো। পথে এক জায়গায় একটা দারুন লঙ্গর পাওয়া গেল যাতে নানা খাবার আয়োজন ছিল। এমনকি আইসক্রিমও। আমি শেষে পপকর্ন হাতে নিয়ে বাসের দিকে ফিরি। জহর টানেল এর মধ্যে যাত্রীরা আবার জেগে উঠলো , সঙ্গীতার নেতৃত্বে বোম বোম  ভোলে রব উঠলো পুরো অন্ধকার টানেলে , বেশ লম্বা সময়ের ব্যাপার , শেষদিকে ঠিক কি উচ্চারণ হচ্ছিল গুলিয়ে যাচ্ছিল তবুও ব্যাপারটা গায়ে কাঁটা দেবার মতই। যাত্রীদের মধ্যে এই চঞ্চলতা এই চিত্কার বাইরের লোকেদের কাছেও আনন্দের ।  চুপচাপ বাসে যেন কোনো মজা নেই। এর পরে এক জায়গায় আমাদের বাস সহ আরো অনেক বাস কে ঘন্টা খানেক দাঁড়িয়ে থাকতে হল পুলিশ এসকর্ট এর জন্য। পহলগাম এর ৪ কিমি আগেই বাস থেমে গেল , কযেক প্রস্থ চেকিং এর পরে বেশ কিছুটা হেঁটে আমরা পৌঁছলাম নুনওয়ান বেস ক্যাম্পে। দালালদের পহলগাম হোটেলে নিয়ে যাবারও প্রচেষ্টা ছিল। ১৫০/- করে এক একজনের , নিচে শোবার তাঁবুতে  আমরা ৬ জনে ঢুকে গেলাম , যদিও ১০ জনের তাঁবু , আমাদের ভাগ্য যে আর ৪ জন আসেনি। ওরা সবাই বি এস এন এল কানেকশন নিয়ে নিল , আমি আর নিলাব্জ ছাড়া। রাতে লঙ্গরেই খাওয়া।  যা বোঝা গেল জঙ্গলের মধ্যেই দোকানপাট , লঙ্গর , তাঁবু আরো অনেক কিছু নিয়ে বিশাল এই বেস ক্যাম্প। 

জম্মু থেকে পহলগাম এর পথে 
জম্মু থেকে পহলগাম এর পথে 
জম্মু থেকে পহলগাম এর পথে 
জম্মু থেকে পহলগাম এর পথে 
১৫/০৭/১৫ - প্রাতঃকৃত্য  সেরে চা বিস্কুট খেয়ে আমরা বেরোনোর লাইনে দাঁড়ালাম। কাল যে গেট দিয়ে ঢুকেছিলাম আজ অন্য গেট দিয়ে বের করাচ্ছে।  এঁকেবেঁকে সে লাইন প্রায় ১ কিমি লম্বা , এখান থেকে বেরোনোর সময় কেন এই লাইন মাথায় ঢুকলনা।  বেরোতেই ২ ঘন্টা লেগে যাবে।  আমি , নিলাব্জ আর মুকুল বাবু  লাইনে দাঁড়ালাম , বাকিরা পরে এসে ঢুকবে।  নিলাব্জ একবার ওদের খুঁজতে গিয়ে আশার খবর নিয়ে এলো।  আমরা লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।  রুপাদি পায়ে চোট পেয়েছিল , ডাক্তারবাবু মেডিকেল ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে বিশেষ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেরিয়ে যায়, লাইন ছাড়াই।  ইতিমধ্যে মুকুলবাবুর স্ত্রী ওনাকে খুঁজে না পেয়ে অনুসন্ধান অফিসে ঘোষণা করে , সেই ঘোষণা আবার লাইনের শেষদিকে দাড়ানো আমরা শুনতে পাইনি , বাইরে চলে যাওয়া রুপাদি শুনতে পেয়ে তাকে ভিতরে নিতে আসে , সেই সময় নিলাব্জও ওদের খুঁজতে যায় আর সৌভাগ্যক্রমে ওদের সাথে দেখা হয়ে যায় আর আমরা সবাই একজোট হয়ে সরু লাইন দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাই।  গেটের বাইরেই প্রচুর ছোট গাড়ি নির্ধারিত ১০০/- তে ১৬ কিমি দুরের চন্দনবাড়ি যাচ্ছে।  পহলগাম হয়ে ১ ঘন্টায় আমরা ৯৫০০' উচ্চতার  চন্দনবাড়ি পৌঁছে যাই। এখানে এক প্রস্থ চেকিং হল , পারমিটের একটা পার্ট দিয়ে দিতে হল।  এখানে টিফিন খেয়ে ৮-৩০ নাগাদ আমরা ট্রেক শুরু করলাম কিন্তু এখানেই আমরা তিনটে ভাগে ভাগ হয়ে পড়লাম।  আমি আর নিলাব্জ একসাথে থাকলাম যদিও ও আমার অনেক আগে আগেই উঠে যাচ্ছিল , আমার চড়াই ভাঙ্গতে সময় লাগে।  প্রথমেই চরম চড়াই পিসু টপ।  মুকুলবাবুদের আর দেখা পেলাম না।  তবে ডাক্তারবাবু আর রুপাদিকে দেখলাম ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে যেতে।  অনেকদিন পরে স্যাক নিয়ে হাঁটছি , যদিও স্যাক বেশ হালকাই তবুও ভালই কষ্ট হচ্ছিল। ৩ কিমি চড়াই ভাঙতে ৩ ঘন্টা লেগে গেল। ১১-৩০ নাগাদ ১১৫০০' উচ্চতার পিসু টপে পৌছে গেলাম , ওখানে আবার নিলাব্জর সাথে দেখা হল।  আধ ঘন্টা বিশ্রাম নেবার পরে ১২ টা  নাগাদ আবার রওনা দিলাম।  এবার পথের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবার পালা।  সবুজ পাহাড়ের মাথায় কোথাও কোথাও সাদা বরফের মুকুট , পাশে শ্বেতশুভ্র স্রোতস্বিনী নদী , তার উপরেও মাঝে মধ্যে স্নো ব্রিজ। ভক্তি প্রদর্শনে নয় , এই সৌন্দর্যের টানেই আমার অমরনাথ আসা। নকল পা লাগান একজনকে দর্শন করে ফিরে আসতে দেখলাম। ১-৩০ নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই ৩ কিমি দূরের জোজিবল একসাথেই। এখানে অনেক কিছু খেলাম , চটুল হিন্দি গানের সুরে ভক্তিমূলক কথা বসিয়ে গমগম করে চলা গানের তালে অনেকের সাথে আমরাও একটু নেচে নিলাম।  ভরপুর আনন্দ ! এখানেও আধ ঘন্টা বিশ্রাম নেবার পরে ২ টো নাগাদ হাঁটা শুরু করলাম।  এ পথেরও অসাধারণ সৌন্দর্য।  একটা বিশাল ঝর্ণাও পেলাম পথের ধারে। ৩-৩০ নাগাদ যখন শেষনাগের হ্রদের কাছে পৌঁছলাম তখন আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করেছে। সারাদিন ভালই রোদ ছিল।  ৪ টের পরে ৬ কিমি দূরের শেষনাগ ক্যাম্পে পৌঁছলাম , উচ্চতা ১১৭৩০' , মোট ১২ কিমি পথ পাড়ি দিতে ৭.৫ ঘন্টা সময় লেগে  গেল। নিলাব্জ আমার আগে পৌঁছে অপেক্ষা করছিল।  সারা পথে আমাদের দলের কারও সাথে আর দেখা হয়নি। ওদের এখানকার ফোন নাম্বারটাও নেওয়া হয়নি , এইভাবে যে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব ভাবতে পারিনি। আমরা প্রথমেই অনুসন্ধান অফিসে গিয়ে কয়েকবার ঘোষণা করলাম , কিন্তু কারও কোনো দেখা না পেয়ে ২৫০/- করে  দিয়ে নীচে শোবার তাঁবুতে আরো অনেকের সাথে ঢুকে গেলাম।  কিন্তু সে তাঁবুও ভালো ছিলনা , তাঁবু ওয়ালাও ভালো ছিলনা। যখন মুষলধারায় বৃষ্টি হল আমাদের তখন বেশ অসুবিধাই হল , জলও ঢুকলো একদিকে।  তারমধ্যে আরও ৪ জনকে ঢুকিয়ে মোট ১০ জন ঢুকিয়ে দিল , অনেক ঝগড়া করার পরে শেষে ৮ জন মিলে থাকি। স্থানীয় মুসলিমরাই সব ব্যবস্থাপনায় , শ্রাইন বোর্ডের কোনো নিয়ন্ত্রণ চোখে পড়লনা। আমাদের পাঞ্জাবের কিছু তাঁবু-মেট তাদের সহ পুরো কাশ্মীরি মুসলিমদের শ্রাদ্ধ শুরু করে দিল , সাথে অবশ্যই পরশী দেশও রেহাই পেলনা।  নিলাব্জর শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল। বাইরে পিচ্ছিল পথ পেড়িয়ে খেতে যাওয়াটাও বেশ কঠিন। নিলাব্জ সন্ধ্যে বেলায় বেরিয়ে কিছু খেয়ে এসেছিল।  আমি একাই গিয়ে অনেক কষ্ট করে খেয়ে এলাম। 
চন্দনবাড়ি তে যাত্রার শুরুতে আমরা সবাই 

