অমরনাথের পথে
ভূমিকা :- কালকূট কে শ্রদ্ধা না জানিয়ে এই লেখা শুরু করা উচিত হবেনা কারণ আমার শৈশব ওনার ধর্মীয় ভ্রমন কাহিনী পরে সমৃদ্ধ হয়েছিল।
সব ট্রেক বারবার অমরনাথ শেষবার , এই ছিল আমার স্লোগান ! কারণ এই ট্রেকের জন্য ব্যবস্থাপনা লাগেনা , খরচও যত্সামান্য , তাই বেশী বয়েসেই এটা যাবার ইচ্ছে ছিল। এই ট্রেকটার কাঠিন্য সম্বন্ধেও তেমন কোন ধারণা ছিলনা , কারণ বুড়ো-বুড়ি সবাই যায় শুনেছি। তাছাড়া অমরনাথ যাত্রার জন্য অনুমতি বার করাটাও আমার কাছে বেশ বিরক্তিকর ব্যাপার তাই অতি সম্প্রতি এই ট্রেক টায় যাবার কোন পরিকল্পনা ছিলনা। সময়টা এপ্রিল মাস '২০১৫ , আমাদের রুপিন পাস ট্রেকের পরিকল্পনা তুঙ্গে কিন্তু কিছুতেই ৪ জন যোগার হচ্ছিলনা ওদিকে নেপালে আবার ভয়াবহ ভূমিকম্প , ফলে ট্রেকটা হবে কিনা আমি নিশ্চিত ছিলাম না। ততদিনে নিলাব্জ তার কযেকজন কাছের মানুষদের নিয়ে অমরনাথ যাবার ১৪ জুলাইয়ের পারমিট বের করেছে জানতাম। অবশেষে একদিন নিলাব্জকে ফোন করলাম আর পরদিন মানে ৬ই মে ওর সাহায্যে চুঁচুঁড়া হাসপাতাল থেকে মেডিকেল সার্টিফিকেট বের করে চন্দননগরের পি এন বি থেকে ১৪ই জুলাইয়ের পরে থাকা দুটির মধ্যে একটি পারমিট আমি পেয়ে গেলাম। ব্যাঙ্কের কাজটা প্রথামত হল , ৫০/- জমা দিয়ে একটা ফর্ম পূরণ করে মেডিকেল সার্টিফিকেট ও আইডেন্টিটি কার্ডের কপি সহ জমা দেবার পরে , খালি পরে থাকা তারিখ আমার সাথে কথা বলে পাকা করে দিল। পুরোটাই অনলাইন ব্যবস্থাপনা। আপনার এলাকায় কোন হাসপাতাল বা ব্যাঙ্ক থেকে এইকাজ গুলো করা যাবে সেটাও অনলাইন এ অমরনাথ শ্রাইন বোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়। আমি ছবি সহ পারমিটের তিনটি পার্ট একত্রে পেলাম। কিন্তু হাসপাতাল থেকে মেডিকেল সার্টিফিকেট বের করার ব্যাপারটা বেশ জটিল ও বিরক্তিকর। আমি যে সব নিয়ম মেনে করেছি তা নয় , তাই তার বিবরণ এখানে দিলাম না । শুধু এটুকু পরামর্শ দিতে পারি 'যে যার সরু লাইন , মোটা লাইন , পরিচিতি কাজে লাগিয়ে এই ব্যাপারটা যত সংক্ষেপে সারতে পারবেন সেরে ফেলুন। এখানে নিলাব্জই আমাকে সে ব্যাপারে সাহায্য করেছে , নইলে এমনিতেই সরকারী হাসপাতালে যাওয়া হয়না , একা একা গেলে ২/৩ দিন লেগে যেত মনে হয় ! তবে জটিল অসুস্থতা লুকিয়ে কেও অমরনাথে যাবেন না। পারমিট হাতে পাবার পরে মৈত্রেয়ীদি , সুখেন্দুদের বাড়ি যাবার পথে স্বাস্থ্য দপ্তরে রুপাদির সাথেও দেখা করলাম , এরা সবাই অমরনাথ যাবে। ইতিমধ্যে আমাদের রুপিন পাস ট্রেকও নির্ধারিত সময়েই ( ২৭ মে থেকে ৯ জুন ) সম্পন্ন হয়। রুপিন পাস যেতেই অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল মেঘের কাছে তারপর পরের মাসেই আবার অমরনাথ , সে এক চরম অশান্তি ! তিনমাসের গুড়গুড়িকে রেখে কোন বাবাকেই বা যেতে দিতে চাইবে। তবুও আমার বিশ্বাস ছিল মেঘ আমাকে যেতে দেবেই ! যাবার আগে আমার শ্বশুর-শাশুড়ীর কাছেও তথ্য যোগার করেছি , ওনারা ২০১১ তে গেছিলেন। কথা বলেছিলাম মুম্বাইবাসী রুদ্রদার সাথেও , সম্ভবত দুবার গেছিলেন আর প্রথমবারে কাছ থেকেই দর্শন করেছিলেন, ছবিও তুলেছিলেন , এখন যেটা অসম্ভব। ইতিমধ্যে সুখেন্দুর হাত ভেঙ্গে যাওয়ায় ওরা তিনজন যেতে পারবেনা জানিয়ে দেয়। আমাদের দল হয় ৬ জনের।
১১/০৭/১৫ - অফিসের কাজে আটকে যাওয়ায় শেষ মুহুর্তে সূচী বদল করে আমাকে একাই যেতে হচ্ছে। ওরা সবাই কালকেই হিমগিরিতে রওনা দিয়েছে। আমি যুভা তে দিল্লী গিয়ে শ্রী শক্তিতে জম্মু পৌঁছাব ১৩ ই জুলাই ভোর রাতে , সেখানে ওদের সাথে মিলিত হয়ে পহেলগাম যাব একসাথে। আমি রওনা হবার আগেই জেনে গেছিলাম ওদিককার আবহাওয়া পরিস্থিতি খারাপ। যাত্রা বন্ধ , জম্মু থেকে রাস্তাও বন্ধ ইত্যাদি নানা খবর পাওয়া যাচ্ছিল। পার্থদা , রনিতদা , মেঘ এরা আমায় ফোন করে খবর দিচ্ছিলেন । আমিও আমার ভাগ্নি - জামাই শোভনকে ফোন করে রাখলাম , যদি জম্মু থেকে এগোতে না পারি তাহলে অমৃতসরে ওর ওখানে চলে যাব , ওদিক টাও আমার ঘোরা নেই। আমার সহযাত্রী ছিল দুটি মেয়ে ও তাদের বাবা , তারাও অমরনাথ যাবে।
১২/০৭/১৫ - সকালেই যোগাযোগ করলাম ফেবুতে পরিচয় হওয়া হীরক সিনহার সাথে , ওনারা আমাদের একদিন আগেই যাচ্ছেন জানতাম। জানতে পারলাম মূল রাস্তা বন্ধ ওনারা নিজেদের গাড়িতে মুঘল রোড হয়ে অনেক ঘুরে পহেলগাম যাচ্ছেন। হটাত মনে পড়ল আমার বাল্যবন্ধু মিঠু এখন দিল্লীতেই আছে। ট্রেন ঘন্টা খানেক দেরী করালো। মিঠুর সাথে যোগাযোগ করে ওর নেতাজিনগরের বাসাতেই দুপুরের স্নান খাওয়া সারলাম। রবিবারের ছুটির দিনের মাংস ভাত ! বিকালের ট্রেনে উঠে দেখি আগের তিনজন এখানেও আমার সহযাত্রী ! কথায় কথায় জানা গেল মেয়ে দুজন ঘোড়ায় দর্শন করে আসবে , বয়েস্ক বাবা পহেলগাম তেই অপেক্ষা করবে। এদিকে আবার পহেলগাম তে মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টির খবর পাওয়া গেল। হীরক বাবুকে ফোন করে জানালাম , ওনারা তখনো পহেলগাম পৌঁছাননি , রাত ১০ টা তখন , কিন্তু ওনাদের কাছে দুর্যোগের কোনো খবর ছিলনা। বিকালেই নিলাব্জ ফোন করে জানিয়েছিল ওরা কোথায় আছে।
