ঘুরতে ভালবাসি - একটি বাংলা ভ্রমন বৃত্তান্ত ।

Wednesday, July 11, 2012

রূপকুন্ডের রূপের টানে ....


রূপকুণ্ডের  রূপের রহস্যে..



বিঃদ্রঃ > নীচের ছবিতে ক্লিক করলে ছবিগুল বড় আকারে ও পরপর দেখা যাবে । 

০২/০৬/১২ – আমি মহারা‍ষ্ট্রের  লাতুর থেকে আর আমার জগত  জোড়া জাল ফেলে খুঁজে পাওয়া ভাত্রিপ্রতিম বন্ধু সোমনাথ দে কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করি হরিদ্বার এর উদ্দেশ্যে আমি ও সোমনাথ দুজনেই যথাক্রমে অফিসে ও বাড়িতে অর্ধসত্য বলি আমি নিজের উন্নতির জন্য  যোগ-ধ্যান শিবিরের কথা বলি আর সোমনাথ আমার পরিবারের সাথে  হরিদ্বার-হৃষীকেশ-লছমনঝোলা ঘোরার কথা বলে । সোমনাথের কল্যাণে ওর বাবার কাছে চিরকুমার আমি কিছুক্ষণের জন্য বৌ-বাচ্চার মালিক হয়ে যাই ! মিথ্যা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও কোনোও মহাপুরুষ যেন বলেছিলেন ভাল কাজের জন্য মিথ্যা বললে সেটা মিথ্যা হয়না !  প্রথমে আমরা সতপন্থ তালের পরিকল্পনা করেছিলাম কিন্তু আরও কয়েকজন শেষ মুহূর্তে সরে যাওয়ায় আমরা রূপকুণ্ডের কথা ভাবি । যদিও সোমনাথ শেষ পর্যন্ত আসবে কিনা আমি নিশ্চিত ছিলাম না ।  ও ট্রেক করতে আসছে শুনলে ওর বাবা কিছুতেই ছাড়তো না। তাই একার জন্য আমার প্ল্যান সি তৈরী ছিল দেওরিয়া তাল - চোপতা - তুঙ্গনাথ - চন্দ্রশীলা আর মদমহেশ্বরকে নিয়ে । এগুল তুলনামূলক ভাবে সোজা আর একা যেতেও কোন ঝামেলা নেই । তুলনায় রূপকুন্ড উচ্চতা ও কাঠিন্যে অনেক এগিয়ে । আমি নিজেও নিশ্চিত ছিলাম না যে দুজন অনভিজ্ঞ ট্রেকারের রূপকুন্ডে যাওয়া সমীচীন হবে কিনা । অক্সিজেন বা ঠান্ডার কারণে কোনও শারীরিক বিপত্তি ঘটলে আমরা খুবই বিপদে পড়তাম । এর আগে আমাদের সান্দাকফু-ফালুট ছাড়া অন্য বড় ট্রেকের অভিজ্ঞতা  ছিলনা ।  পাহাড়ে ওঠার নেশাকে সম্বল করেই বেরিয়ে পড়ি তবে যাবার আগে দুজনেই নেট ঘেঁটে অনেক তথ্য জোগাড় করি আর শুধু লোহাজঙের গাইড নরেন্দ্র সিং এর সাথে দু-একবার ফোনে কথা বলি । 

০৩/০৬/১২ – আমি লাতুর থেকে সকালে বম্বে পৌঁছাই একটু দেরিতেই । দুশ্চিন্তা নিয়েই প্রায় শেষ মুহূর্তে দিল্লীর উড়ান ধরি । ভর দুপুরের দিল্লীর গরমে আমার সঙ্গী  গ্লুকন ডি কারন কদিন আগেই ইনফেকটিভ হেপাটাইটিসে ভুগে উঠেছি । সোমনাথের সাথে ফোনে যোগাযোগ ছিলই ।   সোমনাথ আমার আগেই পৌঁছে গেছিলো আর পয়সা বাঁচাতে তিন সফরসঙ্গীর সাথে স্টেশনের কাছে এক হোটেলে ওঠে । আমি পৌঁছলাম রাত আটটার পর । হর-কি-পৌড়ি থেকে আমাকে নিতে এসেছিল, যদিও ভিড়ের জন্য সন্ধ্যায় গঙ্গারতি কিছুই দেখতে পায়নি । স্টেশনের কাছেই সরকারি-বেসরকারি বাসস্ট্যাণ্ড, জীপস্ট্যাণ্ডও। কিন্তু তেমন কোনও খবর জোগাড় করা গেলনা । দাদাবউদির হোটেলে  বাঙ্গালী খাবার খেয়ে হোটেলে যাই । ৫ জন  হওয়ায়  ২০০/- করে  খরচ  পড়ল  বাতানুকুল  ঘড়ের । ক্যামেরা  টেস্ট করা হল , কিন্তু ব্যাটারি ঠিকমত   কাজ না করায়  ছবি তোলা  নিয়ে একটা  দুশ্চিন্তা রয়েই গেল । আমার নিজের ক্যামেরাটা   খারাপ   হয়ে  যাওয়ায় আমার অন্য একটা ক্যামেরা   সোমনাথ কলকাতা থেকে নিয়ে আসে । আর সেই কামেরার জন্য আমি দু ডজন  ব্যাটারি  কিনে নিয়ে আসি ।

