রূপের টানে রুপিনে ...
ভূমিকা :- আমার প্রতিটা ট্রেকের একটা বড়সড় ভূমিকা থাকে , এবারেও ভূমিকা দিয়েই শুরু করলাম ! আমার সান্দাকফু ট্রেকের সঙ্গী জয়দীপ ২০১২ তেই জোংরি ট্রেক করে বলে রেখেছিল ও অনেকদিন ট্রেক করতে পারবেনা , ২০১৫ তে রুপিন পাস যাবে , আমি যেন ওই সময় টা খালি রাখি এই ট্রেকের জন্য। তা আমিও কথা রেখেছি , জানুয়ারী মাসের পরিকল্পনা পর্ব থেকে শেষ পর্যন্ত আমি ওর পাশেই ছিলাম সংসার চক্রে প্রচন্ড ভাবে জড়িয়ে থাকা সত্বেও। তারিখ সেই জানুয়ারী মাসেই ঠিক হয়ে গেছিল ২৭ মে থেকে ৯ জুন , আগে-পরে দুবারই আমার রবিবারের ছুটি চটকে দিয়ে ! শুভ্রজ্যোতি , ভালো ট্রেকে যাবার যার অদম্য ইচ্ছা কিন্তু অফিস থেকে ছুটি আদায়ে একেবারেই পটু নয় , একসাথে ট্রেক না করলেও আমরা কয়েকটা ছোট টুর করেছি , গতবছরে সিঙ্গালিলা পাস করে এবারে আমাদের সাথে রুপিনে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করে আর যথারীতি যাবার ৭ দিন আগে পর্যন্তও দোদুল্যমান অবস্থায় ছিল । জয়দীপ আর শুভ আবার বাল্যবন্ধু , হাওড়ায় থাকে , আমার সাথে আলাপ অর্কুট আর ফেবুর মাধ্যমে। কিন্তু আড়াই জনে তো আর ট্রেকে যাওয়া যায়না ! জয়দীপ তার আরো কয়েকজন ট্রেকার বন্ধু কে বলে রেখেছিল , তারা প্রাথমিক ভাবে মত দিয়েও পরে বালখিল্য অযুহাত দেখিয়ে অন্য রুটে চলে গেল ! এরপর আমি আর জয়দীপ আরো কয়েকজনের সাথে কথা শুরু করেছিলাম কিন্তু "সরণ শুন্য" বা সেই আড়াই ! ইতিমধ্যে নেপালে প্রবল ভূমিকম্পের জেরে একের পর এক ট্রেক বাতিল আর আমিও পারিবারিক দায়বদ্ধতায় ব্যস্ত হয়ে পরি কারণ নন্দাদেবী ট্রেকের সময় সবার অলক্ষে বেড়ে ওঠা গুড়গুড়ি তখন আমার কোলে ! ট্রেকটা বাতিল হবারই যোগার কিন্তু আমরা কেওই সে কথা মুখে আনছিলাম না। আমিও ভাবগতিক দেখে নীলাবজের সাহায্যে অমরনাথের অনুমতি বের করে নিলাম ১৪ জুলাই এ , ওদের সাথেই যাবার জন্য । এরমধ্যে সৌগতদের সাথে বাগিনি গ্লেসিয়ার রুটেও আমার যাবার কথা শুরু হয় , আমি বা সৌগত না গেলেও ওদের টীম মিড মে তে ট্রেকটা করে আসে। এমথবস্থায় জয়্দীপের সাথে কথা শুরু হয় কমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর । ১০ মে , নিলাব্জর সার পাস টিমকে সিঅফ করতে গিয়ে হাওড়া স্টেশন এ আমাদের চারজনের দেখা হয়ে যায় , আলাপ হয় বালির কেপির সাথে, বেশ কিছু ট্রেকের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন । ৪ জনের একটা রূপরেখা এতদিনে তৈরী হয়। জয়দীপ ট্রেক এর বাকি কাজ গুলোও সব একাই করেছে , আমাদের ব্লগ লিংক পাঠানো থেকে টিকিট কাটা , গাইডের সাথে কথা বলা , যুবকল্যাণ দপ্তরে ট্রেক এর খবর লিখিত ভাবে জমা দেওয়া সবকিছু। রুপিন পাস ট্রেক রুটের ঝাকার নর সিং এর ছেলে জর্জ আমাদের নিয়ে যাবে, সবকিছু নিয়ে ১০৫০০/- নেবে জনপ্রতি।
২৭/০৫/১৫ - রাত সাড়ে আট টায় দুন এক্ষ্প্রেস। ২ টোয় অফিস থেকে বেরোবার প্লান করে ৪.৩০ এ বেরোতে পারলাম। মেঘ এবার ছাড়তে আসতে পারলনা। গুড়গুড়িকে নিয়ে ওর কটা দিন যে চরম দুশ্চিন্তায় কাটবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেড় মাসের বাচ্চাকে ছেড়ে ট্রেকে যাওয়াটাও যে চরম স্বার্থপরতা সেটাও বুঝি। শেষ মুহুর্তের টেনসন নিয়েই হাওড়ায় পৌঁছলাম। সৌগত এসেছিল ছাড়তে , ওর সাথে এখনো কোনো ট্রেক করা হয়নি , ও আমার ভবিষ্যতের ট্রেক সঙ্গী ! শুভর বাব-মা , জয়্দিপের বউ-শ্বসুর এসেছিলেন। আমাদের মধ্যে কেপিই শুধু একলা নিতাই ! বরাত জোরে আমাদের সাথেই তত্কাল টিকিট পেয়ে গেছে। আমাদের ৪ জনের যাত্রা ভালই হবে। পার্থদা ফোন করে পই পই করে বারণ করে দিয়েছিলেন কোনরকম রিস্ক যেন না নেই , সে ভাবনা এবার আমার মনেও ছিল। ইছাপুর অর্ডনান্স ফ্যাক্টরির একটা টিম এদিনই দেরাদুন পৌঁছায় স্বর্গারহিনী ২ পিক এর উদ্দেশ্যে , তাদের লিডার প্রদ্যুত্দার সাথে যোগাযোগ রেখেছিলাম যাতে আমাদের ধউলা যাবার গাড়ির কোনো খোজ দিতে পারে। ব্যান্ডেলে দেখা করে গেল নিলাব্জ আর সুখেন্দু অনেক খাবার দাবার নিয়ে। সকলের শুভেচ্ছা নিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম দেহরাদুনের উদ্দেশ্যে।
২৮/০৫/১৫ - দুন এক্সপ্রেসের অবস্থা লোকাল ট্রেনের মতই , অসংখ্য স্টপেজ। জয়দীপ সমায়্সারনির কপি এনেছিল , শুভ সেটার সাথে সময় মিলিয়ে নিচ্ছিল । সঠিক সময়েই আমরা বড় স্টেশন গুলোতে পৌঁছে যাচ্ছিলাম। আমাদের সহযাত্রী ছিল হাওড়া র একটি ক্লাবের নন্দাঘুন্টি পর্বতারোহন টিমের লিডার কুন্তল। আমার পরিচিত সুব্রত সহ বাকিরা আগেই রওনা দিয়েছিল। কুন্তলের কাছে তাদের ক্লাবের নানা এক্সপিডিসন এর গল্প শোনা গেল। বিশেষ করে বাসুকী তাল ক্যাম্পে বরফ চাপা পরে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনা মনে দাগ কেটে গেল। বাকি দিনটা চরম অলসতায় কেটে গেল।