১৩/০৭/১৫ - নিলাব্জর বলে দেওয়া ভগবতিনগর যাত্রী নিবাসে পৌঁছানোর আগে আমি বাস স্টান্ডে পৌঁছে গেছিলাম , দুটো ভিন্ন জায়গায়। ভোর রাতে বৃষ্টির মধ্যে আমাকে হয়রানি হতে হল। যাইহোক ৪-৩০ নাগাদ যখন প্রচুর চেকিং এর পরে যাত্রী নিবাসের দরজায় পৌঁছলাম তখন নিলাব্জকে দেখে ভরসা পেলাম। ওর সাহায্যেই ভিতরে ঢুকতে পারলাম , তখন কাওকে ঢুকতে দিচ্ছিলনা । বিরাট একটা হল ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখি হাওড়া স্টেশনের ভিড় , সবাই মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে আছে। তার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের এলাকায় যেখানে বাকি ৪ জন আছেন। রুপাদির একদা সহকর্মি ডা: শৈবাল ব্যানার্জীর সাথে আলাপ হল , ইনি এখন স্বাস্থভবনেই আছেন। আরো দুজন ছিলেন মুকুল বাবু ও তার স্ত্রী। ততক্ষণে ভোরের চা বিস্কুট পাউরুটি দেওয়া শুরু হয়ে গেছে , সব ফ্রী ! জানা গেল ১২ তারিখ থেকে বাস ছাড়েনি , কবে ছাড়বে কেও বলতে পারছেনা। অনেকেই ছোট গাড়ি করে পহলগাম রওনা দিচ্ছে। আমিও হীরক বাবুকে আবার ফোন করে জানলাম ওনারা আজই যাত্রা শুরু করার জন্য চন্দনবাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছেন। আমাদের প্রি পেইড ফোন এখানে অচল , পোস্ট পেইড ফোন কাজ করছে। বুথ থেকে ফোন করার খরচ মিনিটে ৫/- ! মোবাইল কানেকশন দেবার জন্যও সব কোম্পানি হাজির , বি এস এন এল দেবে পহলগাম থেকে , সেটা অমরনাথের পুরো রাস্তাতেই পাওয়া যাবে। অনেকেই সে কানেকশন নিচ্ছে , আমাদের প্রয়োজন মনে হয়নি। সকালে টিফিন কিছু দিলনা , নিজেদের আনা খাবার ভাগ করে খাওয়া হল। ৮ টার পরে আমরাও একটু বাইরে বেরোলাম খোঁজ খবর নিতে। বাসের ব্যবস্থা ভিতরেই ছিল। বাইরে বেরিয়ে অনেকেই ছোট গাড়িতে রওনা দিচ্ছিল। ইনোভা , ট্রাভেরা ইত্যাদি গাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল ৮০০/- জনপ্রতি , ৮ জনের জায়গা , পুরো গাড়ি ৬৪০০/- । ৯ টা বেজে যাওয়ায় আমরা তখনি আর বেরোলাম না , ঠিক হল কালকেও বাস না ছাড়লে আমরা ছোট গাড়িতে বেরিয়ে যাব সক্কাল বেলাতেই। যাত্রী নিবাসে ঢোকাটা বেশ হ্যাপা , প্রচুর চেকিং। সকাল থেকে আরো লোক ঢুকেছে , চাতাল গুলোও সব মানুষে কিলবিল করছে। বৃষ্টি আর খুব একটা না হলেও মেঘাছন্ন আবহাওয়া। ভিতরে অবশ্য সব ব্যবস্থাই আছে। বিশাল তিনতলা বাড়িতে বড় বড় হল ঘর , যাত্রীদের থাকার জন্য। স্নান করে গেলাম খাবার লাইনে , সেখানে হটাত দেখতে পেলাম সভ্যদাকে , আমার পাড়ার পরমাত্মীয়। বিদেশ - বিভূঁইয়ে চেনা কাওকে ওরা ১০ জনে মিলে এসেছে। ফ্রী তে এখানে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ভালই , শুধু ৩/৪ দিনের যাত্রী এক হয়ে যাওয়ায় ভিড়টা বেশী হয়ে গেছিল। খাবার পরেই আরো অনেকের মতই আমরাও বাসের টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ালাম , যদিও টিকিট দেবার কোনো খবর ছিলনা। ঘন্টা খানেক পরে লাইন ছত্রভঙ্গ হয়ে হালকা হয়ে গেল। বিশ্বাসীরা কাউন্টার এর সামনেই বসে গেল , তার মধ্যে আমরাও ছিলাম , যদি টিকিট দেয় তাহলে আমরাই প্রথমদিকে থাকব এই আশায় , পাশে আলাপ হল বলিয়া থেকে আসা একজনের সাথে। আলাপ হল দমদমের একটি মেয়ের সাথে সে নাকি ১৭ বার এসেছে। উদ্যোগী মেয়ে , এবার একা আসলেও পথে আরো ৪ বাঙালী যুবককে জুটিয়ে ৫ জন হয়ে গেছে। সে তার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়ে বলল সব বাস একই , কোনও ফারাক নেই , তার কথা শুনে আমরাও কমদামের টিকিট কাটার ভরসা পেলাম। ৩ রকম দামের বাস আছে , যেগুলোর টিকিট যাত্রী নিবাসের মধ্যে থেকেই দেবে , আর ঠিক পাশেই বাস দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় একটি ছেলে ১৯ টা টিকিট ফেরত দিতে এসেছিল , আমরা আর ওই মেয়েটি সঙ্গীতা তাকে পাকড়াও করলাম। কিন্তু আমরা মোট ১১ জন , আরও ৮ জন দরকার , পাশের বালিয়ার দুজন , আরও দুটো দলের ৬ জন লোক জুটে মোট ১৯ জন হয়েই গেল , সঙ্গীতা ই বাকি ডিল টা কমপ্লিট করে টিকিট গুলো নিয়ে নিল , ৩১৪/- ( বাকি দুটো ৪৫০/- আর ৫২৫/- ) দামের সবথেকে কমা বাসের টিকিট। ১২ তারিখের জন্য ওরা কেটেছিল , তারপর থেকে আর বাস ছাড়েনি। এরকম অজানা টিকিট কাটা নিয়ে একটু সন্দেহ বা ভয় ছিলই , সেটাও কাউন্টার এর লোকেদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া হয়েছিল। বিকালে চা খাবার আগে আমরা ম্যাট্রেস নিলাম ১০০/- জমা দিয়ে , যেটা ফেরত পাওয়া যাবে, মানে ফ্রী ম্যাট সার্ভিস ! যাত্রী নিবাসের ভিতরে এগুলো সব দেখভাল করছে শিবসেনা কোম্পানির বিশাল ভান্ডার , ওদের এবার ২০ বছর হল এই সেবায়। বাইরেও এমন গোটাকতক বিশাল ভান্ডার আছে , চলতি কথায় লঙ্গর , ফ্রী তে নানা খাবার সরবরাহ করে যাত্রীদেরকে। পাশেই প্রচুর বাস দাঁড়িয়ে আছে , আমাদের ৫৯ নম্বর বাসটাও দেখে নিলাম। ততক্ষণে বাসের টিকিট দেওয়া শুরু হয়েছে, লম্বা লাইন , অনন্ত অপেক্ষা। আমরা ভাগ্যবান। আশেপাশে আমি আর নিলাব্জ একটু ঘুরে দেখলাম। বাইরেও খোলা আস্তানায় থাকার ব্যবস্থা আছে , সেখানেও প্রচুর মানুষ , ভক্তিমূলক নাচ গানে মেতে আছে। সব মিলিয়ে পুরো জায়গাটা সরগরম , মাঝে মধ্যেই বোম বোম ভোলে ধ্বনি , হর হর মহাদেব টা কমই শোনা যাচ্ছে। আমরা সন্ধ্যা বেলায় খাবার জন্য বাইরের একটা লঙ্গরে লাইন লাগাই , কিন্তু তারাও খাবার দেবার আগে মিনিট ২০ ভজনের সাথে হাত তালি দিইয়ে নিল ! ওখানে রুটি পায়েস খেয়ে আমরা ভিতরে ঢুকি ৮ টা নাগাদ। ভিতরের খাবার খাই ১০ টার পরে। তারপরে আমি রাতেই আর একবার চান করে নিয়ে শুয়ে পরি , ওই হাটের মধ্যে যেটুকু বিশ্রাম নেওয়া সম্ভব আর কি !
