নতুন পথে নন্দাদেবী পূর্ব বেস ক্যাম্পে
( ছবিতে ক্লিক করলে ছবিগুলো পরপর ও বড় আকারে দেখা যাবে )
ভুমিকা :- ভ্রমণকাহিনী লিখতে বসে আমি ধর্ম সঙ্কটে পরে যাই যে তথ্যের কচকচানিতে ভরিয়ে তুলব নাকি সাহিত্যের কল্পনায় রাঙিয়ে তুলবো । আমি জানি যারা এই রুটে যাবেন না তারা আমার দেওয়া তথ্যে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠবেন আর যারা যাবেন বা আগে গেছেন তারা সৌন্দর্যের মধ্যে থেকেও বাস্তব তথ্য টাকেই খুঁজে নেবেন । আমার চেষ্টা থাকবে দু ধরনের পাঠককেই আকৃষ্ট করে রাখা ।
২০১৩-র অক্টোবরে সুন্দর ভাবে সিকিম এর গোচালা ট্রেক করে ফেলার পরেই আমরা চারজন মানে আমি, সব্যসাচী , তারক আর শান্তনু মিলে ঠিক করে ফেলি পরের বছর একি সময় নন্দাদেবী পূর্ব বেস ক্যাম্পে যাব । আরও কযেকজন যাবার কথা বলেছিলেন , তার মধ্যে শেষ পর্যন্ত আশা জিইয়ে রেখেছিলেন মুম্বাই বাসী ষাটোর্ধ পাটকর স্যর , যার সাথে আমি ভাসুকিতাল সহ ওয়েস্টার্ন ঘাটে আরও দুটো ছোট ট্রেক করেছিলাম। ওনার স্ত্রী কে নিয়ে ওই সময় সুন্দরডুঙ্গা ট্রেকে থাকার কথা। উনিও দুদিন আগে জানালেন পায়ে চোট পেয়েছেন , তাই আমরা চারমুর্তিই বহাল থাকলাম। ২০১৪-র জুন মাস থেকেই আমাদের পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায় । ততদিনে আমরা জেনে গেছি ছন্দা গায়েন তার দুই সঙ্গী সহ কান্চন্জন্ঘার কোলে চিরতরে বসবাস শুরু করে দিয়েছে। হাসিখুশী প্রানোচ্ছল মেয়েটি আমার খুব প্রিয় ছিল। খুব কম পর্বতারহিকেই এমন দেখেছি। তারক তার সুন্দরডুঙ্গার গাইড জাটোলি নিবাসী বল্লু সিং এর সাথে কথা বলে, ঠিক হয় তার ছেলে মোহন আমাদের নিয়ে যাবে । আমরা নিশ্চিত হতে পারছিলাম না ট্রেক টায় ঠিক কতদিন লাগবে বা কোন পথে গেলে আমরা সহজে মুন্সিয়ারি পৌঁছাতে পারব । প্রদ্যুতদা , যার সাথে দেখা হয়েছিল গোচালা ট্রেক এ , তাঁর একটা লেখা আমরা পড়ি , ওনারা মাত্র ৮ দিনে এই ট্রেক টা করেছিলেন , কিন্তু সেটা ২০১১ সালের কথা । আমাদের গাইড বলছে ১১-১২ দিন লাগবে । যাইহোক আমরা ঠিক করি ট্রেক টা ৯-১০ দিনের মধ্যে করবো আর লখনউ , টনকপুর হয়ে মুন্সিয়ারি পৌঁছাব । যাবার ঠিক কদিন আগে শারদীয়া পত্রিকায় তমাল ঘোষ এর একটি লেখা আমাদের নজরে এলো । ওনারা ২০১৪-র মে মাসে গেছিলেন এবং ২০১৩-র দুর্ঘটনার জন্য রাস্তা ভেঙ্গে যাওয়ায় নন্দাদেবী পূর্ব বেস ক্যাম্পে না যেতে পেরে মিলাম এ যেতে বাধ্য হয়েছিলেন । যাবার ঠিক আগে এই লেখাটা আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছিল বৈকি !
০৪/১০/১৪ - কবিগুরুর সেই আসাম যাত্রার ভোগান্তির কথা মাথায় রেখেও আমরা শনিবারের বারবেলাতেই বেরবো বলে ঠিক করেছিলাম । এবারের পূজা ছিল তিনদিনের , হিসেবমত আজি একাদশী , কিন্তু আজকেই বিসর্জন দেবে ঠিক করায় আমার বাত্সরিক ভাসানের নাচ শিকেয় তুলে রেখে বেড়িয়ে পরতে হল । হাওড়া থেকে সন্ধ্যে ৭-৪০ এর অমৃতসর মেল , প্রথমদিকে দ্বিধাগ্রস্ত সব্যসাচীর কনফার্ম টিকিট নেই । ট্রেক টা শেষ হওয়া পর্যন্তও আমরা ওকে বোঝাতে পারিনি যে ও যাক বা না যাক টিকিট টা আগেই কেটে রাখা উচিত ছিল !! ষ্টেশনের বাইরে থেকে নেওয়া রুটি আর ডিম তরকা দিয়ে ভালই খাওয়া হল । চললাম লখনউ ।
০৫/১০/১৪ - মোটামুটি সঠিক সাময়েই বিকাল ৫ টা নাগাদ লখনউ পৌঁছলাম । স্টেশনে বেশ কিছুক্ষণ কাটালাম । সব্য বাদে সবাই এ টি এম থেকে টাকাও তুললাম , কারন ২০১১ তে মুন্সিয়ারি তে এ টি এম বানাতে দেখলেও তার উপর ভরসা করা মুশকিল । আমরা একটা অটো ঠিক করলাম যে আমাদের তুণ্ডে কাবাব হয়ে আইশবাগ ষ্টেশনে ছেড়ে দেবে মাত্র ১৫০/- এ । অটো ওয়ালাও কেও তুণ্ডে কাবাব খুঁজে পেতে বেগ পেতে হল , যদিও এটা লখনউ এর বিখ্যাত কাবাবি ওয়ালা । যাতায়াতের পথে প্রবল ট্রাফিক জ্যামে পরে গেলাম , যদিও সময় মতই স্টেশনে পোঁছে যাই । গিলাবটি কাবাব , তন্দুরি চিকেন , রুমালি রুটি আর চিকেন বিরিয়ানি প্লাটফর্মে বসেই ভগবান শ্রী রামচন্দ্র কি জয় বলে মেরে দিলাম ! ৮-২৫ এই ছাড়ল টনকপুর গামী ট্রেন ।
০৬/১০/১৪ - রাত ৩ টেয় আমরা পিলভিট এই নেমে গেলাম, কারন এখানে ট্রেন টা ৪ ঘণ্টা দাড়িয়ে থেকে ৯-২৫ এ টনকপুর পৌঁছায় । আমরা আশা করেছিলাম ৬০ কিমি দূরের টনকপুর এ তার আগেই পৌঁছে যাব । টনকপুর আর হলদুয়ানি দু জায়গা থেকেই মুন্সিয়ারির দূরত্ব কমবেশি ২৯০ কিমি । যেহেতু টনকপুরেই ভোর বেলায় পৌঁছান সম্ভব তাই আমরা এই পথ টাই বেছে নিয়েছিলাম । কিন্তু টনকপুর পৌঁছনটাও সুখকর ছিলনা । টনকপুর এ অনেক টা সময় কাটল জীপ আর বাস এর দ্বিধা কাটাতে । পুরো রিসার্ভ করে যেতে পারলে ভাল হত কিন্তু সে অনেক খরচ । বাসে পিথোরাগড় পৌঁছাতে বিকাল পেরিয়ে গেল, শেয়ার জীপ আর পেলাম না । থল গেলাম যে জীপে সেটাই বুক করে রাত ৯ টায় মুন্সিয়ারি পৌঁছলাম । সবমিলিয়ে জনপ্রতি ৯০০/- খরচ হল, আর ১৮ ঘণ্টার প্রানান্তকর যাত্রা সইতে হল । পাণ্ডেজী পাশেই হোটেল দেবভূমি তে আমাদের ব্যবস্থা করেছিলেন । ৭৫০/- র একটা ছোট রুমে আমরা ৪ জন । হোটেলের নীচেই ছোট্ট খাবার দোকানে পেটভরে গরম রুটি খেয়ে সারাদিনের ক্লান্তি কাটাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম ।