                                   # রাতের হরিদ্বার স্টেশন #

                                 # সন্ধ্যারতির সময় হর - কি - পৌড়ি #
   
                                   # দাদা বৌদির খাবার হোটেল #


০৪/০৬/১২ – ভোর ৫টায় বেরিয়ে যাই । জিএমওইউ স্ট্যাণ্ড থেকে বাস ধরলাম । আমাদের গন্তব্য লোহাজঙ, কিন্তু সরাসরি বাস নেই এমনকি কর্ণপ্রয়াগের বাসেও জায়গা না পেয়ে রূদ্রপ্রয়াগের বাসে উঠলাম ।  হৃষীকেশ – দেবপ্রয়াগ – শ্রীনগর হয়ে ৬ ঘন্টা সময় লাগল । আবার বাসে কর্ণপ্রয়াগ ।  প্রচণ্ড গরম আর ধোঁয়াশায় প্রয়াগ গুল দৃষ্টিনন্দন লাগলনা । আরও কয়েকবার জীপ পালটে রাত ৯ টায় লোহাজঙ পৌঁছাই নারায়নবাগার – থারালি – দেবল হয়ে । পিণ্ডার নদীর ধারে দেবল এখন বেশ জমজমাট । রাত হয়ে যাওয়ায় থারালি থেকে লোহাজঙ ভায়া দেবল দুবার জীপ রিসার্ভ করতে হল ৪০০/- আর ৮০০/- টাকায় । থারালিতে  জীপে বসে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে  হল , পরে অনেক মেয়ে এসে উঠলো , কিন্তু তারা মাঝরাস্তায় নেমে যাবে বলে বাকি রাস্তার জন্য আমাদের জীপটা বুক করতে হল । বিকালে যখন নরেন্দ্রাজীর সাথে কথা হয় তখন উনি দেবলেই ছিলেন , কিন্তু আমরা গিয়ে আর পাইনি । তবে ওনার চেনাজানা শাহুজীর দোকানে উঠি, উনিই জীপ ঠিক করে দেন ।  হরিদ্বার থেকে জীপ রিসার্ভ না করায় সস্তার তিন অবস্থার ১৫ ঘন্টার প্রণান্তকর ধকল হজম করতে হল প্রায় ২৪০ কিমি রাস্তায় ! গিয়ে দেখলাম নরেন্দ্রজী ইণ্ডিয়া হাইকসের লোকাল ম্যানেজার হয়ে কাজ করছে , যারা নির্ঝঞ্ঝাট রুপকুণ্ড করাচ্ছে । তাদের আস্তানাতেই  রাত কাটালাম ।  নরেন্দ্রজীর সাথে আলোচনাও সেরে নিলাম । উনি সব ব্যবস্থা করে দেবেন বলে আশ্বাস দিলেন । ৮০০০ ফিট উচ্চতায় পৌঁছে হাল্কা ঠাণ্ডায় শরীরটা জুড়াল । কিন্তু আমার ক্যামেরায় সাধারন ব্যাটারি কাজ করছিলোনা বলে মনটা খিঁচিয়ে ছিল ।
                 