২৯/০৫/১৫ - দেড় ঘন্টা দেরিতে হরিদ্বার থেকে ছাড়লেও আমরা ৮ টার আগেই দেহরাদূন পৌঁছে গেলাম। সকাল ৬ টায় সাঁকরির বাস ছেড়ে গেছে। আমাদের ওই পথে নায়তবার পর্যন্ত গিয়ে ধৌলার পথে বেঁকে যেতে হবে। স্টেশন থেকে বেরিয়েই বাস স্ট্যান্ড , পাশাপাশি ট্যাক্সি স্ট্যান্ড। পরের বাস ৯ টা তে মোরি পর্যন্ত যাবে। আমরা ৪৫১০/- এ কাউন্টার থেকে ট্যাক্সি বুক করলাম ধৌলা পর্যন্ত। অ্যাম্বাসেডর গাড়ি , আরামেই এগোতে থাকলাম। আমরা এগোব মুসৌরী , কেম্পটি , নয়্গাঁও , পুরোলা , মোরি , নায়তবার হয়ে ধৌলা , প্রায় ২০০ কিমি পথ । কেম্পটি তে প্রাতঃরাশ সারলাম। প্রথমে যমুনাকে পেলাম। তারপর টনস নদী , যে যমুনাতেই এসে মিশেছে। রাস্তা খুব সুন্দর। আবহাওয়া ঘোলাটে , রোদ থাকলেও নীলাকাশ নেই। মাঝপথে একজায়গায় ব্রেড অমলেট দিয়ে লাঞ্চ সারা হলো। নায়তবার এ গিয়ে পরে রাস্তা খুব খারাপ হবে বলে ড্রাইভার আমাদের শেয়ার জীপে তুলে দিল। এই নায়তবারের কাছেই রুপিন আর সুপিন নদী টনস এ এসে মিশেছে। জীপের পিছনে মালের সাথে কোনরকমে বসে আধ ঘন্টায় ধৌলা পৌঁছে গেলাম। ১ কিমি আগেই ইন্ডিয়া হাইকস ( ইহা ) এর ক্যাম্প দেখলাম। আমরা রুপিন নদী পার হয়ে আমাদের জন্য বরাদ্দ রুপিন পাস হোটেলে উঠলাম। দেখা হলো আমাদের গাইডের সাথে। প্রথম দর্শনেই সাদাসিধে যুবক জর্জ নেগী। কিছু পরে তার দাদা শামসের ও হাজির হল , তার একটা টীম নাকি সেবা তে আছে। সে আসলে এসেছিল আমাদের সাথে নতুন করে দরদাম করতে। আমাদেরকে প্রথমদিন বেশী হাঁটিয়ে দুটো দলকে একসাথে নিয়ে যাবার প্লানে ছিল। রুপিন নদীর ধারে ৫১০০ ফিট উচ্চতায় ছিমছাম জায়গা এই ধৌলা। আমরা বিকালে নদীখাতে নেমে কিছু ছবিও তুললাম। জীপ নদীর ওপারে ধৌলা হয়ে এগিয়ে যায় আর একটু বড় গ্রাম পাউদির দিকে। সন্ধ্যের পরে হালকা ঠান্ডা , বেশ রোমান্টিক জায়গা।
 |
| ধৌলার পথে |
 |
| ধৌলার পথে টনস নদী |
 |
| রুপিন নদীর ধারে ধৌলা |
পরিকল্পিত ট্রেক সূচী ( শ্রবন কুমারের ব্লগ অনুযায়ী ) :-
২৯/০৫/১৫ - ধৌলা ৫১০০'
৩০/০৫/১৫ - সেবা ৬১৫০' , ১১ কিমি , ৫ ঘন্টা
৩১/০৫/১৫ - ঝাকা ৮৭০০' , ১৭ কিমি , ৮.৫ ঘন্টা
০১/০৬/১৫ - সরুবাস থচ ১০২৫০' , ৭.৫ কিমি , ৪.৫ ঘন্টা
০২/০৬/১৫ - ধনদেরাস থচ ( লোয়ার ওয়াটার ফল ) ১১৬৮০' , ৪ কিমি , ২.৫ ঘন্টা
০৩/০৬/১৫ - আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প ১৩৩০০' , ৪ কিমি , ৩ ঘন্টা
০৪/০৬/১৫ - অতিরিক্ত দিন
০৫/০৬/১৫ - রন্টি গড ১৩১২০' , ভায়া রুপিন পাস ১৫২৫০' , ১১ কিমি , ৭.৫ ঘন্টা
০৬/০৬/১৫ - সাংলা ৮৮০০' , ১২ কিমি , ৭ ঘন্টা
৩০/০৫/১৫ - সকালে ঘুম থেকে উঠে নদীর ধারেই যেতে হল , যদিও টয়লেট একটা ছিল। স্যাক গুছিয়ে ওদের কাছে দেবার পরে বড় ভাই শামসের আসল নাটকটা শুরু করল। জয়দীপ কে আমাদের স্যাক ওরা নেবে এই হিসেবেই ১০৫০০/- বলেছিল , যেটা পুরো অস্বীকার করে গেল , এবং নতুন করে আবার দরদাম করে আলাদা পোর্টার বাবদ একটা রফা করে ফেলল কেপি আমাদের মতামত নিয়েই। প্রতিটা ট্রেকের শুরুতেই এমন একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরী হয়, বুদ্ধিমানের কাজ হল ঠান্ডা মাথায় সেটা সল্টে ফেলে ট্রেক শুরু করে দেওয়া। কিছু আর্থিক ক্ষতি মেনে নিয়েই। আমরাও সেটাই করলাম। প্রাতঃরাশে রুটির সাথে ফার্ন এর শুরের তরকারী , যা কোনমতেই আমার রুচলনা , শুকনো ঢেলা গুড় দিয়ে দুটো রুটি কোনরকমে খেলাম। এই ফার্ণের শুরের তরকারী কাটতে দেখেছিলাম তুঙ্গনাথের পথে আরাম চটিতে , এতদিন পরে পাতে পেলাম ! ওরা তিনজন ছিল , আর একজন পার্ট টাইম পোর্টার নিয়ে স্যাক গুলো নিজেরাই নিয়ে নিল। বাকি সব মাল নেবে ঝাকা থেকে। হোটেলের থাকা খাওয়ার পেমেন্ট ওরাই করে দিল। ৮ টায় ট্রেক শুরু হল। সহজ পথ। গাড়ি চলবার মতই চওড়া রাস্তা। রুপিন নদীর পাশ দিয়েই সুন্দর পথ। আমাদের আগেই ইহার দল হাঁটা শুরু করেছিল , ওদের দলে সর্বসাকুল্যে তিনটি মেয়ে ছিল , যারমধ্যে দুজন বেশ সুন্দরী যুবতী , আর একজনকে দেখে মনে হল মধ্যবয়স্কা অভিজ্ঞ ট্রেকার। মাঝামাঝি এসে একটা চড়াই উঠতে হয় , সেখানেই আবার দুদলের দেখা হল। চড়াই টা ওঠার সময় দেখলাম একজন সুন্দরী তার ৫০০ মিলির বিসলেরির বোতল উল্টে বসে আছে , ক্লান্ত অবসন্ন চেহারা , ওদের গাইড জ্ঞান দিচ্ছে আগে বলা সত্বেও বেশী জল কেন নেয়নি ! জানিনা এ শেষ পর্যন্ত কি করে পৌঁছাবে। কারো পাল্লায় পরে মনে হয় সামার ভ্যাকেসনে চলে এসেছে ! এরপরে ইহার দলের সাথে মিশেই বাকি পথটা গেলাম। ওদের ২০ জনের বড় দল , ফলে রাস্তায় কারো না কারো সাথে দেখা হয়েই যাচ্ছিল। সেবাতে পৌঁছানোর কিছু আগে আমরা প্রবল ঘোড়া - জাম এর কবলে পরলাম , আসলে মুখোমুখি হওয়া দুই ঘোড়া ওয়ালার বিবাদে ঘোড়াদের এই বাঁদরামি ! সেবা গ্রামে ঢোকার আগেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল, আমার নতুন বানানো প্লাস্টিক রেনকোট দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে নিলাম। সেবা গ্রামে ঢুকে ইহার ক্যাম্প পার করেও আমরা হেঁটেই যাচ্ছিলাম , সন্দেহ দেখা দিল যে ভুলিয়ে ঝাকাতেই নিয়ে যাবেনাত। ১১ কিমি পথ ৪ ঘন্টায় হেঁটে দুপুর ১২ টায় আজকের ট্রেক শেষ হল। একদম শেষ মাথায় সেবা মন্দিরের ( যার কথা লেখায় পড়েছিলাম ) পাশের হোম স্টে তে আমরা উঠলাম। ভালই ব্যবস্থা। খাবার সেই শুধু ডাল আর ভাত ! বিকালে শামসের এসে বিদায় নিল, ও ঝাকায় চলে যাচ্ছে , পরদিন আমাদের সাথে দেখা হবে বলে গেল।মন্দিরের পাশে বাচ্চারা ক্রিকেট খেলছিল। এরা খুব ক্রিকেট প্রেমী। জিতে পাওয়া শীল্ড গুলো সব মন্দিরগাত্রে টাঙানো। ঝাকায় নাকি কদিন বাদে টুরনামেন্ট আছে , তাই পোর্টার পাওয়া যাচ্ছেনা ! বাচ্চাদের ডেকে আরো অবাক হলাম , ওদের নাম গুলো সব ক্রিকেটারদের নামে ! আমরাও পরে নীচে নেমে একটু ঘুরলাম , খেললাম। আবহাওয়া মেঘলা সাথে হালকা বৃষ্টি। এখান থেকেও ফোনে যোগাযোগ করা গেল। শুভর বি এস এন এল টাই শুধু কাজ করছিল। উত্তরাখন্ড আর হিমাচলের সীমানায় অবস্থিত ৬১৫০ ফিট উচ্চতার সেবায় ঠান্ডা আরেকটু বেশী , কিন্তু সহনীয়। রাতে ডাল রুটি দিয়েই আহার সারতে হল। এরা ডিম নেবেনা , তাই মেনু যে নিয়মিত এমনটাই হবে তা বোঝা গেল।