চন্দনবাড়ি লঙ্গর 
চন্দনবাড়ি লঙ্গর
চন্দনবাড়ি ক্যাম্প 
 পিসু টপে 
পিসু টপ থেকে জোজিবলের পথে 
পিসু টপ থেকে জোজিবলের পথে
পিসু টপ থেকে জোজিবলের পথে
 জোজিবল লঙ্গর 
 জোজিবল লঙ্গর এর পায়েস 
 জোজিবল লঙ্গর এ নাচ 
জোজিবল লঙ্গর এ নাচ
জোজিবল থেকে শেষনাগের পথে 
জোজিবল থেকে শেষনাগের পথে 
 শেষনাগ 

১৬/০৭/১৫ - টয়লেট এর এলাহী ব্যবস্থা থাকলেও জলের আকালে ৫/১০ টাকায় ঠান্ডা গরম জল বিক্রী হচ্ছে , স্নানের গরম জলের বালতিও ৫০/- য় পাওয়া যাচ্ছে। চা - বিস্কুট খেয়ে আমরা ৬ টা  নাগাদ ট্রেক শুরু করলাম। আজকেই আমাদের সর্বোচ্চ ১৪৫০০' উচ্চতার মহাগুনাস পাস অতিক্রম করতে হবে যেটা স্থানীয়রা গনেশ টপ বলে উল্লেখ করছিল  , ৪.৬ কিমি দুরত্ব। মধ্যে বার্বল টপ পৌঁছাতেই ৮-৩০ বেজে গেল আর চড়াই টাও বেশ কঠিন ছিল।  একদিনের জন্য পিট্টু (পোর্টার ) নিলে দুজনের মোট ৫০০/- মত লাগত , কিন্তু আলোচনা করেও শেষ পর্যন্ত আর নেওয়া হয়নি।  এই বার্বল টপ থেকেও দারুন দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল , বরফ চূড়ার মাথা থেকে হেলিকপ্টার বেরিয়ে এসে আবার অন্যদিকে মিলিয়ে যাচ্ছিল। এখানে আমি  টিফিন খেলাম , আধ ঘন্টার বেশী সময় কাটালাম , নিলাব্জর সাথে দেখা হয়নি , ও আগে বেরিয়ে গেছে। ৯-১৫ নাগাদ বেরিয়ে এক ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম মহাগুনাস টপে। এখানেও নিলাব্জর সাথে দেখা হলনা , বুঝলাম ও পাঁই পাঁই করে হাঁটছে ! এই চড়াই টা অত কষ্টকর মনে হয়নি। এখানে প্রচুর বরফ পাওয়া গেল। এখানেও আধ ঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। এখান থেকে পঞ্চতারিনী, জম্মু যাত্রী নিবাসের ম্যাপে ৬ কিমি দেখেছিলাম , পথের নির্দেশে দেখলাম এখনও ১০ কিমি।  এক ঘন্টায় ২ কিমি দূরের পোষপত্রিতে পৌঁছে নিলাব্জর দেখা পেলাম।  ওই আমাকে নানা খাবার নিয়ে এসে খাওয়ালো , যদিও খেতে খুব একটা ভালো লাগছিলনা , মনের মত খাবারও তেমন কিছু ছিলনা।  এখানে প্রায় এক ঘন্টা বিশ্রাম নেবার পরে ১ টা  নাগাদ আবার যাত্রা শুরু করি। এক ঘন্টায় একটা চটিতে পৌঁছাই  , চা খেয়ে বেড়িয়ে যাই। মহাগুনাস পাস থেকে উতরাই সহজ পথ। অনেক দূর থেকেই পঞ্চতারিনী দেখা গেল, ১২৭২৯' উচ্চতা , নদীর ধারে বিস্তীর্ণ উপত্যকায় ক্যাম্প , এবং হেলিপ্যাড।  আজ আবহাওয়া ভালো থাকায় অটো সার্ভিসের মত হেলিকপ্টার ওঠা নামা করছিল। নদী পার হয়ে ৩-৩০ নাগাদ আমরা ক্যাম্পে ঢুকে গেলাম।  এখানেও নীচে শোবার তাঁবুতে ঢুকলাম ৩০০/- করে , কালকের থেকে বেশ ভালো , সাথী হল নিলাব্জর সাথে পরিচয় হওয়া ধানবাদের কিছু লোক। এখান থেকে মেঘকে ফোন করে বলা হল , ফেবুতে রুপাদির এখানকার ফোন নম্বর জানতে চেয়ে পোস্ট করে দিতে , রুপাদির ছেলের কাছ থেকে নিশ্চই নাম্বার পাওয়া যাবে। তারপর টেন্টে ঢুকে দুজনেই কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পরলাম। এখান থেকে বালতালের একপিঠের হেলিকপ্টার ভাড়া ১৯০০/- , আমরাও তাতে যাবার প্লান করলাম , পরদিন সকালে টিকিট  দেবে। আবহাওয়া আবার খারাপ হয়ে গেছিল ততক্ষণে , কালকের মতই মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। নিলাব্জ আজকেও খেতে গেলনা , আমিই একা গেলাম রাত ১০ টা নাগাদ।  আজ রাস্তাটা ভালো থাকলেও লঙ্গরের সামনেটা পিচ্ছিল কর্দমাক্ত। একটাই খোলা ছিল।  দেখলাম পার্সেল দিচ্ছে।  নিলাব্জর জন্যও রুটি-তরকারী নিয়ে এলাম। 

শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে  
শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে
শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে, বার্বল টপ থেকে 
শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে, বার্বল টপ 
শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে, বার্বল টপ থেকে
 বার্বল টপ এর লঙ্গর 
শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে
শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে
মহাগুনাস টপ
মহাগুনাস টপ
মহাগুনাস টপ
মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে 
মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে 
মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে 
মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে 
মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে , পোষপত্রী লঙ্গর 

মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে 
 পঞ্চতারিনী 
পঞ্চতারিনী
১৭/০৭/১৫ - ৬ টা নাগাদ আমরা লঙ্গরে গেলাম।  সামনেই হেলিপ্যাড।  টিকিটের জন্য লম্বা লাইন।  আমরা সেখানে লাইন না দিয়ে ৬-৩০ এ হাঁটা শুরু করলাম। আজকের পথটা বেশ বিরক্তিকর।  ঘোড়া , পালকি ইত্যাদির ভিড় অনেক বেশী।  আজও আমরা পিট্টু নিলাম না , দু একবার দরদাম করেছিলাম বটে। রাস্তা সরু , কর্দমাক্ত ফলে বেশ কয়েক জায়গায় অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল।  সে এক বিভত্স পরিস্থিতি। তারমধ্যে এক আধুনিক যুবককে দেখলাম খালি পায়ে হাঁটছে ! আজকের প্রথম ৩ কিমি ভালই চড়াই , ২ ঘন্টা লাগলো পৌঁছাতে। নীচেই সঙ্গম, তবে দৃশ্যমান নয় , উল্টোদিকে বালতালের রাস্তা। সঙ্গম ক্যাম্প তখনও বেশ দূরে , পুরোটাই অমরাবতী নদীর ধারে , বরফের মধ্যে। কিছুটা এগোতেই দুরে পবিত্র গুহামুখ দেখা গেল। উতরাই সহজ পথ বাকিটা।  এই পথেও প্রবল ভিড়ের মধ্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। আরও দেড় ঘন্টা পরে আমরা সঙ্গম ক্যাম্পে পৌঁছলাম ১০ টা নাগাদ । নদীর ওপারের রাস্তাতেই বেশী ভিড় আর দোকান। আমরা ডানদিক দিয়েই বরফের উপর দিয়ে ধীরে সুস্থে এগোতে থাকলাম পবিত্র গুহার দিকে। ১১-৩০ নাগাদ আমরা গুহার বেশ কাছে পৌঁছে গিয়ে বরফের উপর দিয়ে নদী পার করে এক বৃদ্ধের দোকানে আশ্রয় নিলাম।  এগুলো সব নাম্বার দেওয়া পরপর প্রসাদী দোকান সাথে টেন্ট , মূলত দর্শন কালীন সময়টায় থাকার জন্য।  রাত্রিবাস খুব একটা কেও করেনা।  আমরা এখানেই রাত্রিবাস করব ঠিক ছিল। থাকার খরচও বেশ কম, ১৫০/- করে।  আমাদের প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিলনা , দর্শন করে আসার পরে যদি থাকতে না দেয় ! আসলে এদের কাছ থেকে প্রসাদ কেনার বিনিময়ে এরা যাত্রীদের ব্যাগ , মোবাইল , ক্যামেরা যত্ন সহকারে রেখে দেয় বিনামূল্যে।  কিন্তু অন্তত ১০০/- র প্রসাদ কিনতে হবে। দোকানদার আমাদের বিশ্রাম নেবার সুযোগ না দিয়ে অনবরত দর্শনে যাবার জন্য পাগল করে দিচ্ছিল। ৫০/- দিয়ে এক বালতি গরম জলে স্নান করে নিলাম।  নতুন জামা কাপড় পড়লাম। ভক্তি না থাকলেও ভাবের কোনও অভাব নেই ! বৃদ্ধ প্রথম থেকেই কিটকিট করছিল , আমি দুটো ৫০/- র প্রসাদ চাওয়াতে তার ব্যবহার আরও খারাপ হয়ে গেল , কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না যে নিলাব্জও আলাদা প্রসাদ নেবে। আমাদেরকে চলে যেতে বলল , কিছুক্ষণ বোঝাবার চেষ্টা করে আমরাও চলে যাবার  সিদ্ধান্ত নিলাম।  এই কিটকিটে বুড়োর সাথে কিছুতেই সহবাস করা যাবেনা ! আমরা আরও গুহার দিকে এগিয়ে গিয়ে ৭২ নম্বর দোকানে উঠলাম।  সদালাপী যুবক , নাম ইয়াসির।  আমরা ব্যাগ-পত্তর রেখে একটা লঙ্গরে সামান্য খেয়ে গুহার দিকে এগোতে থাকলাম। বরফের উপর দিয়ে হালকা চড়াই। দুদিকে সার দিয়ে দোকান বিশ্বনাথ গলির কথা মনে করিয়ে দেয়। গুহার প্রায় ৫০০ মিটার নীচে চেক পোস্ট , এর পরে আর মোবাইল-ক্যামেরা ইত্যদি নিয়ে ঢোকা যাবেনা। এরপরে চওড়া সিড়ি গুহামুখের ভিতরে পৌঁছে গেছে। রাস্তার ভিড় এখানে নেই।  