                      # দেবল # 


০৫/০৬/১২ – সক্কাল বেলায় গাইড নারায়ণ এসে ঘুম ভাঙ্গালতারপর সেই সব ব্যবস্থা করতে লাগল । যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটা ক্রাইসিস তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গেছে । একটি ঘোড়া সহ পোর্টার গুড্ডু কে পাওয়া গেল। নারায়ণ রান্নার জিনিসপত্র নিয়ে আসল  । স্থানিও দোকান থেকে রসদ নেওয়া হল । কেরোসিনের অভাবে গমকল থেকে ডীজেল নেওয়া হল । লোহাজঙ এ ট্রেকিং এর সবকিছুই কিনতে বা ভাড়ায় পাওয়া যায় । আমি আরও কিছু ব্যাটারি কিনি, তখন কাজ করলেও পরে আর ঠিকঠাক কাজ করেনি ।  উপরে টেন্ট পাওয়া যাবে তাই টেন্ট নেওয়া হয়নি ।  ঠাণ্ডায় আর চান করার চেষ্টা করিনি ।  আলুপরটা আর চা খেয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করতে ১০ টা বেজে গেল ।  আমাদের গন্ত্যব্য দিদিনা , দূরত্ব প্রায় ৭ কিমি ।  যদিও অনেকেই গাড়ীতে আরও এগিয়ে ওয়ান গিয়ে ট্রেক শুরু করে । প্রথমেই নামা । আমাদের রুকস্যাকও ঘোড়ার পিঠে । তাই নাচতে নাচতে নামতে গিয়ে আমার অতি বিশ্বস্ত হাঁটুযুগলের ডানদিকের টি বিগড়ে গেল !  আড়াই ঘণ্টার উৎরাই পথ তখন প্রাণান্তকর লেগেছিল । যদিও রডডেনড্রন-ওক-পাইনের জঙ্গলে ঘেরা পথটা বেশ সুন্দর ।  একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম আর নীলগঙ্গা নদী পার হয়ে এবার একটা প্রাণান্তকর চড়াই পথ । হালকা বৃষ্টিও শুরু হল । আমি প্রায় এক পায়েই উঠতে থাকলাম । পথে হাওড়ার চার যুবকের সাথে আলাপ হল । মনের সুখে ছবি তুলতে পারছিলাম না , সোমনাথকেও বারণ করছিলাম , যাতে রুপকুন্ড পর্যন্ত ছবি তোলা যায় মোট ৫ ঘণ্টা ট্রেক করে বিকাল ৩ টা নাগাদ বৃষ্টিভেজা দিদিনায় পৌঁছলাম । ছবির মত সুন্দর মাটি-পাথরের দোতলা বাড়িতে উঠলাম । এটাই এখানকার থাকার ব্যবস্থা , হোম-স্টেউচ্চতা ৮০০০ ফিট, তাই ঠাণ্ডাও হালকা । চা খেয়েই লেগে গেলাম খিচুড়ি বানাতে এদের কাঠের উনুনে । সাহায্যে নারায়ন । হাওড়ার বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরেই সন্ধ্যাটা কাটল । ওরা আমাকে একটা স্প্র্রে লাগাতে দিল । রাতে আবার হেঁশেলে ঢুকে ডিমেরঝোল আর ভাত রান্না করলাম, সাথে স্যালাড ।