 |
| ধৌলাতে ট্রেক শুরুর সময় , বাঁদিক থেকে জয়দীপ কেপি শুভ আমি |
 |
| রুপিন নদী সেবার পথে |
 |
| সেবা মন্দির |
( অনেকদিন পরে আবার লেখাটা শুরু করলাম। আসলে লেখা আমার পেশাও নয় , নেশাও নয়। শুধুই স্মৃতি গুলোকে যত্ন করে সাজিয়ে রাখার একটা প্রয়াস মাত্র। এটাও অনুভব করলাম যখন খুশী ব্লগ টা খুলে দু চার লাইন লিখে ফেলা যায়না। সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করে ট্রেক রুটের সেই দিনের সেই জায়গায় পৌঁছে যেতে হয়। আর ব্যস্ত বাস্তব আমাকে সে সুযোগটাই দিতে চায়না। )
৩১/০৫/১৫ - সকালে টয়লেট এই সবার জায়গা হয়ে গেল ! পাহাড়ে এলে তাড়াতাড়ি ঘুমটাও ভেঙ্গে যায়। হালকা খেয়ে আমরা ৭ টাতেই বেড়িয়ে পড়লাম নিজেরাই। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই অপেক্ষা করতে হল গাইডের। রুপিন নদীর পাশ দিয়েই ওঠা নামা করতে করতে একটা ব্রিজ পার হয়ে সামান্য চড়াই ভেঙ্গে পৌঁছে গেলাম ৩.৫ কিমি দূরের হিমাচলের গোসাঙ্গুর গাড়ির রাস্তায় এক ঘন্টায় । একটু চা বিরতি দেওয়া হল। একটা বাস গেল , যেটা উল্টোদিকের দোদরা কাওয়ার থেকে ছেড়ে গোসাঙ্গু হয়ে ১০০ কিমি দুরের রহরু যাবে ৫ ঘন্টায়। রহরু থেকে শিমলা আরো ৪ ঘন্টার পথ। আবার গোসাঙ্গু থেকে আর একটা গাড়ির রাস্তা আমাদের ট্রেক রুটের ৯ কিমি দুরের জিসকুন গেছে। তাই ট্রেকাররা শিমলা থেকে গাড়িতে জিসকুন পৌঁছে , সামান্য ট্রেক করে ঝাকা থেকেও মূল ট্রেকটা শুরু করতে পারে। যাইহোক আমরা গাড়ির রাস্তা ধরেই হাঁটা শুরু করলাম। একটা শেয়ার জীপ্ যেতেও দেখলাম। রুপিন নদী তখন অনেক নিচে সরু ফিতের মত বয়ে চলেছে , মাঝেমধ্যে নদীর উপরে ঝুলতে থাকা সেতু। মনোরম দৃশ্য। রাস্তাটা হালকা চড়াই। প্রায় শেষদিকে গাড়ির রাস্তা শেষ না করেই আমরা একটা চড়াই ভেঙ্গে জিসকুন গ্রামের ভিতরে ঢুকে পরলাম ৩ ঘন্টায়। পাহাড়ে তখনো রমরমিয়ে ম্যাগি চলছে। আমরাও খিদের মুখে একটা ম্যাগি ব্রেক নিয়ে নিলাম। রাস্তার খাবারের দাম আমাদের দিতে হয়নি। কেপির জুতোর সোল খুলতে শুরু করেছিল , সেটা সামলানোর জন্যে এক ডজন ফেভি কুইক ই কিনে ফেলল ! জিসকুন গ্রামটা বেশ বড়ই , অনেকক্ষন গ্রামের মধ্যে দিয়েই হাঁটলাম, ইহার ক্যাম্প পার করে গ্রামের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর পর সামনের পাহাড়ের গায়ে ঝুলন্ত ঝাকাকে দেখা গেল। বোঝাই গেল ঝাকার চড়াই টা আমাদের একটু ঝাঁকিয়ে দেবে ! সবুজে মাখা পথ , রুপিনের শব্দ শুনতে শুনতে আমরা এগোছিলাম। একটা নালা পার হবার পরে পাথর কেটে বানানো একটা রাস্তা পড়ল মাঝে , সরু পাশে খাদ , রোমাঞ্চকর। এর পরেই শুরু হল আসল চড়াই। তবে সুন্দর পথ , চলতে অসুবিধা হচ্ছিলনা। ইহার দলের সাথে আজ আর দেখা হলনা। গতকাল তৃষ্ণার্তকে জল না দেবার জন্য বারবার মনটা খচখচ করছিল। ফাঁকা মন নিয়েই ঝাকায় পৌঁছে গেলাম দুপুর ২ টোয় । গাইডের বাড়িতেই উঠলাম। আজও শেষদিকে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছিল। শেষ ৪.৫ কিমি রাস্তা পেরোলাম ২ ঘন্টায়। আজ মোট ৭ ঘন্টায় ১৭ কিমি রাস্তা ট্রেক করে ৭৮০০ ফিট উচ্চতায় উঠে এসেছি । ঠান্ডাটা ভালই অনুভূত হচ্ছিল। আলাপ হলো গাইডদের বাবা নর সিং এর সাথে , বয়স্ক পেটানো চেহাড়া। আমরা ওদের বললাম ডাল ভাত না বানিয়ে একেবারে খিচুড়ি বানিয়ে দিতে , কিন্তু তার সাথে চাখনার ব্যবস্থা করার কথা ওদের কিছুতেই বোঝানো গেলনা। মেনু যত্সামান্য হলেও , সেটা খাওয়া যাচ্ছিল তাই রক্ষে। বিকালের দিকে বৃষ্টি কমলে রামধনুর দেখা পাওয়া গেল। কিন্তু সামশেরের দেখা পাওয়া গেলনা , ওর তো অন্য টিম ছিল , তাদের নিয়েই এগিয়ে গেছে। ওর মিথ্যাচার টা স্পষ্ট হয়ে গেল। ও ধৌলা গেছিল শুধু দরদাম করতে আর দুটো টিমকে এক করাতে। সন্ধ্যাবেলায় শুরু করলো বাবা নর সিং নিজে। পুরো টাকা দিয়ে দিতে বলল। অনেক পাপর বেলার পরে ঠিক হল ওকে এখন ২২০০০/- দিতে হবে , বাকিটা সাংলায় গিয়ে শামসের কে দেওয়া হবে। বেচারা ভালোমানুষ জর্জ এসবের মধ্যে কখনো আসেনি। পরে কথায় কথায় জানলাম এই নর সিং ই ঝাকার বিখ্যাত মামাজী , এবং বুঝলাম ইনিই আমাদের পড়ে আসা সুমিত চক্রবর্তীর ভ্রমন কাহিনীর কুখ্যাত মামাজী ! আমরা আসার আগে এই ব্যাপারটা মেলাইনি। অগত্যা আগামী আরো অনেক বিপদের আশঙ্কায় বাঘের ডেরাতেই থাকতে বাধ্য হলাম।
 |
| গোসাঙ্গুর পথে |
 |
| গোসাঙ্গুর বাস রাস্তা |
 |
| জিসকুনের পথে |
 |
| জিসকুনে ম্যাগি ব্রেক |
 |
| জিসকুনের শেষ প্রান্তে |
 |
| ঝাকার পথে |
 |
| দুরে দেখা যায় ঝাকা |
০১/০৬/১৫ - সকালে একটা করে আলু পরোটা। চাইবার পরে আরো অর্ধেক। আমার অর্ধেক কেপি কে দিতে বলায় কেপিকে তার অবাক প্রশ্ন " আপ দো খায়েঙ্গে ? " !! ৭-৩০ টায় ট্রেক শুরু হল। জর্জ রা পরে আসবে, আমাদের সাথে একটা পোর্টার দিয়ে দিল। সে কিছুটা ওঠার পরেই একটা মাঠের ধারে ( যেখানে ক্রিকেট খেলা হয় ) আমাদের দাঁড় করিয়ে বাড়ি থেকে মাল আনতে গেল। দেড় ঘন্টা হাঁটার পরে প্রথম স্নো ব্রিজ এর দেখা পেলাম। এর আগে কখনো ঠিকঠাক স্নো ব্রিজ পার হইনি। এখন অবশ্য ভয়ের কিছু ছিলনা কারণ বরফের স্তর বেশ পুরু , যখন বরফের আস্তরণ গলে পাতলা হয়ে যাবে তখন ব্যাপারটা ভয়ের। আজও পথের দুধারে সবুজের সমারোহ। আড়াই ঘন্টা পরে আমরা দ্বিতীয় স্নো ব্রিজ এ পৌঁছলাম , এটা আরো বড়। ৩.