০৭/১০/১৪ - আজ আমাদের মুন্সিয়ারি তেই বিশ্রাম । বাগেশ্বর থেকে মোহন এসে সব ব্যবস্থা করবে । ওর কথামত আমরা উপকারী পাণ্ডেজী র সাথেও যোগাযোগ করেছিলাম , কিন্তু সে অভিজ্ঞতা ভাল নয় , রুক্ষ ভাবে জানিয়ে দিল পারমিশন কিছু লাগবেনা , এমনিই যাওয়া যাবে । মুন্সিয়ারি আমার আগে দুবার ঘোরা , তাই নতুন করে কিছু দেখার ছিলনা । সকাল থেকে ওয়েদারটাও ভাল নয়, পঞ্চচুল্লি ভালকরে দেখা দিলনা । আমাদের হোটেলের পাশের চড়াই দিয়ে উঠে কে এম ভি এন'এ গেলাম । উপরে রাস্তার পাশে কসমস ট্রাভেল অফিসে ঢুকে কিছু কেনাকাটা করা হল । দীপক ছেলেটা খুব হেল্পফুল , এরাও ট্রেক করায় । পারমিশন যোগাড় করার ব্যাপারে একটা সহজ পথ দেখিয়ে দিল । কারন ততক্ষণে মোহন কখন পৌঁছবে তার আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছিলোনা । নীচে যেখানে আমরা খাই , তার মালিক তহশিল অফিসে যোগাযোগ রাখে , সেই আমাদের দরখাস্ত লিখে সাজিয়ে দিল , এক কপি ছবি সহ বানিয়ে দুটো জেরক্স করা হল । এস ডি এম ছিলেন না , বড়বাবুকে দিয়ে আমাদের কাজ টা করিয়ে দিলেন , একবার আই টি বি পি'র অফিসেও যেতে হয়েছিল । সহজেই ব্যাপারটা মিটে গেল , কোন পয়সাও লাগল না । আমাদের হোটেলেই একটা বাঙ্গালী ফ্যামিলি গ্রুপ ছিল , তাদের মধ্যে ভীষণভাবে দ্রব্যগুণে প্রভাবিত কয়েকজন দেখা হলেই বারবার আমাদের পরিচয় আর কোথায় যাব জানতে ছাইছিল । এদের সাথে এক কুঞ্চিত কুন্তলা কৃষ্ণকলি ছিল , যে বারবার আমাদের নজর কেড়ে নিচ্ছিল । পথ চলতে চলতে আমরা এমন অনেক মানুষকেই দেখি , যাদের সাথে হয়ত ভালভাবে আলাপও হয়না , ভবিষ্যতে আর কখনো দেখা হবারও সম্ভাবনা থাকেনা , তাদের মধ্যে কেও কেও মনের মণিকোঠায় চিরস্থায়ী হয়ে যায় । ততক্ষণে মোহন পৌঁছে গেছিল । সব্য মোহনকে নিয়ে এ টি এম থেকে টাকা তুলে আনলো। মোহনের সাথে ১০ দিনের ট্রেক এর জন্য সবকিছু নিয়ে ১০৫০০/- তে কথা হয়েছিল । ৫০০/- র খচ্চর ৮০০/- নিচ্ছে জানিয়ে নাটক শুরু করে দিল । আসলে বাইরের লোক বলে ওর এখানে হোল্ড কম । আমরা কিছু বেশী দেব বলে আপাতত রফা করা হল । কাল সকাল থেকে আমাদের ট্রেক শুরু হবে ।
পরিকল্পিত ট্রেক সূচি :-
প্রথম দিন -- গাড়িতে ধাপা , লিলাম হয়ে রারগাড়ি ১৪ কিমি ট্রেক ...
দ্বিতীয় দিন - বুগডিয়ার , নাহারদেবী হয়ে রিলকোট ১৩ কিমি ট্রেক ...
তৃতীয় দিন - বুরফু হয়ে গাঙ্ঘার ১৩ কিমি ট্রেক ...
চতুর্থ দিন -- নন্দাদেবী পূর্ব বেস ক্যাম্প ৭ কিমি ট্রেক ...
পঞ্চম দিন -- নন্দাদেবী পূর্ব বেস ক্যাম্প ঘুরে দেখা ...
ষষ্ট দিন --- গাঙ্ঘার , বুরফু হয়ে মারতোলি ১৪ কিমি ট্রেক ...
সপ্তম দিন - রিলকোট , নাহারদেবী হয়ে বুগডিয়ার ১৫ কিমি ট্রেক ...
অষ্টম দিন - বুগডিয়ার থেকে রারগাড়ি ৭ কিমি ট্রেক ...
নবম দিন - রারগাড়ি থেকে লিলাম হয়ে ধাপা ১৪ কিমি ট্রেক , গাড়িতে মুন্সিয়ারি ...
দশম দিন - অতিরিক্ত দিন ...
 |
| ছিলিমধারে আমরা চারমূর্তি |
০৮/১০/১৪ - আজ আমার জন্মদিন , গত কয়েক বছর ধরে এই দিনটায় আমি বাইরেই থেকেছি বেশী । আই টি বি পি'র কাছে চলে যাই ভোদাফোনের লাইন পেতে , বাড়িতে কথা বলি মা ও মেঘের সাথে । অন্তঃস্বত্তা মেঘকে ছেড়ে আসায় দুজনেরি মন খারাপ । ও যে এই অবস্থায় আমাকে ছেড়েছিল এটাই আমার কাছে অনেক পাওয়া । ওদের আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা নিয়ে হোটেলে ফিরি । আজও পঞ্চচুল্লি কে মন ভরে দেখা গেলনা । মোহন সেই খচ্চর নিয়ে নাটক করল, ফলে বেড়তে দেরি হল । দুজন বাচ্চা খচ্চরওয়ালা , নাম চঞ্চল আর সনু । গাড়িতে ৫০০/- য় আধ ঘণ্টায় দারকোট হয়ে পৌঁছে গেলাম ১৪ কিমি দুরের ছিলিমধার'এ । ধাপা তে নেমে জিমিঘাট , লিলাম হয়ে গৌরীগঙ্গার পাশ দিয়ে নীচের রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে । ছিলিমধার থেকে ১০-৩০ এ আমরা ট্রেক শুরু করে নেমে এলাম নদীগর্ভে , এই নদীটাই কিছুদূরে জিমিঘাটে গিয়ে মিশেছে গৌরীগঙ্গায় । ঝকঝকে নীলাকাশ , ঝরঝরে পাহাড়ি নদী মনোরম দৃশ্য উপহার দিল প্রথমেই । চড়াই ভেঙ্গে আমরা উঠে এলাম লিলাম যাবার গাড়ির রাস্তায়, যদিও সে পথ বেশিদূর পাওয়া গেলনা, কাজ চলছে । এই গাড়ির রাস্তাই একদিন পুরো পৌঁছে দেবে বুরফু হয়ে মিলাম । আমরা গাড়ির রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকের পাহাড়ি চড়াই পথ ধরলাম । সবুজে ঢাকা পাহাড়ি পথ যতটা সুন্দর ততটাই কষ্টকর । এক সময় দূর থেকে ছবির মত লিলাম গ্রাম চোখে পড়ল , ২ ঘণ্টায় লিলাম পৌঁছে উপরের একটা একাকী বাড়িতে আমরা বিশ্রাম ও আহার সারলাম । উল্টোদিকের পাহাড়েও দুটো ছবির মত গ্রাম ঝুলে থাকতে দেখা গেল । খচ্চরওয়ালারা আজ আর এগোতে চাইছিলনা , কিন্তু আমরা আরও এগিয়ে যাব ঠিক করলাম । সেখান থেকে আগামী পথটা চরম চড়াই, দূর থেকেই সেটা বোঝা যাচ্ছিল । আন্দাজ করা গেল আরও ঘণ্টা চারেক লাগবে চড়াইটা পার হতে, উল্টোদিকের ঢালে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে । ফিরতি পথের কিছু ট্রেকার আমাদের আগামী পথের কষ্টকর চড়াই এর বর্ণনা শুনিয়ে দিল । শুরু করে দিলাম মিশন মৈন সিং টপ ! হাঁটু সমান পাথুরে ধাপ ভেঙ্গে উঠেই চলেছি । গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত হাজির হল বৃষ্টিও ! একটা লাল পতাকা দেখে আমরা উঠছিলাম , সেখানে পৌঁছে দেখা গেল এখনও অর্ধেক বাকী ! সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে আমরা মৈন সিং টপ'এ যখন উঠলাম , তখন ঘড়িতে ৫-১৫ । বৃষ্টির জন্য প্রায় অন্ধকার । উতরাই পথের তিনটি ধাপে তিনটি ঝুপড়ি আছে , জায়গা টাকে বলা হচ্ছে বাবলধার । টপ থেকেই আমি আর শান্তনু দেখতে পেলাম তারক প্রথম ঝুপড়িতে অপেক্ষা করছে । সব্য আমাদের পিছনে ছিল , সবাই চা পান করে আবার যাত্রা শুরু করলাম মধ্যবর্তী ঝুপড়ির দিকে । এটাই আমাদের ভুল ছিল , কারন তখন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে আর বাকি পথটা গাইডের কথামত ২০-২৫ মিনিটের ছিলনা । হেডল্যাম্পের আলোয় কর্দমাক্ত পিচ্ছিল জঙ্গলে ঘেরা পথে নামতেও অসুবিধা হচ্ছিল । একসময় দেখি গাইডরা বড় আলো নিয়ে আমাদের নিতে এসেছে । প্রায় ৯ ঘণ্টা ট্রেক করে সন্ধ্যে ৭-১৫ তে আমরা বাবলধারের মধ্যের ঝুপড়িতে পৌঁছলাম বিদ্ধস্ত অবস্থায় । ঝুপড়িওয়ালাও বড্ড অসহযোগিতা করল , রাত্রিবাসের জন্য ২০০/- জনপ্রতি চাওয়ায় , যেটা আসলে ৫০/- , আমরা থাকবনা বলায় আর রেট ও কম না করে আমাদের তাবড়তোপ ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলল , এমনকি তার আশেপাশে ক্যাম্প করলেও টাকা লাগবে বলল । আজ আসলে ক্যাম্প করার প্ল্যান ছিলনা , কিন্তু ওর দুর্ব্যবহারে গাইডরাও জেদ করে জঙ্গলের মধ্যে গিয়েই টেন্ট খাটায় । বেশ একটা গা ছমছমে পরিবেশ পাওয়া গেল । আমি আর তারক একটায় , অন্যটায় শান্তনু আর সব্য ঢুকে পড়লাম । গরম স্যুপে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করার বৃথা চেষ্টা । রাতের খাওয়া শেষ করে শুতে শুতে ১০ টা বাজল । মোহনের ব্যবস্থাপনা বেশ ভালই ।