                     # লোহাজঙ থেকে ট্রেক শুরু #

                    # লোহাজঙ থেকে নামার পথে #
                         
                                         # দিদিনায় ওঠার পথে #

                                      # দিদিনা গ্রামের হোম স্টে #
 
০৬/০৬/১২ – গাইড-পোর্টারের রান্না করাতে বেশ অনীহা, তবুও সকালে তারাই খিচুড়ি বানাল । সোমনাথ তার নীক্যাপ দিল, সেটা লাগিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ বোধ করলাম । আজও প্রায় ৯ টা বাজল বেরতে । শুরুতেই শুকনো পাতায় বিছানো জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কঠিন চড়াই । টোলাপানি হয়ে উঠলে চড়াই টা একটু সহজ হত । ঘণ্টা চারেকে পৌঁছলাম খুপাল টপ এ । এখান থেকেই শুরু বিখ্যাত আলি বুগিয়ালেরবুগিয়ালের সবুজ গালিচায় বসে ছাতু মেখে খেলামআকাশ পরিস্কার থাকলে অনেক তুষারশৃঙ্গ দেখা যায় । আরও ঘণ্টা দুয়েক হেঁটে দেখা পেলাম আর এক বিখ্যাত বেদিনী বুগিয়ালের  প্রায় ১২ কিমি পথ ঘণ্টায় ট্রেক করে বেদিনী বুগিয়ালের ক্যাম্পে পৌঁছলাম বিকাল ৪ টা নাগাদ । উচ্চতা প্রায় ১২০০০ ফিট । সোনালি রোদ , আকাশে ত্রিশূল , নন্দাঘুন্টি  বিদ্যমান । অন্যদিকটা মেঘলা থাকায় এর বেশি পর্বতশৃঙ্গ দেখা গেলনা ।  এখানটায় ফরেস্টের টি হাট আর একটা ঝুপড়িও ছিল , যারা থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ছাড়াও ফোন করার সুবিধাও রেখেছিল ।  ইণ্ডিয়া হাইকসের  টেন্টেই আমাদের জায়গা হল । আমরা রোদে ঘাসের উপরে বসেই মুরি-বাদাম খেতে শুরু করি, চাও এসে যায় । ইহা’ বিরাট একটা দল রূপকুণ্ড করতে ব্যর্থ হয়ে বেদিনী ফিরল । একটা হাট রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার হচ্ছিল , আমরাও সেখানে আমাদের জিনিসেই   ডিমেরঝোল ভাত বানালাম । ওদের ক্যাম্প ফায়ারেও যোগ দিলাম । বেশ ঠাণ্ডা । টেন্টের মধ্যেও বেশ অস্বস্তি হতে লাগল । আমাদের স্লীপিং ব্যাগও হয়ত অধিক উচ্চতার জন্য উপযুক্ত ছিলনা, হয়ত বা আমরা উচ্চতা ও পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেবার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাইনি

                       # দিদিনা থেকে খুপাল টপ ওঠার পথে  #
# খুপাল টপে  ওঠার আনন্দে  #
# আলী বুগিয়ালে এ ছাতু খেতে বসে   # 
 #  আলী বুগিয়াল  #
# আলী বুগিয়ালের সম্পূর্ণ  দৃশ্য  #
# বেদিনী বুগিয়ালের প্রথম দৃশ্য  #
# সোমনাথ বেদিনী বুগিয়াল ক্যাম্পে  #