একদম শেষ ধাপে গিয়ে আমরা জুতো খুললাম অনিচ্ছা সত্বেও। দেখলাম ওই এলাকায় পুলিশও খড়ম পায়ে কাজ করছে ! এই এলাকাটা পুরোটাই গুহার ছাদের নীচে। উপর থেকে বরফ গলা জল পরে মেঝেটা পায়ে ঠান্ডা লাগার উপযুক্ত হয়ে আছে। জেলখানার মত খাঁচা দিয়ে বাবাকে আটকে দিয়েছে , ফলে দূর থেকে দেখবার কোনো উপায় নেই। এই খানে একটু লাইন পরেছিল আর সে লাইনটা দ্রুত এগোচ্ছিলও না। খাঁচার বাইরে দান পাত্রের কাছে কয়েকজন পুরোহিত গোছের লোক ছিল। তারা যাত্রীদের প্রসাদ টা দান পাত্রে ঠেকিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল। আমার প্রসাদ গুলো আমি নিজেই ঠেকিয়ে নিলাম।  কি মনে হল কি জানি ১০০/- পাত্রে ঢুকিয়েও দিলাম। হয়ত গুড়গুড়ির জন্যই। আমরা যতই আধুনিক হইনা কেন , ভগবানবাদ নিয়ে যতই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করিনা কেন একটা সময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই কম বেশী ধর্মভীরু হয়ে পড়ি। এছাড়া আমার দানপাত্রে ১০০/- ঢোকানোর আর কোনও ব্যাখ্যা নেই ! এর পর আমিও একসময় খাঁচার সামনে যাবার সুযোগ পেলাম , ছোট বেলার চিড়িয়াখানার খাঁচায় লেপটে থাকার স্টাইলে এখানেও খাঁচার খাঁজে চোখ নাক মুখ সেঁটে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ওই দূরে কোনায় গুহার শায়িত দেওয়ালের সাথে লেপটে থাকা ৬/৭ ' এর বরফের স্তর , বর্ফানি বাবা , অমরনাথের শিবলিঙ্গ ! তখন বেলা ২ টো , গুহার উচ্চতা ১৩৫০০'।  ছবিতে দেখা ও গল্পে শোনা বরফের শিবলিঙ্গের সাথে অনেক কষ্টেও বিন্দুমাত্র মেলাতে পারলাম না।  মনের মধ্যে নানা সন্দেহ দানা বাঁধতে লাগলো।  কিন্তু বেশীক্ষণ থাকার উপায় নেই। অন্যদিকের সিড়ি দিয়ে নেমে আসতে হল। জুতো পরার সময়েও মাথায় বাবার লিঙ্গটাই খোচা মারতে থাকলো। এখানকার সব দোকানে যে ছবি বিক্রি হচ্ছে তাতে লিঙ্গের একটা দ্বৈত সত্তা লক্ষ্য করেছি , অর্থাত সামনে একটি নধর নিটোল শিবলিঙ্গ , পিছনে অন্য একটার আভাস। যদিও অনেক আগের বন্ধুদের তোলা ছবিতে এই দ্বৈত লিঙ্গের আভাস কখনো দেখিনি। হতে পারে সামনেরটা সম্পূর্ণ গলে গিয়ে পিছনের ওই আভাস টুকুই সামান্য রয়ে গেছে।  আমরা যাত্রা শুরু হবার ঠিক ১৫ দিন পরে দর্শন করলাম , জানিনা এত তাড়াতাড়ি সব গলে যাবার কথা কিনা।  একদম প্রথমদিকে একবার না দেখলে আসল ব্যাপারটা কোনদিনই বুঝতে পারবনা। তবে এটাও ঠিক যত দিন যাবে তত লিঙ্গ সৃষ্টি হবার সম্ভাবনাও কমতে থাকবে। বাবাকে কি আর জেলখানায় আটকে রাখা যায় ! এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই নামছিলাম।  হটাত দেখলাম কিছু লোক মোবাইলে ছবি তুলছে নিষিদ্ধ এলাকায়। নিলাব্জ পাশের পুলিশ কে অভিযোগ জানানোয় সে মোবাইল দুটো নিয়ে নেয়। ছবি তোলার দলে সুন্দরী মহিলাও ছিল , সুতরাং পুলিসের কি সাধ্যি বেশীক্ষণ সেগুলো আটকে রাখবে ! আমরা টেন্টে ফিরে বরফ ঠান্ডা বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। আমাদের ইচ্ছা ছিল সন্ধ্যে বেলায় আরতি দেখতে উঠব আর পরদিন সকালে আর একবার দর্শন সেরে ফেরার পথ ধরব। এখানকার টেন্ট গুলো সব বরফের উপরে।  ইয়াসির আমাদের খুব খেয়াল রাখছিল , নীচে আরো একটা কম্বল পেতে দেয়। গায়ে একটা কম্বল ছিল , ও আরও একটা করে চাপিয়ে দেয়। ভালই ঠান্ডা লাগছিল। কম্বলের ওমের মধ্যে হটাত মনে পড়ল বাবার কাছে অনেক কিছু চাওয়ার ছিল , বাবাকে চেক করতে গিয়ে সেসবের কিছুই চেয়ে ওঠা হয়নি। শুয়ে শুয়েই বাবার উদ্দেশ্যে বললাম , তুমি তো অন্তর্যামী , সর্বত্র বিরাজমান , আমার সন্দেহবাতিক মনের অপরাধ নিওনা , আমাদের সবাইকে ভালো রেখো , তুমিও ভালো থেক।  নিজের যা চেহাড়াখান বানিয়েছ তাতে লোকজন আর বাবা বলে মানবে না ! বাবা আমার কথা শুনলো আর এমন ঘুম পাড়িয়ে  দিল দুজনকেই যে সন্ধারতি দূরে থাকুক , রাতের খাবার টাও আর খাওয়া হলনা। লঙ্গরের সেবায় নিজেদের কাছেও কোনও খাবার ছিলনা।  এদিকে প্রত্যেক রাতেই আমাকে হাঁটু ব্যথার ওষুধ খেতে হয় , নইলে পরদিন হাঁটতে পারব কিনা তার ঠিক নেই। ব্যাগে রুপিন পাসের কিছু কিসমিস আর মেঘের দেওয়া ক্যাডবেরি পরে ছিল , সেটাই দুজনে খেয়ে , জল খেয়ে আরও একটা করে কম্বল চাপিয়ে শুয়ে পড়লাম।  বিশাল টেন্টে আমরা দুজন আর ইয়াসির।    
পঞ্চতারিনী থেকে সঙ্গমের পথে 
পঞ্চতারিনী থেকে সঙ্গমের পথে 