 |
| ছিলিমধার থেকে নদীগর্ভে নেমে |
 |
| ছিলিমধার থেকে নদীগর্ভে নেমে |
 |
| লিলাম গ্রাম |
০৯/১০/১৪ - সকালে প্রাতঃকৃত্য সারতে গিয়ে বুঝলাম জঙ্গলের গভীরতা , আর বাঁদরের বাঁদরামি ! প্রাতরাশ সেরে ট্রেক শুরু করতে ৯-১৫ বেজে গেল । কাল যে মৈন সিং টপ চড়ে উল্টোদিকের ঢালে কিছুটা নেমে এসেছিলাম , আজও সেই পথেই নামতে শুরু করলাম । এক ঘণ্টায় পোঁছে গেলাম রারগাড়ি সেতুতে । রারগাড়ির আস্তানা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে । এই প্রথম আমরা গৌরীগঙ্গাকে কাছ থেকে ভাল করে দেখতে পেলাম । এর পরে গৌরীগঙ্গাকে ডানদিকে রেখে আমাদের চলার পথটা বড্ড একঘেঁয়ে । পাহাড়ের ঢালে জঙ্গলে ঘেরা পথ আর সেটা খুব একটা দৃষ্টিনন্দন নয়। পুরনো পথ নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় মাঝেমধ্যেই এক একটা বিরাট ধসা এলাকা উপরে উঠে পার করতে হচ্ছে । সহজ পথটা কঠিন হয়ে উঠেছে । পথের দুরত্ব বাড়ছে , ফলে আগে যে দুরত্ব আমরা জানতাম এখন তার আর কোন মিল নেই । ২০১৩'র দুর্ঘটনা পরবর্তী তমাল ঘোষের লেখার সাথে মিলে যাচ্ছে । অবশেষে দুপুর ১ টায় আমরা বুগডিয়ার পৌঁছে চোখের আরাম পেলাম । গৌরীগঙ্গার তীরে খুব সুন্দর ছোট্ট একটা পাহাড়ি জনপদ । প্রথম আই টি বি পি'র ক্যাম্পের সম্মুখিন হলাম এখানেই । অনুমতি পত্র দেখিয়ে নাম নথিভুক্ত করালাম । পরিচয় পত্র সাথে থাকলেও হয়ত কাজ মিটে যেত , কিন্তু আমি বলব মুন্সিয়ারি থেকে আনুমতি পত্র নিয়েই যাত্রা শুরু করতে । হোটেল বুগডিয়ার এ বসে আমরা আহার সারলাম , অতিরিক্ত অমলেট ও চা নেওয়া হল , ২০/- ও ১০/- করে দাম নিল । এরপর পোটিং নালা পার করে ঘণ্টা তিনেকের বিরক্তিকর ট্রেক শেষে ৪-১৫ তে নাহারদেবী পৌঁছে গেলাম । আজ ৭ ঘণ্টা ট্রেক করতে হল । এখানেও একটা ঝুপড়ি আছে , যেগুলোর পোশাকি নাম হোটেল ! প্রতিদিন প্রচুর স্থানীও লোক মুন্সিয়ারি থেকে মিলাম ৭২ কিমি একদিনেই যাতায়াত করে , কোন কারনে দেরী হয়ে গেলে এই হোটেল গুলোতেই রাত কাটায় । আমরা পাশের পাথুরে টিলার উপরে ক্যাম্প করলাম । তারপরেই গৌরীগঙ্গার বিস্তীর্ণ নদীখাত । জায়গাটার সৌন্দর্য কম হলেও কেমন যেন একটা ভয়াবহতা আছে । হটাত্ আশা মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি যদি টিলাটাকেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় ! রাস্তায় গৌরীগঙ্গার তাণ্ডবে মাঝেমধ্যেই বুক দুরুদুরু করে উঠেছিল । সন্ধ্যায় মুড়ি মাখা হল তরিযুত করে, সাথে চা । সারাদিন কষ্টের পরে এই টেন্ট বাস বড়ই মধুর ।
 |
| বাবলধার জঙ্গল ক্যাম্প |
 |
| বাবলধার থেকে রারগারি সেতুর পথে |
 |
| রারগারি সেতু |
 |
| বুগডিয়ারযের পথে গৌরীগঙ্গা |
 |
| বুগডিয়ার |
 |
| বুগডিয়ার |
১০/১০/১৪ - কাল রাতে শোবার পর থেকেই প্রচণ্ড হাওয়া শুরু হয় , টেন্ট যেন উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায় । সকালে উঠে দেখি কিচেন টেন্ট এর লণ্ডভণ্ড অবস্থা , চারিদিকে মালপত্র ছড়িয়ে আছে । তখনো প্রচণ্ড হাওয়া বইছে । মোহন একটা বড় পাথরের আড়ালে গিয়ে রান্না শুরু করল । প্রাতরাশ সেরে ৯ টায় আমরা বেড়িয়ে পড়লাম , ওরা গোছগাছ করে পরে বেরোবে । টিলা থেকে নদীখাতে নেমে হাঁটা শুরু হল । দুদিকেই খাঁড়া পাহাড় , আমরা বাঁদিক দিয়ে এগোতে লাগলাম । নদীখাতের মধ্যে পাহাড়ের দেয়ালে জাগ্রত নাহারদেবীর মন্দির । নদীখাত থেকে উঠে আমরা সরু পাথুরে খিলানের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলাম , এই পথটা বড়ই মনোরম আর তেমনি রোমাঞ্চকর। শুরু থেকেই ডানদিকে কখন ৫০ ফুট কখনও বা ১০০০ ফুট নীচে দিয়ে দূর্বার গতিতে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ নিল-সবুজ জলের গৌরীগঙ্গা । কিছু পরে পথের পাশেই পেলাম সুন্দর লম্বা এক ঝর্ণা । এখানে অনেকক্ষণ ফটো সেশন হল । দুপুর ১২ টায় আমরা পৌঁছলাম মাপাং এ । গ্রাম টা ২০১৩ তে ধ্বংস হয়ে গেছে , বসতিটা উঠে গেছে অনেক উপরে । এখানে একটা নালার ধারে বসে আমরা আহার সারলাম । ফিরতি পথে আসা কলকাতার ৭ বছরের ছেলের সাথে আলাপ হল , যে মা বাবার সাথে ট্রেক'এ এসেছে , যদিও সময় সমস্যায় তারা রিলকোট থেকেই ফিরতে বাধ্য হয়েছে । এর পর আবার সেই একঘেঁয়ে ট্রেকিং , তবে আজ জঙ্গলে ঘেরা পথ বেশী ছিলনা। পুরনো রাস্তা ছেড়ে অমানুষিক পরিশ্রম করে একটার পর একটা ধসা এলাকা পার করা । কিছু চড়াই তো প্রান হাতে করে নিয়ে পার হতে হল , যেকোনো মুহূর্তে বিপদ হতে পারত আর সোজা গৌরীগঙ্গার জলে যেতে হত । গত কয়েকদিন ধরেই পুরনো পথ আর নতুন পথের চক্করে আমরা বারবার বিভ্রান্ত হয়েছি , মন চেয়েছে পুরন সহজ পথে যেতে কিন্তু গেলেই বেকার খাটুনি , আবার ফিরে আসতে হবে । এরকম ভাবেই আমরা একবার বিস্তীর্ণ বিশালাকার বোল্ডার জোনে ঢুকে পরি । এলাকাটা পার হতে গিয়ে বুঝলাম এটা হয়ত স্থানীও লোকেরা ব্যবহার করে , আমাদের জন্য নয় , সব্য বাদে আমরা তিনজন একসাথেই জায়গাটা পার হই । রিলকোটে পৌঁছনোর ঠিক আগে আবার নদীখাতে নেমে যেতে হল , কিন্তু এবার ছোট বড় বোল্ডার বিছানো রাস্তা । সেটা পার করে উপরে উঠেই রিলকোট গ্রাম । সাড়ে ছ' ঘণ্টা ট্রেক করে ৩-৩০ নাগাদ রিলকোটে পৌঁছলাম । প্রথমেই আই টি বি পি'র ক্যাম্প পড়ল । আমরা সবাই বাড়ীতে ফোন করার সুযোগ পেলাম এখান থেকে । মিনিটে মাত্র এক টাকা খরচে ! এখানেও ক্যাম্প করার জন্য লোকাল ট্যাক্স দিতে হবে , যে যার মত পাঁচিল দিয়ে জায়গা ঘিরে রেখেছে । কে এম ভি এন'এর পাশেই আমরা ক্যাম্প করলাম । শেষদিকে একটু বৃষ্টিও শুরু হয়েছিল , আমরা অনেকক্ষণ কিচেন টেন্টের মধ্যেই মাথা গুঁজে বসে ছিলাম । সামনেই বেশ নীচে গৌরীগঙ্গা ।