                                             # বেদিনি বুগিয়াল #

                              # বেদিনি বুগিয়াল থেকে ত্রিশুল পাহাড় #


০৭/০৭/১২ সারারাত দুজনেরই ভাল ঘুম হয়নি । সকালটা মেঘলা । নারায়নের কল্যাণে প্রাতঃরাশটা ওদের সাথেই হয়ে গেল । যদিও পেটরোগা দুজনেই তেল চপচপে পুরী-সব্জি ভক্তি করে খেতে পারলাম না । ফরেস্ট গার্ড এসে ৪২৫/- র পরচি কেটে গেল । এরা টেন্টের পয়সা চায়নি আর আমরাও দেইনি । আজ ৭ টা নাগাদ বেরলাম । হাওড়ার বন্ধুরা বেদিনীতেই থেকে গেল মানিয়ে নেবার জন্য । বেদিনী কুণ্ডের পাশের ছোট্ট মন্দিরে পুজা দেওয়া হল । বর্ষার পর কুণ্ডে যখন জল থাকে তখন নন্দাঘুন্টি আর ত্রিশূলের অসাধারন প্রতিফলন দেখা যায়। শুরুতেই দূরে পাহাড়ের খাঁজে যেখানে রাস্তাটা মিলিয়ে যেতে দেখা যায় সেটা ঘোড়ালোটানি । সামান্য চড়াই ভেঙ্গে সেখানে পৌঁছে গেলাম । এরপর সহজ লম্বা পথ পাথরনাচুনি পর্যন্ত । আমরা বিশ্রাম নিতে নিতেই এগচ্ছিলাম । এক বিদেশী দম্পতি যেন পাখির মত উড়ে গেল আমাদের টপকে ! পাথরনাচুনিতে ফরেস্ট হাট আছে , বেদিনীর মত একটা ঝুপড়িও আছে । এখান থেকে দেখা যায় সামনের পাহাড়ের মাথায় কলু বিনায়ক । কঠিন চড়াই । মনে আর হাঁটুতে জোর সঞ্চয় করে লড়াইটা শুরু করে দিলাম ! মাঝপথে ছাতু খাবার আছিলায় বেশ খানিকটা বিশ্রাম । পথের ধারে বরফ পেতে থাকলাম । কলু বিনায়ক এ ছোট্ট একটা মন্দির । মেঘলা আবহাওয়া । আকাশ পরিস্কার থাকলে এখান থেকেও দারুন দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় । এখান থেকে একটা সহজ পথ গিয়েছে বাগুয়াবাসা ক্যাম্পে । মে মাসে যারা এসেছিল তাদেরকে এখান থেকেই বরফ কেটে এগোতে হয়েছিল । আমরাও এই পথে মাঝেমধ্যেই বরফে ঢাকা পেলাম। তখন থেকেই সোমনাথের নার্ভাস হবার শুরু । প্রায় ৯ কিমি পথ ৯ ঘণ্টায় ট্রেক করে বিকাল ৪ টে নাগাদ পৌঁছলাম । বাগুয়াবাসার উচ্চতা প্রায় ১৪০০০ ফিটআবহাওয়া মেঘলা , তবুও ঠাণ্ডাটা ভালই লাগছিল । ইণ্ডিয়া হাইকসের টেন্টেই জায়গা হল ওদের স্লিপিং ব্যাগও পেলাম । এখানেও ফরেস্টের দুটি  হাট আছে   এই সময় ইহা  বিরাট দল রূপকুণ্ড করতে ব্যর্থ হয়ে খুব খারাপ অবস্থায় ফিরল যেন কোনরকমে প্রান নিয়ে ফিরতে পেরেছে তখনো আমরা দূরে দেখছিলাম আরও জন নামছিল আমরা তাদের নামাটা দেখছিলাম বড় দলটা ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেল বেদিনী উদ্দেশ্যে জানিনা ওদের এমন  বিদঘুটে সূচি হল কেন ! বাকি জন নামার পর দেখলাম দুজন ট্রেকার ব্যর্থ হয়ে বারবার বরফে আছাড় খেয়ে সম্পূর্ণ ভিজে শরীর নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে যেন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এল, বাকি দুজন গাইড এরাও একটু পরে লে গেল, জানিনা কি অবস্থা হয়েছিল তাদের ক্যাম্পের পাশের বরফের উপর আমি একটু পা-পাকিয়ে নিলাম ! কিন্তু কিছুতেই সোমনাথকে বরফের উপর  নিয়ে যেতে পারলাম না অন্য এক গাইড ভুবনও তার দলকে বরফে নিয়ে গেল। তাদের সাথে আমাদের একপ্রস্থ আলোচনা হল বিদেশীরা যাবেনা , আমরা দুই দলই যাব সোমনাথ হাল ছেড়ে দিয়ে পরদিন আমাকে একাই যেতে বল আবহাওয়া আরও খারাপ হতে থাকল আমরা তাঁবুর মধ্যে ঢুকে বাগুয়াবাসাতেও উচ্চকণ্ঠে রবীন্দ্রনাথকেই স্মরণ করতে লাগলাম , কখনো একলা চল রে বা কখনো ভেঙ্গে মোর ঘড়ের চাবি ! তাই শুনে বিদেশী পুরুষটি বাঁশি বাজিয়ে শোনাল । পরে জানলাম, ওনারা দার্জিলিং প্রবাসী , হিন্দি , বাংলাও জানে । আর ছিল নারী-পুরুষ মিলিয়ে দিল্লীর ৬ জন । আমরা তিনটে আলাদা দল একসাথেই খেলাম । শেষমুহুর্তে সোমনাথও সাহস সঞ্চয় করে “যা হয় হবে দেখা যাবে” মনোভাব  নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিল ।  পরদিন কাকভোরে যাত্রা শুরু হবে ঠিক হল ।

