ভূমিকা : এবারের লক্ষ্য বুরানঘাটি। ২০২২ এর জুন মাস । কিন্তু এই ঘাটি আমাদের জন্য যেনো শক্ত মাটি হয়ে উঠেছিল । তাহলে শুরু থেকেই শুরু করা যাক।
২০১৯ সালের গ্রীষ্মে মান্দানী ভ্যালি যাবার অনুমতি না পেয়ে পঞ্চকেদার দর্শন করে ফিরে আসতে হয় । সেটাও একটা অনন্য অভিজ্ঞতা । যদিও এখনকার ট্রেকাররা খুব কমই একত্রে পঞ্চকেদার দর্শনের পরিকল্পনা করে। টিআরপি কম! প্রথম পছন্দের ট্রেকে না যেতে পারার জন্য মনের মধ্যে একটা খিদে রয়েই যায়। কিন্তু লাগাতার হাওড়া হরিদ্বার করতে করতে উত্তরাখণ্ড একঘেঁয়ে হয়ে ওঠে। তাই ২০২০ র গ্রীষ্মে কোনো ট্রেক প্ল্যান করা হয়নি , পরে গেলেও অন্য রাজ্যে যাবার কথাই ভাবা হয়। এমথবস্থায় মার্চ মাসে বাংলা সিকিম বর্ডারে মুলখারকা লেকে ফ্যামিলি ট্রেক এর প্ল্যান করি। কিন্তু তার আগেই আমরা মুখোমুখি হই করোনা নামক এক অতিমারীর। ট্রেক স্থগিত রাখতে বাধ্য হই আমরা।
করোনা ভাইরাস চীন থেকে আগত এক নতুন আপদ। সারা বিশ্ব ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গৃহবন্দী হয়ে পড়ে। বাইরে প্রায় সবকিছু বন্ধ থাকে মাসের পর মাস , যার পোশাকি নাম লকডাউন। মুখে মাস্ক , হাতে স্যানিটাইজার নিত্য সঙ্গী হয়ে ওঠে। সে এক নতুন অভিজ্ঞতা। স্বাভাবিক জীবন যাপন যেখানে "রাম ভরসায়" পরিণত হয়ে যায় , সেখানে বেড়ানো বিলাসিতা । করোনাও আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলতে থাকে, কখনো মনে হয় যে আপদ গেছে তো পরক্ষণেই আবার চোখ রাঙিয়ে ফিরে এসেছে। সেগুলো নাকি করোনার ঢেউ। ভ্রমন প্রিয় বাঙালি ঘরে বসে সেই ঢেউ গুনতে গুনতে সুযোগ বুঝে বড়জোর দিপুদার স্মরণাপন্ন হতে পেরেছে। কিন্তু বড় বেড়ানো বা ট্রেক তখনও চিন্তার বাইরে। ২০২০ এইভাবেই কেটে যায়। ২০২১ এর শুরুতেই চলে আসে করোনা ভ্যাকসিন । অত্যন্ত গর্বের যে ভারতে দুটি ভ্যাকসিন তৈরী হয় , যার একটি বিদেশী ফর্মুলায় কোভিশিল্ড , অন্যটি সম্পূর্ণ দেশজ কোভ্যাক্সিন। সেই ভ্যাকসিন এর সার্টিফিকেট দেখালে দেশে বিদেশে যাতায়াতের কিছু ছাড় পাওয়া যাচ্ছিল , কখনোও তার সাথে নতুন RTPCR টেস্ট রিপোর্টও নিতে হচ্ছিল । তখন বাইরে বেড়াতে যাওয়া মানে বেশ হ্যাপা । তারমধ্যে আবার আমাদের রাজ্যে দিদির ছবি নাকি মোদীর ছবি লাগানো সার্টিফিকেট, কোনটা বৈধ তা নিয়েও টানাপোড়েন চলে। যারা বাইরে যাবে তারা মোদীর ছবিকেই গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়! শুরু হয় নিউ নর্মাল লাইফ । তো, সুযোগ বুঝে আমরাও ২০২১ এর গ্রীষ্মে হিমাচলের বুরানঘাটি যাবার প্ল্যান করি। যোগাযোগ করা হয় রহরু - চিরগাঁও - জাংলিক এলাকার গাইড লাকি আর ছোটুর সাথে। এদের এজেন্সি নর্দার্ন ট্রেলস এর সাথে আমাদের কথা হয়। ৬ দিনের জনপ্রতি ট্রেক খরচ ১১০০০/-, ফুল প্যাকেজ। এদের ২৫০০০/- আর শিমলার এক গাড়ি এজেন্সি কে ৫০০০/- অগ্রিমও দেওয়া হয়। আমি , সুব্রত, কৌশিক আর ৮ জন নতুন সঙ্গী নিয়ে মোট ১২ জনের দলও তৈরী হয়ে যায়। সাথে ছিল পুরোনো ট্রেক সঙ্গী জয়দীপ, যে তিনবছর অন্তর ফোটে, থুড়ি হাঁটে ! যাইহোক, করোনা কাঁটায় আমাদের এই যাত্রাও স্থগিত করতে হয়। তখন আমাদের পাগলপ্রায় অবস্থা। লাকি জানায় অক্টোবরে ট্রেক করিয়ে দেবে অথবা ডিসেম্বরে টাকা ফেরত দিয়ে দেবে । অক্টোবরে আমাদের দলের সবাই যেতে পারতো না তাই টাকাই ফেরত চাওয়া হয় আর সুযোগ হলে ২০২২ এ এদের সাথেই ওই ট্রেকে যাবো ঠিক করা হয় । কিন্তু লাকির আর পাত্তা পাওয়া যায়নি , টাকারও না !
করোনা কালে আমরা অনেক প্রিয়জন আত্মীয় স্বজন পরিচিত বন্ধু বান্ধব দের হারিয়েছি। চলে গেছে অনেক বিখ্যাত মানুষও। আমরা বাঙালি হিসেবে যাদের চলে যাওয়াতে উদ্বেলিত হয়ে পড়ি তাদের মধ্যে অন্যতম মারাদোনা, প্রণব মুখোপাধ্যায় , পিকে , সৌমিত্র, লতা, সন্ধ্যা হয়ত আরও অনেকে। আরও দুঃসংবাদ ট্রেকার দের জন্য অপেক্ষা করে ছিল , ২০২১ অক্টোবরের আগে পরে বেশ কয়েকজন বাঙালি ট্রেকার ট্রেকে গিয়ে প্রাণ হারায়। যাদের মধ্যে চ্যাটালাপে সামান্য পরিচয় হয়েছিল অভিজ্ঞ সন্দীপ গুহ ঠাকুরতা আর সদ্যযুবা সাগর দে'র সাথে। এই দুর্ঘটনায় বাঙালি ট্রেকাররা কয়েক পা পিছিয়ে পড়ে। কারণ এর আগে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু পর্বতারোহীও প্রাণ হারিয়েছে। তার ছাপ পড়ে আমাদের দলেও। তাছাড়া কাছা খোলা হয়ে নতুন দের টিমে নেওয়াটাও বোকামি হয়ে যাচ্ছে। কোনো টিমেই এমন যে কাউকে ঢুকিয়ে নেয়না। ট্রেকে উৎসাহ দেবার লক্ষ্যে সবার জন্যই আমাদের টিমের দরজা খোলা। কিন্তু মনে হচ্ছে এবার আমাদের আরও বেশি চুজি হতে হবে। উদ্যোগ ও আগ্রহহীন ট্রেকার দের এড়িয়ে চলতে হবে। এই ক' বছরের অভিজ্ঞতায় আরও একটা উপলব্ধি হয়েছে , কাউকে তেল মেরে দলে ঢোকানো উচিৎ না , বিশেষ করে ট্রেক টিমে। তুমি না গেলে টিম জমবে না , তোমাকে খুব মিস করবো , প্লিজ চল ইত্যাদি নেকুপুষু ( শ্রীলেখা মিত্র থেকে ধার নেওয়া ) মার্কা চিন্তা ভাবনা ট্রেক টিম তৈরীর সময় সরিয়ে রাখা উচিৎ। উদ্যোগী এবং আগ্রহী সদস্য কেই প্রাধান্য দিতে হবে। সাত কাণ্ড রামায়ণের শেষে সীতা কার মাসী সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা না থাকলেও আমাদের ১২ জনের টিম দাঁড়ালো ৮ জন এ , নতুন ঢুকলো পুরোনো দেবু !
আমি পারিবারিক কারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ার জন্য ২০২২ এর শুরুতে জয়দীপকে দায়িত্ব দেওয়া হয় লাকি ছোটু দের সাথে কথা চালানোর , টিকিট কাটার। এর আগে ও রুপিন পাস ট্রেকের ব্যবস্থা করেছিল। অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু পিকচারে লাকি ছিলনা। ছোটুর সাথেই কথা হচ্ছিল। আগের বারের অগ্রিম এডজাস্ট করবে আর আগের বারের রেটেই নিয়ে যাবে। কিন্তু ৮ জন হতে হবে, কম হলেই অন্য রেট, যেটা গতবারেই জানা ছিল আমাদের। নিউ নর্মালে আমরা আরও একটা ব্যাপারে সড়গড় হই , সেটা হলো অন লাইন ক্লাস বা মিটিং। আমাদেরও বেশ কয়েকবার অন লাইন মিটিং হয়। এবং প্রথামত নন্দনে সাক্ষাৎ মিটিংও হয় একটা। কিন্তু তারপরে আরও দুজন নাম কাটায়। এতো দিনের অনিশ্চয়তাটাই বাস্তবিত হয়ে যায়। বেশি খরচের কাঁটাটা বিধতে শুরু করে। আমি, জয়দীপ, কৌশিক, সুব্রত , রাহুল , সানি ও দেবু মিলে আমাদের ৭ জনের দল যাবার জন্য তৈরী হতে শুরু করে দিই । জয়দীপ ভালোভাবেই সব সামলাচ্ছিল, ও রেগুলার ট্রেকার হলে নিশ্চিত একটা ট্রেক এজেন্সি খুলে ফেলতে পারতো ! যদিও কলকাতায় এমন বাণিজ্যিক ট্রেকিং গ্রুপ এর বাড়বাড়ন্ত নবিশ ট্রেকার দের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতে। যাইহোক, আমাদের যাত্রা শুরু হবে ২৭ মে হাওড়া স্টেশন থেকে নেতাজী এক্সপ্রেসে, প্রথম গন্তব্য কালকা। করোনা তখনও পিছু ছাড়েনি কিন্তু আমরাও আর করোনা কে মাথায় তুলে রাখিনি ! মানুষ তখন দু বছরের বন্দিদশার ভয় কাটিয়ে স্বাধীনতার রসাস্বাদনে মত্ত হয়ে পড়েছে।
২৭/০৫/২০২২ , শুক্রবার - দেখতে দেখতে শুভ যাত্রার দিনটা চলেই আসে। আমি মসলন্দ্পুর থেকে বাড়িতে বানানো ঘী দিয়ে ভাজা লুচি - টুচি নিয়ে চলে আসি হাওড়া স্টেশন , সাথে মধ্যমগ্রাম থেকে দেবু। করোনা কালের দু বছর টানা গ্রামের বাড়িতেই থেকেছি। আর সব থেকে আনন্দের খবর করোনা এবার আর আমাদের আটকাতে পারলো না। আমরা সত্যি সত্যিই যাচ্ছি। যদিও আমাকে একটু রিস্ক নিয়েই যেতে হচ্ছে। সপ্তাহ তিনেক আগে স্কুটার উল্টে আমি দুর্ঘটনা ঘটাই যাতে ডান পায়ের বুড়ো আঙুল জখম হয়, হালকা চির ধরে। পুরো ফিট হবার জন্য যতটা সময়ের এবং বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল দিতে পারিনি। তবুও যাবার সিদ্ধান্ত নিতেই হয় , মেঘ ও অভয় দেয় এই বলে যে যতদূর পারবে যাবে অসুবিধা হলে ফিরে আসবে। এই দুর্ঘটনায় আর একটা সমস্যা যেটা হয় সেটা হলো আমার শারীরিক প্রস্তুতিতে ছেদ পড়ে । দিন কুড়ি কোনো হাঁটাহাঁটি করা সম্ভব হয়নি । শুধু আসার আগে এক দুদিন হেঁটে পরখ করে নিই যে আমি একটানা আধ ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা হাঁটার মত জায়গায় আছি কিনা। যাইহোক, একে একে ৭ জনেই হাজির হয়ে যাই বড় ঘড়ির নিচে। জয়দীপ কিছুদিন হলো ছোট ক্যামেরা কিনে ভিডিও ব্লগ বানানো শুরু করেছে। এখানেও ও শুরু থেকেই ভিডিও শুরু করে দিয়েছে। এবার জয়দীপ এর ব্লগে আমাদের ট্রেক এর ছবি ভিডিও থাকবে ভেবে বেশ আনন্দ হচ্ছে। এর আগে আমি বা আমরা কখনো এই ভাবে ভাবিনি। রীতেশ একবার শুট করেছিল বাগিনী গ্লেসিয়ার ট্রেক এর সময় , কিন্তু সে ছবি আর হলে রিলিজ করেনি! এবারে বলার মত ঘটনা হলো , এই প্রথম আমাদের কাউকেই সি অফ্ করতে কেউ হাওড়া স্টেশনে আসেনি! রাত ৯-৫৫ র কালকা মেল , অধুনা নেতাজী এক্সপ্রেস , নেতাজীর ১২৫ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে নামকরণ। একই ট্রেনে উঠলেও আমরা চারজন ঠান্ডা বগির আরামে , বাকি তিনজন টগবগে গরমে। মনে পড়ে গেলো আমাদের বালি পাস ট্রেকে যাবার সময়ের ট্রেন যাত্রার দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা।