 |
| জম্মু যাত্রী নিবাসে |
 |
| জম্মু যাত্রী নিবাসে |
 |
| জম্মু যাত্রী নিবাসে চায়ের লাইনে |
 |
| জম্মু যাত্রী নিবাসের বাইরের আস্তানায় |
১৪/০৭/১৫ - রাত ৩ টের সময় উঠেই আমরা তৈরী হতে থাকলাম। ম্যাট ফেরত নিতে ৪ টে বাজিয়ে দিল। চা-বিস্কুট অবশ্য পাওয়া গেল যাবার আগে। কিন্তু বাস ছাড়ার কোনো ঘোষণা হচ্ছিলনা , তার অপেক্ষায় না থেকে অনেকের মত আমরাও বেরিয়ে গিয়ে ৫৯ নম্বর বাসে চলে গেলাম। একদল বাঙালী যাত্রী আমাদের আসনে বসেছিল , বয়স্ক গ্রাম্য লোকজন। তাদের পিছনে নিজেদের আসনে সরিয়ে আমাদের আসনে ( ১-১৯ ) বসতে অনেকটা সময় গেল , যদিও আমাদের ১৯ জনের আমরাই প্রথমে আসায় পছন্দ মত জায়গায় বসে গেলাম , একধারের তিনটে টু -সিটার আমরা নিয়ে বসে যাই। তারপরে বাকিরাও এসে বসে যায়। সব শেষে সেই সঙ্গীতা দলবল সহ এসে পছন্দমত সিট না পেয়ে খুব হম্বিতম্বি দেখায়। একটু গরম হয় আবহাওয়া। কিন্তু যারা আগে এসেছে তারা আগে পছন্দের জায়গায় বসেছে এতে তো দোষের কিছু ছিলনা। ১৯ টা টিকিটের মালিক আমরা সবাইই ছিলাম , নামে নামে তো আর টিকিট কাটা হয়নি , যে আগে আসবে সে আগে সুযোগ পাবে সেটাই স্বাভাবিক। ফলে তার চ্যাঁচানটাই সার হল , যে জায়গা পরে ছিল তাতেই তাদের বসতে হল , শুধু শুধু সম্পর্ক টা তিক্ত হল। এক সময় বোম বোম ভোলে রব তুলে বাস ছাড়ল প্রায় ৬ টা নাগাদ । আজকেই আমাদের পারমিট ছিল , কিন্তু আমরা জেনে গেছি আগে ঢোকা না গেলেও পরে যবে খুশী ঢোকা যেতে পারে , আর এই ক্ষেত্রে তো যাত্রাই বন্ধ ছিল , তাই ১৪ তারিখের পারমিট এ ১৫ বা ১৬ তারিখে ঢুকতে কোনো অসুবিধা হবেনা। যত সময় পার হল তত আমরা তিনরকম বাসের ফারাকটা বুঝতে থাকলাম যেটা ওই সঙ্গীতা ১৭ বারেও কেন বুঝতে পারেনি বুঝলাম না ! বাস প্রথম দাঁড়ালো রেস্তোরা দেখেই , যেখানে কিনে খেতে হবে। তারপর অবশ্য লঙ্গরেই দাঁড়াতে শুরু করলো। পথে এক জায়গায় একটা দারুন লঙ্গর পাওয়া গেল যাতে নানা খাবার আয়োজন ছিল। এমনকি আইসক্রিমও। আমি শেষে পপকর্ন হাতে নিয়ে বাসের দিকে ফিরি। জহর টানেল এর মধ্যে যাত্রীরা আবার জেগে উঠলো , সঙ্গীতার নেতৃত্বে বোম বোম ভোলে রব উঠলো পুরো অন্ধকার টানেলে , বেশ লম্বা সময়ের ব্যাপার , শেষদিকে ঠিক কি উচ্চারণ হচ্ছিল গুলিয়ে যাচ্ছিল তবুও ব্যাপারটা গায়ে কাঁটা দেবার মতই। যাত্রীদের মধ্যে এই চঞ্চলতা এই চিত্কার বাইরের লোকেদের কাছেও আনন্দের । চুপচাপ বাসে যেন কোনো মজা নেই। এর পরে এক জায়গায় আমাদের বাস সহ আরো অনেক বাস কে ঘন্টা খানেক দাঁড়িয়ে থাকতে হল পুলিশ এসকর্ট এর জন্য। পহলগাম এর ৪ কিমি আগেই বাস থেমে গেল , কযেক প্রস্থ চেকিং এর পরে বেশ কিছুটা হেঁটে আমরা পৌঁছলাম নুনওয়ান বেস ক্যাম্পে। দালালদের পহলগাম হোটেলে নিয়ে যাবারও প্রচেষ্টা ছিল। ১৫০/- করে এক একজনের , নিচে শোবার তাঁবুতে আমরা ৬ জনে ঢুকে গেলাম , যদিও ১০ জনের তাঁবু , আমাদের ভাগ্য যে আর ৪ জন আসেনি। ওরা সবাই বি এস এন এল কানেকশন নিয়ে নিল , আমি আর নিলাব্জ ছাড়া। রাতে লঙ্গরেই খাওয়া। যা বোঝা গেল জঙ্গলের মধ্যেই দোকানপাট , লঙ্গর , তাঁবু আরো অনেক কিছু নিয়ে বিশাল এই বেস ক্যাম্প।
 |
| জম্মু থেকে পহলগাম এর পথে |
 |
| জম্মু থেকে পহলগাম এর পথে |
 |
| জম্মু থেকে পহলগাম এর পথে |
 |
| জম্মু থেকে পহলগাম এর পথে |
১৫/০৭/১৫ - প্রাতঃকৃত্য সেরে চা বিস্কুট খেয়ে আমরা বেরোনোর লাইনে দাঁড়ালাম। কাল যে গেট দিয়ে ঢুকেছিলাম আজ অন্য গেট দিয়ে বের করাচ্ছে। এঁকেবেঁকে সে লাইন প্রায় ১ কিমি লম্বা , এখান থেকে বেরোনোর সময় কেন এই লাইন মাথায় ঢুকলনা। বেরোতেই ২ ঘন্টা লেগে যাবে। আমি , নিলাব্জ আর মুকুল বাবু লাইনে দাঁড়ালাম , বাকিরা পরে এসে ঢুকবে। নিলাব্জ একবার ওদের খুঁজতে গিয়ে আশার খবর নিয়ে এলো। আমরা লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। রুপাদি পায়ে চোট পেয়েছিল , ডাক্তারবাবু মেডিকেল ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে বিশেষ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেরিয়ে যায়, লাইন ছাড়াই। ইতিমধ্যে মুকুলবাবুর স্ত্রী ওনাকে খুঁজে না পেয়ে অনুসন্ধান অফিসে ঘোষণা করে , সেই ঘোষণা আবার লাইনের শেষদিকে দাড়ানো আমরা শুনতে পাইনি , বাইরে চলে যাওয়া রুপাদি শুনতে পেয়ে তাকে ভিতরে নিতে আসে , সেই সময় নিলাব্জও ওদের খুঁজতে যায় আর সৌভাগ্যক্রমে ওদের সাথে দেখা হয়ে যায় আর আমরা সবাই একজোট হয়ে সরু লাইন দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাই। গেটের বাইরেই প্রচুর ছোট গাড়ি নির্ধারিত ১০০/- তে ১৬ কিমি দুরের চন্দনবাড়ি যাচ্ছে। পহলগাম হয়ে ১ ঘন্টায় আমরা ৯৫০০' উচ্চতার চন্দনবাড়ি পৌঁছে যাই। এখানে এক প্রস্থ চেকিং হল , পারমিটের একটা পার্ট দিয়ে দিতে হল। এখানে টিফিন খেয়ে ৮-৩০ নাগাদ আমরা ট্রেক শুরু করলাম কিন্তু এখানেই আমরা তিনটে ভাগে ভাগ হয়ে পড়লাম। আমি আর নিলাব্জ একসাথে থাকলাম যদিও ও আমার অনেক আগে আগেই উঠে যাচ্ছিল , আমার চড়াই ভাঙ্গতে সময় লাগে। প্রথমেই চরম চড়াই পিসু টপ। মুকুলবাবুদের আর দেখা পেলাম না। তবে ডাক্তারবাবু আর রুপাদিকে দেখলাম ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে যেতে। অনেকদিন পরে স্যাক নিয়ে হাঁটছি , যদিও স্যাক বেশ হালকাই তবুও ভালই কষ্ট হচ্ছিল। ৩ কিমি চড়াই ভাঙতে ৩ ঘন্টা লেগে গেল। ১১-৩০ নাগাদ ১১৫০০' উচ্চতার পিসু টপে পৌছে গেলাম , ওখানে আবার নিলাব্জর সাথে দেখা হল। আধ ঘন্টা বিশ্রাম নেবার পরে ১২ টা নাগাদ আবার রওনা দিলাম। এবার পথের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবার পালা। সবুজ পাহাড়ের মাথায় কোথাও কোথাও সাদা বরফের মুকুট , পাশে শ্বেতশুভ্র স্রোতস্বিনী নদী , তার উপরেও মাঝে মধ্যে স্নো ব্রিজ। ভক্তি প্রদর্শনে নয় , এই সৌন্দর্যের টানেই আমার অমরনাথ আসা। নকল পা লাগান একজনকে দর্শন করে ফিরে আসতে দেখলাম। ১-৩০ নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই ৩ কিমি দূরের জোজিবল একসাথেই। এখানে অনেক কিছু খেলাম , চটুল হিন্দি গানের সুরে ভক্তিমূলক কথা বসিয়ে গমগম করে চলা গানের তালে অনেকের সাথে আমরাও একটু নেচে নিলাম। ভরপুর আনন্দ ! এখানেও আধ ঘন্টা বিশ্রাম নেবার পরে ২ টো নাগাদ হাঁটা শুরু করলাম। এ পথেরও অসাধারণ সৌন্দর্য। একটা বিশাল ঝর্ণাও পেলাম পথের ধারে। ৩-৩০ নাগাদ যখন শেষনাগের হ্রদের কাছে পৌঁছলাম তখন আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করেছে। সারাদিন ভালই রোদ ছিল। ৪ টের পরে ৬ কিমি দূরের শেষনাগ ক্যাম্পে পৌঁছলাম , উচ্চতা ১১৭৩০' , মোট ১২ কিমি পথ পাড়ি দিতে ৭.৫ ঘন্টা সময় লেগে গেল। নিলাব্জ আমার আগে পৌঁছে অপেক্ষা করছিল। সারা পথে আমাদের দলের কারও সাথে আর দেখা হয়নি। ওদের এখানকার ফোন নাম্বারটাও নেওয়া হয়নি , এইভাবে যে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব ভাবতে পারিনি। আমরা প্রথমেই অনুসন্ধান অফিসে গিয়ে কয়েকবার ঘোষণা করলাম , কিন্তু কারও কোনো দেখা না পেয়ে ২৫০/- করে দিয়ে নীচে শোবার তাঁবুতে আরো অনেকের সাথে ঢুকে গেলাম। কিন্তু সে তাঁবুও ভালো ছিলনা , তাঁবু ওয়ালাও ভালো ছিলনা। যখন মুষলধারায় বৃষ্টি হল আমাদের তখন বেশ অসুবিধাই হল , জলও ঢুকলো একদিকে। তারমধ্যে আরও ৪ জনকে ঢুকিয়ে মোট ১০ জন ঢুকিয়ে দিল , অনেক ঝগড়া করার পরে শেষে ৮ জন মিলে থাকি। স্থানীয় মুসলিমরাই সব ব্যবস্থাপনায় , শ্রাইন বোর্ডের কোনো নিয়ন্ত্রণ চোখে পড়লনা। আমাদের পাঞ্জাবের কিছু তাঁবু-মেট তাদের সহ পুরো কাশ্মীরি মুসলিমদের শ্রাদ্ধ শুরু করে দিল , সাথে অবশ্যই পরশী দেশও রেহাই পেলনা। নিলাব্জর শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল। বাইরে পিচ্ছিল পথ পেড়িয়ে খেতে যাওয়াটাও বেশ কঠিন। নিলাব্জ সন্ধ্যে বেলায় বেরিয়ে কিছু খেয়ে এসেছিল। আমি একাই গিয়ে অনেক কষ্ট করে খেয়ে এলাম।
১৬/০৭/১৫ - টয়লেট এর এলাহী ব্যবস্থা থাকলেও জলের আকালে ৫/১০ টাকায় ঠান্ডা গরম জল বিক্রী হচ্ছে , স্নানের গরম জলের বালতিও ৫০/- য় পাওয়া যাচ্ছে। চা - বিস্কুট খেয়ে আমরা ৬ টা নাগাদ ট্রেক শুরু করলাম। আজকেই আমাদের সর্বোচ্চ ১৪৫০০' উচ্চতার মহাগুনাস পাস অতিক্রম করতে হবে যেটা স্থানীয়রা গনেশ টপ বলে উল্লেখ করছিল , ৪.৬ কিমি দুরত্ব। মধ্যে বার্বল টপ পৌঁছাতেই ৮-৩০ বেজে গেল আর চড়াই টাও বেশ কঠিন ছিল। একদিনের জন্য পিট্টু (পোর্টার ) নিলে দুজনের মোট ৫০০/- মত লাগত , কিন্তু আলোচনা করেও শেষ পর্যন্ত আর নেওয়া হয়নি। এই বার্বল টপ থেকেও দারুন দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল , বরফ চূড়ার মাথা থেকে হেলিকপ্টার বেরিয়ে এসে আবার অন্যদিকে মিলিয়ে যাচ্ছিল। এখানে আমি টিফিন খেলাম , আধ ঘন্টার বেশী সময় কাটালাম , নিলাব্জর সাথে দেখা হয়নি , ও আগে বেরিয়ে গেছে। ৯-১৫ নাগাদ বেরিয়ে এক ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম মহাগুনাস টপে। এখানেও নিলাব্জর সাথে দেখা হলনা , বুঝলাম ও পাঁই পাঁই করে হাঁটছে ! এই চড়াই টা অত কষ্টকর মনে হয়নি। এখানে প্রচুর বরফ পাওয়া গেল। এখানেও আধ ঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। এখান থেকে পঞ্চতারিনী, জম্মু যাত্রী নিবাসের ম্যাপে ৬ কিমি দেখেছিলাম , পথের নির্দেশে দেখলাম এখনও ১০ কিমি। এক ঘন্টায় ২ কিমি দূরের পোষপত্রিতে পৌঁছে নিলাব্জর দেখা পেলাম। ওই আমাকে নানা খাবার নিয়ে এসে খাওয়ালো , যদিও খেতে খুব একটা ভালো লাগছিলনা , মনের মত খাবারও তেমন কিছু ছিলনা। এখানে প্রায় এক ঘন্টা বিশ্রাম নেবার পরে ১ টা নাগাদ আবার যাত্রা শুরু করি। এক ঘন্টায় একটা চটিতে পৌঁছাই , চা খেয়ে বেড়িয়ে যাই। মহাগুনাস পাস থেকে উতরাই সহজ পথ। অনেক দূর থেকেই পঞ্চতারিনী দেখা গেল, ১২৭২৯' উচ্চতা , নদীর ধারে বিস্তীর্ণ উপত্যকায় ক্যাম্প , এবং হেলিপ্যাড। আজ আবহাওয়া ভালো থাকায় অটো সার্ভিসের মত হেলিকপ্টার ওঠা নামা করছিল। নদী পার হয়ে ৩-৩০ নাগাদ আমরা ক্যাম্পে ঢুকে গেলাম। এখানেও নীচে শোবার তাঁবুতে ঢুকলাম ৩০০/- করে , কালকের থেকে বেশ ভালো , সাথী হল নিলাব্জর সাথে পরিচয় হওয়া ধানবাদের কিছু লোক। এখান থেকে মেঘকে ফোন করে বলা হল , ফেবুতে রুপাদির এখানকার ফোন নম্বর জানতে চেয়ে পোস্ট করে দিতে , রুপাদির ছেলের কাছ থেকে নিশ্চই নাম্বার পাওয়া যাবে। তারপর টেন্টে ঢুকে দুজনেই কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পরলাম। এখান থেকে বালতালের একপিঠের হেলিকপ্টার ভাড়া ১৯০০/- , আমরাও তাতে যাবার প্লান করলাম , পরদিন সকালে টিকিট দেবে। আবহাওয়া আবার খারাপ হয়ে গেছিল ততক্ষণে , কালকের মতই মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। নিলাব্জ আজকেও খেতে গেলনা , আমিই একা গেলাম রাত ১০ টা নাগাদ। আজ রাস্তাটা ভালো থাকলেও লঙ্গরের সামনেটা পিচ্ছিল কর্দমাক্ত। একটাই খোলা ছিল। দেখলাম পার্সেল দিচ্ছে। নিলাব্জর জন্যও রুটি-তরকারী নিয়ে এলাম।
 |
| শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে |
 |
| শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে |
 |
| শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে, বার্বল টপ থেকে |
 |
| শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে, বার্বল টপ |
 |
| শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে, বার্বল টপ থেকে |