১১/১০/১৪ - রিলকোট থেকেও আমরা সকাল ৯ টায় ট্রেক শুরু করলাম । একটু উপরে উঠেই আমরা আবার পেয়ে গেলাম গাড়ির রাস্তা । ডানদিকে কোনও যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে যাওয়া রিলকোট গ্রাম । সামনের গাড়ির রাস্তা যদিও ভাঙ্গা , বিপর্যস্ত তবুও নিশ্চিন্তে হাঁটা যাবে । এখানেও কয়েকটা দানবিক যন্ত্র চোখে পরল , খুবি ঢিমেতালে কাজ এগোচ্ছে । এই রাস্তা শেষ হবার আগে ভারতীয়রা চাঁদে পৌঁছে গেলেও আমি অবাক হবনা ! আর একটু এগোতেই প্রথম চোখে পড়ল বরফাবৃত পর্বত চূড়া । ডানদিকে নদীর অন্য পারে দেখা পেলাম টোলা গ্রামের । গ্রামটার ঠিক উল্টোদিকে যখন চলে এলাম , তখন বাঁদিকে একটা খাঁড়াই সরু পথ উঠে গেছে মারতোলির দিকে । মারতোলি অসম্ভব সুন্দর একটা গ্রাম । আরও উপরে হওয়ায় অনেক বেশী পর্বতশৃঙ্গ দেখা যায় । মারতোলি-লোয়াঁ-পাট্টা হয়ে আরেকটি কঠিন পথও নন্দাদেবী পূর্বের আরেকটি বেস ক্যাম্পে গেছে । শুনেছি সে পথ আমাদের মত সাধারন ট্রেকারদের জন্য নয় , অভিযাত্রীরা সে পথে পাড়ি দেয়। তমাল ঘোষরা ওই পথে যেতে চেয়েছিলেন কেন বুঝিনি । আমরা ফেরার সময় মারতোলি যাব । দুপুর ১২ টায় বুরফু পৌঁছে গেলাম, গ্রামটা নদীর ওপারে । ওদিকে কিছু গাড়ী মিলাম এ যাতায়াত করতে দেখলাম । এই জায়গাটাও বেশ সুন্দর সামনে এবং ডানদিকে শ্বেতশুভ্র পর্বত চুড়া ব্রিজগঙ্গাধর দেখা যাচ্ছে । আমরা এক ঘণ্টা কাটালাম আহারের আছিলায় । এর পরের পথটা অপেক্ষাকৃত সহজ সবুজ প্রান্তরের উপর দিয়ে । একটু এগোতেই বুঝলাম সহজ হলেও স্বাভাবিক নয় , ঘাসের নীচে জমে থাকা জল কাদা থেকে জুতো বাঁচিয়ে চলাই মুশকিল । আমাদের জুতোও কাদায় মাখামাখি হল । সব্য নতুন কিনে আনা কেচুয়া'র জুতোয় ইতিমধ্যেই আহত হয়ে মোহনের সাথে জুতো পরিবর্তন করে নিয়েছে । ঘণ্টা খানেকের মধ্যে আমরা মাপা গ্রামে পৌঁছলাম , যদিও বাসিন্দারা এই সময় সবাই নীচে নেমে গিয়েছে । ডানদিকে গৌরীগঙ্গার অন্য পারে মিলাম যাবার গাড়ির রাস্তা সবসময় সঙ্গী । বিকাল ৪ টেয় আমরা গাঙ্ঘার পৌঁছে গেলাম , আজও ৭ ঘণ্টা ট্রেক করতে হল । আজকের পথে জঙ্গল প্রায় ছিলইনা , গ্রামটার উপরের দিকে কিছু ভোজ গাছ চোখে পরে। গ্রামটা বেশ বড় , যথারীতি কোনও বাসিন্দা ছিলনা । পাথর দিয়ে দরজার মুখ বন্ধ করে নীচে নেমে গেছে । এখানেই গৌরীগঙ্গাতে এসে মিশেছে পাছু নালা , যার অন্য পারে পাছু গ্রাম , যেখানে কে এম ভি এন'এর ট্রেকার্স হাটও আছে । দূরে মিলাম গ্রামও দেখা যাচ্ছে অস্পষ্ট ভাবে । আমাদের মধ্যে তারকই অনেক আগে এসে পৌঁছায় , তারপরে আমি আর শান্তনু আগেপরে পৌঁছে যাই , আরও খানিকটা পরে সব্য আসে, এইভাবেই প্রতিদিন আমরা ট্রেক করেছি । আজ সব্যর পৌঁছাতে বেশ দেরী হচ্ছিল , আমরা চিন্তিত হয়ে মোহনকে দোষারোপ করছিলাম ওকে একা ছেড়ে দিয়ে আসার জন্য । এমন সময় শান্তনু আবিষ্কার করলো সব্য পাছু নালা পার করে গ্রাম এর দিকে এগোচ্ছে !!! এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা । ওঠা নামা মিলিয়ে রাস্তাটা নেহাত কম নয় । আমরা আশ্রয় নিলাম পঞ্চায়েত এর দোতলা বাড়ীতে । অনেকদিন পরে আমরা গৃহবাসী হলাম ! দিনের আলো ভালই ছিল , তাই আমরা প্রথমবার দেখা পেলাম নন্দাদেবী পূর্বের শিখরচূড়া । গাঙ্ঘার থেকে যত উপরে উঠবো নন্দাদেবী তত দৃশ্যমান হবে ।
১২/১০/১৪ - সকালের শুরুতেই বিপত্তি , খচ্চর পাওয়া যাচ্ছেনা ! একজন চলে গেছে তাদের খোঁজে । ওদেরও দোষ দিয়ে লাভ নেই , আসার আগে জেনেছিলাম গাঙ্ঘার পর্যন্তই খচ্চর যায় , এর পরে পোর্টার নিতে হয় , আমরা যে নন্দাদেবী পূর্ব বেস ক্যাম্প পর্যন্তই ওদের নিয়ে যাব সেটা মনে হয় কোনও ভাবে ওরা বুঝতে পেরেছিল ! কে বলে ওদের বুদ্ধি নেই ! কিন্তু আমরা পরলাম বিপদে , বুঝেই পাচ্ছিলাম না এত লটবহর নিয়ে কিভাবে উপরে উঠবো । কারন ততক্ষণে জানা হয়ে গেছে আশেপাশে ওরা নেই । সকাল ১০ টায় বুরফু থেকে ওদের ধরে নিয়ে আসল । আমাদের দুশ্চিন্তা কাটল । আমরাও অনেক মালপত্র , রুকস্যাক একটা ঘরে রেখে দিলাম । চুরি হবার কোনও ভয় নেই , করারও কেও নেই ! ট্রেক শুরু করতে ১১ টা বাজল । সুন্দর ঝকঝকে আবহাওয়া । সামনের চড়াই টা উঠতেই নন্দাদেবী পূর্ব ও নন্দাদেবী মেন আমাদের সামনে সম্পূর্ণ রূপে উন্মচিত হল । এতদিনের কষ্টের পরে এখন শুধু অবাক হয়ে দেখার পালা । এর পরে যত এগোব দৃশ্যপট কিছু বদলাবে না , শুধু আমরা আরও কাছে পৌঁছে যাব নন্দাদেবীর । আজকের পথের দুরত্ব সবথেকে কম , ৪ ঘণ্টা ট্রেক করে ৩ টের সময় পৌঁছে গেলাম নন্দাদেবী পূর্ব বেস ক্যাম্পে । কিন্তু এই স্বল্প দুরত্ব পার করতেই অবস্থা শোচনীয় । একটার পর একটা ধ্বসা অঞ্চল , বেশ কয়েকটা তার বুক চিরে ভিজে গুঁড়ো পাথরের উপর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে পার হতে হল । কোনটাও বা উপরে উঠে পার হতে হল । এমনি একটা ধ্বসা অঞ্চলের উপরে উঠতে প্রায় হামাগুড়ি দিতে হল । এবার চলার পথ যত বিপদজনক হয়েছে আমি তত মদন সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়েছি । নিজে পরে গেলে কে বাঁচাবে বা অন্য কেও পরে গেলে আমি কিভাবে তাকে উদ্ধার করব মাথার মধ্যে শুধু সেটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল । নিজে কোনরকমে পার হয়ে গিয়ে অন্যরা কিভাবে পার হচ্ছে সেটা দেখার আর সাহস পাচ্ছিলাম না । এই রাস্তা