২৯/০৫/২০২২ , রবিবার - মধ্যের শনিবার দিনটা পুরোই ট্রেনে কাটাই। বলোতব্য তেমন কিছু ঘটেনি। শুধু জয়দীপ রেলফ্যান হিসেবে সারাদিন ধরে আমাদের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দিলেও আমরা ওর উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আর ও নিজের খাবার ফুড অন হুইলসে অর্ডার করেও পায়নি , অথচ কমপ্লেন করে ম্যা ম্যা করে কথা বলেছে ! অনুব্রত যদি খাবার না পেত, শুঁটিয়ে লাল করে দিত না ! আর সবথেকে বড় অভিযোগ , একজন রেলফ্যান হয়েও আমাদের সমস্যার কমপ্লেন করে দিতে চায়নি।
খুব ভোরে কালকা পৌঁছানোর কথা ছিল কিন্তু ঘণ্টা তিনেক দেরী হয়। সুব্রতর ঠিক করা আমাদের টেম্পো ট্রাভেলার গাড়ি অবশ্য স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করছিল। আমরা দেরী না করে দ্রুত যাত্রা শুরু করে দিই আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য ২৩০ কিমি দূরের জাংলিক গ্রামের উদ্দেশ্যে। তখন সকাল প্রায় ৭ টা বাজে। আমাদের গাড়ি এগিয়ে যাবে শিমলা , রোহরু, চিরগাঁও হয়ে। কুফরী পেরিয়ে ফাগু তে আমরা প্রাতঃরাশ সেরে নিই। এই এলাকায় সবুজ পাহাড়ের ঢালে শুধুই আপেল গাছ , সেও বেশ মনোরম দৃশ্য। বাকি পথটাও টুকটাক খেতে খেতে যাই , সেই অর্থে আর লাঞ্চ করা হয়নি। রোহরুর পরে পথের সৌন্দর্য্য আরও বেশি। উচ্ছ্বল যৌবনা পাব্বার নদীর কোমর ছুঁতে ছুঁতে অনেকটা পথ যাবার সৌভাগ্য হয় , অপূর্ব সে অনুভূতি। এইভাবে পৌঁছে যাই চিরগাঁওতে , সেখানে আমাদের অর্গানাইজার গাইড ছোটুর সাথে দেখা হয়। এই পর্যন্ত রাস্তা বেশ ভালই ছিল। এখান থেকে একটা পথ গেছে দোদরা - কাওয়ার , রুপিন পাস ট্রেকে সেবা থেকে জিসকুন যাবার সময় এই বাস রুটকে আমরা ক্রস করেছিলাম । এখন আমাদের পথ বাঁ দিকে।
তাগনু বলে একটি জায়গা পর্যন্ত আমাদের বড় গাড়ি যায়। সে পথ বড়ই দুর্গম আর বিপদজনক তার উপর বৃষ্টিভেজা কর্দমাক্ত। তারপর পাব্বার নদীর উপর ভাঙ্গা ব্রিজ পেরিয়ে আমরা ছোট গাড়ি করে যেতে হবে , সে পথ আবার চড়াই। ব্রিজ পর্যন্ত যেতেই আমাদের ড্রাইভারের মাথা গরম হয়ে যায় কারণ সে এদিকে কখনো আসেনি , জানেওনা রাস্তা কেমন ! ড্রাইভারের সাথে তর্কাতর্কিতে শেষটুকু একটু তিক্ত হয়ে যায়। তাছাড়া বাকি যাত্রা ভালই ছিল , আমরাও চাইছিলাম ফেরার দিন এই গাড়িই আমাদের শিমলা ফেরত নিয়ে যাক। যাইহোক, এখান থেকে আমরা একটা বোলেরো পিক আপ ভ্যানের সামনে পিছনে উঠে বাকি ৪ কিমি পথ পাড়ি দিই। ঘণ্টা দশেকের যাত্রা শেষে বিকাল ৫ টায় আমরা পৌঁছে যাই ৯০০০ ফিট উচ্চতায় ছবির মত সুন্দর জাংলিক গ্রামের হালকা ঠান্ডায়। আমরা একটা বড় বাংলো টাইপের বাড়িতে উঠি। এর পর থেকে আমাদের খাওয়া বা যত্নের কোনো অভাব হয়নি। কারণ জাংলিক পৌঁছানোর পর থেকে আমাদের প্যাকেজ চালু হয়ে যায়।
এই গ্রামে তখন ট্রেকার আর অর্গানাইজার দের ভিড়। আমরাও গ্রামটা ঘুরে দেখতে থাকি , হিমাচলি স্টাইলের কাঠের মন্দির , সেবা গ্রামে যেমন দেখেছিলাম , ছাড়াও আরও একটি কাঠের মন্দির দেখি। দেখা হয়ে গেলো আর একজন অর্গানাইজার সঞ্জয় নেগীর সাথে। গত বছর থেকে এর সাথেও আমি কথা চালিয়ে গেছি। গ্রাম, গ্রামের মানুষ আর ট্রেকার দের দেখতে দেখতে আমাদের অনেকের মনেই একটা গান চাপা দুঃখ হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিলো ....
" বাজালে বাজে না আর,
পুরনো সুরে এই মনের সেতার।।
সেই তানপুরা আছে
ছিঁড়ে গেছে তার। "
তানপুরা ছিল কিন্তু বাজানোর উপায় ছিলনা !
রাত্রে ছোটু এলে তাকে আরও কিছু টাকা দেওয়া হয়। মাত্র একজন কম হবার জন্য আমাদের ১১০০০/- এর পরিবর্তে ১২৫০০/- টাকা করে দিতে হবে। কোনও অনুরোধ উপরোধে চিঁড়ে ভিজলো না। সবাই মিলে ঠিক করা হলো , গতবারের ২৫০০০/- এডজাস্ট করার পরে বাকি টাকাটা আমরা ৬ জনে ভাগ করে দেবো , দেবু পুরো টাকাটাই দেবে। পুরো টিম না আসায় এর পরেও গাড়ি আর ট্রেক মিলিয়ে আমাদের ১৫০০/- করে অতিরিক্ত খরচ হবে।
৩০/০৫/২০২২ , সোমবার - নির্ধারিত দিনেই আমাদের ট্রেক শুরু হয়। সকালের দিকে আবহাওয়া ভালই জাংলিকে। আমাদের খাওয়া দাওয়াও দিলখুস করে দেবার মত। রাস্তার জন্যেও দিয়ে দেয় কিছু। ব্যবস্থাপনায় এখনও কোনো ত্রুটি চোখে পড়েনি। শুধু ছোটু আমাদের সাথে যাবেনা , ও হলো বেস ক্যাম্প ম্যানেজার। ছোটুকে অনুরোধ করি পাস ক্রসের দিন ও যেনো অবশ্যই যায়। আমাদের গাইড এর নাম দীক্ষিত। সাথে আর মাত্র তিনজন , তাদের পোর্টার , কুক, হেল্পার যা খুশি বলা যেতে পারে। আর দুটো খচ্চর। দুটো স্যাক অফলোড এ দেওয়া হয়, একটা জয়দীপের, অন্যটা সানি আর রাহুল দুই ভাইয়ের মিলিয়ে। বাকিরা স্যাক ক্যারি করবো। এর আগে বক্সা আর চিন্তাফু রুটে নিজে স্যাক ক্যারি করে কিছুটা সাহস পেয়েছি , সেগুলো কম উচ্চতার ট্রেক হলেও চড়াই ভালই , তাই প্র্যাকটিস টা ভালই হয়ে গেছে। তখনই ঠিক করি বেশি উচ্চতার ট্রেকেও স্যাক ক্যারি করার চেষ্টা করবো। কিন্তু ভার লাঘব করার সুযোগ থাকলে কেউ ছাড়েনা , জয়দীপের স্যাকের খালি জায়গায় আমার জামা কাপড়ের একটা কিলো দুয়েকের পুঁটলি ঢুকিয়ে দিই। এর পরেও আমার স্যাকের ওজন কিছু অতিরিক্ত জিনিসের জন্য কমবেশী ১০ কেজি। যেটা আমার জন্য যথেষ্ট।
সকাল ৮ টায় ট্রেক শুরু হয়। গন্তব্য ৮ কিমি দূরের ১১০০০ ফিট উচ্চতার দায়রা থচ বা বুগীয়াল। প্রায় ২০০০ ফিট উচ্চতা চড়তে হবে। প্রথম দিনের জন্য বেশ কঠিন। গ্রাম ছাড়িয়ে নির্জনতায় পৌঁছাতে আধ ঘন্টা কেটে গেলো। ঘণ্টা খানেক বাদে একটা টেবিল টপে পৌঁছাই। একটু বিশ্রাম। নীলাকাশ , সবুজ ঘাস , জঙ্গল পাহাড় মিলিয়ে মন ভালো করা ছবি ।
চলার পথে ভিড় না থাকলেও ট্রেকার দের সাথে যে দেখা হচ্ছিল না তা নয় । তবে সব ছোট গ্রুপ । বড় এজেন্সি গুলোর ভিড় তখনও পাইনি। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সবুজ উপত্যকা আর পাইন গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ, উপত্যকায় কোথাও কোথাও হলুদ বুনো ফুলের ডালি , নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেসে বেড়ানো। এক অপরূপ শান্ত নির্জন পরিবেশের মধ্যে দিয়ে আমাদের চলার পথ। মাঝে মাঝে সামান্য চড়াই। মোটেই কষ্টদায়ক মনে হচ্ছে না। প্রথম ঘণ্টার গণনা শেষে বলা যেতেই পারে আমরা বিপুল ভালোলাগায় এগিয়ে আছি। ঘণ্টা তিনেক বাদে , তখন বেলা ১১ টা, আমরা পৌঁছাই একটা ফরেস্ট হল্টে , যেখানে একটা স্থানীয় ঝুপড়ি দোকানও আছে । আমরা চা বিরতি নিলাম। আগেও সেখানে কিছু ট্রেকার ছিল, পরেও একটা বড় দল আসল। অন্য দলের মানুষগুলো , সুন্দরী যুবতী হলে তো কথাই নেই, আসলে আমাদের চোখের আরাম , পথের ক্লান্তি দুর করার মহৌষধ।
এর পরে কিছুটা বড় বড় বোল্ডার পার করে, কিছুটা জঙ্গলের পথ পেরিয়ে একটা ছোট রঙিন কাঠের ব্রিজের কাছে পৌঁছাই। এই পাহাড়ি ঝোড়া গুলো সবই পাব্বার নদীর উপধারা , একটু নিচে খাদের মধ্যে গিয়ে মূল নদীতে মিশেছে। আমরা নদীর ধার দিয়েই হাঁটছি কিন্তু নদী সবসময় দৃশ্যমান নয় , অনেক নিচে খাদের মধ্যে।ব্রিজ পার করে উপরে উঠতেই আমরা সামনের পথ বরাবর তুষারাবৃত পাহাড়ের দেখা পাই। সৌন্দর্যের মাত্রা হটাৎ করেই বেড়ে যায়। আর একটু এগোতেই আমরা অদূরে দেখা পাই আজকের ক্যাম্প সাইটের, তখন ১২ টা বেজে গেছে , আমাদের নয় ঘড়িতে! দুপুর ১ টায় আমরা পৌঁছে যাই আজকের গন্তব্য দায়রা থচে।
ক্যাম্প সাইটে এবং আজকের ট্রেকের শুরুতে দূরত্ব ও উচ্চতা লেখা দুটো বোর্ড ছিল। তার সাথে অন্য লেখার বা তথ্যের বা আমাদের অনুভূতির বেশ ফারাক। তাই এই লেখায় উল্লেখিত দূরত্ব বা উচ্চতা নিয়ে কেউ ভুল ধরতে আসবেন না। সবই দীপানুমানিক ! যেমন সুব্রতর স্মার্ট ঘড়িতে দূরত্ব প্রায় 11 কিমি দেখিয়েছে আবার ২০০০ ফিট উচ্চতা ওঠাটা কখনোই কষ্টদায়ক মনে হয়নি, হয়ত সেটা কমই হবে। দায়রা থাচ একটা বিশাল সবুজ বুগীয়াল , চতুর্দিকে পাহাড়ে ঘেরা যার বেশ কিছুটা তুষারাবৃত। আমাদের ক্যাম্পটা হলো বেশ খানিকটা নিচের দিকে , অন্য ক্যাম্পের সুন্দরী দের দেখতে গেলে দূরবীন লাগবে ! উপরের দিকে পাহাড়ের ঢালে যেনো একটা গ্রাম বসে গেছে ! আমাদের ক্যাম্পের শেষেই খাদের মধ্যে পাব্বার নদী , দেখা না গেলেও তার গর্জন শোনা যাচ্ছে । দূরে আমাদের আসার পথে পাইন গাছ গুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। এরকম একটা পরিবেশে আমাদের কাঁচা হলুদ রঙের তিনটে তাঁবু আর জলপাই রঙের রান্নাঘর ! হাতে গরম গরম চা। এমন ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে দাঁড়ালে মানুষ তার সমতলের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা কষ্ট সাময়িক ভুলে যেতে বাধ্য। লেজের দৈর্ঘ্য বড় করতে নয় , এই জন্যেই আমাদের পাহাড়ে আসা , অন্তত আমি নিজে সেটাই মনে করি। তবুও এই সবুজ প্রান্তর আমাদের নয়, এগুলো সবই গোচারণ ভূমি। সেখানে প্রায় আস্ত একটা গ্রাম বসে যাওয়ায় দূরে দাঁড়িয়ে গরু গুলোও হয়ত ভেবেছে এই গাধা গুলো কোত্থেকে কি জন্য আসল, ঘাস তো কিছুই খাচ্ছেনা!