 |
| বার্বল টপ এর লঙ্গর |
 |
| শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে |
 |
| শেষনাগ থেকে মহাগুনাস টপের পথে |
 |
| মহাগুনাস টপ |
 |
| মহাগুনাস টপ |
 |
| মহাগুনাস টপ |
 |
| মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে |
 |
| মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে |
 |
| মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে |
 |
| মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে |
 |
| মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে , পোষপত্রী লঙ্গর |
 |
| মহাগুনাস টপ থেকে পঞ্চতারিনীর পথে |
 |
| পঞ্চতারিনী |
 |
| পঞ্চতারিনী |
১৭/০৭/১৫ - ৬ টা নাগাদ আমরা লঙ্গরে গেলাম। সামনেই হেলিপ্যাড। টিকিটের জন্য লম্বা লাইন। আমরা সেখানে লাইন না দিয়ে ৬-৩০ এ হাঁটা শুরু করলাম। আজকের পথটা বেশ বিরক্তিকর। ঘোড়া , পালকি ইত্যাদির ভিড় অনেক বেশী। আজও আমরা পিট্টু নিলাম না , দু একবার দরদাম করেছিলাম বটে। রাস্তা সরু , কর্দমাক্ত ফলে বেশ কয়েক জায়গায় অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। সে এক বিভত্স পরিস্থিতি। তারমধ্যে এক আধুনিক যুবককে দেখলাম খালি পায়ে হাঁটছে ! আজকের প্রথম ৩ কিমি ভালই চড়াই , ২ ঘন্টা লাগলো পৌঁছাতে। নীচেই সঙ্গম, তবে দৃশ্যমান নয় , উল্টোদিকে বালতালের রাস্তা। সঙ্গম ক্যাম্প তখনও বেশ দূরে , পুরোটাই অমরাবতী নদীর ধারে , বরফের মধ্যে। কিছুটা এগোতেই দুরে পবিত্র গুহামুখ দেখা গেল। উতরাই সহজ পথ বাকিটা। এই পথেও প্রবল ভিড়ের মধ্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। আরও দেড় ঘন্টা পরে আমরা সঙ্গম ক্যাম্পে পৌঁছলাম ১০ টা নাগাদ । নদীর ওপারের রাস্তাতেই বেশী ভিড় আর দোকান। আমরা ডানদিক দিয়েই বরফের উপর দিয়ে ধীরে সুস্থে এগোতে থাকলাম পবিত্র গুহার দিকে। ১১-৩০ নাগাদ আমরা গুহার বেশ কাছে পৌঁছে গিয়ে বরফের উপর দিয়ে নদী পার করে এক বৃদ্ধের দোকানে আশ্রয় নিলাম। এগুলো সব নাম্বার দেওয়া পরপর প্রসাদী দোকান সাথে টেন্ট , মূলত দর্শন কালীন সময়টায় থাকার জন্য। রাত্রিবাস খুব একটা কেও করেনা। আমরা এখানেই রাত্রিবাস করব ঠিক ছিল। থাকার খরচও বেশ কম, ১৫০/- করে। আমাদের প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিলনা , দর্শন করে আসার পরে যদি থাকতে না দেয় ! আসলে এদের কাছ থেকে প্রসাদ কেনার বিনিময়ে এরা যাত্রীদের ব্যাগ , মোবাইল , ক্যামেরা যত্ন সহকারে রেখে দেয় বিনামূল্যে। কিন্তু অন্তত ১০০/- র প্রসাদ কিনতে হবে। দোকানদার আমাদের বিশ্রাম নেবার সুযোগ না দিয়ে অনবরত দর্শনে যাবার জন্য পাগল করে দিচ্ছিল। ৫০/- দিয়ে এক বালতি গরম জলে স্নান করে নিলাম। নতুন জামা কাপড় পড়লাম। ভক্তি না থাকলেও ভাবের কোনও অভাব নেই ! বৃদ্ধ প্রথম থেকেই কিটকিট করছিল , আমি দুটো ৫০/- র প্রসাদ চাওয়াতে তার ব্যবহার আরও খারাপ হয়ে গেল , কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না যে নিলাব্জও আলাদা প্রসাদ নেবে। আমাদেরকে চলে যেতে বলল , কিছুক্ষণ বোঝাবার চেষ্টা করে আমরাও চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই কিটকিটে বুড়োর সাথে কিছুতেই সহবাস করা যাবেনা ! আমরা আরও গুহার দিকে এগিয়ে গিয়ে ৭২ নম্বর দোকানে উঠলাম। সদালাপী যুবক , নাম ইয়াসির। আমরা ব্যাগ-পত্তর রেখে একটা লঙ্গরে সামান্য খেয়ে গুহার দিকে এগোতে থাকলাম। বরফের উপর দিয়ে হালকা চড়াই। দুদিকে সার দিয়ে দোকান বিশ্বনাথ গলির কথা মনে করিয়ে দেয়। গুহার প্রায় ৫০০ মিটার নীচে চেক পোস্ট , এর পরে আর মোবাইল-ক্যামেরা ইত্যদি নিয়ে ঢোকা যাবেনা। এরপরে চওড়া সিড়ি গুহামুখের ভিতরে পৌঁছে গেছে। রাস্তার ভিড় এখানে নেই। একদম শেষ ধাপে গিয়ে আমরা জুতো খুললাম অনিচ্ছা সত্বেও। দেখলাম ওই এলাকায় পুলিশও খড়ম পায়ে কাজ করছে ! এই এলাকাটা পুরোটাই গুহার ছাদের নীচে। উপর থেকে বরফ গলা জল পরে মেঝেটা পায়ে ঠান্ডা লাগার উপযুক্ত হয়ে আছে। জেলখানার মত খাঁচা দিয়ে বাবাকে আটকে দিয়েছে , ফলে দূর থেকে দেখবার কোনো উপায় নেই। এই খানে একটু লাইন পরেছিল আর সে লাইনটা দ্রুত এগোচ্ছিলও না। খাঁচার বাইরে দান পাত্রের কাছে কয়েকজন পুরোহিত গোছের লোক ছিল। তারা যাত্রীদের প্রসাদ টা দান পাত্রে ঠেকিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল। আমার প্রসাদ গুলো আমি নিজেই ঠেকিয়ে নিলাম। কি মনে হল কি জানি ১০০/- পাত্রে ঢুকিয়েও দিলাম। হয়ত গুড়গুড়ির জন্যই। আমরা যতই আধুনিক হইনা কেন , ভগবানবাদ নিয়ে যতই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করিনা কেন একটা সময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই কম বেশী ধর্মভীরু হয়ে পড়ি। এছাড়া আমার দানপাত্রে ১০০/- ঢোকানোর আর কোনও ব্যাখ্যা নেই ! এর পর আমিও একসময় খাঁচার সামনে যাবার সুযোগ পেলাম , ছোট বেলার চিড়িয়াখানার খাঁচায় লেপটে থাকার স্টাইলে এখানেও খাঁচার খাঁজে চোখ নাক মুখ সেঁটে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ওই দূরে কোনায় গুহার শায়িত দেওয়ালের সাথে লেপটে থাকা ৬/৭ ' এর বরফের স্তর , বর্ফানি বাবা , অমরনাথের শিবলিঙ্গ ! তখন বেলা ২ টো , গুহার উচ্চতা ১৩৫০০'। ছবিতে দেখা ও গল্পে শোনা বরফের শিবলিঙ্গের সাথে অনেক কষ্টেও বিন্দুমাত্র মেলাতে পারলাম না। মনের মধ্যে নানা সন্দেহ দানা বাঁধতে লাগলো। কিন্তু বেশীক্ষণ থাকার উপায় নেই। অন্যদিকের সিড়ি দিয়ে নেমে আসতে হল। জুতো পরার সময়েও মাথায় বাবার লিঙ্গটাই খোচা মারতে থাকলো। এখানকার সব দোকানে যে ছবি বিক্রি হচ্ছে তাতে লিঙ্গের একটা দ্বৈত