দিয়ে খচ্চর গুলো কিভাবে পার হল ভেবে পাচ্ছিলাম না । হয়ত পা ফস্কালে কি বিপদ হতে পারে এই চিন্তাশক্তি ওদের ছিলনা । তবুও ওই অবলা জীব গুলোকে আমার শতকোটি অভিবাদন । ওরা না থাকলে ট্রেক টা এত আরামদায়ক হতনা । আমরা যেখানে ক্যাম্প করলাম সেখানকার ছবিই পাণ্ডে লজে দেখেছিলাম । গান্ঘার থেকে বেস ক্যাম্প পর্যন্ত ভোজপত্র আর রডডেনড্রন গাছের আধিক্য চোখে পরেছে , এর পরে আর কোন গাছ নেই। তবে আরও এগিয়ে গিয়েও ক্যাম্প করা যেত , জলের সোর্স নিশ্চিত করে নিয়ে । এখান থেকে কিন্তু নন্দাদেবী বেশ দূরে , তবে এই পথটা কঠিন নয় । পাছু গ্রাম থেকেও একটা পথ পাছু নালার উল্টোদিকের পাহাড়ের বুক চিরে বেস ক্যাম্পের দিকে এসেছে । এদিক থেকে ওইদিকের পথ টাই সহজ মনে হচ্ছিল , কিন্তু শেষে এসে দেখা গেল পথটা পাছু নালায় বিলীন হয়ে গেছে , সেটা পার করা যেত না । আর একটা ব্যাপার আমি উল্লেখ করতে চাই , পুর ট্রেকপথে আমরা আশেপাশের পাহাড় গুলোতে বরফ দেখিনি , বা প্রদ্যুতদার লেখা মত কোনও হিমবাহ বা স্নো-ব্রিজ পার হতে হয়নি । মে মাসে হয়ত পরিস্থিতি অন্যরকম থাকে । ২০১৩'র আগে যারা গেছেন তারা হয়ত আমার বর্ণিত কাঠিন্যের সাথে একমত হতে পারবেন না , কারন তখন এই রুট টা দীর্ঘ হলেও সহজই ছিল । ৭৫০০ ফুট উচ্চতা থেকে ৫ দিনে ১৩৫০০ ফুট উচ্চতায় উত্তরন , তাই উচ্চতাজনিত কারনে ট্রেকটি মোটেও কঠিন নয় ।
 |
| পাছু আর গাঙ্ঘার |
 |
| গাঙ্ঘার গ্রাম |
 |
| পাছু গ্রাম |
 |
| গাঙ্ঘার থেকে উপরে উঠেই |
 |
| প্রথম নন্দাদেবী দর্শন |
 |
| বেস ক্যাম্পের পথে গাঙ্ঘার এর দিকের দৃশ্য |
 |
| গাঙ্ঘার থেকে বেস ক্যাম্পের পথে |
 |
| বেস ক্যাম্পের পথে গাঙ্ঘার এর দিকের দৃশ্য |
 |
| গাঙ্ঘার থেকে বেস ক্যাম্পের পথে |
 |
| গাঙ্ঘার থেকে বেস ক্যাম্পের পথে |
১৩/১০/১৪ - মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল খচ্চরের দ্রুতগামী ঘণ্টাধ্বনি শুনে । কাল থেকেই আমাদের মধ্যে একটা খচ্চর-ফোবিয়া প্রচণ্ড ভাবে কাজ করছিল ! গাইডদের জানানো হলে, ওদের একজন গেল উদ্ধারকার্যে ! কখন ফিরেছিল জানিনা । আমরা ভোর ৫-৩০ এ বেরিয়ে আধ ঘণ্টা দুরের আর একটা স্পটে গিয়ে দাঁড়ালাম সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় । আকাশে তখন স্পষ্ট চাঁদের আলয় মনে হচ্ছিল নন্দাদেবী যেন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে । কিছু সময় পরে নন্দাদেবীরা দুই বোন যেন সোনার জল গায়ে মেখে নিল । ওই প্রান্তরে আমরা পাঁচজন শুধু সেই মুহূর্তের সাক্ষী , কারও মুখে কোনও কথা নেই , শুধুই অবিরাম শাটারের সাবধানী ক্লিক ! এতদিনের বিরক্তিকর কষ্টের অভিমান গলে জল হয়ে পাছুঁ নালায় যেন মিশে গেল । এখান থেকে নন্দাদেবীর পাদদেশ অনেকটাই দূরে , ছুঁয়ে দেখতে গেলে এখনও ২/৩ কিমি যেতে হবে । সঙ্গীরা কেও যেতে চাইলনা , আমি আর মোহন নন্দাদেবীর পাদদেশের উদ্দেশ্যে হাঁটা লাগালাম , বাকিরা ক্যাম্পে ফিরে গেল । নন্দাদেবী পূর্বের রিজ ধরে এগোলে নন্দাদেবী লাম্পাক ( ১৮৯৭০ ফুট ) শৃঙ্গের পাদদেশে পৌঁছান সম্ভব । যদিও নন্দাদেবী মেন ( ২৫৬৪৩ ফুট) আর নন্দাদেবী পূর্ব (২৪৩৮৯ ফুট ) কেই আমরা ঠিকঠাক চিনতে পারলাম । আমরা আছি গৌরীগঙ্গা উপত্যকায় যেটা জোহার বা মিলাম উপত্যকা নামেও পরিচিত , নন্দাদেবীর অন্যদিকে রিশিগঙ্গা উপত্যকা । তারক যখন মোহনের সাথে কথা বলেছিল তখন একদিন অতিরিক্ত পেলে ও আমাদের অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্প ঘুড়িয়ে দেবে বলেছিল , এখন তাই বলেই আমরা পাদদেশের দিকে এগলাম । কিন্তু আসল কথা হল এই পথে অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্প নয় , ওটা সেই কঠিন পথে । এটাকে আপার বেস ক্যাম্প বলা যেতে পারে । আমরা ঘণ্টা খানেক বাঁদিকের পাহাড়ের ঢালে নুড়ি পাথর বিছানো পথে হেঁটে নন্দাদেবির আরও কাছে পৌঁছে গেলাম । এখানেও উপরে কোন বরফ ছিলনা , মোরামের নীচে হয়ত ছিল । এর পরে পুরোটাই মোরাম বিছানো গ্লেসিয়ার । এটাই পাছু গ্লেসিয়ার , পাছু নালা এখান থেকেই বয়ে চলেছে । আজকেই আমরা গাঙ্ঘার ফিরে যাব বলে আর এগোনো গেলনা কারন মোহন ফিরে খাবার বানাবে । এই জায়গাতে একটা কংক্রিট পিলার ছিল , সেখানেই আমরা হলদিরামের সনপাপড়ি আর ধূপ জ্বালিয়ে নন্দাদেবির পূজা করলাম । খুব সুন্দর আবহাওয়া , ফেরার সময় মিলামের দিকেও কিছু নাম না জানা স্নো-পিক দেখা গেল । ১০ টা নাগাদ ক্যাম্পে ফিরে খাওয়া সেরে আমরা গাঙ্ঘারের দিকে যাত্রা শুরু করলাম ১১ টায় । সফল ভাবে গন্ত্যব্যে পৌঁছানোর পর আমাদের ফেরা শুরু হল । এই পথ টুকুই সবথেকে বেশী বিপদজনক , অতি সাবধানে আমরা পার হচ্ছিলাম । সব্য যেভাবে টাল খেতে খেতে পার হচ্ছিল সেটা দেখার সাহস আমার ছিলনা । সব্যর সাথে সবসময় মোহন থাকলেও কিছু সময় সব্য একা হয়ে যাচ্ছিল , তখন তারক বা শান্তনু দূর থেকে সব্যকে পরামর্শ দিচ্ছিল , ওদের সাহস আছে ! ১ টায় গাঙ্ঘারে পোঁছে আমরা লাঞ্চ করলাম । আগের মালপত্র নিয়ে বেরতে ২ টো বাজল । এবার সহজ পথ , ৪ টের সময় বুরফু পৌঁছে গেলাম । আমার আর তারকের ইচ্ছে ছিল আজ মারতোলি চলে যাওয়া , কিন্তু বাকি দুজন তাতে রাজী না হওয়ায় আমরা বুরফুতেই থেকে যাব ঠিক করলাম । পরদিন আমরা দুজন মারতোলি হয়ে যাব , আর ওরা সরাসরি রিলকোট যাবে ঠিক হল । আসলে আমরা ৯ দিনেই ট্রেক শেষ করতে চাইছিলাম যাতে নিশ্চিন্তে লালকুঁয়া পৌঁছে ট্রেন ধরা যায় । তাই আজকের পরে আর মারতোলি তে থাকা সম্ভব হচ্ছিলনা । ক্রমশঃ আবহাওয়া খারাপ হতে থাকল , হালকা বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেল । আমরা তাঁবুর আপাত নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকে গেলাম ।
 |
| চাঁদের আলোয় নন্দাদেবী |
 |
| ভোরের আলোয় নন্দাদেবী |
 |