হট লাঞ্চ খেয়ে আমরা তাঁবুর মধ্যে সিধিয়ে যাই। একটাই বিরক্তির ব্যাপার , এখানে এক ধরনের মাছি এবং প্রচুর পরিমাণে। তাদের কয়েকটা তাঁবুর মধ্যেও ঢুকে পড়েছে! হটাৎ মনে হলো বাইরে গরুগুলো বিভ্রান্তের মত তীব্র গতিতে ছুটোছুটি করছে। ভয়ে সিঁটিয়ে আছি আমরা। কারণ গাই আমাদের মাতা সেসব বাড়ি গিয়ে হবে, এখন বোঝার চেষ্টা করছি আমাদের ত্রাতা কে হবে। বাইরে গাইড পোর্টাররা তাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু বাই চান্স তাঁবুর উপর দিয়ে খান দুয়েক গরুও যদি অতিক্রম করে তাহলে তাদের চার জোড়া খুড়ের আঘাতে তাঁবুও যাবে আমরাও যাবো , পুরো না গেলেও খানিকটা তো যেতেই হবে ! একা রামে রক্ষে নেই সুগ্রীব দোসর। এমন সময় শুরু হলো হটাৎ বৃষ্টি! তাহলে কি ওরা ঘরপোড়া গরু ছিল , সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরিয়েছিল ? বৃষ্টির সাথে মুহুর্মুহু বজ্রপাত। যেটাকে আমি বেশ ভয় পাই এই কারণেই যে মাথার উপর পড়লে পালাবার কোনো পথ থাকেনা, বেঘোরেই প্রাণটা কাঠি হয়ে যায়। বজ্রপাতে ট্রেকারদের মৃত্যুর সংখ্যাও নেহাত কম নয়, তার বেশিরভাগ চলার পথেই। কিন্তু ক্যাম্পের উপর বজ্রপাত হলে তো ঝাঁকে ঝাঁকে কই মারা পড়বে। হ্যাঁ, ট্রেকারদের হলো কই মাছের প্রাণ। আমার মনে হলো বড় এজেন্সি গুলোই বা কেনো কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি! তাদের তো প্রায় স্থায়ী কায়দায় অস্থায়ী ক্যাম্প! একটা লম্বা পোলের মাধ্যমে আর্থিং এর ব্যবস্থা কি করা যায়না ? বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন সেটা কার্যকরী হবে কিনা। আমি আর জয়দীপ এক তাঁবুতে। ওর ভিডিওতে একটু বাইট দিই। এক্সপার্ট কমেন্ট আর কি! নতুন অভিজ্ঞতা। সুব্রত আর তার দুই সঙ্গী এক তাঁবুতে। দেবু আর কৌশিক এক আস্তাবলে। ওরা ঘোড়াই তবে সাত্বিক। যদিও আজ লাগামহীন ভাবে ছোটেনি। আমার গালি শোনার ভয়ে কিনা জানা নেই! আমরা প্রায় একসাথেই হেঁটেছি বা একটা সময়ের পরে আবার সবাই মিলিত হয়ে বিশ্রাম নিয়েছি। একটা বড় টিমের সবার যেমন একসাথে হাঁটা সম্ভব নয় তেমন বিশেষ কারণ ছাড়া সঙ্গীকে পিছনে ফেলে তরতর করে এগিয়ে যাওয়াটাও ভালো টিম মেটের পরিচয় নয়। একটা বড় দলের বিভিন্ন সক্ষমতার ট্রেকারদের মধ্যে একটা যোগসূত্র বজায় রেখেই এগোনো উচিত। সেই হিসেবে আজকের টিম অ্যাকটিভিটি একদম পারফেক্ট ছিল। বৃষ্টি থামলে বাইরে বেরিয়ে একটু চক্কর মারি , পাশের পাড়ায় যাই , লক্ষ্য একটাই বা অনেকে কিন্তু বেশি সাহস দেখানো গেলনা , অঞ্জন দত্তের অনুপ্রেরণায় যদি কেউ ঠ্যাং ভেঙে দেয়! ক্যাম্পে তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলে আর বিশেষ কিছু করার থাকেনা , খাওয়া , ঘুমানো আর গেঁজানো ছাড়া। এদের খাওয়া দাওয়ায় কোনো কমতি নেই , চা পাকোড়া , সুপ, ডিনার পর পর চলছে। প্রথম দুদিন ডিমও থাকার কথা। আর খুব বেশি হলে রাত নটার মধ্যে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে একা হয়ে যাওয়া। তখন আপনা হাত জগন্নাথ!
৩১/০৫/২০২২, মঙ্গলবার - ভিনদেশী তারারা যত আলোকবর্ষ দূরেই থাক মাঝরাতে এসে সস্নেহে আমাদের স্লিপিং ব্যাগের চেন আটকে দিয়ে গেছে। তাই সকালটা বেশ ফুরফুরে। আজ আমাদের গন্তব্য 6 কিমি দূরের ১১৫০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত লিথাম। রাজকীয় প্রাতঃরাশ আর একের পর এক ফটোসেশন সেরে যখন হাঁটা শুরু করি তখন ঘড়ির ডিজিটে পৌনে ন'টা। আসলে জায়গাটা ছেড়ে কারোই যেতে ইচ্ছে করেনি।
আমাদের পথ ওই বরফে ঢাকা পাহাড়ের দিকেই। যেনো ধীরে ধীরে আমরা সেই বরফের চাদরের তলায় আশ্রয় খুঁজতে যাচ্ছি। আজকের পথও অনেকটা কালকের মতই। পাহাড়ের ঢাল চিরে সবুজ ঘাসের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলার সরু রাস্তা , কখনো পাইন গাছের জঙ্গল। এইভাবেই এগোতে এগোতে এক ঘণ্টা পরে পৌঁছে যাই একটা বিস্তীর্ণ সবুজ ঢালে , যেখানে হলুদ ফুলের প্রাধান্যও চোখে পড়ার মত। সিংহমুখী কল থেকে পড়ছে পাহাড়ি ঝোরার জল। তার পাশেই বিশ্রাম আর ছবি তোলার হিড়িক।
মোটামুটি আরামদায়ক পথ। যখনই কোনো পাহাড়ি ঝোরা আসছে তখনই কেবল চড়াই উৎরাই। আরও আধ ঘণ্টা হাঁটার পর এরকমই একটা ভাঙ্গা ব্রিজ পার করে চড়াই ওঠার পথে পাথরের খাঁজে একদল পাহাড়ি মানুষের অস্থায়ী আস্তানা চোখে পড়ে। পাথরের দেওয়ালের সাথে একটা ত্রিপল টাঙানো। হয়ত পাহাড়ে গবাদি পশু চরায় বা জরিবুটি তোলে। এরাই পাহাড়িয়া, আমরা তো সখ পূরণ করতে পাহাড়ে আসি। বছরভর পাহাড়ে থাকার যে কষ্ট সেটা টের পাওয়ার আগেই সমতলের বিলাসিতায় নেমে আসি। এদের কাছে গেলে হয়ত চা পাওয়া যেত। সানি আর রাহুল অবশ্য সেই শুরু থেকেই অন্য কিছু খুঁজে যাচ্ছে , দুজনে যেনো নন্দী ভৃঙ্গী ,আর তাদের নাটের গুরু মহাদেবের নেশার জন্য জান লড়িয়ে দিতে পারে! আর একটু এগোতেই আমরা দেখা পাই একদল মহিলার, রঙিন পোশাক পরা স্থানীয় হিমাচলী। নীল সবুজ সাদার প্রেক্ষাপটে এই রঙিন পোশাক যেনো লাল নীল সবুজের মেলা বসিয়ে দিয়েছে। ছবি তো বানতা হ্যায় দোস্ত। তারাও সাগ্রহে ছবি তুলিয়ে বেশ মজা পেয়েছে।
আরও আধ ঘণ্টা হাঁটার পর পাহাড়ের ঢাল থেকে কয়েকজন মহিলা চলে আসে আমাদের কাছ থেকে জল নিতে। এরা সবাই পাহাড়ের ঢালে জড়িবুটি তোলে। আমরাও তখন দূরে আমাদের ক্যাম্প দেখতে পাচ্ছি। তাই বোতলের জল খালি করতে অসুবিধা নেই। এরাও সেটা জেনেই জল নিতে আসে। সুব্রতর অবাক জলদান ছবি হয়ে যায়। পথ মোটেই বিপদজনক নয়, কিন্তু পাহাড়ের একদিকের ঢাল নেমে গেছে চোখের আড়ালে থাকা পাব্বার নদীর কোলে। তাই গড়িয়ে পড়লে বিপদ যে ঘটবে না তা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়না। নিদেন পক্ষে ব্যাগ বা জলের বোতল তো গড়িয়ে যেতেই পারে। ট্রেল সাধারণত একটাই কিন্তু কিছু জায়গায় উপরে নিচে স্থানীয় দের কল্যাণে আরও কয়েকটা ট্রেল তৈরী হয়ে গেছে। কিছু জায়গায় বোঝা মুশকিল হয় কোনটা দিয়ে এগোলে সহজে পৌঁছানো যায়। এরকমই একবার দেখি সানি নিচের দিকের একটা ট্রেল ধরে এগোচ্ছে এবং জায়গাটা কিঞ্চিৎ কঠিন। ওকে মুখ দিয়ে টেনে লাইন আনি। এই সানি চলনে বলনে চেহারায় টাল খাওয়ায় অনেকটাই আমাদের হেলিকপ্টার সব্যর মত। এ যেনো হাঁটেনা, শুধু বডি টাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ওর প্রথম ট্রেক এটা যদি ভাবনা হয়, ওর কম বয়স সেটা ভরসা! তো সেই ভরসার উপর ভর করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এই বিশ্বাসে যে সানিও ঠিক পারবেই। এইভাবে আমরা দুপুর ১২ টায় তাঁবুর জগতে প্রবেশ করে যাই। কিন্তু এই ক্যাম্প সাইট টা বেশ বিস্তীর্ণ। আমাদের ক্যাম্প আরও এগিয়ে।
আবার নিচে নেমে এবার পাব্বার নদী পার হতে হলো অস্থায়ী ব্রিজ দিয়ে। বাঁদিকের পাহাড়ের মাথায় দৃশ্যমান ঝর্না থেকেই নেমে এসেছে নদী , যেদিকে আমাদের আগামীকালের গন্তব্য চন্দ্রনাহান লেক, পাব্বার নদীর উৎস। ডানদিকে কিছুটা নেমে পাব্বার নদী মিশেছে ধুন্দার দিক থেকে নেমে আসা এক অনামী ঝোরায়, যেটাও নদীর মতই চেহারা। আর একটু এগিয়ে গিয়ে সেই অনামী নদীর ধারেই আমাদের তাঁবু পড়েছে। ১২:৩০ এ আমরা আজকের গন্তব্যে পৌঁছাই। কিন্তু আমরা যেনো পাড়ার একঘরে করে দেওয়া পরিবারের মত, সব ক্যাম্পেই কেনো যেনো পাড়াছাড়া অবস্থা । সব থেকে বাজে জায়গায় আমাদের ক্যাম্প। এখানে তো আবার কিচেন টেন্ট আর থাকার টেন্ট এর মধ্যে বেশ কিছুটা ব্যবধান , মধ্যে আবার একটা নালা ! অদূরে বড় বড় এজেন্সির ক্যাম্পের টয়লেট গুলো আমাদের দিকে। আমরা কিচেন টেন্ট এর পাশেই ঘাঁটি গাঁড়ি। এই পথে দিয়ে আমাদের সামনে দিয়েই সবাই যাচ্ছে। চা হাতে নিয়ে আমরা প্রকৃতি ও প্রাণের রূপ রস গন্ধ উপভোগ করতে থাকি। কয়েকজনের সাথে সামান্য হয় আমাদের। গড়িয়া বাসী এক ব্লগার নজর কারলো আমাদের। পথেও এর সাথে দেখা হয়েছে। স্ট্যান্ডে ক্যামেরা লাগিয়ে নিজের হাঁটার ছবি তোলার জন্য অনেকটা রাস্তাই তাকে দুবার করে হাঁটতে হয়েছে! আজ টেন্ট সঙ্গী কিছুটা পাল্টে গেলো। সবারই সবার সাথে থাকার অভ্যাস থাকা উচিত। লিথাম ক্যাম্প থেকে দূরের বরফাবৃত পাহাড় যেনো আরও কাছে , চারিদিকে পাহাড় ঘেরা সবুজ ঘাসে ঢাকা উঁচু নিচু উপত্যকা, পাশে নদীও সশব্দে দৃশ্যমান , দৃশ্যে পাইন গাছের সারি বিরাজ না করলেও, আজকের সৌন্দর্য্য যেনো গতকালের সৌন্দর্য্যকে ছাপিয়ে যেতে চাইছে। আবহাওয়া তখনও ঝকঝকে।