৫ ঘন্টা হাঁটার পরে আমরা পৌঁছলাম ইহার ক্যাম্প কোদাকনালে। নদীর ধারেই জঙ্গলের মধ্যে ক্যাম্প , একদিকে বরফের হাতছানি , সবমিলিয়ে খুব সুন্দর জায়গা । আমরা কিছুক্ষণ বসলাম , হালকা বৃষ্টি হয়েছিল। ইহার দলের সাথে আজও দেখা হবেনা। ক্যাম্প থেকে নেমেই আরো একটা স্নো ব্রিজ পার করে কিছুটা এগোতেই আমরা ঢুকে গেলাম গুরাস কান্ডির মধ্যে। পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট অসংখ্য রডোডেনড্রন গাছ। বেগুনী রঙের ফুলেরই আধিক্য। তার জন্যই নাম গুরাস কান্ডি। এই সময় বৃষ্টি বেশ জোরেই শুরু হল , আমরা একটা হাট এ আশ্রয় নিলাম , তখন দুপুর ১২ টা । জর্জদের আসার নাম নেই , এদিকে খিদেয় পেট জ্বলছে। আশেপাশে প্রচুর বরফ , বেশ ঠান্ডাও লাগছিল। ৪ জন পোর্টার হাজির হয়ে গেছিল কিন্তু তাদের কাছে আমাদের খাবার নেই। ওরা হাটের মধ্যে আগুন জ্বালালো। নতুন কেনা এলুমিনিয়ামের বোতল টাও জল শুদ্ধু চাপিয়ে দিলাম আগুনে , গরম জল খাওয়া গেল। পোর্টার রাই তাদের রুটি-গুড় আমাদেরকে খেতে দিল। আমরা স্বস্তি পেলাম ভারী কিছু খেয়ে। সবাই আসার পর ঠিক করলো আজ এখানেই আমাদের ক্যাম্প হবে। আজকের গন্ত্যব্য সরুবাস থচ আর সামান্য দুরেই। আজকের ৭ কিমি দুরত্ব আমরা পার হলাম ৪.৫ ঘন্টায়। এবারের ট্রেকটা বেশ আরামের। সকাল সকাল হেঁটে দুপুর নাগাদ ট্রেক শেষ , তারপর খাও আর ঘুমাও ! টেন্টে ঢোকার পরে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। বিকালের পরে আবার বেশ পরিষ্কার আকাশ। আমরা সবাই রিভার বেডের ধারে গেলাম। রুপিন জলপ্রপাতের উপরের টা এখান থেকেই প্রথম দেখা গেল। আমি একটু এগিয়ে রিভার বেড পার করে সরুবাস থচ পর্যন্ত গেলাম , উচ্চতা ১০২৫০ ফিট । সেখানে সিমলার ৩+১ এর একটা দল দুটো ছোট টেন্ট খাটিয়ে ছিল। টেন্টের মধ্যে নানা আড্ডা নানা বিদঘুটে আইডিয়া ঘুড়ে বেড়াতে লাগলো। সেসব নিয়েও একটা গল্প লিখে ফেলা যায় ! ইহার সাথে দেখা না হওয়ার খারাপ লাগাটা সবার মধ্যেই ছিল ! শুভ কে আজ তৃতীয়দিন বোঝানো হল এয়ারপোর্ট এ ঢুকে ঠিক কি কি করতে হবে। ও আগেই দিল্লী হয়ে ফ্লাইটে ফিরবে। শুভর আরো একটা প্রবলেম , পটি কোথায় করবে ! জয়্দীপের মাথা দিয়েই বেশী আইডিয়া বেরচ্ছিল আর নীচ দিয়ে বিষাক্ত হাওয়া ! আমি ঝাকা থেকে একটা প্লাস্টিকের ঘীএর বোতল এনেছিলাম , কিন্তু ইমার্জেন্সি তেও কেপি কিছুতেই সেটা ব্যবহার করতে দিলনা , এই দুর্যোগের মধ্যে টেন্টের বাইরে যাওয়া কি চাড্ডিখানি কথা !
 |
| প্রথম স্নো ব্রিজ |
 |
| দ্বিতীয় স্নো ব্রিজ |
 |
| কোদাকনাল , ইহার ক্যাম্প |
 |
| বুরাস কান্ডির হাট |
 |
| U আকৃতির রুপিন উপত্যকা |
 |
| ধউলাধার পর্বতশ্রেণী |
 |
| বুরাস কান্ডি আর সরুবাস থচের মধ্যে |
০২/০৬/১৫ - ৭.৫ টায় ট্রেক শুরু হল। রিভার বেড এ গেলেই u আকৃতির রুপিন ভ্যালি দৃশ্যমান হয়।সরুবাস থচ এ উঠলে রুপিন জলপ্রপাত আরো বেশী দৃশ্যমান হয়। এই পথে যত এগিয়েছি স্নো ফিল্ড , স্নো ব্রিজ আর গ্লেসিয়ার এর বরফ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সবুজের আভা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। এমনিতে সহজ পথ হলেও শেষদিকে একটা চড়াই ছিল আর বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেছিল , কখনো সেটা বরফ হয়েই নিচে পড়ছিল। একসময় আমরা পুরো বরফের রাজ্যে ঢুকে পড়লাম , মাঝে মধ্যে শুধু কালো পাথুরে এলাকা। ৪.৫ কিমি পথ ৩.৫ ঘন্টায় ট্রেক করে অবশেষে আমরা ১১ টাতেই পৌঁছে গেলাম ১১৬৮০ ফিট উচ্চতার ধনদেরাস থচ এ , যাকে লোয়ার ওয়াটার ফল ক্যাম্প ও বলা হয়। ইহার ক্যাম্প পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে একটা পাথুরে জায়গায় আমাদের টেন্ট খাটানো হল বৃষ্টির মধ্যেই , সাথে তুষারপাত ও চলছে। কোনরকমে আমরা টেন্টের মধ্যে ঢুকে গেলাম। পোর্টার রা বেশ উঁচুতে পাহাড়ের ঢালে একটা গুহায় আশ্রয় নিয়েছে। সেখানেই দুপুরের রান্না সেরে আমাদের নীচে এসে খাইয়ে গেছে। এই দুর্যোগের মধ্যে বেশ পরিশ্রমের কাজ। তুষারপাতে কালো এলাকাও সাদা হয়ে গেল। যথারীতি বিকালের দিকে আবহাওয়া শান্ত হলেও সম্পূর্ণ পরিস্কার হলনা। যদিও আমরা আগেই জেনে এসেছিলাম এই কদিন এই রুটে সম্পূর্ণ পরিস্কার আবহাওয়া পাওয়া যাবেনা , রোদ - মেঘ - হালকা বৃষ্টিপাত - তুষারপাত সবই থাকবে , কিন্তু এবার দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকলো আগামী দুদিনের জন্য। কারণ এই রুটে আগামী দুদিনের ট্রেক টাই হলো সবথেকে কঠিন আর বিপদ্দজনক। দূরে ইহার ক্যাম্পে হইচই দেখে আমরা জুম্ করে দেখলাম সুন্দরীরা এসেছে , তাদের ফটো সেশন চলছে ! শিমলার দলটাও এখানেই আছে। এখান থেকে রুপিন জলপ্রপাত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে , যদিও তিনটি ধাপের নীচের টা পাথরের আড়ালে। আমি আর জয়দীপ পাশের গ্লেসিয়ার এ একটু পা-পাকিয়ে নিলাম , যার উপরেও একটা বড় ঝরনা ছিল। আমরা দুজনে একটু উপরে উঠে আসায় রুপিন জলপ্রপাতের তিনটি ধাপই দেখতে পেলাম। জয়্দীপের প্রায় সমান হয়ে যাওয়া উডল্যান্ডসের সোল দেখে জর্জ বলল কাল থেকে ওর জুতোটা পরে নিতে। আগামীকালের কঠিন পথে ঘাবড়ে যাবার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ! সন্ধ্যায় পাকোড়া আর গার্লিক সুপ সহ দেদার আড্ডা। সেই আড্ডায় কেপির ছোলা , শুভর এয়ারপোর্ট আর পটির জায়গা , জয়্দীপের আইডিয়া আর বিষাক্ত হাওয়া আর আমার ঝাকা থেকে বয়ে আনা বোতল ব্যবহার করার চেষ্টা সবই ছিল ! আড্ডার শেষে যখন ইহার সুন্দরীরাও এলো তখন আমরা নিশ্চিত হলাম যে কেওই "এ এম এস " এ আক্রান্ত হইনি !