পঞ্চতারিনী থেকে সঙ্গমের পথে 
সঙ্গম টপ থেকে বালতালের রাস্তা 
সঙ্গমের  ক্যাম্পের পথে 

দুরে সঙ্গম ক্যাম্প ও পবিত্র গুহা 
সঙ্গম ক্যাম্প ও পবিত্র গুহা
দুই পথ সঙ্গম ক্যাম্প এ মিশছে 
সঙ্গম ক্যাম্প ও দুরে পবিত্র গুহা 
 পবিত্র গুহার সামনে আমি আর নিলাব্জ 
 পবিত্র গুহার পথে 
পবিত্র গুহা ও ক্যাম্প 
পবিত্র অমরনাথ গুহা
পবিত্র গুহা ক্যাম্পে 
পবিত্র গুহা ক্যাম্পে ইয়াসিরের তাঁবু 
১৯৮৭ তে রুদ্র মন্ডল দাদার তোলা ছবি 
২০১৫ তে অমরনাথের পথে ছবিতে যেমন দেখেছিলাম ( সংগৃহীত )
১৮/০৭/১৫ - খুব সকালে ওঠা হলনা।  বাবার সাথে দেখা করাও হলনা।  ছবি তুলতে গিয়ে দেখলাম দ্বিতীয় সেটের ব্যাটারী গুলো তাড়াতাড়িই ফুরিয়ে গেছে। বালতাল দিয়ে না নামার ঘোষণা শুনতে পেলাম , রাস্তা বন্ধ।  ইয়াসির বলল নেমে যেতে , এরকম রাস্তা বন্ধ থাকে মাঝেমধ্যে, আবার খুলেও যাবে।ইয়াসিরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ৭ টা নাগাদ হাঁটা শুরু করলাম । পঞ্চকুলা অনুসন্ধান কেন্দ্রে আমরা চা-বিস্কুট খেলাম। এখানে শুনলাম বালতাল নামতে কোনো অসুবিধা নেই কিন্তু বালতাল থেকে শ্রীনগরের রাস্তা বন্ধ আছে। আমরা হেলিকপ্টারে ফেরার পরিকল্পনাও বাতিল করেছি কারণ গিয়ে যদি টিকিট না পাই তাহলে ফাটা বাঁশে আটকে যাব ! সঙ্গম পর্যন্ত ফিরে আসতে যা সময় লাগবে ততক্ষণে আমরা বালতাল নেমে যাব। গতকাল থেকেই এখানকার বিচিত্র ঘোষণা দূর থেকে শুনছিলাম। এই বিষয়ে গঙ্গাসাগর আর অমরনাথে কোনো ফারাক নেই।  আমরা থাকতেই এক মুসলিম যুবক আরবি ভাষায় লম্বা একটা ঘোষণা করে গেল , গতকাল যখন ঢুকেছিলাম তখন এই ঘোষণা টা শুনে একটু বিরক্তই হয়েছিলাম কারণ এটুকু বোঝা যাচ্ছিল নমাজ পড়তে ডাকার জন্যই এই ঘোষণা। মনে মনে ভেবেছিলাম আমারনাথেও কি একজোট হয়ে নমাজ না পড়লেই চলছিলনা ! যুবকটি উল্টোদিকের দোকানদার। আমরা এগোতে থাকলাম। ক্রমশ: চড়াই বাড়তে থাকলো। নীচে অমরাবতী ও পঞ্চতারিনী এই দুই নদীর সঙ্গম স্পষ্ট দেখা গেল। একটা মিলিটারী ক্যাম্পও আছে ওখানে। মোবাইলেই ছবি তুলতে থাকলাম। ঘন্টা খানেক বাদে এই সঙ্গমের উপরেই একটা চটিতে পৌঁছলাম। প্রথমবারের জন্য একটা ফ্রুট জুস কিনে খেলাম দ্বিগুন দাম দিয়ে ! এখানেই কথায় কথায় জানতে পারলাম আজ ঈদ। ১৮ তারিখে ঈদ সেটা জানতাম কিন্তু গত ২/৩ দিনে সেটা মাথা থেকে একদম বেরিয়ে গেছিল।দুটো কারনে নিজের উপরে রাগ হতে থাকল। এক ইয়াসির কে ঈদ এর শুভেচ্ছা টুকুও জানানো হয়নি আর দুই ওই ঘোষক যুবককে ভুল বোঝার জন্য।  হিন্দীতে ঘোষণাটা হলে অবশ্য কোনও ভুল বোঝাবুঝি হতনা। আমি মনে করি ওদের খুশীর উত্সবে অমরনাথেও ঈদ এর নমাজ খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আমরা সকালে যতক্ষণ ছিলাম ওদের ঈদ পালন করতেও দেখিনি , ব্যবসায় ব্যস্ত কাওকে কোলাকুলি বা শুভেচ্ছা বিনিময় করতেও দেখিনি।  আর তার ফলেই আমার এই বিরাট ভুল। অমরনাথ কে পিছনে রেখে ঈদ এর নমাজের ছবিটা থেকেও বঞ্চিত হলাম।  একটা অসাধারণ ছবি হত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি ফটোগ্রাফার হলে হয়ত ফিরেই যেতাম  ! এর পরে আরও এক ঘন্টা চড়াই ভাঙ্গার পরে পৌঁছলাম বরারি ক্যাম্পে (১৩১২০'), সঙ্গম ক্যাম্প থেকে দুরত্ব ৪ কিমি , সময় তখন ১০ টা। লঙ্গরে রুটির সাথে পায়েস দেখে একটু বেশী করেই নিয়েছিলাম , মুখে দিয়ে দেখি টক দই ! দুটো রুটি খুব কষ্ট করে খেলাম। আসার আগে খাবারের সম্ভারের যে গল্প শুনেছিলাম তার কিছুই প্রায় আমরা পাইনি। সব জায়গাতেই সেই ভাত রুটি ডাল রাজমা এই সব , যা সত্যিই আর খাওয়া যাচ্ছিলনা।  