| প্রথম সূর্য কিরণে নন্দাদেবী |
 |
| সোনায় মোড়া নন্দাদেবী |
 |
| সোনায় মোড়া নন্দাদেবী |
 |
| সোনায় মোড়া নন্দাদেবী |
 |
| সোনায় মোড়া নন্দাদেবী |
 |
| ছবি তুলতে ব্যস্ত আমার তিনসঙ্গী |
 |
| গাইড মোহনের সাথে আমরা চারমূর্তি |
 |
| নন্দাদেবী পাদদেশের পথে |
 |
| নন্দাদেবী পাদদেশের পথে |
 |
| নন্দাদেবী পাদদেশের পথে |
 |
| নন্দাদেবী পাদদেশের পথে |
 |
| পূর্ণ রূপে নন্দাদেবী |
 |
| নন্দাদেবী পূর্ব ও নন্দাদেবী মেন |
 |
| নন্দাদেবী পূর্ব |
 |
| প্রণমি তোমায় নন্দাদেবী |
 |
| নন্দাদেবী পাদদেশের পথে |
 |
| নন্দাদেবী পাদদেশের পথে |
 |
| ক্যাম্পে ফিরে আমার তিনসঙ্গী |
 |
| বেস ক্যাম্পে চঞ্চল আর সনু |
 |
| বেস ক্যাম্প থেকে নন্দাদেবী |
 |
| বেস ক্যাম্প থেকে গান্ঘারের দিকের দৃশ্য |
 |
| বেস ক্যাম্প থেকে গান্ঘারের দিকের দৃশ্য |
 |
| বেস ক্যাম্প থেকে নামার সময়, দুরে পাছু গ্রাম |
 |
গান্ঘার থেকে বুরফুর পথে
|
১৪/১০/১৪ - সারারাত বৃষ্টি হয়েছে , সকালেও আবহাওয়া অত্যন্ত খারাপ । আমাদের মারতোলি যাওয়া বাতিল করতে হল , কারন গিয়ে কিছুই দেখা যেতনা । হালকা বৃষ্টির মধ্যেই আমরা সকাল ৮-৩০ এ বেরিয়ে পরলাম । বৃষ্টি বাড়লেও রিলকোট পর্যন্ত সহজ রাস্তা থাকায় ১১ টায় পৌঁছে গেলাম । আই টি বি পি ক্যাম্পে সবাই ফোন করলাম । আমি আই টি বি পি'র অফিসার সেজে মেঘকে ফোন করে ঘাবড়ে দিতে চেয়েছিলাম , আর ও ঘাবড়েও গেছিল । আমি কি আর জানতাম কলকাতায় তখন টিভিতে তথাগত জানা দের নেপালে ট্রেক করতে গিয়ে নিখোঁজ হবার খবর দেখাচ্ছে ! যার সাথে আমার স্বল্প পরিচয় ছিল আর আমাদের এই ট্রেকটা নিয়েও তার সাথে আমার কথা হয়েছিল । আমাদের সফল ও সুস্থ হয়ে নেমে আসার কথা শুনে মেঘ প্রায় কেঁদেই ফেলল । আসলে আমরা যেসব প্রিয়জনদের বাড়িতে রেখে পাহাড়ে এসে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই , আমরা ভালো থাকলেও তারা কিন্তু চরম দুশ্চিন্তার মধ্যেই দিন কাটায়। যদিও আমাদের বিপদ তখনও পুরোপুরি কাটেনি । মনে পরে গেল সৌগত রায় সহ আমাদের পাড়ার অনেকেরই এই সময় রুপকুণ্ড ট্রেক এ থাকার কথা । সবার জন্যেই মনটা খারাপ হয়ে গেল । কারন বৃষ্টির ধরন আর খবর টা শুনে মনে হল আবহাওয়ার এই হটাত পরিবর্তনটা সার্বিক , শুধু আমাদের এখানেই সীমাবদ্ধ নয় । আই টি বি পি'র ছোট্ট গার্ড রুমে আমরা লাঞ্চ সারলাম । খচ্চরয়ালারা আর যেতে চাইছিলনা , আমরা এগোতে চাওয়ায় মোহন ওদের রাজী করায় । ১২ টায় আবার হাঁটা শুরু হল বৃষ্টির মধ্যেই । জুতো সহ শরীরের নানা অংশই তখন ভিজে চপচপে । রিলকোট থেকে একটু এগোতেই একটা শান্ত ঝোরা ছিল যা সহজেই পার হয়েছিলাম, এবার সেটা ভয়ঙ্কর রূপ ধারন করেছে , শেষ পর্যন্ত সেটা পার হওয়া গেলনা , ৮/১০ ফুট উপর থেকে অজানা পাথরের খাঁজে ঝাপ দিয়ে সেটা একটু ঘুরে পার হলাম । সবার গায়ে মাথা কাটা প্লাস্টিক শিট , যেটা ওরা গোচালা যাবার সময় বানিয়েছিল , হাঁটার পক্ষে সুবিধাজনক । কিন্তু আমার গায়ে চোঙার মত প্লাস্টিক শিট , যার সামনেটা ধরে রাখতে হচ্ছিল , আর বারবার সেটা বিপর্যস্ত হয়ে পরছিল । আমাকে অতিরিক্ত খেয়াল রাখতে হচ্ছিল যাতে পায়ে জড়িয়ে পরে না যাই । বহু বছর ধরে এটা আমার সাথে থাকলেও কখনও সেভাবে ব্যবহার করতে হয়নি , এবার বুঝলাম এটা খুব সমস্যার , আমাকেও ওদের মতই বানাতে হবে এর পরে । রিলকোট থেকে নাহারদেবীর পথটা এমনিতেই কঠিন ছিল , তার উপরে বৃষ্টিতে সেটা আরও বিপদজনক হয়ে পরেছে । আমাদের গতিও স্লথ হয়ে গেছিল । আমরা তিনজন একসাথে এগোচ্ছিলাম , মোহন সব্যকে নিয়ে পিছনে আসছিল । ফলে আবার আমরা পথের ধাঁধায় বিভ্রান্ত হচ্ছিলাম । খচ্চর বিষ্ঠাও যে মানুষের উপকারে লাগতে পারে সেটা এবার টের পেলাম । যে রাস্তায় বিষ্ঠার পরিমান ও নতুনত্ব বেশী আমরা সেটাতেই এগোতে থাকলাম । এই হিসেব করেই একবার আমরা মনে সন্দেহ নিয়েই একটা পথে অনেকটা নীচে নেমে গেছিলাম , সেটা ভুল হলে জানিনা সেদিন আমাদের কপালে কি অপেক্ষা করে ছিল ! যাইহোক পথটা পার করার পর বুঝলাম এটা যাবার সময়ের সেই বোল্ডার জোন ছিল । যাবার সময় যে সুন্দরি গৌরীগঙ্গাকে দেখেছিলাম, এখন কর্দমাক্ত জলে সে ভয়ঙ্কর কদাকার রূপ ধারণ করেছে । যখনি আমরা নীচে গৌরীগঙ্গার কাছাকাছি নেমে আসছিলাম তখনি আমার মনে আর একটা ভয় দানা বাঁধতে শুরু করেছিল । হটাত হড়কা বান এসে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে নাতো ! মাঝেমধ্যেই পাশের পাহাড়ের খাঁজে বাঁচার জায়গা খুঁজে রাখছিলাম ! পথ যেন আর শেষই হতে চাইছিলনা , আলও কমে আসছিল , তবুও আমরা থামিনি , এগিয়ে গেছি নাহারদেবীর নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে । বিকাল ৫-৩০ এ আমি পৌঁছলাম , তখন প্রায় অন্ধকার , তারক অনেক আগেই পৌঁছেছিল তারপর শান্তনু , সবশেষে সব্যও চলে আসে একসময় । আমরা সবাই নাহারদেবীর ঝুপড়ি হোটেলে , টেন্ট খাটানোর মত পরিবেশ ছিলনা । আমরা তখন কাঁপছি , হাঁটার সময় এত শীত লাগেনি । ভিজে পোশাক পাল্টে আমরা সবাই একটু উষ্ণতার জন্য উদগ্রীব হয়ে পরলাম । ওদের কাঠের উনুনে নিজেদের সাঁকার সময় হদিশ পেলাম রামের । ৭০০/- য় পেয়ে গেলাম ৭৫০ ! আমরা শুধু মদনবাবুর প্যানিক অ্যাটাকের ভাগীদার হব তা বললে তো চলবে না !! আজ রাতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার জন্য এর অর্ধেক আমরা ব্যবহার করলাম , বাকিটা রাখা হল পরের দিনের জন্য । হোটেলটার একটু বিবরণ দেওয়া দরকার , বেত , বাঁশ , কাঠ , ঘাস আর অল্প টিন ও প্লাস্টিক দিয়ে বানানো । মাটি থেকে এক দেড় ফুট উপরে বিছানো বেতের উপরেই বসার বা শোবার ব্যবস্থা । দেয়ালটাও বেতের , যার ফাঁক দিয়ে হুহু করে হাওয়া ঢুকছে । উপর থেকে জলও পরছিল । তবুও আজ রাতের জন্য এই আস্তানাই দ্রব্যগুণে অসাধারণ হয়ে উঠেছিল ! গরম গরম খিচুড়ি জমিয়ে দিল রাতের খাওয়া । পরদিন সব ঝড় থেমে গিয়ে পৃথিবী আবার শান্ত হবে এই আশা নিয়ে শুয়ে পরলাম ।