 |
| সরুবাস থচ থেকে ধনদেরাস থচের পথে |
 |
| সরুবাস থচ থেকে ধনদেরাস থচের পথে |
 |
| সরুবাস থচ থেকে ধনদেরাস থচের পথে |
 |
| ধনদেরাস থচ |
 |
| আপার ওয়াটার ফল ধনদেরাস থচ থেকে |
 |
| মিডল ওয়াটার ফল ধনদেরাস থচ থেকে |
 |
| তিনটি ধাপে রুপিন জলপ্রপাত ধনদেরাস থচ থেকে |
 |
| উপর থেকে ধনদেরাস থচ |
০৩/০৬/১৫ - ৮ টায় ট্রেক শুরু হল। জয়দীপ নিজের জুতো পরেই হাঁটছে , একপায়ে ক্রাম্পন দেওয়া হয়েছে ওকে। ইহার দল আমাদের একটু আগেই বেরিয়ে নদীর অন্য পার দিয়ে হাঁটছে। যদিও নদীটাই এখানে বোঝা যায়না , পুরোটাই প্রায় বরফে ঢাকা। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমরা লোয়ার ওয়াটার ফল এর নীচে পৌঁছলাম , যদিও নীচের ধারাটা কখনই ঠিকঠাক দেখা যায়নি। ডানদিক থেকে ততক্ষণে ইহার দল উপরে উঠতে শুরু করছে। আমরাও ওদের বানানো পথেই এগোতে থাকলাম , বরফে মোড়া কঠিন চড়াই। লোয়ার ওয়াটার ফল এর উপরে উঠে মিলিত হলাম , বিশ্রাম নেওয়া হল। এরপর মিডল ওয়াটার ফল কেও বাদিকে রেখে আমরা বরফের উপর দিয়ে মাঝারি চড়াই ভেঙ্গে এগোতে থাকলাম। এক-দেড় ফুট নতুন নরম বরফ থাকায় আইস - এক্স ব্যবহার করে স্টেপ বানাতে হয়নি। আবহাওয়াও মেঘলা থাকায় আমাদের সুবিধাও হয়েছিল। যখন আপার ওয়াটার ফলের কাছে পৌঁছলাম হালকা তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। ইহার দল সবার আগে , তারপর আমাদের তিনজন , শিমলার দলটাকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছিলনা , সবার শেষে আমি জর্জ কে নিয়ে হাঁটছিলাম। বিশ্রামের জায়গায় গিয়ে অবশ্য এক হচ্ছিলাম। আপার ওয়াটার ফলের সামনে একটা স্নো ব্রিজ পার করে আমরা বাদিকে চলে এলাম , মানে ফল আমাদের ডানদিকে। স্নো ব্রিজ পার হয়েই বিশ্রাম। এর পরে একটা পাথুরে চড়াই , ইতস্তত বরফে ঢাকা , মধ্যে আরও দুবার বিশ্রাম নিতে হল , তারপর আমরা পৌঁছলাম আপার ওয়াটার ফলের উপরে , যদিও ফল টা তখন বেশ খানিকটা দূরে। ক্যাম্পেরও কোনো দেখা পেলাম না। এর পরের পথটা হালকা চড়াই উতরাই সহ পুরোটাই বরফে ঢাকা। সহজ মজাদার পথে কিছুক্ষণ হাঁটার পর চোখে পড়ল ইহার ক্যাম্প , বরফের উপরে , পাশে রুপিন নদী টুকরো টুকরো ভাবে জেগে আছে। এখানেই আমাদেরও টেন্ট খাটানো হল , শিমলার দলটাও এখানেই। মানে এই প্রথম তিনটে দলই একসাথে ক্যাম্প করলাম। আজকেও ১১ টাতেই পৌঁছে গেলাম ৪ কিমি দূরের ১৩৩০০ ফিট উচ্চতার আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্পে মাত্র ৩ ঘন্টাতেই। আগেও একবার লিখেছি যে এবারের ট্রেকটা প্রতিদিন দুপুরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে , ফলে শুয়ে-বসে-আড্ডা মেরে কাটানোর জন্য হাতে অঢেল সময়। জয়দীপ আমাদের শ্রবন কুমারের একটা ব্লগ পাঠিয়েছিল , যেখান থেকে ও নর সিংকে পেয়েছিল , সেখানে কিন্তু শ্রবন লিখেছিল বরফের আধিক্য থাকলে এই ওয়াটার ফল ট্রেকটা বেশ কঠিন ও বিপদ্দজনক। আমাদের ততটা মনে হয়নি। হয়ত রোদের মধ্যে গলতে থাকা শক্ত বরফে স্টেপ বানিয়ে উঠতে হলে ব্যাপারটা কঠিন হত। যাইহোক প্রথম হার্ডল টা পার করে সবাই দারুন খুশী ছিলাম। এবারে সত্যি সত্যিই বরফের সাথে সহবাস করতে হবে , চারিদিকে সুধু বরফ আর বরফ , তার মধ্যেই একের পর এক রং বেরঙের টেন্ট , যেন সাদা ক্যানভাসে নানা রঙের ছোপ ! আমরাও ফটো সেশন করলাম , কারণ জানিনা শেষ পর্যন্ত পাস এ পৌঁছানো যাবে কিনা। আমাদের উল্লাস বেশীক্ষণ স্থায়ী হলনা , ঝোড়ো হাওয়া সাথে তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। তারমধ্যেই আমরা খিচুড়ি খেলাম চাখনা ছাড়াই ! দুর্যোগ বাড়তে থাকলো , আমরা চারদিকে টেন্টের পোল ধরে বসে থাকলাম আর মাঝে মধ্যে টেন্টের উপরে পড়তে থাকা বরফ ঝাড়তে থাকলাম। টানা ৫ ঘন্টা ধরে চলল এই দুর্যোগ। লাগেজ এরিয়ার বরফে গর্ত করে টেন্টের মধ্যে থেকেই ছোটকাজ সেরে নিতে হল , কেপি এই দৃশ্য দেখবেনা বলে চোখ বুজিয়ে পরে রইলো ! এরই মধ্যে জর্জ এসে আমার ক্যামেরায় বাইরের দুর্যোগের ছবি তুলে দিল , তাতেই দেখলাম বাইরের বরফে ঢাকা টেন্টের চেহাড়া। একসময় ঝড় থেমে গেল , আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প আবার শান্ত হল ! সবাই বাইরে বেরিয়ে অপার আনন্দে মেতে উঠলো নতুন বরফ নিয়ে। টেন্ট গুলো যেন বরফের মধ্যে গাঁথা আছে। ইহার সাথে আমাদের বরফের গোলা ছোড়াছুড়ি হল। জানা গেল ওরা ১৭ জন আছে আর , মহিলা সদস্যরাও তিনজনেই আছে। দুর্যোগের পরেও সবার মধ্যেই একটা খুশীর ভাব ফুটে উঠেছিল , অকারণ ভয় না পেয়ে সবাই ব্যাপারটা উপভোগ করছিল। আমাদের গাইড টিম যতই চাপ দিয়ে দাম বাড়িয়ে নিক , সামান্য খাবার পরিবেশন করুক না কেন প্রথম থেকেই ওরা পাস ক্রস করার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়ে গেছে , ফলে আমরাও অনেকটাই নির্ভিক ছিলাম। এখানে অনেক পরে অন্ধকার নামে , ৭ টার পরে তো আমরাই আলো পেয়েছি আবহাওয়া ভালো থাকলে মনে হয় ৮ তা পর্যন্তও আলো পাওয়া যেত। আর একটা ব্যাপার যেটা আমাদের সবার নজর কেড়েছিল ,বরফের উপরে ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা রঙিন গর্ত , আমাদেরই ইউরিনের চিহ্ন ! অতিরিক্ত সাদা বরফের জন্য অমন রং নাকি সত্যিই অমন রং সেটা চিন্তার কারণ ছিল। পরিদন ভোর ৫ টায় ট্রেক শুরু হবে ঠিক করে আমরা টেন্টের আড্ডায় ঢুকে গেলাম। যথারীতি সুন্দরীদের আলোচনায় মেতে উঠে আমরা "এ এম এস" এ আক্রান্ত হয়েছি কিনা চেক করে নেওয়া হল। রাতে শোবার সময় জয়্দীপের অদ্ভুত আবদার ওকে শুভর পাশে শুতে দিতে হবে ! তারপর অবশ্য আমি আর কেপি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম !!!