এর পরে সহজ উতরাই চওড়া পথ। রাস্তায় ভিড়ও কম। পথে এক দোকানদারের মোবাইল থেকে মেঘকে ফোন করলাম , রুপাদির নাম্বার মেসেজ করে দিতে বললাম কিন্তু মিনিট দশেক অপেক্ষা করেও মেসেজ পেলাম না। ৩.৫ কিমি দূরের রেল-পাথরি ( ১০৭০০') পৌঁছলাম ১২ টা  নাগাদ। এ পথে সৌন্দর্য একটু কম। ২.৫ কিমি দূরের দুমাইলে ( ৯৭৬০') পৌঁছে গেলাম আরো এক ঘন্টায়। বালতাল দিয়ে যারা যায় , দুমাইল তাদের চেক পোস্ট। এখানেও প্রচুর দোকান, লঙ্গর , টেন্ট।  আমরা আরও ৩ কিমি হেঁটে বালতাল ক্যাম্পে ( ৯৫০০') পৌঁছে গেলাম ২ টো নাগাদ, গাড়িতেও আসা যেত । পবিত্র গুহার প্রায় কাছ থেকেই আমরা হাঁটা শুরু করেছিলাম, দুরত্ব কমবেশী ১৬ কিমি , আমাদের সময় লাগল ৭ ঘন্টা। আমার মনে হয় যারা শুধুই দর্শন করতে আসেন তাদের জন্য বালতালের পথটাই সুবিধার।  ওঠার সময় বরারী পর্যন্ত ৭ কিমি চড়াই , কিন্তু চওড়া ভালো রাস্তা , তারপরের ৭ কিমি সহজ উতরাই ও চড়াই।  একদিনেই হেঁটে গিয়ে নেমে আসা সম্ভব , যারা ঘোড়ায় যাবেন তাদের জন্যও স্বস্তির যাত্রা। আমরা ৫০/- দিয়ে একটা বাসে উঠে পড়লাম , যেটা সোনমার্গের ২ কিমি আগে নামিয়ে দিল , এখানে রাস্তা হড়কা বানে নেমে আসা কাদায় সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে, একটা একটা করে গাড়ি পার হচ্ছে কিন্তু বাসটা আমাদের আগেই নামিয়ে দিল। যাত্রীরা সব আবার পাশের চড়াই ভেঙ্গে রাস্তার ভালো জায়গায় পৌছাচ্ছে।  আমরা একটা লরির সামনে উঠে পড়লাম , জানলাম সেও শ্রীনগর যাবে। ভাবলাম আরামেই যাওয়া যাবে।  সোনমার্গে  ঢোকার আগে লরি গুলোকেও আটকে দিল , আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে হেঁটে  সোনমার্গের স্ট্যান্ডে পৌঁছলাম।  একটা রানিং গাড়িতে দুজনে ৫০০/- তে উঠে গেলাম দরদাম করে , বালতাল থেকেই আসছিল বাকিদের কাছ থেকে ৪০০/- করে নিয়ে।  ড্রাইভার তখন জানতনা রাস্তা খারাপের কথা। গগনগীরের কাছে প্রথম বাঁধা টা পার হতেই ঘন্টা খানেক লেগে গেল। তবে ড্রাইভার ভাই খুব উদ্যোগী তাড়াতাড়ি শ্রীনগর ফেরার জন্য , বাড়িতে তার বাচ্চারা অপেক্ষা করে আছে ঈদ এর জন্য।  তখন সে জানেনা রাস্তায় আরো কি অপেক্ষা করে আছে।  এর পরের হড়কা বানের এলাকায় আমরা ৫ ঘন্টা অপেক্ষা করলাম , রাস্তা বানানোর কাজ দেখলাম , অসীম শক্তিধর এক যন্ত্র আর তার অসীম ধৈর্যশীল চালক নিরলস কাজ করে চলেছে , বাইকার্স রা ধ্বসের উপর দিয়েই বেরিয়ে যাবার পথ খুঁজে নিল। কয়েক হাজার গাড়ি দাঁড়িয়ে। আমাদের ড্রাইভার শের খাঁ , কমবয়েসী , এই পথের পরিচিত , প্রচুর গাড়িকে টপকিয়ে এসে অন্তত ঘন্টা দুয়েক সময় বাঁচিয়েছে। কাছে খাবার জল কিছুই নেই , দোকানও কিছু ছিলনা , সে এক দুর্বিসহ অপেক্ষা। রাত ৯ টার পর এই জায়গাটা পার হবার ২/৩ কিমি পরেই  আমরা অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আরো ক্ষতিগ্রস্ত একটা জায়গা পার হলাম , এই রাস্তাটা ততক্ষণে খুলে যাওয়ায় আমাদের আর অপেক্ষা করতে হয়নি। এর পর এক জায়গায় শুধু চা আর চিপস খেয়েছি। সেখানে ড্রাইভারের মোবাইল থেকে মেঘের সাথে যোগাযোগ করে ফেবু থেকে পাওয়া রুপাদির নম্বর নিলাম। জানলাম হীরক বাবুরা আজ শ্রীনগরেই আছেন , হোটেল পেতে অসুবিধা হলে যোগাযোগ করতে বলেছেন। নিলাব্জ রুপাদিকে ফোন করে জানল ওরা পহলগাম আছে , কাল শ্রীনগর আসবে। অসুস্থতার কারণে ওদের দর্শন করা হয়নি। আমরা রাত ১২ টায় শ্রীনগর পৌঁছলাম।  ড্রাইভার কে ৬০০/- দিলাম , ওর সামান্য বেশী দাবি ছিল। ডাল লেকের ধারে নামিয়েছিল , সেখানে পরপর কয়েকটা ভেজ রেস্তোরা ছিল। আমরা আগে খেয়ে নিয়ে তারপর অনেক দরদাম করে হাউসবোটের মাঝের একটা হোটেলে , নাম শালিমার , ৫০০/- দিয়ে একটা রুমে ঢুকে শুয়ে পড়লাম। রাত তখন প্রায় ২ টো ! 