                         # বেদিনী কুন্ডের মন্দিরে পুজো #
# বেদিনী কুন্ড মন্দিরে  #
# শুকনো বেদিনী কুন্ড  #


                                    # বেদিনি বুগিয়ালে ভেড়ার পাল #



                         # পাথর নাচুনি  তে বসে দূরে  কলু  বিনায়ক  দেখছি  #

                                         # বাগুয়াবাসা ক্যাম্প #

                           # বাগুয়াবাসা ক্যাম্প থেকে নন্দাঘুণ্টি পাহাড় #

                            # বাগুয়াবাসা ক্যাম্প থেকে আমাদের গন্ত্যব্য #

                        # তুষারপাতের পরে বাগুয়াবাসা থেকে রুপকুণ্ড #

                                  # বাগুয়াবাসা থেকে রূপকুণ্ডের পথ #






০৮/০৬/১২ – ভোর ৪ টেয় ডেকে দিল । সারারাত তুষারপাত হয়েছে , যদিও ভোরের আবহাওয়া ভালই মনে হল ।  উঠে আমি দুটো কাজ করলাম , নিজের পেটে জ্বালানী ভরে নিলাম, আর রাস্তার জন্যও বানিয়ে নিলাম । জুতোয় ইহা’ ক্রাম্পন লাগিয়ে ৫ টায়  যাত্রা শুরু হল । গাইডদের কাছে বাকি নানা সরঞ্জাম । আমরা দুজন, দিল্লীর এক মহিলা সহ তিনজন আর ৪ জন গাইড মিলে মোট ৯ জন । আজকের পুরো পথটাই প্রায় চড়াই আর বরফে ঢাকা, তাই বেশ কঠিন । মাসখানেক পরে বরফ গলে যাবার পর আবার ততটাই সহজ । তখন এই পথে ব্রহ্মকমল , হেমকমল ইত্যাদি অধিক উচ্চতার পাহাড়ি ফুল দেখতে পাওয়া যায় ।   ওদের গাইড ভুবন আগে থেকে পথ বানাচ্ছিল বরফ কেটে । আমরা ওর পদাঙ্ক অনুসরণ করছিলাম । শুরু থেকেই আমরা পিছিয়ে ছিলাম । উচ্চতা নিয়ে আমাদের মনে একটা ভয় ছিলই । এর আগে বরফের উপরে হাঁটলেও সেটা ছিল বিনোদন , আর এখানে মুহূর্তের ভুলে প্রানসংশয় । মাঝপথে সোমনাথের আনা কোকা-৩০ একডোজ খেয়ে নিলাম দুজনেই ।  ঠিক ৭-৩০ টায় আমরা প্রায় একসাথেই রূপকুণ্ডের মন্দিরে পৌঁছলাম । উচ্চতা প্রায় ১৬০০০ ফিট ।  নিচে চারিদকে বরফের ঢালে ঘেরা  বরফাবৃত রূপকুণ্ড । সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় । সোমনাথ ষস্টাঙ্গে মন্দিরের সামনের বরফে শুয়ে পড়ল । এখানেও পূজা দেওয়া হল , প্রসাদ হল আমার আনা চিকি ! তারপর হটাৎ এক গাইড মোবাইলে দারুন একটা গাড়োয়ালী গান চালিয়ে দিয়ে নাচতে থাকল । আমিও তাতে যোগ দিলাম, এবং একে একে অন্যেরাও সেই স্বতস্ফূর্ত আবেগে ভেসে গেল । রূপকুণ্ড বা মিস্ট্রী লেকের গল্পটা গাইডই শোনাবে, আমি রহস্যই রেখে দিলাম ! আমাদের সৌভাগ্য আবহাওয়া তখন দারুন সুন্দর । আমরা ঠিক করলাম জোনারগলি পাসেও উঠব ।  