 |
| ইহার দল লোয়ার থেকে আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্পের পথে . |
 |
| লোয়ার থেকে আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্পের পথে |
 |
| লোয়ার ওয়াটার ফল এর উপরে |
 |
| মিডল থেকে আপার ওয়াটার ফল এর পথে |
 |
| আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্পের পথে |
 |
| আপার ওয়াটার ফল এর পাশে |
 |
| আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্পের পথে |
 |
| পুরো দল আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্পে |
 |
| পুরো দল আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্পে |
 |
| আমাদের আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প |
 |
| তুষারপাতের পরে আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প |
 |
| সম্পূর্ণ আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প |
 |
| আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প |
০৪/০৬/১৫ - ভোরের আলো ফুটতেই আমরা উঠে গেছিলাম। এতদিন শুভর করে আসা প্রশ্নটা আমাদের মনেও এলো , পটি কোথায় করব ! চারিদিকে ধু ধু করছে সাদা প্রান্তর , লুকানোরও জায়গা নেই বসারও জায়গা নেই। লজ্জার মাথা খেয়ে এতদিন চলন্ত ট্রেন থেকে দেখে আসা লোকেদের মত কখনও মাথা নিচু করে কখনও বা উদাস ভঙ্গিতে বরফে গর্ত করে বসে পটি পর্ব সমাধা করতে হলো !!! যারা ইহার দলের বিবরণ পরবেন বলে আশা করে বসে আছেন তাদের জানাই ওদের তিন তিনখানা টয়লেট টেন্ট ছিল ! চা আর সেঁকা নরম পাপর খেয়ে আমরা ৫-৩০ এ তৈরী হয়ে গেলাম। আমি কাল থেকেই গেইটার পরেছিলাম , আজ দুপায়ের জন্যই ক্রাম্পন পেলাম সবাই। জর্জ এগুলো কাল ফিরতি পোর্টার দের কাছ থেকে নিয়েছিল। ইহার পরেপরেই আমরা এগোচ্ছিলাম । মেঘলা আবহাওয়া। সামনে বেশ কিছুটা যাবার পরে বাদিকের চড়াইতে উঠতে হল। উচ্চতার কারণে আর চড়াই ভাঙ্গার জন্য কষ্ট হচ্ছিল ঠিকিই , কিন্তু গতকালের মতই নতুন বরফে অসুবিধা কিছু হচ্ছিলনা। চড়াই টা ওঠার পর একটা বিস্তীর্ণ তুষারক্ষেত্র , হালকা চড়াই সহ। এর মাঝামাঝি যাবার পরে প্রথম দেখা পেলাম রুপিন পাসের। কালো পাথুরে এলাকার মধ্যে একটা লম্বা সরু বরফে ঢাকা প্যাসেজ , যেন বরফের স্লিপ ! কেও যদি পার্কের স্লিপে নীচ থেকে উপরে উঠে থাকেন তাহলে বুঝতে পারবেন বরফের স্লিপে ওঠা কতটা কঠিন হতে পারে। চারিদিকে বরফের মধ্যে কিছু পাথর জেগে ছিল আমাদের বিশ্রাম নেবার জন্যই , যেন রকি আইল্যান্ড। কেপির ছোলা সহ যেযার ড্রাই ফুড খেলাম , পেট তো একেবারে ফাঁকা। এখান থেকেই দেখা গেল ইহার দল পাসে ওঠা শুরু করে দিয়েছে। একজন বেশ আগে এগিয়ে গেছে , সম্ভবত সেই অভিজ্ঞ মহিলা ট্রেকার। আমরা ওঠা শুরু করার আগে আমাদের ন্যাপ স্যাক গুলোও পোর্টার রা নিয়ে নিল। আমাদের কাছে শুধু ক্যামেরা। শেষ পর্যায়ের লড়াই শুরু করে দিলাম। না , আর কোন ছবি তুলতে পারিনি। মনোযোগটা সম্পূর্ণ পথেই দিতে হয়েছিল। অর্ধেক ওঠার পরে দেখা গেল নীচে একপাল ভেড়া , তারাও একই পথে পাস ক্রস করবে ! এর মধ্যে আবার আবহাওয়াটাও বিগড়ে গেল , অল্প ঝড় আর তুষারপাত। গাইড বলল এটা বাড়লে দম নিতে অসুবিধা হবে , আমরা বিপদে পড়ব , বিপদ পিছনের ভেড়া গুলোও। তাড়াতাড়ি উঠতে বলল। আমিই সবার শেষে। প্রায় শেষ দিকে একটা রকি এরিয়ায় দাঁড়ানো গেল , কেপি তখন শেষ টুকু উঠছে। জয়দীপ আর শুভও আমার আগে বেরিয়ে গেল। পোর্টার রা আগে থেকেই ওদের সাহায্য করছিল উঠতে। ভেড়ার দল আরও উপরে উঠে এসেছে। শেষ টুকু আমিও এক পোর্টার এর হাত ধরে ভেড়াদের আগেই ১০ টা নাগাদ পাস এ উঠে গেলাম। পাসে তখন ইহার দলের ভিড়। একের পর এক ফটো সেশন। একটু উপরে মন্দিরে গিয়ে আমি , জর্জ আর একজন পোর্টার মিলে পুজো দিয়ে আসলাম। আমার আনা শোনপাপড়ি, জয়্দীপের খেজুর আর ওদের আনা সুজির হালুয়া আর নারকেল দিয়ে পুজো দেওয়া হল। ইতিমধ্যে ভেড়ার দল লাইন দিয়ে পাস থেকে নেমে যাচ্ছিল। অদ্ভুত সুন্দর সে দৃশ্য। এর পরে ইহার দলও নেমে গেল। আমাদের ফটো সেশন শুরু হল। প্রায় এক ঘন্টা পাসের মাথায় ছিলাম। ১৫২৫০ ফিট উচ্চতায় আমরা সুস্থই ছিলাম। এখানেও আমাদের টিফিন দেওয়া হলনা , খিদেয় পেট জ্বলছে। ১১ টা নাগাদ আমরা নামতে শুরু করলাম। বরফে ঢাকা উতরাই পথও খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। তবে আমি নামি ভালো , যেহেতু হাঁফিয়ে যাইনা , ওঠার সময় আমাকে বারবার বিশ্রাম নিতে হয়। বেশ কিছু জায়গায় আমরা কখনও একা কখনো ২/৩ জন একসাথে বরফের উপরে বসে গড়িয়ে ( স্লাইডিং ) নেমে গেলাম , ৩০ মিনিটের পথ ৩০ সেকেন্ডে পার হওয়া যায়। আর পাওয়া যায় অফুরন্ত মজা যদিও প্রথমদিকে একটু ভয়ই লাগে। প্রায় ১২ টা নাগাদ বরফের ঢালে বসেই লুচি আর হালুয়া দিয়ে আমরা টিফিন সারলাম। পথ তখনও অনেকটা বাকি। ইহার দলকে আর বেশিক্ষণ দেখা গেলনা। আমাদের ক্রাম্পন খুলে নেবার পরেও দেখা গেল তখনও কিছু কঠিন বরফে ঢাকা পথ বাকি ছিল। ধীরে ধীরে বরফ কমতে শুরু করলো আর কালো পাথুরে এলাকা পেতে থাকলাম। ২ টো নাগাদ দেখা পেলাম শামসের এর , ওকে দেখেই মনে কু ডাকলো , নিশ্চই আবার কোনো ডিল করতে এসেছে। বলল আর এক ঘন্টা হাঁটতে হবে, দারুন জায়গায় ক্যাম্প করবে ইত্যাদি। ৩-৩০ নাগাদ আমরা রন্টি গড এ পৌঁছে গেলাম , ইহার ক্যাম্পও দেখলাম , কিন্তু আমাদের হাঁটা থামলনা। এরপরে আরও একঘন্টা হাঁটার পরে আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। সাংলা কান্ডার পুকুরটার একটু আগে একটা পাহাড়ি ঢিবিতে আমাদের ক্যাম্প করা হবে ঠিক হল। তখন ৪-৩০ , আমাদের শক্তি শেষ , সারাদিন তেমন কিছু খাওয়াও হয়নি। প্রায় ১৩ কিমি পথ ১১ ঘন্টায় ট্রেক করে পৌঁছলাম ১৩০০০ ফিট উচ্চতার সাংলা কান্ডায়। শামসের থেকে সাবধান ! ও যেকদিন ছিলনা , আমরা ঠিকই ছিলাম জর্জ এর হাতে , ওর সবকিছুতেই উগ্র মাতব্বরি। প্রচন্ড হাওয়া। এদিককার ছোট টেন্টে কষ্ট করে থাকা। কিন্নর কৈলাশ পর্বতমালা এখান থেকে দৃশ্যমান। ভোডাফোনের লাইন ও পাওয়া গেল , কথা হল বাড়ির লোকেদের সাথে। একটা দুশ্চিন্তার ট্রেক প্রায় সম্পন্ন করে আমরা এখন নিরাপদ জায়গায়।