সত্তা লক্ষ্য করেছি , অর্থাত সামনে একটি নধর নিটোল শিবলিঙ্গ , পিছনে অন্য একটার আভাস। যদিও অনেক আগের বন্ধুদের তোলা ছবিতে এই দ্বৈত লিঙ্গের আভাস কখনো দেখিনি। হতে পারে সামনেরটা সম্পূর্ণ গলে গিয়ে পিছনের ওই আভাস টুকুই সামান্য রয়ে গেছে। আমরা যাত্রা শুরু হবার ঠিক ১৫ দিন পরে দর্শন করলাম , জানিনা এত তাড়াতাড়ি সব গলে যাবার কথা কিনা। একদম প্রথমদিকে একবার না দেখলে আসল ব্যাপারটা কোনদিনই বুঝতে পারবনা। তবে এটাও ঠিক যত দিন যাবে তত লিঙ্গ সৃষ্টি হবার সম্ভাবনাও কমতে থাকবে। বাবাকে কি আর জেলখানায় আটকে রাখা যায় ! এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই নামছিলাম। হটাত দেখলাম কিছু লোক মোবাইলে ছবি তুলছে নিষিদ্ধ এলাকায়। নিলাব্জ পাশের পুলিশ কে অভিযোগ জানানোয় সে মোবাইল দুটো নিয়ে নেয়। ছবি তোলার দলে সুন্দরী মহিলাও ছিল , সুতরাং পুলিসের কি সাধ্যি বেশীক্ষণ সেগুলো আটকে রাখবে ! আমরা টেন্টে ফিরে বরফ ঠান্ডা বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। আমাদের ইচ্ছা ছিল সন্ধ্যে বেলায় আরতি দেখতে উঠব আর পরদিন সকালে আর একবার দর্শন সেরে ফেরার পথ ধরব। এখানকার টেন্ট গুলো সব বরফের উপরে। ইয়াসির আমাদের খুব খেয়াল রাখছিল , নীচে আরো একটা কম্বল পেতে দেয়। গায়ে একটা কম্বল ছিল , ও আরও একটা করে চাপিয়ে দেয়। ভালই ঠান্ডা লাগছিল। কম্বলের ওমের মধ্যে হটাত মনে পড়ল বাবার কাছে অনেক কিছু চাওয়ার ছিল , বাবাকে চেক করতে গিয়ে সেসবের কিছুই চেয়ে ওঠা হয়নি। শুয়ে শুয়েই বাবার উদ্দেশ্যে বললাম , তুমি তো অন্তর্যামী , সর্বত্র বিরাজমান , আমার সন্দেহবাতিক মনের অপরাধ নিওনা , আমাদের সবাইকে ভালো রেখো , তুমিও ভালো থেক। নিজের যা চেহাড়াখান বানিয়েছ তাতে লোকজন আর বাবা বলে মানবে না ! বাবা আমার কথা শুনলো আর এমন ঘুম পাড়িয়ে দিল দুজনকেই যে সন্ধারতি দূরে থাকুক , রাতের খাবার টাও আর খাওয়া হলনা। লঙ্গরের সেবায় নিজেদের কাছেও কোনও খাবার ছিলনা। এদিকে প্রত্যেক রাতেই আমাকে হাঁটু ব্যথার ওষুধ খেতে হয় , নইলে পরদিন হাঁটতে পারব কিনা তার ঠিক নেই। ব্যাগে রুপিন পাসের কিছু কিসমিস আর মেঘের দেওয়া ক্যাডবেরি পরে ছিল , সেটাই দুজনে খেয়ে , জল খেয়ে আরও একটা করে কম্বল চাপিয়ে শুয়ে পড়লাম। বিশাল টেন্টে আমরা দুজন আর ইয়াসির।
 |
| পঞ্চতারিনী থেকে সঙ্গমের পথে |
 |
| পঞ্চতারিনী থেকে সঙ্গমের পথে |
 |
| পঞ্চতারিনী থেকে সঙ্গমের পথে |
 |
| সঙ্গম টপ থেকে বালতালের রাস্তা |
 |
| সঙ্গমের ক্যাম্পের পথে |
 |
| দুরে সঙ্গম ক্যাম্প ও পবিত্র গুহা |
 |
| সঙ্গম ক্যাম্প ও পবিত্র গুহা |
 |
| দুই পথ সঙ্গম ক্যাম্প এ মিশছে |
 |
| সঙ্গম ক্যাম্প ও দুরে পবিত্র গুহা |
 |
| পবিত্র গুহার সামনে আমি আর নিলাব্জ |
 |
| পবিত্র গুহার পথে |
 |
| পবিত্র গুহা ও ক্যাম্প |
 |
| পবিত্র অমরনাথ গুহা |
 |
| পবিত্র গুহা ক্যাম্পে |
 |
| পবিত্র গুহা ক্যাম্পে ইয়াসিরের তাঁবু |
 |
| ১৯৮৭ তে রুদ্র মন্ডল দাদার তোলা ছবি |
 |
| ২০১৫ তে অমরনাথের পথে ছবিতে যেমন দেখেছিলাম ( সংগৃহীত ) |
১৮/০৭/১৫ - খুব সকালে ওঠা হলনা। বাবার সাথে দেখা করাও হলনা। ছবি তুলতে গিয়ে দেখলাম দ্বিতীয় সেটের ব্যাটারী গুলো তাড়াতাড়িই ফুরিয়ে গেছে। বালতাল দিয়ে না নামার ঘোষণা শুনতে পেলাম , রাস্তা বন্ধ। ইয়াসির বলল নেমে যেতে , এরকম রাস্তা বন্ধ থাকে মাঝেমধ্যে, আবার খুলেও যাবে।ইয়াসিরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ৭ টা নাগাদ হাঁটা শুরু করলাম । পঞ্চকুলা অনুসন্ধান কেন্দ্রে আমরা চা-বিস্কুট খেলাম। এখানে শুনলাম বালতাল নামতে কোনো অসুবিধা নেই কিন্তু বালতাল থেকে শ্রীনগরের রাস্তা বন্ধ আছে। আমরা হেলিকপ্টারে ফেরার পরিকল্পনাও বাতিল করেছি কারণ গিয়ে যদি টিকিট না পাই তাহলে ফাটা বাঁশে আটকে যাব ! সঙ্গম পর্যন্ত ফিরে আসতে যা সময় লাগবে ততক্ষণে আমরা বালতাল নেমে যাব। গতকাল থেকেই এখানকার বিচিত্র ঘোষণা দূর থেকে শুনছিলাম। এই বিষয়ে গঙ্গাসাগর আর অমরনাথে কোনো ফারাক নেই। আমরা থাকতেই এক মুসলিম যুবক আরবি ভাষায় লম্বা একটা ঘোষণা করে গেল , গতকাল যখন ঢুকেছিলাম তখন এই ঘোষণা টা শুনে একটু বিরক্তই হয়েছিলাম কারণ এটুকু বোঝা যাচ্ছিল নমাজ পড়তে ডাকার জন্যই এই ঘোষণা। মনে মনে ভেবেছিলাম আমারনাথেও কি একজোট হয়ে নমাজ না পড়লেই চলছিলনা ! যুবকটি উল্টোদিকের দোকানদার। আমরা এগোতে থাকলাম। ক্রমশ: চড়াই বাড়তে থাকলো। নীচে অমরাবতী ও পঞ্চতারিনী এই দুই নদীর সঙ্গম স্পষ্ট দেখা গেল। একটা মিলিটারী ক্যাম্পও আছে ওখানে। মোবাইলেই ছবি তুলতে থাকলাম। ঘন্টা খানেক বাদে এই সঙ্গমের উপরেই একটা চটিতে পৌঁছলাম। প্রথমবারের জন্য একটা ফ্রুট জুস কিনে খেলাম দ্বিগুন দাম দিয়ে ! এখানেই কথায় কথায় জানতে পারলাম আজ ঈদ। ১৮ তারিখে ঈদ সেটা জানতাম কিন্তু গত ২/৩ দিনে সেটা মাথা থেকে একদম বেরিয়ে গেছিল।দুটো কারনে নিজের উপরে রাগ হতে থাকল। এক ইয়াসির কে ঈদ এর শুভেচ্ছা টুকুও জানানো হয়নি আর দুই ওই ঘোষক যুবককে ভুল বোঝার জন্য। হিন্দীতে ঘোষণাটা হলে অবশ্য কোনও ভুল বোঝাবুঝি হতনা। আমি মনে করি ওদের খুশীর উত্সবে অমরনাথেও ঈদ এর নমাজ খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আমরা সকালে যতক্ষণ ছিলাম ওদের ঈদ পালন করতেও দেখিনি , ব্যবসায় ব্যস্ত কাওকে কোলাকুলি বা শুভেচ্ছা বিনিময় করতেও দেখিনি। আর তার ফলেই আমার এই বিরাট ভুল। অমরনাথ কে পিছনে রেখে ঈদ এর নমাজের ছবিটা থেকেও বঞ্চিত হলাম। একটা অসাধারণ ছবি হত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি ফটোগ্রাফার হলে হয়ত ফিরেই যেতাম ! এর পরে আরও এক ঘন্টা চড়াই ভাঙ্গার পরে পৌঁছলাম বরারি ক্যাম্পে (১৩১২০'), সঙ্গম ক্যাম্প থেকে দুরত্ব ৪ কিমি , সময় তখন ১০ টা। লঙ্গরে রুটির সাথে পায়েস দেখে একটু বেশী করেই নিয়েছিলাম , মুখে দিয়ে দেখি টক দই ! দুটো রুটি খুব কষ্ট করে খেলাম। আসার আগে খাবারের সম্ভারের যে গল্প শুনেছিলাম তার কিছুই প্রায় আমরা পাইনি। সব জায়গাতেই সেই ভাত রুটি ডাল রাজমা এই সব , যা সত্যিই আর খাওয়া যাচ্ছিলনা। এর পরে সহজ উতরাই চওড়া পথ। রাস্তায় ভিড়ও কম। পথে এক দোকানদারের মোবাইল থেকে মেঘকে ফোন করলাম , রুপাদির নাম্বার মেসেজ করে দিতে বললাম কিন্তু মিনিট দশেক অপেক্ষা করেও মেসেজ পেলাম না। ৩.