সোমনাথ আর ওই মহিলা এক গাইডকে নিয়ে নেমে যাবে , বাকি ৬ জন উঠবো । স্বর্গের সিঁড়ি দিয়ে আমরা উঠতে শুরু করলাম । এক ঘণ্টায় পৌঁছেও গেলাম । উচ্চতা প্রায় ১৭০০০ ফিট ।  চারিদিকে ধবধবে সাদা বরফের উপরে দাঁড়িয়ে , নীলাকাশে সাদা পেঁজা তুলোর মত মেঘ । এত স্বর্গই ! এমন জায়গায় পৌঁছানর জন্য  মৃত্যুকেও তুচ্ছজ্ঞ্যান করা যায় । চোখের সামনেই নন্দাঘুন্টি আর ত্রিশূল । আর নিচে শৈলসমুদ্র পার করে এই দুই পর্বতের মধ্যে দিয়েই হোমকুণ্ড আর রন্টি স্যাডল যাবার পথ । সেখানে যেতে গেলে অগস্টে বা তার পরে আসতে হবে ।  আমার ছাতুমাখা আর ওদের আপেল ভাগ করে খাওয়া হল । এবার স্বর্গ থেকে বাস্তবে নেমে আসার কঠিন বাস্তবতা ! বরফের রাজ্য থেকে কর্কশ পাথুরে জমিতে ফিরে আসা । তবুও নামার সময়েও সাবধানের ত্রুটি ছিলনা । আমি অনেক দেরিতে সবার শেষে বাগুয়াবাসায় ফিরলাম ১০ কিমি পথ ৭ ঘণ্টায় হেঁটে , তখন বেলা ১২ টা । ফিরে দেখি হাওড়ার বন্ধুদের মধ্যে শুধু  সৌমাশীষ হাজির , মানসিক ও শারীরিক ভাবে বিদ্ধস্ত , বাকি তিনজন ওয়ান ফিরে গেছে । ওর তাঁবুতে বসেই আড্ডা মারতে লাগলাম । আমাদের পেয়ে বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠল । দিল্লীর দলটাও চলে গেল । আমরা থেকে যাব ঠিক করলাম । আসলে ওই বরফের রাজ্য থেকে ফিরতে মন চাইছিলনা । শুরু হল প্রবল তুষারপাত । খিচুরির সাথে তাঁবুর মধ্যে আমাদের আড্ডাও জমে উঠল । আলাপ হল ওর গাইড বিখ্যাত মোহন সিং বিস্ত এর সাথে ।  বাগুয়াবাসাতে আজ আমরা তিনজন মাত্র । রাত্রে ঠাণ্ডার প্রকপ থেকে বাঁচতে আমরা খালি হাটে গিয়ে ঢুকি  তিনজনেই ।  সৌমাশীষ তার মোবাইলে অঞ্জন দত্তের বান্ধবী নাটক টা শোনাল । অসাধারন পরিবেশে  অর্ণব - জয়িতার অনবদ্য প্রেমের গল্প ! পাহাড়কে যারা ভয়ডরহীন ভাবে ভালবাসে তাদের ভালবাসার খবর কেও রাখেনা । অথচ জীবনে গভীর আঘাত না পেলে পাহাড়কে এইভাবে হৃদয় দিয়ে জড়িয়ে ধরা যায়না ।