 |
| আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প থেকে রুপিন পাসের পথে |
 |
| আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প থেকে রুপিন পাসের পথে |
 |
| আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প থেকে রুপিন পাসের পথে |
 |
| প্রথম দর্শনে রুপিন পাস |
 |
| আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প থেকে রুপিন পাসের পথে |
 |
| ইহার দলের রুপিন পাস অভিযান |
 |
| রুপিন পাসের মন্দিরে |
 |
| রুপিন পাসের অতিক্রম করে গেল ভেড়ারাও |
 |
| আমাদের পুরো দল রুপিন পাসে |
 |
| রুপিন পাস থেকে নামার সময় |
 |
| রুপিন পাস থেকে নামার সময় ব্রেকফাস্ট |
 |
| রুপিন পাস থেকে নামার সময় স্লাইডিং জোন |
 |
| রুপিন পাস থেকে নামার সময় হাতেহাত |
 |
| ইহার ক্যাম্প রন্টি গড এ |
 |
| আমাদের ক্যাম্প ক্যাম্প সাংলা কাণ্ডায় |
০৫/০৬/১৫ - শেষ দিন সকাল টা বেশ মজা করেই কাটল। ট্রেক শুরু করলাম ৮.৩০ টায়। সহজ উতরাই পথ একসময় গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করল। দুরে দেখা গেল বসপা নদী , সাংলা শহর। ব্রিজ পার করে নাগ মন্দির দেখে সাংলা মেন রোডে পৌঁছে গেলাম দুপুর ১২ টায়। ১০ কিমি পথ পারি দিলাম ৩.৫ ঘন্টায়। সাংলার উচ্চতা ৮৮০০ ফিট। সুন্দরী শৈল শহর। সামশেরের দেখানো রেস্তোরায় উঠলাম। পেমেন্ট করার সময় আর এক প্রস্থ নাটক , দুদিনের পোর্টার ফী বেশী দিতে হবে। আমরা অবশ্য আর একটাও পয়সা বেশী দেইনি। ধৌলার ডিল অনুযায়ী ৭ দিনের দেড়খানা পোর্টারের খরচ হিসেবে প্রত্যেককে ১৫৭৫/- ( ৬০০+৩০০ x ৭ /৪) করে অতিরিক্ত দিতে হল। এখান থেকেই নীচের রাস্তায় দেখলাম প্রথমদিনের সেই তৃষ্ণার্ত সুন্দরী খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পৌঁছে গেছে। অচেনা সুন্দরীকে আমার স্যালুট। রেস্তোরায় আমরা একটু ফ্রেশ হতে চেয়েছিলাম , কিন্তু বেশী টাকা চাওয়ায় আর ফ্রেশ হওয়া হয়নি। সবথেকে অবাক হলাম ৮০/- র চাউমিন অর্ডার করার পরে বলল ১২০/- , আর তার জন্য নানা অযুহাত। এখানেও অন্য গন্ধ পেয়ে মাথা গরম করে শামসের কে দুচার টে কড়া ও স্পষ্ট কথা শুনিয়ে ( যেটা এতদিন শোনাতে পারিনি ) দিয়ে আশিয়ানা কাফেতে ঢুকলাম। চাউমিন , বিরিয়ানি দিয়ে আমাদের সাফল্য উদযাপন করলাম। পরে ইহার দলের প্রায় সবাই এখানেই খেতে এলো , সুন্দরীদের শেষবারের মত কাছে থেকে দেখা গেল ! হোটেল মালিক আমাদের ওখানেই বিয়ার পানের ব্যবস্থাও করে দিলেন। আর সেই পানের পাল্লায় পরে ৫ টার বাসে জায়গা দখল করতে পারলাম না , একমাত্র কেপিই ৫০০ কিমি দুরে এসেও পানে বিরত থাকায় দুটো জায়গা দখল করেছিল। পরে অবশ্য সবাই জায়গা পেয়েছিলাম। ইহার দলের অনেকেও এই বাসে ছিল। সাংলা - শিমলা ৩৮০/- ভাড়া , প্রায় ২২০ কিমি পথ । রাতের অন্ধকারে এই পথের সৌন্দর্য কিছুই উপভোগ করা গেলনা। ভোর ৩ টায় শিমলা পৌঁছে গেলাম।
 |
| কিন্নর কৈলাশ পর্বত শ্রেণী |
 |
| শামসের ডানদিকে , সাংলা কাণ্ডায় |
 |
| কেপি উড়ছে সাংলা কাণ্ডায় |
 |
| সাংলার পথে বিশ্রাম |
 |
| সাংলা |
 |
| সাংলার ব্রিজ থেকে বসপা নদী |
 |
| বিদায় সাংলা |
 |
| বাঁ দিক থেকে শুভ কেপি আমি জয়দীপ জর্জ। মধুরেণ সমাপয়েত |
০৬/০৬/১৫ - শুভ ওই বাসেই চন্ডিগড় চলে গেল , সেখান থেকে দিল্লী গিয়ে দুদিন থেকে ৮ তারিখের বিমান ধরবে। যাবার আগে আশাকরি এয়ারপোর্ট জনিত নিয়মকানুন সব মুখস্থ করে ফেলেছিল ! মনে পরে গেল ২০০৩ সালে আমার প্রথম বিমান যাত্রার কথা , পোর্ট ব্লেয়ার থেকে কলকাতা , সেদিন পাশে নিয়মকানুন জানার মত কাওকে পাইনি , টিকিটের পিছন পরেই বিমানে উঠে পড়েছিলাম। হয়ত একটু বেশিই স্মার্টনেস দেখিয়ে খাবার দেবার সময় চোখ বুজিয়ে ছিলাম আর তারফলে ফ্রুট জুস টা মিস হয়ে গেছিল ! সে দুঃখ্য আমার বহুদিন ছিল। যাইহোক এদিকে বাস স্টান্ডে ই আমরা বসে কাটালাম , সকাল হতে কিছুটা হেঁটে বাকিটা বাসে পৌঁছে গেলাম রিভলি সিনেমা হল এলাকায়। উপরে উঠলেই ম্যাল। নিজেরা এবং দালালের সাহায্যেও হোটেল পাওয়া যাচ্ছিলনা। কালকা চলে আসব ভাবছিলাম , তখন ৯ টার পরে দালালের সাহায্যে এবং হোটেল মালিকের প্রায় হাতে পায় ধরে মান্নত হোটেলের একটা ওঁচা রুমে ১৫০০/- দিয়ে আমরা জায়গা পেলাম , তাও ১২ টার পরে ঢুকতে পারব এই কড়ারে ! খুবই দুর্ভোগ হল। কেপি তত্কাল এ চেষ্টা করলো , বলাবাহুল্য পেলনা ! শিমলার ম্যাল এলাকাটা আমরা ভালোভাবেই ঘুরলাম , কেনাকাটা করলাম। গুড়গুড়ির জন্য অনেক কিছু কিনলাম। সকালের দুর্ভোগ কাটিয়ে বাকি দিনটা আমাদের দারুন কাটল।
০৭/০৬/১৫ - সকালেও ম্যালে ঘুরলাম , কেনাকাটা করলাম। দুপুরের পরে বাসে ওল্ড বাস স্ট্যান্ড গিয়ে সেখান থেকে প্রায় মারপিট করে বাসে উঠে নিউ বাস স্টান্ডে গেলাম। প্রচুর খাবার দোকান নিউ বাস স্টান্ডে , কিন্তু ভালো খাবার নেই বললেই চললে , যা নিলাম তা খেতেই পারলাম না। তবে শিমলায় প্রচুর আইস ক্রিম খেয়েছি। বাসের পাঞ্জাবি ড্রাইভার জয়্দীপের সাথে বেশ উগ্র আচরণ করলো , বুঝলাম ভর দুপুরের পাইয়াদের মাথা গরম হবার গল্পটা সঠিক ! শিমলা - কালকা ১৪০/- ভাড়া। কালকার ওয়েটিং রুমে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল, রাত ১১-৫৫ তে কালকা - হাওড়া মেল। অনেক ফলমূল কেনা হলো , সাথে টাটকা ভাজা চিকেন , যেটা পানীয় ছাড়াই কচকচ করে খেতে হল !