 |
| বুরফু থেকে রিলকোটের পথে |
 |
| নাহারদেবীর হোটেলে শান্তনু আর আমি |
 |
| নাহারদেবীর হোটেলে সব্য আর তারক |
১৫/১০/১৪ - বাস্তবটা বড় কঠিন থুড়ি ভিজে ! বৃষ্টি থামার আর খচ্চরয়ালাদের বেরোবার কোন লক্ষণই নেই । কিন্তু আমাদের এগোতে হবে , আমরা বদ্ধপরিকর । দু পক্ষের একটা ঠাণ্ডা লড়াই চলছিল যেন । এর মধ্যে হোটেল মালিক জানাল লোডিং এর জন্য খচ্চর ভীতরে ঢোকানো যাবেনা , বৃষ্টির মধ্যে বাইরে মাল লোড করাও বেশ ঝামেলার । এমনিতেও যদিও অনেক কিছুই ভিজে গেছে , ওদের কাছে বড় প্লাস্টিক না থাকায় । সকাল থেকে অনেক পাঁপড় বেলার পরে ওরা নিমরাজী হল বেরতে । চারটেই খচ্চর , তারমধ্যে দুটো আবার চরম আলসে আর পাতা খোর ! আগের দিনের ভিজে পোশাক আর জুতো পরেই আমরা ১১-৩০ এ বেরলাম । জল কাদায় মাখামাখি হয়ে খুব সতর্ক ভাবে আমরা এগচ্ছিলাম । ১ টায় বুগডিয়ারের সেই হোটেলে আশ্রয় নিলাম লাঞ্চ করার জন্য । আলাপ হল এক অভিজ্ঞ্য ট্রেকারের সাথে যিনি নতুন একজনকে ৩০ কিলোর লোড চাপিয়ে দিয়ে সাথে এনেছেন । ওনারা কাল থেকে এখানে আছেন , অপেক্ষা করবেন বৃষ্টি থামার , গন্ত্যব্য নন্দাদেবী পূর্ব বেস ক্যাম্প , আমাদের যাতায়াতের পথে এঁরাই একমাত্র নন্দাদেবী যাত্রী। ইনি নাকি খবর পেয়েছেন আগামীকাল বৃষ্টি থেমে যাবে । আমাদের অপেক্ষা করার ঊপায় নেই , তাই ২ টোর সময় বৃষ্টির মধ্যেই আবার বেড়িয়ে পড়লাম বাবলধারের উদ্দেশ্যে । লক্ষ্য যতটা সম্ভব এগিয়ে থাকা । আই টি বি পি ক্যাম্পে ফোন করতে চেয়েও তেমন সাহায্য পেলাম না । ২ ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম রারগাড়ি সেতুতে । ৪-৪৫ এ পৌঁছে গেলাম বাবলধারের সবথেকে নীচের ঝুপড়িতে । এখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল । কালকের মতই ভিজে চপচপে অবস্থায় আমরা হোটেলে ঢুকলাম । এটার অবস্থা আরও সঙ্গীন । হাওয়া , জল বাঁচিয়ে বসা বা শোবার জায়গা পাওয়াই মুশকিল ! শুকনো পোশাক পরে আমরা শেষ দিনের সেলিব্রেশন শুরু করে দিলাম । রাত্রে সঙ্গী হল আমাদের খচ্চর আর মালিকের গরু । আমরা ওই ঠাণ্ডায় আর বৃষ্টিতেও বাইরে যাচ্ছিলাম কাজ সারতে । এরা হোটেলের মধ্যেই ত্যাগ করতে শুরু করলো । সে এক দুর্বিষহ গোয়ালঘরে রাত্রিবাস শুরু হল পরেরদিনের নতুন সূর্যের আশায় ।
 |
| বাবলধার হোটেলে |
 |
| বাবলধার হোটেলে |
১৬/১০/১৪ - সকালটা ঝকঝকে , বৃষ্টি থেমে গেছে । যাবার সময় যে পাহাড় গুল রুক্ষ দেখেছিলাম সেগুলো এখন পাতলা বরফের চাদর মুড়ি দিয়ে রোদ পোহাচ্ছে ! শেষ দিনের ট্রেক শুরু করলাম ৮-৩০ এ । একে একে বাকী হোটেল দুটো পার করে ১০ টায় ঊঠে গেলাম মৈণ সিং টপ এ । এবার কিছু রজতশুভ্র পাহাড় চূড়া দেখা গেলো । এখান থেকে নামাটাও কম কষ্টের নয় , হাঁটুযুগলের অগ্নিপরীক্ষা । প্রথমে খালকোট পরে মরতয় পার করে , একটা করে বাড়ী আছে জায়গা গুলোতে , ১২ টায় পৌঁছে গেলাম লিলামের সেই বাড়ীটায় । একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়েকে দেখে আমার আসন্ন্য গুড়গুড়ির কথা মনে পরে গেলো । গত এপ্রিলে ইয়ুমথাঙ গিয়ে আমি আর মেঘ আমাদের কল্পনার গুড়গুড়িকে বানিয়েছিলাম । বাচ্চাটার সাথে আমরা অনেকটা সময় কাটালাম । ১ টায় আমাদের শেষ ধাপের ট্রেক শুরু হল । বাকী পথটা তেমন কষ্টের নয় । কিন্তু নদী পার করে ছিলিমধারে ওঠার সময় যেন জান বেড়িয়ে যাচ্ছিল , এখানেও যে এত কষ্ট হতে পারে এটা আমাদের হিসেবেই ছিলনা ! যথারীতি তারক সবার আগে উঠে গেছিল , তারপর শান্তনু আর আমি উঠে যখন ভাবছি সব্য কত দূরে আছে বা কখন পৌঁছবে , আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে মিনিট ১৫ বাদেই সব্য পৌঁছে গেলো ! আমরা চারমূর্তি সফল ও সুস্থ ভাবে ট্রেক টা সম্পন্ন করলাম । একই গাড়িতে আমরা মুন্সিয়ারি ফিরলাম , মুখ্যমন্ত্রী শ্রী হরিশ রাওয়াত আসায় আমাদের বেশ ভোগান্তি হল , আগের হোটেল বা অন্য হোটেলে জায়গা পেলাম না । পাণ্ডে লজে ১২০০/- র একটাই মাত্র রুম খালি ছিল , অনিচ্ছা সত্বেও সেখানেই থাকতে হল । মুন্সিয়ারিতে কোথাও মুরগি পাওয়া গেলনা আজ ! অগত্যা মুরগি ছাড়াই আমাদের পার্টি শুরু হল । মোহনের হিসেব চুকান হল , বাড়তি ৫০০/- করে দিয়ে , হয়ত ও খুশী হতে পারলনা , কিন্তু আমরাও যৌথ ভাবে আর বেশী দেবার সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি । শুরুর ওই খচ্চর পর্ব আর শেসের এই পেমেন্ট পর্ব টা ছাড়া বাকি ট্রেকটা মোহনের সাথে আমাদের দারুন কেটেছে , খুব ভাল ছেলে , আমাদের ব্যবস্থাপনাও খুব সুন্দর করেছিল । সবচেয়ে বড় কথা আগে একবারও টাকা চায়নি , নিজেই ইনভেস্ট করেছিল , এর আগে বাসুকিতাল আর গোচালা ট্রেকে আমার এ অভিজ্ঞতা ছিলনা । বাড়ীতে কথা বলতে পারায় তারাও নিশ্চিন্ত হয়েছে । তথাগত জানা তখনও নিখোঁজ , ওর সঙ্গীরা কেও ফিরে এসেছে , কারও বা নিথর দেহ পাওয়া গেছে । মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে এইসব খবরে । ঠিক করি কঠিন ট্রেক আর নয় । শুধু আমার সান্দাকফুর সঙ্গী জয়দীপ বহুদিন আগে থেকেই বলে রেখেছিল ২০১৫'র গ্রীষ্মে রুপিন পাস যেতে হবে , সেটাই হয়ত যাব যদি মেঘ অনুমতি দেয় ! কিন্তু আমাদের চারমূর্তির আগামী বছরের কোনও পরিকল্পনা করা হলনা ! জানিনা আমরা আবার কবে একসাথে হাঁটবো ।
 |
| বাবলধার তৃতীয় |
 |
| বাবলধার তৃতীয় থেকে |
 |
| বাবলধার দ্বিতীয় |
 |
| বাবলধার প্রথম |
 |
| বাবলধার প্রথম থেকে |
 |
| মৈন সিং টপ |
 |
| মৈন সিং টপ থেকে নামার পথে |
 |
| মৈন সিং টপ থেকে নামার পথে |
 |
| মৈন সিং টপ থেকে নামার পথে |
 |
| মৈন সিং টপ থেকে নামার পথে |
 |