অল্প অল্প হাঁটা, তাই ক্যাম্পে এসে হট লাঞ্চ। সব ট্রেকে এই সৌভাগ্য হয়না। কিন্তু টেন্টের মধ্যে বেশ গরম, একটানা বেশিক্ষণ থাকা যাচ্ছেনা। বিকালের দিকে আমরা ক্যাম্পের চারিদিকে ইতস্তত বিচরণ করতে থাকি। উদ্দেশ্য শরীর ও মন কে তরতাজা রাখা। বড় টিমগুলো দেখছি পিটি করছে, একে অপরের পিঠ টিপে দিচ্ছে, আহা ! এই জন্যেই মনে হচ্ছে ওদের সাথে একবার ট্রেকে যেতে হবে। আমি আর জয়দীপ নদী ধরে অনেকটা এগিয়ে যাই, আমাদের মূল গন্তব্য ওই দিকেই। একটা স্নো ব্রিজ পাই অনেক দূরে, কিন্তু পার হবার সাহস পাইনা, যদি ভেঙে যায়! নিচে খরস্রোতা শীতল জলধারা। দুজনে মিলে পাথর সাজিয়ে চূড়া বানাই, এগুলো প্রার্থনা করা জন্যেও তৈরী করে কেউ, আবার পাহাড়ি পথে দিক নির্দেশের জন্যও বানিয়ে রাখে গাইডরা। তাঁবুতে ফিরে এসে এক তাঁবুতে আড্ডা , আর সবার আনা নানা খাবার টেস্ট করা। কোম্পানি যে খেতে দিচ্ছেনা তা নয়, যথেষ্ট দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের বোয়ে আনা খাবার গুলোও তো পাসে ওঠার আগে হালকা করতে হবে। যাইহোক, আগামীকাল আমাদের এই ক্যাম্পেই থাকার প্ল্যান। তাই আজকের মত শুভরাত্রি।
০১/০৬/২০২২, বুধবার - মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা। যদিও আজ আমাদের কোথাও চলে যাবার কথা নেই , লিথামেই বিশ্রাম নেবার দিন। তবে এই বিশ্রাম ল্যাদ খাওয়ার বিশ্রাম নয়। ট্রেকারদের বিশ্রামেও শ্রম থাকে! তাঁবুর বাইরে জয়দীপের উল্লাস শুনে ঘুমটা ভাঙাতেই হলো, বাইরে নাকি বরফ পাওয়া গেছে । উঁকি মেরে দেখি ঘাসের উপরে পাতলা সাদা আস্তরণ। শিশির গুলো জমে গেছে মনে হয়। তুষারপাত হয়নি নিশ্চিত। দারিংবাড়ির বরফের মত ব্যাপার আর কি। খুব যে ঠান্ডা লাগছে তা নয়, খাওয়া বা হাতমুখ ধোয়ার জন্য সবসময় যে গরম জল পাচ্ছি তাও নয়, গরম জল দিচ্ছে কিন্তু কখনো কখনো ঠান্ডা জলেও কাজ সেরে নিচ্ছি। আমরা পাঁচজন এক তাঁবুতে ঢুকে সকালের চা পান করি। দুই ভাই তখনও নিজেদের তাঁবুতে ল্যাদ খাচ্ছে আর পুরিয়ার স্বপ্ন দেখছে।
আমাদেরও টয়লেট টেন্ট আছে। যতদূর মনে পড়ছে সেই বালি পাস ট্রেক থেকে আমরা টয়লেট টেন্ট পাচ্ছি। ট্রেকার হিসেবে মনে হচ্ছে আমরাও জাতে উঠে গেছি। আমরাও এখন টেন্টের মধ্যে বসে হাগি। তবে আমরা হলাম গিয়ে বিদ্যাসাগরের উত্তরসূরি, তাই নুন ভাত খাওয়ার অভ্যাস পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারিনি, স্বেচ্ছায় হোক বা বিপাকে পড়ে টেন্টের বাইরেও হাগতে পারি আমরা! তবে এই পাহাড়ে হাগার কিছু নিয়ম কানুন আছে , নতুনদের সেগুলো জানা উচিত আর নতুন পুরোনো সবার সেগুলো মেনে চলা উচিত। মোদ্দা কথা হলো কখনোই তোমার ছেড়ে আসা নমুনা উন্মুক্ত না রাখা , পরের জন সেটা দেখে মোটেই উল্লসিত হয়না। যাইহোক, এইসব গন্ধকাতর বিষয় ছেড়ে খাওয়ায় ফেরা যাক। নদী পার করে কিচেনে খেতে যাই। এক একদিন এক এক রকম ব্রেকফাস্ট। মুখে না দিতে পারার মত এখনও কিছু বানায়নি এরা। তাই খাওয়া দাওয়া বেশ ভালই হচ্ছে। শুধু সুব্রতকে কখনও ঠিকঠাক খেতে দেখছিনা , কেসটা কি সেটাও বুঝতে পারছি না। তবে যা চেহারা বানিয়েছে শুধু স্যান্ডউইচ আর চকোলেট খেয়েই পাহাড়ে ২৬ দিন হেঁটে দেবে!
আমরা তাড়াতাড়ি শুরু করতে চাইলেও, আমাদের সাপোর্টিং টিমের তেমন কোনো তাড়া নেই। তাই আজকে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেবার জন্য হাঁটা শুরু করতে ৮ টা বেজে গেলো। ঠিকই আছে, দেরী হয়নি। ছোট স্যাক নিয়ে আমরা সবাই বেরিয়ে পড়ি, গাইড দীক্ষিত পথে আমাদের ধরে নেবে। আমাদের আজকের গন্তব্য ৩ কিমি দূরে প্রায় ১৪০০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত চন্দ্রনাহান লেক। প্রচুর ট্রেকার শুধু এই পর্যন্ত ঘুরে দেখে আবার জাংলিক ফিরে যায়। সাধারণ ট্রেকারদের জন্য একটি জনপ্রিয় ট্রেক রুট। প্রথমেই আমাদের কালকের পথে নদী পার করে প্রথম ক্যাম্প সাইটে যেতে হলো। প্রাথমিক লক্ষ্য পাহাড়ের মাথায় সেই ঝর্নার উপরে যাওয়া, তারপর আরও হেঁটে সাতটি লেকের যত গুলো সম্ভব এক্সপ্লোর করা। এরপরে বেশ কিছুটা চড়াই ওঠার পর আমরা পৌঁছে যায় নদীর পার্শ্ববর্তী বোল্ডার জোনে। আমাদের আগে ইসকা ফৌজ উসকা ফৌজ যাচ্ছে তবুও রাস্তা যে খুব একটা বোঝা যাচ্ছে তা নয়। এখানেই আমরা যত মত তত পথ ফর্মুলা অ্যাপ্লাই করে নিজেদের পথ নিজেরাই খুঁজে নেই। গাইড তখনও আমাদের সাথে যোগ দেয়নি। এখানে আবার নিজেদের উদ্যোগে ব্রিজ ছাড়াই নদী পার করে আমরা উঠতে থাকি। একটা সময় যেনো বড় বড় বোল্ডার এর মধ্যে হারিয়ে যাই। তবুও এগোতে থাকি আর কিছুক্ষণ দুর থেকে দেখা সবুজ ঢালে পৌঁছে যাই এক ঘণ্টায়। সামনে একটা মারাত্মক চড়াই উঠে গেছে ঝর্ণার মাথায়। আরও এক ঘন্টা চড়ার পরে আমরা পৌঁছেও যাই উপরে ঝর্নার পাশে। অনেকটা সেই রূপিন ঝর্ণার মতই ব্যাপার আর কি। এখানে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই সবাই মিলে। নদীখাতে নেমে আমি আর জয়দীপ একটু ছবি তুলে আসি।
পুরোটাই রুক্ষ এলাকা , সবুজের স' নেই, বরফের ব'ও নেই! কোথাও কোথাও সামান্য ঘাসের আভাস আছে মাত্র। আসলে আমরা এই এলাকার এই সময়ের যে ছবি দেখেছি তা সবই বরফাবৃত। হিট ওয়েভের জন্য , সূত্র জয়দীপ, এবার বরফ গলে জল হয়ে গেছে। আমরা ছোট বড় বোল্ডার বিছানো চড়াই উৎরাই পথ পেরোতে থাকি। একে একে প্রথম, দ্বিতীয় লেক পার করে আমরা তৃতীয় লেকের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাই, তখন সকাল ১১টা। জয়দীপ শুরুর দিকের প্রান্তেই বসে থাকে একা একা। আমরা প্রথম লক্ষ্যে পৌঁছানোর আনন্দে এখানেও জাতীয় পতাকা তুলে জাতীয় সঙ্গীত গাই। আমাদের গাইড সেই ভিডিও করতে গিয়ে কেটেকুটে একাকার করে দিয়েছে। এই প্রান্তে গেরুয়া পতাকা লাগানো একটা ছোট মন্দির আছে। অধিক উচ্চতায় হিমালয়ের কোলে প্রায় সব লেকই পবিত্র এবং পৌরাণিক গল্পের অঙ্গ। স্থানীয়দের বিশ্বাস তাদের আরাধ্য দেবতা শিক্রু মহারাজ এর এলাকা এটি, এবং এখনও বছরে একবার পবিত্র চন্দ্রনাহান হৃদে স্নান করতে আসেন। বাকি দিনগুলো কোথায় স্নান করেন জানা যায়নি! খুব বেশি ট্রেকার এইদিকে আর আসেনি। আর হাতে গোনা দু একজন কে আরও এগিয়ে যেতে দেখি। সামনেই বোল্ডারে বিস্তীর্ণ একটা চড়াই, তার উপরে কি বোঝা যাচ্ছেনা। আমার পক্ষে যাওয়া কষ্টকর হয়ে যেত, বাকিরাও কেউ যেতে আগ্রহ দেখালো না। উপরে আরও চারটি লেক থাকার কথা এবং পাব্বার নদী উৎসমুখ , স্নাউট থাকার কথা। কিন্তু মনে হয়নি উপরের দৃশ্য এখানের থেকে আলাদা কিছু হবে। আবহাওয়া খুব একটা পরিষ্কার নয়, সব কিছু কেমন ঝাপসা, ঘোলাটে মেঘে ঢাকা। এই জায়গাটায় বিচ্ছিন্ন ভাবে হলেও মিষ্টি বেগুনি রঙের ছোট ছোট ফুল দেখি। লেক গুলো যে কাঁচের মত জলে টলমল করছে তা নয়। সত্যি কথা বলতে কি মনে গেঁথে যাবার মত কোনো সৌন্দর্য্য চোখে পড়েনি তবে জার্নিটা নিশ্চয় মনে থাকবে। তবে বর্ষায় যখন লেকের দুদিকের পাহাড়ের ঢাল সবুজে ঢাকা পড়ে বা অন্য সময় বরাফাবৃত হয়ে পড়ে তখন নিশ্চিত অপরূপ হয়ে ওঠে এখানকার পরিবেশ। আসলে পাব্বার নদীর ধারা নানা জায়গায় নানা ভাবে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে এমন লেকের আকার ধারণ করেছে। হর কি দুন উপত্যকায় মিরিন্ডা তাল যেমন দেখেছিলাম। যাইহোক আমরা অধরা স্বর্গ থেকে ফেরার পথ ধরি।
দ্বিতীয় লেকের ধারে সবাই মিলিত হই বিশ্রাম নেবার জন্য। নানা জনের নানা ড্রাই ফ্রুটস্, কখন যে কার টা খাচ্ছি খেয়াল থাকছে না। নিজেরটা খোলার সুযোগই পাচ্ছিনা, ড্রাই ফ্রুটসের ঠোঙ্গা! আমি এবার একটু ক্যারামালাইজড নারকেল এনেছি, কিন্তু শেষ মুহূর্তের ভুলে একটু বেশি পাক হয়ে গেছে, তাই কেউ খেতে চাইছে না। নিজের কর্মফল নিজেই খাচ্ছি! ফেরার পথে প্রায় শেষদিকে, প্রথম ক্যাম্পে নামার সময় দূরে দেখি দেবু আর কৌশিক কাকে যেনো হাত ধরে নামাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখি একজন মধ্যবয়সী মহিলাকে নামতে সাহায্য করছে। এটাই তো আমাদের মানে ট্রেকমেট দের মোটো! আমাদের ব্যানার না থাকলেও, ব্যানারের ডিজাইনে আছে , তোমার সহ পদযাত্রীর দিকে প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও। শুধু অকারণে সুস্থ কাউকে ট্রেক পথে নিজের মাপের জল দিওনা। ওটা সাহায্য করা নয়। নিজের প্রয়োজনীয় জল বহন করার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। জল না দিয়ে সেই শিক্ষাটা তাকে দাও। বিশেষ পরিস্থিতিতে অবশ্যই জলদান করতে হবে, কিন্তু সর্বক্ষেত্রে কখনোই নয়।
দুপুর দুটোর মধ্যে আমরা সবাই ক্যাম্পে ফিরে আসি। ওয়েদার এই সময় দারুন। সকালের সেই ঝাপসা ভাব কেটে গিয়ে ঝকঝকে। লিথাম ক্যাম্প সাইট যেনো স্বর্গ। সামনে অন্য টিমের পিটি আর টেপাটিপি দেখতে দেখতে , ঘাড়-পিঠ, আমরা দুপুরের গরমাগরম খিচুড়ি খেতে থাকি। এখনও পর্যন্ত বেশ আরামদায়ক ট্রেক ও খাওয়া দাওয়া হচ্ছে। এতদিন সহজ পথে হেঁটেছি তাই আমার আহত পা'কে তেমন পরীক্ষার মধ্যে পড়তে হয়নি। আজই প্রথম টের পেলাম অসুবিধাটা, বোল্ডার জোনে পা ফেলার সময়। বুড়ো আঙুলের ব্যথা বাঁচিয়ে পা ফেলতে হয়েছে, সব সময় যে পেরেছি তা নয়। স্বাভাবিক গতি শ্লথ হয়েছে তার জন্য। বিপদ কিছু ঘটেনি। আমি এবং আমরা সবাই আগামীকাল বুরান ঘাটির পথে এগিয়ে যাবার জন্য শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত।