০৮/০৬/১৫ - বাতানুকুল ট্রেনের কামড়ায় আরামেই কাটল। কেপিও সিট্ ম্যানেজ করে ফেলেছিল। শুভর আজি কলকাতায় পৌঁছানোর কথা। ট্রেনটা ভালই আসল মাঝ পথ পর্যন্ত , তারপরেই ঝোলাতে শুরু করলো। কেপির রুপিন পাস ফেরত কাঁচা ছোলাও মেখে খাওয়া হল।
০৯/০৬/১৫ - সকাল ৮ টায় হাওড়া ঢুকে বাড়ি গিয়ে অফিসেও যাবার প্লান ছিল। ট্রেন ৫ ঘন্টার উপর লেট। স্বরুপা এসেছিল জয়দীপকে নিতে। মেঘ এবার কোনবারেই আসতে পারেনি। তাই আমিই দৌড় লাগলাম বাড়ির দিকে যেখানে মেঘ আছে , বৃষ্টি আছে !
এক ঝলকে ট্রেক :- দেহরাদূন থেকে গাড়িতে ধৌলা ২০০ কিমি , ৮ ঘন্টা। প্রথম দিন - ধৌলা ৫১০০' থেকে সেবা ৬১৫০', ১১ কিমি / ৪ ঘন্টা । দ্বিতীয় দিন - সেবা থেকে ঝাকা ৮৭০০', ১৭ কিমি / ৭ ঘন্টা ( গোসাঙ্গু ৩.৫ কিমি / ১ ঘন্টা + জিসকুন ৯ কিমি / ৩ ঘন্টা + ঝাকা ৪.৫ কিমি / ২ ঘন্টা )। তৃতীয় দিন - ঝাকা থেকে বুরাস কান্ডি ১০০০০' , ৭ কিমি / ৪.৫ ঘন্টা ( প্রথম স্নো ব্রিজ ১.৫ ঘন্টা , দ্বিতীয় স্নো ব্রিজ ২.৫ ঘন্টা , ইহার কোদাকনাল ক্যাম্প ৩.৫ ঘন্টা ) । চতুর্থ দিন - বুরাস কান্ডি থেকে ধনদেরাস থচ বা লোয়ার ওয়াটার ফল ক্যাম্প ১১৬৮০' , ৪.৫ কিমি / ৩.৫ ঘন্টা। পঞ্চম দিন - লোয়ার ওয়াটার ফল ক্যাম্প থেকে আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প ১৩৩০০' , ৪ কিমি / ৩ ঘন্টা। ষষ্ট দিন - আপার ওয়াটার ফল ক্যাম্প থেকে সাংলা কাণ্ডা ১৩০০০' , ১৩ কিমি / ১১ ঘন্টা ( ভায়া রুপিন পাস ১৫২৫০' , ৪.৫ ঘন্টা , পাস থেকে রন্টি গড ৪ ঘন্টা ) । সপ্তম দিন - সাংলা কাণ্ডা থেকে সাংলা ৮৮০০' , ১০ কিমি / ৩.৫ ঘন্টা , সাংলা থেকে শিমলা গাড়িতে ২২০ কিমি / ৯ ঘন্টা।
গাইড / পোর্টার - শুনেছি নায়তবার থেকে ১৫ কিমি দুরের সাঁকরি থেকে ন্যায্য মূল্যে গাইড / পোর্টার পাওয়া যায়। সাঁকরির একজন অভিজ্ঞ গাইড রামলাল ( ৯৪১১৩৮০৮১৮)। এই পথের পুরলায় থাকে বান্টি ( ৯৯৯৭৬০৩৪৫৪ ) মূলত গাড়িচালক , এও গাইডের ব্যবস্থা করে দেবে। ঝাকার লোকেরা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমরা ঝাকার নর সিং ( ৯৪৫৯৯৯২০৯৯) ওরফে মামাজীর ( যার দুর্নামও আছে ) দুই ছেলে শামসের ও জর্জ ( ৯৪৫৯৯৯০৯০৯) এর তত্বাবধানে গেছিলাম। এদের সাথে গেলে পাকা কথা লিখিত ভাবে আদায় করে নেবেন।
কিভাবে যাবেন - আমরা কলকাতা থেকে দুন এক্ষ্প্রেস্সে দেহরাদূন গিয়ে স্টেসনের বাইরেই বাস স্টান্ডের লাগোয়া দুন ট্যাক্সি ওনার্স এসোসিয়েশন (০১৩৫-২৭২০২৩২, ২৭২০২৩৩, ৯৭৫৮৯৪৩৬০০, ৯৭১৯৩৩৪৫০০) থেকে গাড়ি বুক করে ২০০ কিমি দূরের ধৌলায় পৌঁছানো যায় ৮ ঘন্টায়। দিল্লী হয়ে খুব সকালে দেহরাদূন পৌঁছাতে পারলে ভোর ৬ টার সাঁকরির বাসে নায়তবর যাওয়া যাবে , সেখান থেকে ধৌলা ১২ কিমি শেয়ার জীপে। সকাল ৯ টায় বাসে মোরি পর্যন্ত গিয়েও শেয়ার বা ভাড়ার জীপে ধৌলা পৌছানো যাবে। এরপর ধৌলা থেকে সাংলা পর্যন্ত ৭ দিনের ট্রেক। সাংলা থেকে বিকাল ৫ টার চন্ডিগড়ের বাসে ২২০ কিমি দূরের শিমলায় আসা যায় ৯ ঘন্টায়। না পেলে শেয়ার জীপে রেকং পিও গিয়ে শিমলার বাস ধরতে হবে। শিমলা থেকে কালকা হয়ে কলকাতার ট্রেন ধরা যাবে। শিমলা থেকে বাসে ( না পেলে ভাড়ার গাড়িতে ) রহরু এসে দোদরা কাওয়ার এর বাসে গোসাঙ্গু নেমে জীপে জিসকুন পৌঁছে ( মোট ১০ ঘন্টা ) ২ ঘন্টা হেঁটে ঝাকা পৌঁছেও ৫ দিনের ট্রেক শুরু করা যায়।
কোথায় থাকবেন - ধৌলা , সেবা ও ঝাকায় হোম স্টে / হোটেল আছে , বাকি জায়গায় টেন্ট এ থাকতে হবে। সাংলা তে অনেক হোটেল আছে , থাকার দরকার হলে আমরা যেখানে খেয়েছিলাম সেই আশিয়ানা ( ৯৮১৬৩৮৫০৬৫ / ৯৮০৫৮৪১২৪৫) তেও থাকা যেতে পারে।
For full album ( 368 photos ) click here :-