বালতালের পথ থেকে সঙ্গম ক্যাম্প ও পবিত্র গুহা
পবিত্র সঙ্গম 
বরারী লঙ্গরে নিলাব্জ 
 রেল - পাথরি 
দোমাইল 
 দোমাইল থেকে বালতালের পথে 
 দোমাইল থেকে বালতালের পথে 
 দূরে ওই বালতাল ক্যাম্প 

 সোনমার্গের কাছে প্রথম বাঁধা 
 সোনমার্গ 
 সোনমার্গ 
 সোনমার্গ 
 গগনগিরের কাছে তৃতীয় বাঁধা 
গগনগিরের কাছে তৃতীয় বাঁধা 
গগনগিরের কাছে তৃতীয় বাঁধা 
গগনগিরের কাছে তৃতীয় বাঁধা 
১৯/০৭/১৫ - সকাল সকাল উঠে আমরা পাড়ে এলাম।  ৪ ন. ঘাট।  আর একটু এগোতেই একটা বাঙালী রেস্তোরা দেখলাম , ২ ন. ঘাটের উল্টোদিকে , সেখানে লুচি তরকারী খেলাম।  বেরিয়ে এসে দেখলাম উল্টোদিকের গলির মুখে রুবিনা গেস্ট হাউসের বিজ্ঞাপন।  মনে পরে গেল ২৫ বছর আগে বাবা মার সাথে এসে আমরা এখানেই উঠেছিলাম , হোটেলটা গলির ভিতরে , কিন্তু বাঙালী ব্যবস্থাপনা , বিজ্ঞাপনটাও বাংলাতেই ছিল। পি সি ও খুঁজে পাওয়া খুব মুস্কিল আজকাল , অনেক হাঁটাহাঁটি করে একটা পেয়ে সবাইকে ফোন করা হল। হীরকবাবুরা একটু পরেই বিমানে বেরিয়ে যাবেন , তাই তাদের সাথে আর দেখা হলনা এ যাত্রায় ! রুপাদী রা আমাদের হোটেলে পৌঁছে গেছেন। আমরা সেখানে গেলে মালিক একটু অভিমান দেখালো , কেন এদেরও ৫০০/- র ঘড় বলে ডেকে এনেছি , আমরা নাকি কাল জোর করেই ঢুকে গেছি ! ঠিক হলো রুপাদির রুম টা ৭০০/- দিতে হবে , ডাক্তারবাবু আমাদের রুমে এডজাস্ট করবেন। আমরা সবাই ফ্রেশ হয়ে বেরোলাম , উদ্দেস্শ্য লাঞ্চ করে একটু ঘুরব।  সোনালী রেস্তোরাতেই পেট ভরে মাছ ভাত খাওয়া হলো , সাথে ডাল আলুপস্ত সহ অন্য তরকারী পাপড় চাটনি , ১৬০/- নিল।  সস্তায় ভালো বাঙালী খাবার।  শিমলায় যেটা খুব মিস করেছিলাম।  উল্টো পাল্টা দরের জন্য অটো পেতে দেরী হচ্ছিল , রুপাদি ক্লান্ত থাকায় আর কয়েক বছর আগেই ঘুরে যাওয়ায় হোটেলে ফিরে গেলেন। আমরা তিনজনে অবশেষে একটা অটো পেলাম ৭৫০/- তে , শঙ্করাচার্য মন্দির , তিনটে বাগ আর হজরত বাল মসজিদ ঘোরাবে । আমারও  ক্লান্তি লাগছিল কিন্তু স্মৃতি রোমন্থনের ইচ্ছেটাকেও ত্যাগ করতে পারছিলাম না। মন্দিরে এখন জমাট নিরাপত্তা ব্যবস্থা।  ছবি তোলার কোনো সুযোগ নেই। নামার পরে এখানেও একটা লঙ্গরে ওরা দুজন লুচি হালুয়া খেল।  আমি একটু টেস্ট করলে দেখলাম হালুয়াটা দুর্দান্ত। এরপর চশমা শাহী বাগ।  প্রচুর ভিড়।  স্থানীয় লোকেরা আজ ঈদ এর খুশী মানাচ্ছে।  বাগে বসে কেও বিরিয়ানি খাচ্ছে তো কেও ফোয়ারার জলে জলকেলি করছে। রোদ থাকলেও আবহাওয়া মেঘলা , আর বেশ গরম।  এরপরে আমরা রাস্তায় বিশাল জামে পড়লাম , ডাল লেকের ধার দিয়েই রাস্তা , কাতারে কাতারে লোক লরি বাস নিজেদের গাড়ি নিয়ে রাস্তায়।  সবারই গন্ত্যব্য কোনও না কোনোও বাগ। এর মধ্যে আমাদের অটো টাও বিগড়ে গেল , কিছুতেই স্টার্ট হচ্ছিলনা। ফলে নিশাদ বাগে পৌঁছাতে বেশ দেরী হয়ে গেল , এখানেও ভিড় অব্যাহত , এটা একেবারে ডাল লেকের ধারেই। এর পরে গেলাম শালিমার বাগ।  এখানে জলের জায়গাটা কে সবাই একুয়াটিকা বানিয়ে ফেলেছে। কাশ্মিরীদের ঈদ এর উত্সবে দুটো জিনিস খেয়াল করলাম বা খেয়াল করতে পারছিলামনা , সে দুটো হলো সুন্দরী আর বোরখা ! কাশ্মিরী সুন্দরীদের নিয়ে যে মিথ ছিল তা ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে গেল , আম জনতা সব জায়গার মতই আম , সুন্দরীরা সবকিছু নির্বিশেষেই সুন্দরী হয় ! বোরখার বিরল ব্যবহারও আমায় অবাক করলো , এরা চিরতরে বোরখা মুক্তি ঘটিয়েছে না এটা শুধুই আজকের উত্সবের স্বাধীনতা তা অবশ্য জানা গেলনা। এর পরে আমরা গেলাম হজরত বাল মসজিদে , মেরামতির কাজ চলছিল , তবুও পাশের সবুজ লন থেকে খুবই সুন্দর লাগছিল। আমাদের হোটেলে ফিরে ওরা ঢুকে গেল , আমি একটু দাড়ি কাটতে গেলাম , পরে আবার মিলিত হয়ে কিছু কেনাকাটা করলাম , রবিবার সরকারী দোকান বন্ধ থাকায় পোশাক-আশাক কিছু কেনা গেলনা অনেক ঘুরেও , গুড়গুড়ির জন্য একটা কাশ্মীরি কাজ করা ফ্রক নিলাম আর নিলাম আখরোট ও খোবানি।  কাল সকালেই আমি বেরিয়ে যাব , ওদের ট্রেন ২৩ তারিখে। রাতেও বাঙালী খাবার খেয়ে আমরা প্রায় ১২ টা  পর্যন্ত ডাল লেকের ধারে আড্ডা মারলাম। 
সকালের ডাল লেক 
বাঙালী রেস্তোরায় 
 মন্দিরের পথ থেকে ডাল 
দুপুরের ডাল লেক
দুপুরের ডাল লেক
 চশমা শাহী বাগ 
 চশমা শাহী বাগ 
 চশমা শাহী বাগ 
নিশাদ বাগ 