০২/০৬/২০২২ , বৃহস্পতিবার - লিথামেয়ারির দু রাত্তির। বুদ্ধদেব গুহর অনুপ্রেরণায় বাংরিপোশির মত কিছু এখানে ঘটেনি। ঘটতেই পারতো। মনে লাড্ডু ফোটার মত অনেক কিছুই হাজির ছিল। ট্রেকারদেরতো এমন আনরোমান্টিক হবার কথা নয়। তাই যেকোনো নদীখাতে বা পাহাড়চূড়ায় সেই অ্যাডভেঞ্চার হতেই পারে। আমরা সকাল সকাল উঠে তৈরী হলেও গাইড পোর্টার দের আজও কোন হেলদোল নেই তাড়াতাড়ি বেরোবার। শুধুই বলছে , থোড়া সা তো হ্যায়, দো ঘন্টেমে আরামসে পৌঁছ যাওগে। তা আরাম তো আমরা গত তিনদিনেই টের পেয়ে গেছি । আজ তো পাহাড়ের আরও গহনে গভীরে ঢুকতে যাচ্ছি! পাহাড়ে হাঁটতে গিয়ে আরাম আর মদ্যপান হারাম এমন কোনো কথা ব্যাদে লেখা নাই। তাই এর কোনো মানেই নেই! তবে বেদে লেখা থাকুক বা না থাকুক অধিক উচ্চতার ট্রেকে ধুম্রপান ও মদ্যপান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, অন্য কিছু পানে কোনো বাঁধা নেই! তো, নদী পার করে টিফিন খেতে যাওয়া আবার ফিরে এসে স্যাক গোছানো এইসব করতে করতে ৮:৩০ বেজে যায়। আজ আমাদের গন্তব্য ৫ কিমি দূরে ১৩৫০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত ঢুন্ডা।
আমাদের আজকের পথ সামনের বরাফাবৃত পাহাড়চূড়াকে লক্ষ্য করে , কিন্তু ক্যাম্প সাইট সেদিকে নয় , শেষে বাঁদিকে বেকে গেছে, যেটা শুরুতেই বোঝা যাচ্ছেনা। প্রথমেই চড়াই ভাঙতে হলো। যে পথ উঠতে সবসময়েই আমাকে অনেক হিসেব নিকেশ করতে হয়। হাঁফ লেগে যায় দশ পা উঠতেই। এবার আবার পিঠে ভারী বোঝা যদিও তার জন্য অতিরিক্ত কোনো কষ্ট অনুভূত হচ্ছেনা। আজকের পথে আর মালবহক ঘোড়া খচ্চর নেই, এরাই নিয়ে যাবে নিজেরা । এক ঘন্টা হাঁটার পর আমরা আবার নদীখাতের বোল্ডার জোনে নেমে আসি। এটা সেই নদী যেটা লিথামে আমাদের ক্যাম্পের পাশে দেখেছি , আর পাব্বারের সাথে মিশেছে। নামটা জানা নেই , তবে এটাই বুরানঘাটি পাসের দিক থেকে নেমে এসেছে। আপাতত এইখানে আমরা বেশ কয়েকবার নদীটা পারাপার করেছি , কঠিন কিছু নয়। উঁচু নিচু বোল্ডার ঢাকা পথে এগিয়ে যেতে থাকি। পথে অন্য দলের অনেকের সাথে দেখা হয়েছে। ওয়াকি টকি হাতে এমনই কোনো দলের টিম লিডার একটি মিষ্টি মেয়ে বারবার নজর কেড়ে নিয়েছে। যেতে যেতে হটাৎ চোখে পড়ে একজন মহিলা আর হাঁটতে পারছে না , বিদ্ধস্ত, হাঁফাচ্ছে, বারবার বসে পড়ছে। যা অবস্থা ফিরে যাওয়াটাই সমীচীন। এ এম এস এর লক্ষণ হলেও হতে পারে। সাথে তার পুরুষ সঙ্গী আছে। তবুও এড়িয়ে চলে যাই কি করে? কথা বলে বোঝার চেষ্টা করি কতটা গুরুতর। কোকা ৩০ ওষুধ দেওয়া ছাড়া আমারও আর বিশেষ কিছু করার নেই। কারণ আমার কথায় সে ফিরে যাবেনা। ভয়ে ভয়ে ওষুধ টা খেলো। এদের মনে হয় টিম থেকে বারণ করে দেওয়া হয় , পথে অচেনা কারও কোনো নির্দেশ না শুনতে, কিছু খাওয়া তো দূর। যাইহোক, এই পথে আরও ঘণ্টা খানেক চলার পরে আমরা একটা বড় স্নো ব্রিজের সামনে পৌঁছাই। এখানেই আমাদের পথ টা কিছু বাঁদিকে বেঁকে পাহাড়ের মাথায় উঠে গেছে। স্নো ব্রিজটা পার করার সময় আমরা সবাই আবার একসাথে হয়ে আগে পরে পার হয়েছি। শুরু হয় আবার চড়াই। একা রাম রক্ষে নেই সুগ্রীব দোসর ! কোম্পানি আমাদের আরও কিছু দিতে চায়। সামনে আরও কঠিন চড়াই। এই চড়াইটা আমরা যে যার মত আগে পরে চড়তে থাকি। পাশ দিয়ে একটা হালকা জলধারা নেমে গিয়ে নিচের নদীতে মিশেছে। ১২ টা নাগাদ এক এক করে আমরা চড়াই টা অতিক্রম করে উপরে সেই ঝোড়ার পাশে পৌঁছে বাকিদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। কারণ আমরা ঢুন্ডা ক্যাম্পে পৌঁছে গেছি। সামনে ভি আকৃতির পাহাড় খাঁজের মধ্যেই আমাদের অভীষ্ট বুরান পাস। আর বরফে ঢাকা পাহাড় গুলো ডান দিকে বা পিছন দিকে। পথে দু একবার সেই অসুস্থ মেয়েটিকে দেখে আগের থেকে বেটার লেগেছে। এখানেই অনেক্ষন কেটে যায়, কারণ আমাদের ক্যাম্প একদম উপরের দিকে, পাসে যাবার পথের দিকে। আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছতে দুপুর ১ টা বেজে যায়।
আমাদের ক্যাম্পটা একটা ছোট টিলার উপরে, নিচে বাকি দলের ক্যাম্প গুলো ছবির মত দেখাচ্ছে। আর সেই সবের ব্যকগ্রাউন্ডে বরফাবৃত পাহাড়। পুরো ক্যাম্পিং এলাকাটা উঁচু নিচু হালকা সবুজ ঘাসে ঢাকা জমিতে। মধ্যে সরু জলের ধারা নেমে গেছে ক্যাম্পের বুক চিরে। আগের দুদিনের ক্যাম্প সাইটের থেকে আজকের সৌন্দর্য্য একেবারেই অন্যরকম। আমরা যেনো একেবারে পাহাড়ের কোলে উঠে পড়েছি। সামান্য দূরে বোল্ডার জোন পেরিয়ে সেই ভি আকৃতির পাহাড়ের খাঁজের মধ্যে বুরান ঘাটির আভাস পাওয়া যাচ্ছে , পুরোটা বোঝা যাচ্ছেনা কারণ উপরে ওঠার পরে পথ একটু বেঁকে গেছে।এই সুন্দরের মধ্যে এসে ছবি তুলে কারোরই যেনো মন ভরছে না। পাব্বার ভ্যালি আর বসপা ভ্যালির সংযোগ রক্ষাকারী এই বুরান পাস। হিমাচল মানেই ধৌলাধার পর্বতশ্রেণী, আর তার দক্ষিণ পূর্ব দিকের ঢালে এই পাস। এই ট্রেক রুট শেষ হয় করছাম এর কাছে বড়ুয়া গ্রামে, যেখান থেকে সাংলাও বেশি দূর নয়। এই এলাকায় উত্তরাখণ্ড আর হিমাচল প্রদেশের মধ্যে একাধিক পাস আছে , যার বেশিরভাগই ব্যাবহার করা হয় ভেড়া পারাপার করার জন্য। এর ডান দিকে কয়েক কিমি এগিয়ে গেলেই রুপিন পাস , যে ট্রেক রুট শেষ হয় সাংলাতে গিয়ে, যেখানে ২০১৫ সালে আমি আর জয়দীপ গেছিলাম। আরও ডানদিকে পরপর আছে খিমলোগা পাস, বোরাসু পাস আর লামখাগা পাস যেগুলো বেশ নামকরা এবং শেষ বা শুরু হয় ছিটকুল থেকে। এ ছাড়াও আরও কয়েকটা পাস আছে এই এলাকায়। রতনলাল বিশ্বাস বা তপন পণ্ডিত কে যেনো এই এলাকার প্রধান পাঁচটি পাসই অতিক্রম করেছেন, পড়েছিলাম, ঠিক মনে নেই। ছিঁছোড়ে সিনেমার সেই ডায়লগ টা মনে আছে ? "আবে ও লোগ কোচ লেকে আয়া!" আমরাও তেমন একটা দৃশ্য দেখি নিচের ক্যাম্পে, ট্রেকাররা সবাই জড়ো হয়ে বসেছে , আর দু একজন দাঁড়িয়ে হাত পা নেড়ে তাদের ভাষণ দিচ্ছে, শুনতে তো পাচ্ছিনা কিছুই ! বোঝা গেলো ওদের টিম মিটিং এ আগামী কালের পরিকল্পনার ব্রিফিং চলছে। আমাদের একটাই প্ল্যান, ভোর রাতে উঠে রেডী হয়ে বেরোতে হবে। আমরা কয়েকজন কালকের পথের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে রেইকি করে আসি। ছোটু কথা রেখেছে, সন্ধ্যার মধ্যেই চলে এসেছে ক্যাম্পে। কাল আমাদের পাস ক্রস করিয়ে দিয়ে ফিরে যাবে।
০৩/০৬/২০২২, শুক্রবার - আজ আমাদের সামিট ডে। যদিও সামিট লিখলে ছ'হাজারীরা খিল্লি করে। তাই সোজা করে বলি, আজ আমাদের ট্রেকের মূল দিন, পাস ক্রস করার দিন। ১৩৫০০ ফিট উচ্চতার ঢুন্ডা থেকে ১৫০০০ ফিট উচ্চতার বুরান পাসে উঠে নেমে যেতে হবে ১০৫০০ ফিট উচ্চতার মুনিরাং বা রিভার সাইড ক্যাম্পে , প্রায় ৮ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে। বোঝাই যাচ্ছে , ওঠার থেকে নামা টাই কঠিন হতে চলেছে।
ভোর ৩ টের সময় ঘুম থেকে উঠে যে যার মত তৈরী হতে থাকি। যদিও এবার সাজগোজের বহর কম, সামনের রাস্তা বরফ হীন, তাই গেইটার বা ক্রাম্পন ইত্যাদি পড়ার কোনো ব্যাপার নেই, তবে হেড ল্যাম্প জরুরী। আজই প্রথম ঠান্ডাটা টের পাওয়া যাচ্ছে। কাল রাত থেকেই আমি সখের পাহাড়ি ঘড়িটা খুঁজে পাচ্ছিনা , বেল্ট ছেঁড়া, তাই ছোট ব্যাগের মধ্যেই তার জায়গা হচ্ছিল। প্রচুর খুঁজেও পাইনি আর মনেও করতে পারিনি কোথায় কখন ভুলে রেখে দিয়েছি। ৪ টে নাগাদ আমরা ট্রেক শুরু করি।
ক্যাম্প সাইট পার করে প্রথমেই একটু নেমে যেতে হচ্ছে। উপর থেকে দূরের পায়ে চলার রাস্তার হালকা দাগ কাল দেখেছি। ওই টুকু দাগ বাদে বাকি জায়গাটা পুরোটাই বোল্ডার জোন। এই সময় যেখানে বরফে ঢাকা থাকার কথা , অন্তত বিভিন্ন ভিডিও বা ব্লগে তেমনই দেখেছি। ছোটু কাল বলেছে আমাদের উঠতে ঘণ্টা চারেক লাগবে। ক্যাম্প থেকে পাসে ওঠার দূরত্ব টা বালি বেস ক্যাম্প থেকে পাসে ওঠার মতই, দুটো পার্থক্য, সেখানে আমরা পুরো বরফে ঢাকা সারফেস পেয়েছি এখানে ছোট বড় বোল্ডারে ঢাকা এলাকা, আর সেখানে আমাদের চোখের সামনে টার্গেটটা দেখা গেছে এখানে পাস এর মাথাটা দেখা যাচ্ছে না তবে আন্দাজ করা যাচ্ছে। কিন্তু প্রথমেই আমরা বিরক্তিকর পরিস্থিতির স্বীকার হই, গাইড পোর্টাররা যারা আছে তারা নিজেদের মর্জি মত নিয়ে যাচ্ছে , আমাদের দেখা সেই ট্রেল টা দিয়ে যাচ্ছেনা। হেড ল্যাম্পের আলোয় বুঝতে পারছি সেই পথে অন্য ট্রেকাররা যাচ্ছে, বিকট কা ফৌজ। আমাদের মনে হচ্ছে আমরা অকারণে কঠিন পথ অতিক্রম করছি। ঘণ্টা খানেক চলার পরে আমরা একই রুটে পৌঁছাই।
ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটছে। যদিও হিমাচলের এই ট্রেক গুলোয় সেই অর্থে সানরাইজ দেখার ব্যাপার নেই , এই রুটে এমন কোনো পর্বতশৃঙ্গ নেই যার মাথার সোনালী মুকুট দেখার জন্য আমাদের তাড়াহুড়ো করতে হবে। যে যার মত এগোচ্ছি। তবে মাঝপথে সবাই একবার মিলিত হয়েছি। আমার যথারীতি পটি পায় , আর বোল্ডারের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে কাজ সেরে আসি। আবার রেডী হয়ে বেরোতে সময় লাগে। ততক্ষণে বাকিরা এগোতে শুরু করেছে। ঘণ্টা দুয়েক চলার পরে পথে বিক্ষিপ্ত ভাবে বরফ পেতে থাকি। আমাদের পথও বাঁদিকে বেঁকে গেছে , যার জন্য নিচে থেকে পাস দেখা যায়নি।
আরও আধ ঘণ্টা পর একটা শক্ত বরফের ঢাল পাই। এর মধ্যে আমায় আরও একবার পটিতে বসতে হয়েছে! তখন আমার সঙ্গীরা তো দুর অন্য ট্রেকার দেরও দেখতে পাওয়া যাচ্ছেনা। শুধু আমার কয়েক কদম আগে দুটি মেয়ে উঠছে, একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা ট্রেকার অন্য জন তার গাইড তাকে এসকর্ট করে নিয়ে যাচ্ছে। আমিও হাঁফাচ্ছি , তার থেকেও বেশি ভয় লাগছে। কারণ আমি বিপদের গন্ধ পাচ্ছি, মনে হচ্ছে কোনো কারণে যদি গ্রিপ বিট্রে করে তাহলে স্লিপ করে গড়িয়ে যাবো, নিজেকে আরেস্ট করার কোনো সুযোগ পাবনা , ভালো রকম আহত হতে হবে। আমার ভয় বা দ্বিধা মনে হয় ওই গাইড টের পেয়েছে, আমার সাহায্য লাগবে কিনা জানতে চেয়েছে। যখন বুঝলাম আমার পা স্লিপ করলে ওই মেয়েটি সাহায্য করতে আসবে, আমিও বুকে বল পাই, নিজের চেষ্টাতেই ধীরে ধীরে উঠতে থাকি। বরফের ঢালটা ওঠার পরে আর কিছুটা এগোতেই উপরে জন অরণ্য চোখে পড়ে, বুঝি অভীষ্ট লক্ষ্যের কাছে পৌঁছে গেছি। আমিই মনে হয় শেষে পৌঁছাই, তখন ৭ টা বাজে। বাকিরা ৬ টা থেকে পৌঁছে গেছে এক এক করে। পাসের মাথায় অবশ্য ভরপুর বরফ। পাসের মাথাটা অনেকটা রুপিন পাসের মত, রুপিন পাস এর থেকে বেশি দূরেও নয়। প্রথম দিকে আবহাওয়া একটু কুয়াশা মাখা ছিল। ছোটুকে ফোন করতে দেখে , আগেই বলেছিল পাসের মাথায় লাইন পাওয়া যায়, আমিও মেঘকে পেয়ে গেলাম লাইনে, পাসের মাথা থেকে আপনজনের সাথে কথা বলার অনুভূতি অন্য রকম। এটা ভালো কি খারাপ জানিনা, যদিও ট্রেক পথের অন্য দিন গুলোয় আমি ফোন করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠিনা। কিন্তু এই পাসের মাথায় নেটওয়ার্ক পাওয়া ডিজিটাল ইন্ডিয়ার পথে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া। এর পর প্রথামত এবং আমার নিয়ম মত পাসের মন্দিরে ক্যাডবেরি সহযোগে পুজো করি। সব শেষে তিরঙ্গা নিয়ে আমাদের গ্রুপ ছবি আর জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া। ততক্ষণে আমরা সবাই নিচে নামার ঢাল দেখে নিয়েছি। কারও অজানাও নয় সেটা। ছোটু এখানে একজন ফ্রিল্যান্স এক্সপার্টকে ভাড়া করেছে , যে দড়ি , হার্নেস ইত্যাদি জিনিসপত্র সহ আমাদের নিচে নামিয়ে দেবার দায়িত্বে আছে। ৭:৩০ থেকে নিচে নামার পালা শুরু হলো। পাশে তখন বিকট এর দল ছিল, তাদের ট্রেক লিডার নীরাজের সাথেও আলাপ হলো। দু দলেরই ট্রেকার রা পাশাপাশি দড়ি খাটিয়ে নামছে। আমাদের দলের প্রথম নামছে দেবু। ওদের নিয়মিত নির্দেশ আসছে, সেগুলো ঠিকঠাক করতে পারলে ব্যাপারটা খুব একটা কঠিন কিছু নয়। ভালো করে লক্ষ্য করে যা বুঝি, নিরাপত্তার কোনো অভাব নেই, দুর্ঘটনা ঘটতে গেলে দড়ি ছিঁড়তে হবে বা হারনেস খুলে বা ছিঁড়ে যেতে হবে অথবা যে অ্যাঙ্গেল টা বরফের মধ্যে ফুট চারেক ঢোকানো আছে সেটা যদি বরফের চাঙ্গ ভেঙে বেরিয়ে আসে, তবেই ট্রেকার দড়ির সাথে আলাদা হয়ে গিয়ে অনেকটা গড়িয়ে পড়বে, তবে চোখের সামনেই থাকবে , খাদের আড়ালে পড়ে যাবার মত জায়গা নয়। ট্রেকার নিজে যদি নামার সময় টুকটাক ভুল করে তাহলে খুব একটা বিপদজনক কিছু ঘটবে না , ব্যালান্স হারিয়ে দড়িতেই লটকে থাকবে, মালের বস্তার মত দড়ি ছেড়ে ছেড়ে নামিয়ে দিতে হবে! যাইহোক, এক এক করে সবাই নামার জন্য রেডি হচ্ছে। মজা যেমন আছে তেমনি একটা চাপা ভয় বা দুশ্চিন্তাও নিচয় কাজ করছে সবার মধ্যে। আমার টার্ন ৩/৪ জন পরে এলো, ততক্ষণে বাকিদের নামা দেখে নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলেছি। আমাদের স্টার্টিং এর জায়গাটাই একটু গড়বড়ে, সেটা পার হয়ে যাবার পর আর অসুবিধা হয়নি। স্পিডেই নামতে চাইছি, কিন্তু উপর থেকে দড়ি অত তাড়াতাড়ি ছাড়ছে না। যাইহোক ১০০ মিটার মত নামার পর দড়ি শেষ। সেখানে সামান্য দঁড়ানোর জায়গা, কিন্তু ঢাল কিছু কম নয়। সেফ জোন আরও খানিকটা নিচে। নিজে নামার বা স্লাইড করার সাহস পাচ্ছিনা। আমাদের স্টাফ কেউ নেই, একজন নিচ থেকে উঠছে। অন্য একজন আমাকে কিছুটা নামিয়ে দিয়ে আমাদের স্টাফ এর কাছে সঁপে দেয়। সেও আমাকে কিছুটা নামিয়ে দেয়। একটা সময় পরে একাই স্লাইড করি। এই পুরো পথে স্যাক কিন্তু আমাদের পিঠেই আছে। স্লাইড করে নামার সময় প্রথমে আমার জলের বোতলটা গড়িয়ে পড়লো, একসময় টের পাই আমার রেন প্যান্ট ( বাইক চালানোর সময় পরে যেগুলো ) ভিতর থেকে ফরফর করে ছিঁড়ে যাচ্ছে। পুরো ব্যাপারটায় মজাও যেমন পেয়েছি ভয়ও তেমন পেয়েছি। মুহুর্তের ভুলে আহত হতে হত। ৮:৩০ এর মধ্যে আমরা সবাই নিচের সেফ জোনের একটা রকের কাছে পৌঁছে যাই। একটা মহিলা দল সেখানে জড়ো হয়েছে আগেই। সানি নামার সময় শেষদিকে একটু গড়িয়ে চোট পেয়েছে, হাত পা কোমর ছ'ড়ে গেছে। মারাত্মক চোট কিছু পায়নি। এই দিক থেকে পাসের মাথা আর নেমে আসার ঢালটা খুব সুন্দর লাগছে, ততক্ষণে রোদ উঠে গেছে , সাদা বরফের মাথায় নীলাকাশ। অপূর্ব ভয়ংকর সে সৌন্দর্য্য। ভেবে ভালো লাগছে যে আমরা সবাই পাস অতিক্রম করে ভালো ভাবে নেমে এসেছি।
বরফের মধ্যে দিয়েই আরও ঘণ্টা খানেক নামার পর আমরা এক জায়গায় পাথরের উপর বসে টিফিন করি। শুকনো পরোটা আর আলু চোখা। খুব একটা খাওয়া গেলনা। ১০ টা বেজে গেছে। আমরা এগোতে থাকি, বরফ যেনো আর শেষ হয়না , পিছনে তাকালে তখনও পাস দেখা যাচ্ছে। একটানা বরফ শেষ হবার পরেও মাঝে মধ্যেই বিশাল বিশাল বরফের ঢাল পাচ্ছি। তবুও খুব একটা অসুবিধা হচ্ছেনা , সবাই নেমেই যাচ্ছি এক এক করে। ১০:৩০ নাগাদ আমরা একটা জায়গায় সবাই মিলে বসে বিশ্রাম নিই , যেখানে পিছনে বরফাবৃত পথ , কিন্তু পাস দেখা যাচ্ছেনা আর সামনের পথ বরফহীন। সামনের এই বরফহীন ঝুড়ো পাথুরে এলাকার সরু পথ টাই বেশি কঠিন ঠেকছে। ১১:৩০ নাগাদ আমরা নেমে এলাম একটা নদী খাতের মধ্যে, তারই একপারে একটি ঝুপড়ি দোকান! এখানেও সবাই মিলিত হয়ে চা - ওমলেট বিরতি নিই। বিশাল নদী খাত পেরিয়ে আবার উপরে উঠতে হলো। এই এলাকা হালকা সবুজ , পাথুরে এলাকা। হয়ত বরফেই ঢাকা থাকে, বরফ গলে গেলেও এখনও ঘন সবুজ ঘাস গজায়নি। এরকমই একটা পাহাড়ি ঢালের নুড়ি ধুলো মেশানো সরু পথ পার হতে গিয়ে আমি থেমে গেছি , বুঝতে পারছিনা সামনের দু চারটে স্টেপ নিশ্চিতে নিতে পারবো কিনা , আবার মনে হচ্ছে জুতোর গ্রিপ বিট্রে করে পাশে গড়িয়ে পড়লে সরাসরি উপরে না গেলেও ভায়া হাসপাতাল যেতে হতেই পারে! কিন্তু উদ্ধার করে নিয়ে যাবে কে! কোনো রিস্ক নেওয়া যাবেনা , বাড়িতে মেঘ - বৃষ্টি অপেক্ষা করে আছে , আমাকে সুস্থ শরীরেই ফিরতে হবে। তাই আমি বেশ কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়েই থাকি, কারণ কাছে কাউকে সাহায্য করার মতো দেখছিও না। হটাৎ পিছন থেকে কেউ আমায় হালকা সরিয়ে আমার ডান দিকে খাদের দিক দিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে আমি কোনরকমে বাঁদিকের পাহাড়ের ঢালে হেলে খামচে ধরি। কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। তাকিয়ে দেখি সুব্রত। আমার মুখ থেকে এ কে ফর্টি সেভেনের গতিতে গুলি বর্ষণ হচ্ছে তখন। বাঁদিকে না হেলে আমি ডান দিকে হেলে গেলেই দুজনেই গড়িয়ে পড়তাম। যাইহোক ঘোর কাটার পরে কারও হাত ধরে জায়গাটা পার হই। পাসে ওঠার মুখে আর এই জায়গাটা, হয়ত মারাত্মক বিপদজনক কিছু নয় কিন্তু আমি ভয় পেয়েছি, সতর্ক হয়েছি। তাড়াহুড়ো করে পার হবার চেষ্টা করিনি। ১২:৩০ এর আশেপাশে সময়ে আমরা প্রবেশ করি গ্রীন জোনে। চলার পথের ঘাস তখন সত্যিই সবুজ। ধীরে ধীরে চলার পথে গাছও পাচ্ছি। দূরে দেখা যাচ্ছে আমাদের আজকের ক্যাম্প সাইট।