৫ কিমি দূরের রেল-পাথরি ( ১০৭০০') পৌঁছলাম ১২ টা নাগাদ। এ পথে সৌন্দর্য একটু কম। ২.৫ কিমি দূরের দুমাইলে ( ৯৭৬০') পৌঁছে গেলাম আরো এক ঘন্টায়। বালতাল দিয়ে যারা যায় , দুমাইল তাদের চেক পোস্ট। এখানেও প্রচুর দোকান, লঙ্গর , টেন্ট। আমরা আরও ৩ কিমি হেঁটে বালতাল ক্যাম্পে ( ৯৫০০') পৌঁছে গেলাম ২ টো নাগাদ, গাড়িতেও আসা যেত । পবিত্র গুহার প্রায় কাছ থেকেই আমরা হাঁটা শুরু করেছিলাম, দুরত্ব কমবেশী ১৬ কিমি , আমাদের সময় লাগল ৭ ঘন্টা। আমার মনে হয় যারা শুধুই দর্শন করতে আসেন তাদের জন্য বালতালের পথটাই সুবিধার। ওঠার সময় বরারী পর্যন্ত ৭ কিমি চড়াই , কিন্তু চওড়া ভালো রাস্তা , তারপরের ৭ কিমি সহজ উতরাই ও চড়াই। একদিনেই হেঁটে গিয়ে নেমে আসা সম্ভব , যারা ঘোড়ায় যাবেন তাদের জন্যও স্বস্তির যাত্রা। আমরা ৫০/- দিয়ে একটা বাসে উঠে পড়লাম , যেটা সোনমার্গের ২ কিমি আগে নামিয়ে দিল , এখানে রাস্তা হড়কা বানে নেমে আসা কাদায় সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে, একটা একটা করে গাড়ি পার হচ্ছে কিন্তু বাসটা আমাদের আগেই নামিয়ে দিল। যাত্রীরা সব আবার পাশের চড়াই ভেঙ্গে রাস্তার ভালো জায়গায় পৌছাচ্ছে। আমরা একটা লরির সামনে উঠে পড়লাম , জানলাম সেও শ্রীনগর যাবে। ভাবলাম আরামেই যাওয়া যাবে। সোনমার্গে ঢোকার আগে লরি গুলোকেও আটকে দিল , আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে হেঁটে সোনমার্গের স্ট্যান্ডে পৌঁছলাম। একটা রানিং গাড়িতে দুজনে ৫০০/- তে উঠে গেলাম দরদাম করে , বালতাল থেকেই আসছিল বাকিদের কাছ থেকে ৪০০/- করে নিয়ে। ড্রাইভার তখন জানতনা রাস্তা খারাপের কথা। গগনগীরের কাছে প্রথম বাঁধা টা পার হতেই ঘন্টা খানেক লেগে গেল। তবে ড্রাইভার ভাই খুব উদ্যোগী তাড়াতাড়ি শ্রীনগর ফেরার জন্য , বাড়িতে তার বাচ্চারা অপেক্ষা করে আছে ঈদ এর জন্য। তখন সে জানেনা রাস্তায় আরো কি অপেক্ষা করে আছে। এর পরের হড়কা বানের এলাকায় আমরা ৫ ঘন্টা অপেক্ষা করলাম , রাস্তা বানানোর কাজ দেখলাম , অসীম শক্তিধর এক যন্ত্র আর তার অসীম ধৈর্যশীল চালক নিরলস কাজ করে চলেছে , বাইকার্স রা ধ্বসের উপর দিয়েই বেরিয়ে যাবার পথ খুঁজে নিল। কয়েক হাজার গাড়ি দাঁড়িয়ে। আমাদের ড্রাইভার শের খাঁ , কমবয়েসী , এই পথের পরিচিত , প্রচুর গাড়িকে টপকিয়ে এসে অন্তত ঘন্টা দুয়েক সময় বাঁচিয়েছে। কাছে খাবার জল কিছুই নেই , দোকানও কিছু ছিলনা , সে এক দুর্বিসহ অপেক্ষা। রাত ৯ টার পর এই জায়গাটা পার হবার ২/৩ কিমি পরেই আমরা অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আরো ক্ষতিগ্রস্ত একটা জায়গা পার হলাম , এই রাস্তাটা ততক্ষণে খুলে যাওয়ায় আমাদের আর অপেক্ষা করতে হয়নি। এর পর এক জায়গায় শুধু চা আর চিপস খেয়েছি। সেখানে ড্রাইভারের মোবাইল থেকে মেঘের সাথে যোগাযোগ করে ফেবু থেকে পাওয়া রুপাদির নম্বর নিলাম। জানলাম হীরক বাবুরা আজ শ্রীনগরেই আছেন , হোটেল পেতে অসুবিধা হলে যোগাযোগ করতে বলেছেন। নিলাব্জ রুপাদিকে ফোন করে জানল ওরা পহলগাম আছে , কাল শ্রীনগর আসবে। অসুস্থতার কারণে ওদের দর্শন করা হয়নি। আমরা রাত ১২ টায় শ্রীনগর পৌঁছলাম। ড্রাইভার কে ৬০০/- দিলাম , ওর সামান্য বেশী দাবি ছিল। ডাল লেকের ধারে নামিয়েছিল , সেখানে পরপর কয়েকটা ভেজ রেস্তোরা ছিল। আমরা আগে খেয়ে নিয়ে তারপর অনেক দরদাম করে হাউসবোটের মাঝের একটা হোটেলে , নাম শালিমার , ৫০০/- দিয়ে একটা রুমে ঢুকে শুয়ে পড়লাম। রাত তখন প্রায় ২ টো !
 |
| বালতালের পথ থেকে সঙ্গম ক্যাম্প ও পবিত্র গুহা |
 |
| পবিত্র সঙ্গম |
 |
| বরারী লঙ্গরে নিলাব্জ |
 |
| রেল - পাথরি |
 |
| দোমাইল |
 |
| দোমাইল থেকে বালতালের পথে |
 |
| দোমাইল থেকে বালতালের পথে |
 |
| দূরে ওই বালতাল ক্যাম্প |
 |
| সোনমার্গের কাছে প্রথম বাঁধা |
 |
| সোনমার্গ |
 |
| সোনমার্গ |
 |
| সোনমার্গ |
 |
| গগনগিরের কাছে তৃতীয় বাঁধা |
 |
| গগনগিরের কাছে তৃতীয় বাঁধা |
 |
| গগনগিরের কাছে তৃতীয় বাঁধা |
 |
| গগনগিরের কাছে তৃতীয় বাঁধা |
১৯/০৭/১৫ - সকাল সকাল উঠে আমরা পাড়ে এলাম। ৪ ন. ঘাট। আর একটু এগোতেই একটা বাঙালী রেস্তোরা দেখলাম , ২ ন. ঘাটের উল্টোদিকে , সেখানে লুচি তরকারী খেলাম। বেরিয়ে এসে দেখলাম উল্টোদিকের গলির মুখে রুবিনা গেস্ট হাউসের বিজ্ঞাপন। মনে পরে গেল ২৫ বছর আগে বাবা মার সাথে এসে আমরা এখানেই উঠেছিলাম , হোটেলটা গলির ভিতরে , কিন্তু বাঙালী ব্যবস্থাপনা , বিজ্ঞাপনটাও বাংলাতেই ছিল। পি সি ও খুঁজে পাওয়া খুব মুস্কিল আজকাল , অনেক হাঁটাহাঁটি করে একটা পেয়ে সবাইকে ফোন করা হল। হীরকবাবুরা একটু পরেই বিমানে বেরিয়ে যাবেন , তাই তাদের সাথে আর দেখা হলনা এ যাত্রায় ! রুপাদী রা আমাদের হোটেলে পৌঁছে গেছেন। আমরা সেখানে গেলে মালিক একটু অভিমান দেখালো , কেন এদেরও ৫০০/- র ঘড় বলে ডেকে এনেছি , আমরা নাকি কাল জোর করেই ঢুকে গেছি ! ঠিক হলো রুপাদির রুম টা ৭০০/- দিতে হবে , ডাক্তারবাবু আমাদের রুমে এডজাস্ট করবেন। আমরা