| খালকোট , মৈন সিং টপ থেকে নামার পথে |
 |
| লিলাম |
 |
| লিলাম |
 |
| লিলামের গুড়গুড়ি |
 |
| লিলামের গুড়গুড়ি |
 |
| লিলামের পথে যন্ত্র দানব |
 |
| লিলামের পথে যন্ত্র দানব |
 |
| ছিলিম ধারে ট্রেক শেষে আমরা সবাই |
১৭/১০/১৪ - সকালের বাস ধরারই প্ল্যান ছিল , কিন্তু কাঠগোদামের শেয়ার জীপ পেয়ে যাওয়ায় তাতেই চেপে বসলাম । ৪০০/- ভাড়া । ড্রাইভার জানাল সকাল ৬ টায় কাঠগোদাম থেকে মুন্সিয়ারি আসার জীপও পাওয়া যায় । আলমোড়ার আগে এক জায়গায় সস্তায় দারুন লাঞ্চ করলাম । ভাওয়ালি নেমে অন্য জীপে সন্ধ্যের আগেই নৈনিতাল পৌঁছে গেলাম । তল্লিতাল থেকে হোটেল খুঁজতে খুঁজতে হেঁটেই মল্লিতালে আমার চেনা গুহদার হোটেলে ২০০০/- র রুম ৬০০/- তে ঠিক করে ঢুকলাম । নৈনিতাল যেন উত্তর ভারতের দিঘা ! আমরাও পড়ে পাওয়া একদিনের সদুপযোগ করলাম ।
 |
| পঞ্চচুল্লি |
১৮/১০/১৪ - গুহদার সুরুচিতে প্রানভরে মাছ ভাত ডাল আলুপোস্ত খেয়েছি । লালকুঁয়া যাবার গাড়ি পাচ্ছিলাম না । হলদোয়ানি যাবার বাস বা জীপও অমিল । ছোট গাড়ি আছে সেটাও আমরা ঠিক করতে অনেকটা সময় নষ্ট করে ফেলি । ৪০০/- তে হলদোয়ানি , সব্য কাঠগোদামে নেমে গেল দিল্লীর ট্রেন ধরবে বলে । শেয়ার টেম্পো করে লালকুঁয়া পৌঁছানটাও বেশ ঝঞ্ঝাটের । এখন অনেক খাবারের দোকান , কিছুদিন আগেও নাকি তেমন কিছু ছিলনা । এমনকি টাটকা ভাজা ফ্রায়েড চিকেন ও পাওয়া গেল , হাফ কেজি নিয়ে নিলাম । ট্রেনে আমাদের সাথে একটা ট্রাভেল গ্রুপ এর ম্যানেজার , সাপোর্ট স্টাফরা থাকায় সিট অ্যাডজাস্টমেন্টে সুবিধা হল , তাদের কুমাউন ট্যুরের গল্প শুনতে শুনতে আমাদের পার্টি করতেও কোনও অসুবিধা হলনা । সৌগতরাও রুপকুন্ড করে এই ট্রেনেই ফিরবে জানতাম । দেখাও হয়ে গেল , ওর সাথে অশোক দা ,ফকির আরও অনেকে । আমাদের চাতরা হাইস্কুলের টিম । ওদের মনটা খারাপ , ওরা খারাপ আবহাওয়া আর অতিরিক্ত তুষারপাতের কারনে পাথরনাচুনি থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে । কিন্তু প্রতিকুল পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসতে পারাটাও তো কম আনন্দের নয় ।
২০/১০/১৪ - ১৯ তারিখটা পুর ট্রেনে কাটে অসংরক্ষিত যাত্রীদের সাথে লড়াই করে । স্লিপার ক্লাসে এই পথে সত্যিই যাওয়া যায়না । অখিলেশ এল , নিতিশ এল , ইউপি বিহার একি জায়গায় পড়ে রইল ! শেষদিকে ট্রেনটা লেট করায় হাওড়া ঢুকতে রাত করে দিল , তারকেরি অসুবিধা হবে কৃষ্ণনগর ফিরতে । মেঘ এসেছিল আমাকে নিতে । নিজের মানুষের কাছে ফেরার সে এক অদ্ভুত আনন্দ । একগাল কাঁচা পাকা দাঁড়ি নিয়ে ওর বুকে মাথা রেখে গুড়গুড়ির স্বপ্ন দেখতে দেখতে ফিরে এলাম নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে।
এক ঝলকে ট্রেক - প্রথম দিন - মুন্সিয়ারি ( ৭৫১৩ ফুট ) থেকে গাড়িতে ১৪ কিমি দুরের ছিলিমধারে । ট্রেক শুরু । ২ ঘণ্টায় লিলাম (৬০৬৯ ) , আরও ৪ ঘণ্টায় মৈন সিং টপ ( ৮৫০০) , শেষ ২ ঘণ্টায় বাবলধার ( ৮০০০ ) দ্বিতীয় , মোট ৯ ঘণ্টায় ১৪ কিমি । দ্বিতীয় দিন - ১ ঘণ্টায় রারগাড়ি সেতু , আরও ৩ ঘণ্টায় বুগডিয়ার ( ৮২০০ ) , শেষ ৩ ঘণ্টায় নাহারদেবী , মোট ৭ ঘণ্টায় ৮ কিমি । তৃতীয় দিন - ৩ ঘণ্টায় মাপাং , আরও ৩ ঘণ্টায় রিলকোট (১০১৬৮ ) , মোট ৬.৫ ঘণ্টায় ৭ কিমি । চতুর্থ দিন - ৩ ঘণ্টায় বুরফু (১০৯৯০) , আরও ৩ ঘণ্টায় গাঙ্ঘার , মোট ৭ ঘণ্টায় ১৫ কিমি । পঞ্চম দিন - ৪ ঘণ্টায় ৭ কিমি দুরের নন্দাদেবী পূর্ব বেস ক্যাম্প ( ১৩৬১২ ) । ষষ্ঠ দিন - ভোর বেলায় বেড়িয়ে ৪/৫ ঘণ্টায় যতদূর সম্ভব ঘুরে আসা । গাঙ্ঘার হয়ে ৪ ঘণ্টায় বুরফু ১৩ কিমি । সপ্তম দিন - বৃষ্টির মধ্যে ২.৫ ঘণ্টায় রিলকোট , আরও ৫.৫ ঘণ্টায় নাহারদেবী , মোট ৯ ঘণ্টায় ১৬ কিমি । অষ্টম দিন - বৃষ্টির মধ্যে ১.৫ ঘণ্টায় বুগডিয়ার, আরও ২ ঘণ্টায় রারগাড়ি সেতু , শেষ ২ ঘণ্টায় বাবলধার তৃতীয় । মোট ৪.৫ ঘণ্টায় ৭ কিমি । নবম দিন - ১.৫ ঘণ্টায় মৈন সিং টপ , আরও ২ ঘণ্টায় লিলাম , শেষ ২ ঘণ্টায় ছিলিমধার , মোট ৬.৫ ঘণ্টায় ১৫ কিমি । গাড়িতে মুন্সিয়ারি । দুরত্ব আনুমানিক , অক্টোবর ২০১৪'র হিসেবে হয়ত আরও বেশী । প্রায় ১১০ কিমি ট্রেক করতে হয় ।
কিভাবে যাবেন - ট্রেনে হাওড়া থেকে লখনউ হয়ে পিলভিট / টনকপুর সেখান থেকে বাস / জীপে পিথোরাগড় , থল হয়ে মুন্সিয়ারি । অথবা ট্রেনে হাওড়া থেকে কাঠগোদাম / হলদোয়ানি / লালকুঁঁয়া গিয়ে বাস / জীপে আলমোরা , শেরাঘাট , থল হয়ে মুন্সিয়ারি । তারপর ৯-১১ দিনের ট্রেক । ট্রেকের জন্য মুন্সিয়ারি ডি এম অফিস থেকে অনুমতি পত্র সংগ্রহ করবেন , কোন ফী লাগেনা ।
কোথায় থাকবেন - মুন্সিয়ারি তে আমি দুবার কে এম ভি এন'এই ছিলাম । এবার ছিলাম হোটেল আর পাণ্ডে লজে । আরও ছোট বড় অনেক হোটেল আছে । মঙ্গল সিং এর মার্তলিয়াতে থাকতে পারেন , ফোন - ৯৪১০১৮৪৬৯৬। ট্রেক পথে গাঙ্ঘার / পাছুঁ পর্যন্ত থাকার জায়গা আছে , কিন্তু বেস ক্যাম্পে টেন্ট লাগবেই । বুরফু পর্যন্ত খাবারও পেয়ে যাবেন , মে মাসে লোকজন থাকলে গাঙ্ঘার / পাছুঁতেও খাবার পেয়ে যাবেন । অন্যথায় গাঙ্ঘার আর বেস ক্যাম্পের জন্য নিজেদের খাবারের ব্যাবস্থা রাখতে হবে । গাঙ্ঘার থেকে ভোর রাতে বেরিয়েও বেস ক্যাম্পে গিয়ে সূর্যোদয় দেখে ফিরে আসা সম্ভব । সেক্ষেত্রে টেন্ট ছাড়াই , মাত্র একদিনের খাবার সাথে নিয়েই খুব কম খরচে ট্রেকটা করা সম্ভব ।
গাইড / পোর্টার - আমাদের গাইড মোহন সিং ধানুর নং - ৯৪৫৮৩৫৫৮১২ , মুন্সিয়ারির কসমস এজেন্সির দীপক পানওয়ারের নং - ৭৫০০০৩০৩৯৫ / ৯৪১১১৩০৩৯৪ । গাইডের রেট ৮০০-১০০০/- প্রতিদিন । এই পথে পোর্টারের থেকে খচ্চরের ব্যবহার বেশী । ভাড়া ৫০০-৮০০/- প্রতিদিন । এরাই পুর দায়িত্ব নিয়ে ট্রেক করালে ৪-৬ জনের দলের জন্য ১০০০-১২০০/- দিনপ্রতি ও জনপ্রতি রেট চাইবে ।