আরও এক ঘন্টা চলার পরে আমি যখন ক্যাম্পে পৌঁছাই তখন সময় ১:৩০ । নদীর ধারেই ক্যাম্প, গর্জন শোনা গেলেও নদী কিঞ্চিৎ নিচে চোখের আড়ালে যদিও দূরে নদীর নেমে আসাটা চোখের সামনে। সবুজ ঘাস, পাইন গাছের সারি , সবুজ বা সাদা পাহাড় চূড়া, সব মিলিয়ে অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ। একটু পরে যা বুঝি, এটা একটা ফ্রিল্যান্স ক্যাম্প, একরাতের জন্য আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে এখানে। মানে ঢুন্ডা থেকে আমাদের ক্যাম্প গুটিয়ে নীচে ফেরত চলে গেছে , পোর্টাররা আমাদের স্যাক দুটো নিজেরাই বয়ে নিয়ে এসেছে। মেক শিফট ব্যবস্থা। আমরা নিজেরা আসলে এই ব্যবস্থা গুলো করে উঠতে পারতাম না। আমাদের ক্যাম্পে আর কোনো দল নেই , প্রচুর টেন্ট। জয়দীপ প্রথমেই একটা টেন্টে ঢুকে বলে ও সেটায় একাই থাকবে! ওকে এই কদিনে প্রায়ই লক্ষ্য করেছি এমন একা হয়ে যেতে চেয়েছে। টিমের সাথে এসে এমন একা হবার ইচ্ছা গ্রহণযোগ্য নয়, বরং কখনো কখনো দুশ্চিন্তার কারণও হয়ে ওঠে। আমাদের আগে পরেও দুটো ক্যাম্প আছে। উপরে একটা ঝুপড়ি দোকান চোখে পড়ায়, আমি আর সুব্রত সেখানে যাই। সেদ্ধ ডিমের অর্ডার দিই। উপরেও ক্যাম্প নজরে পরে। একজন মহিলার সংসার এটি, সাথে স্থানীয় আর ট্রেকার দের ভরসায় ছোট দোকানও চালান। ২০/- করে সেদ্ধ ডিম। উপরে সামান্য নেটওয়ার্ক পাওয়া গেছে , বাড়িতে ফোন করে জানাই আমরা সেফ জোনে নেমে এসেছি। ক্যাম্পে ফিরে টাটকা ডিম সেদ্ধ খাওয়া হলো, শুধু তাই নয় কৌশিকের কাছে একটা সেদ্ধ ডিম ছিল জাংলিকের টিফিনে পাওয়া , সেটাও খেয়ে নিল ! যাইহোক, আমরা ট্রেকের কঠিনতম দিনটা মোটামুটি ভালোভাবেই পার করে সবাই সুস্থ ভাবে তাঁবুর আরামেঢুকে পড়েছি। কাল আমাদের ট্রেকের বিজয়া দশমী।
০৪/০৬/২০২২ , শনিবার - আজ আমাদের ট্রেক এর শেষ দিন, বিসর্জন। আমাদের এতদিনের কষ্ট, বিরক্তি, খারাপ লাগা , মন কষাকষি ইত্যাদি এই বসপা ভ্যালি তেই বিসর্জন দিয়ে আমরা নিয়ে যাবো অভিজ্ঞতা , ভালোলাগা আর সুন্দর স্মৃতি। আমাদের নির্ধারিত সূচী অনুযায়ীই আমাদের ট্রেক শুরু হয়েছে , শেষও হচ্ছে। আবহাওয়া বা অন্য কোনো অনভিপ্রেত ঘটনা আমাদের সূচিতে ব্যাঘাত ঘটায়নি। আজ আমরা ১০৫০০ ফিট উচ্চতার মুনিরাং থেকে নেমে যাবো ৮ কিমি দূরে ৭৫০০ ফিট উচ্চতার বড়ুয়া গ্রামে। সেখানে সুব্রতর ঠিক করা সানি ট্রাভেলসের গাড়ি অপেক্ষা করবে। কাছেই করছাম , শিমলা কল্পা রাস্তায় , যেখান থেকে সাংলা ছিটকুলের রাস্তা আলাদা হয়েছে। আমাদের প্ল্যান সরাসরি শিমলা না ফিরে , কারণ ফিরতে অনেক রাত হত, সাংলা ছিটকুল ঘুরে রাত্রে ট্রাভেল করে পরদিন ভোরে শিমলা ঢোকা , সেভাবেই হোটেল বুক করা আছে। আজ রাতেও শিমলার হোটেল বুক করে ফেরা যেত, কিন্তু সেটাতে অনিশ্চয়তা থাকতো, মানসিক চাপ বাড়ত।
আমাদের সকালে উঠে হাঁটা শুরু করে দেবার তাড়া থাকলেও , গাইড যেনো প্রথম দিন থেকেই গা ছাড়া মনোভাব। উদ্যোগের অভাব। একটা কথা লেখা হয়নি , প্রতিদিন ট্রেক শুরুর আগে আমরা নিজেদের চিয়ার আপ করার জন্য নাড়া লাগাতাম। টিম ইন্ডিয়া এক কালে যেমন করতো আর কি। আইডিয়া টা আসে, প্রথম দিন ক্যাম্পে আসার পর দেখি অন্য দল গুলো নানা কিছু করছে বা ট্রেক লিডার তাদের দিয়ে করাচ্ছে, আমাদেরও কিছু একটা করা দরকার। ওই "হাউ ইস দ জোশ" টাইপের আর কি। চিৎকার করে জয়ধ্বনি দেওয়া। আজও শেষ বারের মত বুরানঘাটি কি জয় , ট্রেক মেট কি জয় টয় বলে আমরা ৮ টার কিছু আগে ক্যাম্প ছাড়ি। সেই উপরেই উঠতে হচ্ছে , দোকান টার ঐদিকে। উপরে উঠে আমাদের অনেক্ষন অপেক্ষা করতে হলো গাইডের জন্য। অন্য দিকে সামান্য নিচে তখন বিকট এর ক্যাম্পের ফটোসেশন চলছে। আধ ঘন্টা হাঁটার পরেই বোঝা গেলো আমরা সবাই নবকুমার হয়ে গেছি , আর আমাদের প্রয়াত বাংলা শিক্ষক অবনী স্যার স্বর্গ থেকেও সুর করে জিজ্ঞেস করছেন , পথিক তোমরা কি পথ হারাইয়াছো?! তিনটের কেউ পথ জানে বলে মনে হলোনা , এতদিন পথ হারানোর মত পথ ছিলনা , আজ যেনো পথ হারাবে বলেই তারা পথে নেমেছে, চোরা পথের ধাঁধায় তারা অনেক ঘুরেছে! আধ ঘন্টা সময় শুধু নষ্ট হলোনা, সেই জায়গাটা থেকে নিচের পায়ে চলার পথের দাগে পৌঁছতে বেশ মেহনত করতে হলো, দুর্ঘটনাও ঘটতে পারতো। তার পর আমরা ক্রমশ দ্রুত নিচে নামতে থাকি। কোথাও মনে হয়েছে এটা সঠিক রাস্তা নয় , কোনো চিহ্ন নেই, আবার কখনো মনে হয়েছে এরকম বাজে রাস্তাই হবে হয়ত। আমরা একদম নিচে নদীতে নেমে যাচ্ছি ধীরে ধীরে। আর নামার সে রাস্তা বড়ই বিপদজনক। আছাড় খেয়ে পড়লে, যার প্রবল সম্ভাবনা, পচা শামুকে পা কাটিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। এই ভাবেই ৯:৩০ নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই পাহাড়ি ঝোড়ার উপর রাখা দুটি লগের কাছে। খুব একটা কঠিন না হলেও ভয়ে ভয়ে পার হয়েই গেলো সবাই। এটা আর একটু নিচে মূল নদীতে গিয়ে মিশেছে প্রবল গর্জন তুলে। কিছুক্ষণ সময় কাটাই ছবি তুলে। নামা মানেই ওঠা, আর ফেরার সময় উঠতে বড়ই অনীহা আমার। কিন্তু নামা তো শেষ হয়নি , আবার দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু হলো ভয়ংকর নামা। ততক্ষণে আমরা নিশ্চিত হয়ে গেছি যে ভুল পথে না আসলেও সঠিক পথেও আমরা আসিনি। কোনো ট্রেকার বা স্থানীয় কারও সাথেই এই পথে সাক্ষাৎ হয়নি। আমাদের বিশ্বাস ট্রেকার দের জন্য অন্য ভালো পথ নিশ্চই আছে। সানির কালকের চোটের পর আজ আরও কাহিল অবস্থা। তার উপর এমন বিপদজনক উৎরাই। ওর মুখ দেখে মনে হয়নি ও নিজে ব্যাপারটা এনজয় করছে। ওকে মানসিক ও শারীরিক ভাবে আরও ফিট হয়ে উঠতে হবে। নতুন ট্রেকার দের বলতে চাই , আগে মানসিক ভাবে পাহাড়ে হাঁটার জন্য প্রস্তুত হও। প্যাশন থাকতে হবে , আগ্রহ থাকতে হবে , ভালোবাসা থাকতে হবে , সব গুলোর অর্থ হয়ত একই কিন্তু থাকতে হবে। নিজের কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে তুমি এত কষ্ট করে খরচ করে কোথায় যাচ্ছ আর কেনই বা যাচ্ছ। অন্য যেকোনো কারও অনুরোধে উপরোধে বা উস্কানি তে কিংবা সোশ্যাল সাইটের দুর্দান্ত সব ছবি দেখে নেচে ট্রেক করতে চলে আসলে হবেনা। আগে মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে হবে। নাহলে পুরোটাই মাটি। এর পর দরকার প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা। এটা একটু কম থাকলেও তোমার যদি মানসিক প্রস্তুতি ঠিক থাকে তাহলে মেক আপ দেওয়া সম্ভব একটা পর্যায় পর্যন্ত। কিন্তু ধরো তুমি চূড়ান্ত ভাবে ফিট , এইসব পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটা তোমার কাছে কোনো ব্যাপার না কিন্তু তোমার মন সাথ দিচ্ছে না , তুমি কিছুই উপভোগ করতে পারবে না। তাই ঠ্যাং ছাড়া পাহাড়ে হাঁটা সম্ভব হলেও মন ছাড়া একেবারেই উচিৎ নয়। নাহলে আবার কখনো শুনতে হতে পারে , সোনালী আবহাওয়ায় নীলাকাশে সাদা পেঁজা তুলোর মেঘের চতুর্দিকে এক সে বারকার এক পর্বত শৃঙ্গেকে সাক্ষী রেখে সম্পূর্ণ রূপে বরফাবৃত তপোবনের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আকাশগঙ্গার পাশে দাঁড়িয়ে , " দীপুদা , এখানে আর কিছু দেখার নেই ?" ! এই প্রশ্ন যতটা না অজ্ঞানতা থেকে তার থেকে বেশি হতাশা থেকে। কারণ সেই প্রকৃতি পরিবেশ তার মনের খিদে মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে।
১০:৩০ নাগাদ আমরা সভ্য জগতে ঢুকতে শুরু করি। জলের পাইপ দেখা যায়, কচি সবুজ আপেল বাগান , পাহারাদারের ঘড়, পঞ্চায়েতের কাজের নিশানা ইত্যাদি। কিন্তু গ্রাম তখনও অনেক দূর। ১১:৩০ নাগাদ আমরা গ্রামের ঘর বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করতে শুরু করি। দুপুর ১২ টার মধ্যে আমরা সবাই বড়ুয়া গ্রামের শেষ প্রান্তে , বা শুরুতে, পার্কিং এলাকায় পৌঁছে যাই।
অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে , বিভিন্ন দলের জন্য অপেক্ষা করছে। এই গাড়ি গুলো মূলত গাইড এজেন্সি ঠিক করে দেয়, ফলে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে পারে সহজে। কিন্তু আমাদের গাড়ির আর দেখা নেই।আমাদের তো শিমলার ট্রাভেল এজেন্সির গাড়ি, যারা শুধু টুরিস্ট স্পট ঘুরিয়ে দেখায়, এইসব প্রান্তিক জায়গা গুলোর সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণা নেই , আর আমরাও প্রথম। ফলে ড্রাইভারের সাথে ফোনে কথা বলে তাকে বোঝানোই দুঃসাধ্য যে আমরা কোথায় আছি। স্থানীয় একজন বলে দেবার পরেও গাড়ি পৌঁছালো প্রায় এক ঘন্টা পরে। একটা শিক্ষা হলো যে , ট্রেক শেষে গাড়ির দরকার হলে সেটা গাইড এজেন্সির মাধ্যমে নেওয়াই ভালো। কারণ তারা এমন গাড়ির ব্যবস্থাই করবে যারা সেই জায়গা গুলো চেনে, তাদের সাথে যোগাযোগও রাখবে আর সবথেকে বড় সুবিধা , নির্ধারিত দিনে ট্রেক শেষ না করতে পারলেও কোনো চাপ নেই।