নিশাদ বাগ 
 দুর্লভ সুন্দরী 
শালিমার বাগ  
শালিমার বাগে জলকেলি 
 বিকালের ডাল লেক 
 হজরত বাল মসজিদ 
হজরত বাল মসজিদ 
  সন্ধ্যে নামার আগে ডাল লেক 
 সন্ধ্যে বেলায় ডাল লেক 
 রাতের ডাল লেক 
২০/০৭/১৫ - সকাল থেকে আমার পেট খারাপ।  মনে হয় কাল রাস্তার বরফ আইসক্রিম খেয়েছিলাম , তারই ফল। ৭ টা নাগাদ নিলাব্জ আর ডাক্তারবাবু আমাকে বাস স্ট্যান্ডে ছেড়ে দিতে আসল।  টিকিটের লম্বা লাইন , বাসের কোনো ঠিক নেই।  লাইনের প্রথমদিকের এক বাঙালী যুবক কে নিলাব্জ হাত করে আমার টিকিট টাও কাটার ব্যবস্থা করলো।  এক সময় টিকিটও পাওয়া গেল।  বাইরে ছোট গাড়ি তখন ১০০০-১৩০০/- চাইছিল।  আমাকে আবার টয়লেট এ ছুটতে হল।  ওরা একসময় চলে গেল , আমরা বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম , আমাদের ৭২ ন. বাস আর আসেইনা , তার আগে পরের ৩ টে বাস এসে ছেড়ে দিল।  সে এক অনন্ত অপেক্ষা।  দুপুর ১২ টা নাগাদ আমাদের বাস ছাড়ল।  পাঞ্জাবী ড্রাইভার তখন যথারীতি গরম।  পরের দিকে সে এত আসতে চালিয়ে বাঁদরামি  করল যে আমরা ধরেই নিয়েছিলাম ট্রেন পাবনা।  একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে শেষে ১০-৪৫ এর হিমগিরি টা  পেলাম। 
  
২১/০৭/১৫ - স্লিপার ক্লাসের বিরক্তিকর জার্নি।  তবে ট্রেনে অতিরিক্ত ভিড় ছিলনা।  ট্রেন জুড়ে শুধু অমরনাথ যাত্রীরাই বসে আছে যেন। আর প্রত্যেকের সাথে যাত্রায় ব্যবহার করা গোদা গোদা লাঠি গুলো , আর ক্রিকেট ব্যাট।  মনে পড়ল ২৫ বছর আগে আমিও একটা ডিউজ ব্যাট কিনেছিলাম মাত্র ৫০/- দিয়ে। কাল থেকে না খেয়ে থাকার পরে আজ রাত থেকে খাওয়া শুরু করলাম ঠিকঠাক ভাবে।  পেট খারাপের ওষুধ চলছিলই।  মোবাইল কানেকশন পাবার পরে মেঘের সাথে প্রানভরে কথাও বলা গেল !

২২/০৭/১৫ - ট্রেন একদম সঠিক সময়েই হাওড়া ঢুকে গেল।  কলকাতা শহর সেদিন বৃষ্টিতে বানভাসি। কিছুটা বাসে এসে বাকিটা মেট্রো তে গিয়ে পৌঁছে  গেলাম মেঘ-বৃষ্টির কাছে।  আমার সর্বশেষ গন্ত্যব্যে। 

এক ঝলকে ট্রেক - প্রথম দিন : পহলগাম থেকে গাড়িতে ১৬ কিমি দূরের চন্দনবাড়ি ( ৯৫০০') থেকে ট্রেক শুরু হবে। পিসু টপ ( ১১৫০০') ৩ কিমি / ৩ ঘন্টা ; জোজিবল ৩ কিমি / ১.৫ ঘন্টা ; শেষনাগ ( ১১৭৩০') ৬ কিমি / ২ ঘন্টা ; মোট ১২ কিমি / ৭.৫ ঘন্টা ।  দ্বিতীয় দিন :  বার্বল টপ ৩ কিমি / ২.৫ ঘন্টা ; মহাগুনাস টপ ( ১৪৫০০') ১.৬ কিমি / ১ ঘন্টা ; পোষপত্রী ২ কিমি / ১ ঘন্টা ; পঞ্চতারিনী ( ১২৭২৯') ৮ কিমি / ২.৫ ঘন্টা ; মোট ১৪.৬ কিমি / ৯.৫ ঘন্টা। তৃতীয় দিন : সঙ্গম ক্যাম্প ( ১১৮০৮') ৩ কিমি / ৩.৫ ঘন্টা ; পবিত্র গুহা ( ১৩৫০০')৩ কিমি / ১.৫ ঘন্টা ; মোট ৬ কিমি / ৫ ঘন্টা। চতুর্থ দিন : সঙ্গম ৩ কিমি / ১ ঘন্টা ; বরারি (১৩১২০') ৪ কিমি / ২ ঘন্টা ; রেল-পাথরি ( ১০৭০০') ৩.৫ কিমি / ১.৫ ঘন্টা ; দোমাইল ( ৯৭৬০') ২.৫ কিমি / ১ ঘন্টা ; বালতাল ( ৯৫০০') ৩ কিমি / ১ ঘন্টা ( গাড়িও চলে ) ; মোট ১৬ কিমি / ৭ ঘন্টা।     
 
কিভাবে যাবেন : হাওড়া থেকে ট্রেনে জম্মু , সেখান থেকে বাসে  বা গাড়িতে পহলগাম বা বালতাল বেস ক্যাম্প।  যারা ট্রেক করতে যাবেন তারা উপরের লেখা অনুযায়ী পহলগাম -পবিত্র গুহা - বালতাল এই পথেই যান।  যারা শুধুমাত্র দর্শন করতে যাবেন বা যাদের হাতে সময় কম তারা বালতাল - পবিত্র গুহা - বালতাল এই পথেই যান ; হেঁটে , ঘোড়ায় বা পালকিতে সবেতেই আরামদায়ক হবে। হেলিকপ্টার উভয় দিক থেকেই পাওয়া যাবে , যাওয়া যাবে পঞ্চতারিনী পর্যন্ত , বাকি ৬ কিমি পথ মোটেও সহজ নয় , ঘোড়াতে গেলে শেষ ১ কিমি হাঁটতে হবে, পালকি একেবারে গুহার উপড়ে পৌঁছে যাবে। বালতাল থেকে সোনমার্গ - শ্রীনগর হয়ে জম্মু ফেরা যায়।  

কারা যেতে পারবেন : ১৩ থেকে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পারমিট পাওয়া যায়। অনেক রকম শারীরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।  শ্বাসকষ্ট , উচ্চ - নিন্ম রক্তচাপ , হৃদয়রোগ বা কোনো পুরানো জটিল অসুস্থতা লুকিয়ে দর্শনে যাবেন না। 

বোম বোম ভোলে # # # হর হর মহাদেব 

AMARNATH TREK 2015 FULL ALBUM ( 379 photos ) Click Here :-

For SELECTED AMARNATH YATRA PHOTO ALBAUM Click Here :-