সবাই ফ্রেশ হয়ে বেরোলাম , উদ্দেস্শ্য লাঞ্চ করে একটু ঘুরব। সোনালী রেস্তোরাতেই পেট ভরে মাছ ভাত খাওয়া হলো , সাথে ডাল আলুপস্ত সহ অন্য তরকারী পাপড় চাটনি , ১৬০/- নিল। সস্তায় ভালো বাঙালী খাবার। শিমলায় যেটা খুব মিস করেছিলাম। উল্টো পাল্টা দরের জন্য অটো পেতে দেরী হচ্ছিল , রুপাদি ক্লান্ত থাকায় আর কয়েক বছর আগেই ঘুরে যাওয়ায় হোটেলে ফিরে গেলেন। আমরা তিনজনে অবশেষে একটা অটো পেলাম ৭৫০/- তে , শঙ্করাচার্য মন্দির , তিনটে বাগ আর হজরত বাল মসজিদ ঘোরাবে । আমারও ক্লান্তি লাগছিল কিন্তু স্মৃতি রোমন্থনের ইচ্ছেটাকেও ত্যাগ করতে পারছিলাম না। মন্দিরে এখন জমাট নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ছবি তোলার কোনো সুযোগ নেই। নামার পরে এখানেও একটা লঙ্গরে ওরা দুজন লুচি হালুয়া খেল। আমি একটু টেস্ট করলে দেখলাম হালুয়াটা দুর্দান্ত। এরপর চশমা শাহী বাগ। প্রচুর ভিড়। স্থানীয় লোকেরা আজ ঈদ এর খুশী মানাচ্ছে। বাগে বসে কেও বিরিয়ানি খাচ্ছে তো কেও ফোয়ারার জলে জলকেলি করছে। রোদ থাকলেও আবহাওয়া মেঘলা , আর বেশ গরম। এরপরে আমরা রাস্তায় বিশাল জামে পড়লাম , ডাল লেকের ধার দিয়েই রাস্তা , কাতারে কাতারে লোক লরি বাস নিজেদের গাড়ি নিয়ে রাস্তায়। সবারই গন্ত্যব্য কোনও না কোনোও বাগ। এর মধ্যে আমাদের অটো টাও বিগড়ে গেল , কিছুতেই স্টার্ট হচ্ছিলনা। ফলে নিশাদ বাগে পৌঁছাতে বেশ দেরী হয়ে গেল , এখানেও ভিড় অব্যাহত , এটা একেবারে ডাল লেকের ধারেই। এর পরে গেলাম শালিমার বাগ। এখানে জলের জায়গাটা কে সবাই একুয়াটিকা বানিয়ে ফেলেছে। কাশ্মিরীদের ঈদ এর উত্সবে দুটো জিনিস খেয়াল করলাম বা খেয়াল করতে পারছিলামনা , সে দুটো হলো সুন্দরী আর বোরখা ! কাশ্মিরী সুন্দরীদের নিয়ে যে মিথ ছিল তা ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে গেল , আম জনতা সব জায়গার মতই আম , সুন্দরীরা সবকিছু নির্বিশেষেই সুন্দরী হয় ! বোরখার বিরল ব্যবহারও আমায় অবাক করলো , এরা চিরতরে বোরখা মুক্তি ঘটিয়েছে না এটা শুধুই আজকের উত্সবের স্বাধীনতা তা অবশ্য জানা গেলনা। এর পরে আমরা গেলাম হজরত বাল মসজিদে , মেরামতির কাজ চলছিল , তবুও পাশের সবুজ লন থেকে খুবই সুন্দর লাগছিল। আমাদের হোটেলে ফিরে ওরা ঢুকে গেল , আমি একটু দাড়ি কাটতে গেলাম , পরে আবার মিলিত হয়ে কিছু কেনাকাটা করলাম , রবিবার সরকারী দোকান বন্ধ থাকায় পোশাক-আশাক কিছু কেনা গেলনা অনেক ঘুরেও , গুড়গুড়ির জন্য একটা কাশ্মীরি কাজ করা ফ্রক নিলাম আর নিলাম আখরোট ও খোবানি। কাল সকালেই আমি বেরিয়ে যাব , ওদের ট্রেন ২৩ তারিখে। রাতেও বাঙালী খাবার খেয়ে আমরা প্রায় ১২ টা পর্যন্ত ডাল লেকের ধারে আড্ডা মারলাম।
২১/০৭/১৫ - স্লিপার ক্লাসের বিরক্তিকর জার্নি। তবে ট্রেনে অতিরিক্ত ভিড় ছিলনা। ট্রেন জুড়ে শুধু অমরনাথ যাত্রীরাই বসে আছে যেন। আর প্রত্যেকের সাথে যাত্রায় ব্যবহার করা গোদা গোদা লাঠি গুলো , আর ক্রিকেট ব্যাট। মনে পড়ল ২৫ বছর আগে আমিও একটা ডিউজ ব্যাট কিনেছিলাম মাত্র ৫০/- দিয়ে। কাল থেকে না খেয়ে থাকার পরে আজ রাত থেকে খাওয়া শুরু করলাম ঠিকঠাক ভাবে। পেট খারাপের ওষুধ চলছিলই। মোবাইল কানেকশন পাবার পরে মেঘের সাথে প্রানভরে কথাও বলা গেল !
২২/০৭/১৫ - ট্রেন একদম সঠিক সময়েই হাওড়া ঢুকে গেল। কলকাতা শহর সেদিন বৃষ্টিতে বানভাসি। কিছুটা বাসে এসে বাকিটা মেট্রো তে গিয়ে পৌঁছে গেলাম মেঘ-বৃষ্টির কাছে। আমার সর্বশেষ গন্ত্যব্যে।
এক ঝলকে ট্রেক - প্রথম দিন : পহলগাম থেকে গাড়িতে ১৬ কিমি দূরের চন্দনবাড়ি ( ৯৫০০') থেকে ট্রেক শুরু হবে। পিসু টপ ( ১১৫০০') ৩ কিমি / ৩ ঘন্টা ; জোজিবল ৩ কিমি / ১.৫ ঘন্টা ; শেষনাগ ( ১১৭৩০') ৬ কিমি / ২ ঘন্টা ; মোট ১২ কিমি / ৭.৫ ঘন্টা । দ্বিতীয় দিন : বার্বল টপ ৩ কিমি / ২.৫ ঘন্টা ; মহাগুনাস টপ ( ১৪৫০০') ১.৬ কিমি / ১ ঘন্টা ; পোষপত্রী ২ কিমি / ১ ঘন্টা ; পঞ্চতারিনী ( ১২৭২৯') ৮ কিমি / ২.৫ ঘন্টা ; মোট ১৪.৬ কিমি / ৯.৫ ঘন্টা। তৃতীয় দিন : সঙ্গম ক্যাম্প ( ১১৮০৮') ৩ কিমি / ৩.৫ ঘন্টা ; পবিত্র গুহা ( ১৩৫০০')৩ কিমি / ১.৫ ঘন্টা ; মোট ৬ কিমি / ৫ ঘন্টা। চতুর্থ দিন : সঙ্গম ৩ কিমি / ১ ঘন্টা ; বরারি (১৩১২০') ৪ কিমি / ২ ঘন্টা ; রেল-পাথরি ( ১০৭০০') ৩.৫ কিমি / ১.৫ ঘন্টা ; দোমাইল ( ৯৭৬০') ২.৫ কিমি / ১ ঘন্টা ; বালতাল ( ৯৫০০') ৩ কিমি / ১ ঘন্টা ( গাড়িও চলে ) ; মোট ১৬ কিমি / ৭ ঘন্টা।
কিভাবে যাবেন : হাওড়া থেকে ট্রেনে জম্মু , সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে পহলগাম বা বালতাল বেস ক্যাম্প। যারা ট্রেক করতে যাবেন তারা উপরের লেখা অনুযায়ী পহলগাম -পবিত্র গুহা - বালতাল এই পথেই যান। যারা শুধুমাত্র দর্শন করতে যাবেন বা যাদের হাতে সময় কম তারা বালতাল - পবিত্র গুহা - বালতাল এই পথেই যান ; হেঁটে , ঘোড়ায় বা পালকিতে সবেতেই আরামদায়ক হবে। হেলিকপ্টার উভয় দিক থেকেই পাওয়া যাবে , যাওয়া যাবে পঞ্চতারিনী পর্যন্ত , বাকি ৬ কিমি পথ মোটেও সহজ নয় , ঘোড়াতে গেলে শেষ ১ কিমি হাঁটতে হবে, পালকি একেবারে গুহার উপড়ে পৌঁছে যাবে। বালতাল থেকে সোনমার্গ - শ্রীনগর হয়ে জম্মু ফেরা যায়।
কারা যেতে পারবেন : ১৩ থেকে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পারমিট পাওয়া যায়। অনেক রকম শারীরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। শ্বাসকষ্ট , উচ্চ - নিন্ম রক্তচাপ , হৃদয়রোগ বা কোনো পুরানো জটিল অসুস্থতা লুকিয়ে দর্শনে যাবেন না।
বোম বোম ভোলে # # # হর হর মহাদেব
AMARNATH TREK 2015 FULL ALBUM ( 379 photos ) Click Here :-
For SELECTED AMARNATH YATRA PHOTO ALBAUM Click Here :-