বিসর্জন শেষ, এবার ঢাকি বিদায়ের পালা। ঢাক যে এরা খুব তালে বাজিয়েছে তা নয়, তবুও এই কদিন এরাই আমাদের দেখ ভালো করেছে , আমাদের সখ পূরণ করতে প্রাণপাত করেছে। তাই এই গাইড পোর্টাররা যেমনই হোক না কেনো , সুষ্ঠ ভাবে ট্রেক শেষ হলে তাদের সম্মান জানানোটা আমাদের কর্তব্য। কিন্তু এটাও বলতে হবে আর এর থেকে বাঁচার উপায়ও খুঁজতে হবে , দুটো ট্রেকে আমরা অনভিজ্ঞ গাইড বা সাপোর্টিং স্টাফ পেলাম, ছোট এজেন্সির মাধ্যমে গিয়ে। যাদের নাম শুনে আমরা এদের সাথে কথা শুরু করি , তারাই আসলে এজেন্সি চালায় , বলাই বাহুল্য নিজেরা সব সময় সাথে যেতে পারেনা। যাদের আমাদের সাথে পাঠায় তারাও যথেষ্ট অভিজ্ঞ হচ্ছেনা, যদিও তাদের সাহায্য করার চেষ্টা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই , তবুও কোথাও একটা খামতি থেকে যাচ্ছে। যেকোনো দিন যেকোনো দল এই অনভিজ্ঞ সাপোর্টিং স্টাফ দের জন্য বিপদে পড়তে পারে। আর এবারে তো মাত্র তিনজনেই আমাদের সাতজনকে সালটে দিলো পুরো ট্রেক, বালি পাসের সময় ১০ জনের জন্য ১০ জন ছিল, রুপিন পাসে ৪ জনের জন্য ৬ জন, বাসুকি তালে ৯ জনের জন্য ১০ জন ছিল, এতো কম স্টাফ কখনোই ছিল না। ভালো গাইডরা সব বড় এজেন্সির সাথেই চলে যাচ্ছে। আমরা যদি মনে করি নিজেরা অ্যারেঞ্জ করে যাবো, গাইড পোর্টার নিয়ে , আমরাও কিন্তু ভালো অভিজ্ঞ স্টাফ জোগাড় করতে পারবো না। এটা একটা ক্রাইসিস। ধীরে ধীরে নিরাপত্তার কারণেই ট্রেক বড় এজেন্সি নির্ভর হয়ে পড়বে। মনে পড়ে যাচ্ছে কখনো আমি গাইড হিসেবে উমেদ রানা বা মোহন সিং বা জর্জ নেগী কে পেয়েছি। এদেরও আর ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে কিনা নিশ্চিত নই।
দুপুর ১ টার পর আমাদের গাড়ি ছাড়লো। প্রথমেই খানিকটা তর্কাতর্কি। সে রাস্তা চিনতে পারেনি আর এতো দূর আসতে হয়েছে বলে আর আমরা দেরি হয়েছে বলে। তার উপর ছোট গাড়ি, টেম্পো ট্রাভেলার বা ফোর্স পাঠায়নি। দোষটা যে কার মীমাংসা হলোনা! ২:৩০ এ আমরা সাংলা ঢুকে পড়ি। বাংলায় লেখা খাবার হোটেল দেখে নেমেও যাই। মাছ ভাত হবেনা, ডিম ভাতও দেরি হবে। বাঙালি পর্যটন ব্যবসায়ী তখন তাদের সাইট সিন সেরে ফেরা এক গাড়ি বাঙালি নিয়ে ব্যস্ত। আমরা এগিয়ে চলি আমাদের চেনা জায়গার খোঁজে। ২০১৫ সালে রুপিন পাস থেকে ফিরে যেখানে খেয়েছিলাম। খুঁজেও পাই সেই আশিয়ানা, কিন্তু থালি ছাড়া কিছু নেই। আমরা অন্য একটা একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে কেউ ভাত কেউ নুডুলস অর্ডার করি। তখন ৩ টে বাজে। ছিটকুল রিভার ভিউ পয়েন্টে পৌঁছাই, গাড়ি থেকে নেমে অনেকটা হেঁটে, যদিও ওই দিকেও গাড়ি যাচ্ছে , প্রায় ৫ টা। নদী খাতে আর নামার ইচ্ছে হয়নি। কারণ দৃশ্যটা মনোমুগ্ধকর নয়, আবহাওয়াও ভালো নয় , না বরফ না সবুজ উপত্যকা। অন্য সময় নিশ্চই এই জায়গা খুবই সুন্দর , কিন্তু আমাদের লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট হলোনা। ছিটকুল ক্যাফেতে বসে চা ওমলেট খেয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটাই। এখানেও নানা জায়গায় "ভারত কা অন্তিম" মার্কা লেখা চোখে পরে। সন্ধ্যার মুখে আমরা শিমলা ফেরার জন্য গাড়িতে উঠি।
০৫/০৬/২০২২, রবিবার - সারারাত গাড়ি চলেছে। এর আগে সারারাত গাড়িতে বা বাসে যাইনি তা নয় , কিন্তু এমন আতঙ্ক আগে হয়নি। হিমাচলে এখন টুরিস্ট দের পিক সিজন চলছে। গাড়ি আর ড্রাইভার প্রয়োজনীয় বিশ্রামের সময় পাচ্ছেনা , একটা ডিউটি শেষ করে আর একটায় ঢুকে পড়ছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে এইভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে কাজ করতে হয়। আমরাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যাচ্ছি। কিন্তু মনে হলো ওই দশ বিশ মিনিটের চা ব্রেক দিকে হবে না। বড় ব্রেক দরকার। রাত তিনটের পরে আমরা ড্রাইভার কে বলি একটু শুয়ে নিতে, ভোরের আলো ফুটলে আমার আবার বেরোবো। মাঝ রাতে আমরা একটু খাওয়া দাওয়া করলাম। কিন্তু সময় কাটানো বড়ই দুষ্কর। ঘুম চোখে মশার কামড় খেয়ে ঘণ্টা খানেক কাটানো বেশ কঠিন ব্যাপার। ৫ টার সময় আমরা গাড়িতে উঠলাম। এবার আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ছি , ড্রাইভারকে পাহারা দিয়ে জাগিয়ে রাখার কেউ নেই। আমি সামনে বসে চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু কখন যে চোখের পাতা জুড়ে যাচ্ছে নিজেও বুঝতে পারছি না। রাত্রিকালীন সফরে চোখ লেগে আসার কারণে সব থেকে দুর্ঘটনা ঘটে এই ভোর ,৪ টে থেকে ৬ টার মধ্যে। এই ভাবেই আমরা শিমলা পৌঁছে যাই ৭:৩০ নাগাদ। আমরা অকল্যান্ড টানেলের মুখে নেমে যাই। তারপর উপরে উঠে , চড়াই রাস্তা দিয়ে লক্কর বাজার এলাকা পার করে আরও উপরে উঠে পৌঁছে যাই ম্যালে আর চার্চের পিছন দিকে। সেখান থেকে পিছন দিকে আরও চড়াই ভেঙে খুঁজে পেতে পৌঁছাই আমাদের বুকিং করা অশোকা হোটেলে। ম্যাল থেকে কাছেই, কিন্তু খুব ভালো জায়গায় তা বলা যাবেনা। সিমলায় রুম দেয় সব দুপুর ১২ টার পর। আমাদের একটা রুম দিয়ে দেয় ফ্রেশ হবার জন্য। সেখানে ব্রেক ফার্স্ট করে নিই ফ্রেশ হয়ে। পরে আমাদের বড় রুমটা দেয়। দোনোমনা করেও শেষ পর্যন্ত সবাই শিমলা কালি বাড়িতেই মাছ ভাত খেতে আসে, জয়দীপ ছাড়া। সস্তায় বাঙালি খাবার। কালি বাড়িতে রুম পাইনি কারণ , পরদিন থেকেই ওদের ড্যান্স ড্রামা ফেস্টিভ্যাল শুরু হবে। ২০১৫ সালেও আমরা এটা দেখেছিলাম। রেল স্টেশন এইদিকে থেকেই যাওয়া সম্ভব , তাই আমরা আগামী কালের লাঞ্চ কুপনও কেটে নিই, ডিম মাছ দুটো মিলিয়ে, তাতেও ১১০/- পেট ভরা খাবার। ম্যালের উপর বিরাট সঙ্গীতানুষ্ঠান চলছে কদিন ধরেই। প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন এই মঞ্চে দুদিন আগেই। তাই ম্যাল পুরো হাওড়া স্টেশন। আমরা সন্ধ্যা বেলায় একটু এদিক সেদিক ঘুরে, মেয়ের জন্য কিছু খেলনা কিনে হোটেলে ঢুকে যাই। রাতের আলোকোজ্জ্বল শিমলা বিশেষ করে ম্যাল সংলগ্ন এলাকা, লাইব্রেরী, চার্চ অসম্ভব সুন্দর লাগছে। ম্যাল তখন নাচছে গানের তালে তালে। শিমলা পুলিশের একটা দলকে পারফর্ম করতে দেখে দারুণ লাগলো। অনুষ্ঠান এলাকার পাশে মেলাও বসেছে নানা দোকানের। যাইহোক, আমাদের আজ সাকসেস পার্টি ফলোড বাই ডিনার ! থ্রি চিয়ার্স ফর ট্রেকমেট। আমি ট্রেকমেট দের অনুভূতি ভিডিও করি, সেই বালি পাস থেকে ফিরে আসার পরে যেমন করেছিলাম। এবার আমাদের আসরের পর্দা টানতে হবে কারণ বাকিটা ব্যক্তিগত।
০৬/০৬/২০২২ , সোমবার - সক্কাল সক্কাল উঠে আমরা হেঁটে পৌঁছে যাই ঝাখু পাহাড়ের হনুমান মূর্তির পাদদেশে। আমাদের হোটেলের পিছনের পাহাড়েই এটি, এক দেড় কিমি মত চড়াই রাস্তা। দুই ভাই আসেনি, আগে এসেছে বলে কিন্তু জয়দীপও এলোনা ! সেই একলা হবার রোগ। আমি, দেবু, কৌশিক আর সুব্রত জায়গাটা ঘুরে দেখি এক ঘন্টা ধরে। ছবি তোলার ভালো জায়গা। সুন্দর করে সাজানো বাগান চত্বরের মধ্যে বিশাল হনুমান মূর্তি, যেটা শিমলা শহর, ম্যাল থেকে দৃশ্যমান , একটা শিব মন্দির, অনেক খাবার জায়গা নিয়ে ভালো টুরিস্ট স্পট। কিন্তু খাবার দোকান গুলো তখনও না খোলায় আমরা লক্কর বাজারে এসে টিফিন করি। একটু কেনাকাটা করাও হয়। আমরা হোটেল ছাড়ি দুপুর ১২ টায়। সবাই মিলে হাঁটা লাগাই শিমলা কালি বাড়ির উদ্দেশ্যে। হোটেল থেকে ম্যাল ৫ মিনিট, ম্যাল থেকে কালীবাড়ি আরও ১০ মিনিট। কাল আমাদের সাঁটিয়ে খেতে দেখে আজ মনে হচ্ছে একটু টেনে পরিবেশন করছে। আজ ডিম মাছ দুটো থাকা সত্বেও কালকের মত গোগ্রাসে খাওয়া গেলনা। বিকাল ৪ টের টয় ট্রেন ধরার জন্য আমরা হেঁটেই যেতে থাকি স্টেশনের দিকে। কালি বাড়ি থেকে ১৫ মিনিটের রাস্তা। জেনারেল টিকিট কেটে বসার জায়গা দখল করার জন্য আগেই পৌঁছতে হচ্ছে। তবে এতে মাত্র ৫০/- তে টয় ট্রেন সফর করা যাচ্ছে , শিমলা থেকে কালকা পর্যন্ত। এই ভাবে সস্তায় যে যাওয়া যেতে পারে, এটা আমাদের বলেছে দুই ভাই সানি আর রাহুল। ওরা এর আগে গেছে এই ভাবে। এই রেল পথের বিশেষত্ব প্রচুর টানেল। তবে এই সময় পথের সৌন্দর্য্য আহামরি কিছু মনে হলনা। এই পথে বরফ থাকে যখন , তখন অসাধারণ লাগে। আবার সবুজ থাকলেও ভালো লাগে। কিন্তু এই সময়টায় সবকিছুই কেমন যেনো ফ্যাকাশে। মাঝপথে সোলাং ভ্যালি দেখতে ভালই লেগেছে। সময়মত কালকা পৌঁছে যাই, আমাদের ট্রেন ছাড়ার আগে ঘণ্টা দুয়েক সময় আছে। সানির শরীরটা ভালো না থাকায় ও আমাদের স্যাক গুলো নিয়ে টিকিট কেটে ওয়েটিং রুমে থেকে যায়। বাকিরা যে যার মত খাওয়ার জন্য বেরিয়ে পরে। আমি সুব্রত রাহুল গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে হাঁটতে থাকি। কোথাও কিছু নেই। কাউন্টার আছে একটা কিন্তু বসার জায়গা কই ! খুঁজতে খুঁজতে জুগার একটা হয়েই গেলো, একটা এমন রেস্টুরেন্ট পাওয়া গেলো। সেখানেই খানাপিনা সেরে আমরা ট্রেনে উঠি। সবারই এসি বগিতে এবার, কিন্তু জায়গা কারও একত্রে নয়। পরের দিন পুরো ট্রেনে কাটিয়ে তারপর দিন সক্কাল সক্কাল আমরা হাওড়া স্টেশন পৌঁছে যাই। মেঘ মসলন্দপুর থেকে গাড়ি ভাড়া করে আমাকে নিয়ে যেতে এসেছে। মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। বিবি হো তো অ্যায়সি! মনে পড়ে যায় , মুঘলে আজমের সেই বিখ্যাত ডায়লগ, " বাখুদা, হাম মহব্বত কে খিলাফ নেহি , আপনে উসুলো কে গুলাম হ্যায় " ! আমার বউ যেনো সেই সুরেই বলতে চায় , " হাম ট্রেকিং কে খিলাফ নেহি , আপনে কর্তব্য কে গুলাম হ্যায় " !!!