                           # আমাদের রূপকুন্ড জয়  #
# রূপ কুণ্ডের  মন্দিরে আরাধনা  #
# রূপ কুন্ডে  ওঠার আনন্দে  #    
# গাইড  নারায়ণের  সাথে আমরা  #
# অসাধ্য সাধন করার পর সোমনাথ  #
                                                         
                                        # রূপকুন্ডে সোমনাথ  #

                      # পরবর্তী গন্ত্যব্য  জোনার  / জোরয়ার গলি  পাস #
                                                                                                                                                                      
                                          # রূপকুন্ডে সোমনাথ  #

#  সম্পুর্ণ  রূপ কুন্ড  এলাকা  #
# রূপকুন্ড থেকে  #

                                         # রূপকুন্ডে ওঠা ও নামার পথ #
                     
                                         # রূপকুন্ডে ওঠার শেষ পথটুকু  #

                              # রূপ কুণ্ড থেকে  জোনার গলি পাস যাত্রা #

                              # রূপ কুণ্ড থেকে  জোনার গলি পাস যাত্রা #


                                   #  আমার  জোনার  গলি  পাস জয় #
                                     
                         # জোনার  গলি পাস  থেকে  মাউন্ট  নন্দাঘুন্টি #

                                       # জোনার  গলি পাস  থেকে #

                                  # জোনার  গলি পাস  থেকে  রূপকুন্ড  #

                               # জোনার  গলি পাস  থেকে  মাউন্ট  ত্রিশূল  #

                                 # জোনার  গলি পাস  থেকে  হোমকুন্ডের  পথ  #

                                        # জোনার  গলি পাস # 

                                         # জোনার  গলি পাস # 
  # জোনার  গলি পাস থেকে ফেরার সময় বরফের রাজ্যে # 
 # জোনার  গলি পাস থেকে ফেরার সময় বরফের রাজ্যে 

                                                 # রূপকুন্ড  থেকে ফেরার পথে  







০৯/০৬/১২ – এবার ফেরার পালাসকালে সামান্য কিছু খেয়ে ৭ টায় বেরলাম বাগুয়াবাসা থেকে । একি পথে বেদিনী পৌঁছোতে দুপুর । বৃষ্টিও ভোগাচ্ছিল । তুষারপাতও শুরু হয়ে গেল । খিচুরি খাওয়া হল । গাইড , বিশেষ করে ঘোড়ায়ালা বাগড়া দিলেও আমরা ওয়ানের পথে রওনা দিলাম । কারন একদিন বাড়লে হাজার খানেক টাকা গচ্চা যাবে । কঠিন উৎরাই পথ , সেটাও আবার বৃষ্টিভেজা শুকনো পাতায় বিছানো ।  এ যেন “ শুকনো পাতার সাজাই সরণি ...” ! দুজনেই বারকয়েক পড়তে-পড়তে কিম্বা মরতে–মরতে বেঁচে গেলাম !  ছোট্ট ফরেস্ট ক্যাম্প গাইরলি পাতাল পার করে , নীলগঙ্গা পার করে সামান্য চড়াই । দূর থেকে ওয়ান ফরেস্ট ক্যাম্প দেখে ভাবছিলাম পথ তাহলে ফুরাল , কিন্তু সেখান থেকেও গ্রাম নেকটাই দূর । ২১ কিমি  পথ প্রায় ১২ ঘণ্টা ট্রেক করে ৭টায় ওয়ান পৌঁছলাম । চা পান করার পরেও নারায়ণ যবার নাম করছিল না । রাত হয়ে যাওয়ায় পোর্টার গুড্ডু  মানতে চাইছিল না , ওকে ২০০/- বেশী দিয়ে বিদায় জানালাম ।  উচ্চতা ৮০০০ ফিট , এখানেও এক রাত কাটান যেত , কিন্তু আমরা নিরুপায় । এখান থেকে জীপ ভাড়াই করতে হবে, তাই ৮০০/- দিয়ে রাতেই লোহাজঙ পৌঁছে গেলাম । জিএমভিএন এ রাত কাটালাম । বিরাট ডর্মিতে আমরা দুজন মাত্র ১০০/- করে দিএ ।  ইহা’  আস্তানা নতুন দলে ভর্তি । নারায়ণকে ১০০/- বেশী দিয়ে আর বেঁচে যাওয়া মালপত্র দিয়ে বিদায় জানালাম ।

১০/০৬/১২ – গত কয়েকদিনে অনেক কষ্ট হয়েছে, বারবার জানতে চেয়েছি আর কতদূর , কতক্ষন সময় লাগবে ইত্যাদি । আজ ফেরার সময় মন চাইছে আবার সেই কষ্টের দুনিয়াতেই ফিরে যাই ।  লোহাজঙ  থেকে সকাল ৬-৩০ টায় দিল্লীগামী একটা বাস ছাড়ে । এটায় হলদোয়ানি যাওয়া যাবে । পরেরটা ৭-৩০ টায় কর্ণপ্রয়াগ । সময়ের গণ্ডগোলে আমরা সেটা পেলাম না । তবে সকালে শেয়ার জীপ পেলাম, বেলা হলেই ৮০০/- দিয়ে ভাড়া করতে হত । আমাদের ধারনা ছিল ৮/৯ দিন লাগবে রুপকুন্ড করতে, কিন্তু আমরা ৫ দিনেই করে ফেলি, যদিও ৬ দিন লাগে। দেবল থেকে ৯টায়  প্রেসের জীপে  কর্ণপ্রয়াগ । রুদ্রপ্রয়াগ , উখিমঠ হয়ে বেঁচে যাওয়া ছুটিতে  আমাদের গন্তব্য দেওরিয়াতাল–চোপতা–তুঙ্গনাথ ।   সে অন্য গল্প ।



অন্যান্য তথ্য :-

full map link - http://my.reset.jp/adachihayao/110813X02.jpg

ম্যাপ :- 


কিভাবে যাবেন – কলকাতা থেকে ট্রেনে হরিদ্বার বা হলদোয়ানি / কাঠগোদাম গিয়ে ভাড়ার গাড়ী বা বাস / জীপে  কর্ণপ্রয়াগ / থারালি হয়ে লোহাজঙ / ওয়ান । তারপর ৫/৭ দিনের ৭০ কিমি ট্রেক ।

স্থানীয় ব্যবস্থা – লোহাজঙ / ওয়ান এ গাইডরাই সব ব্যবস্থা করে দেবে । নরেন্দ্র সিং - 9012171505/৮৯৫৮১০৮৩৮১/৯৪১০৪৮০৩০৮ , নারায়ণ সিং – ৯৪১১৫৬৪৫৭৮ , মোহন সিং – 9012173647/৯৬৩৯২৮৬২৯২ ।

আনুমানিক খরচ - গাইড ৫০০/- , ঘোড়া সহ পোর্টার ৩৫০/- , রান্নার সরঞ্জাম ১০০/- , টেন্ট ১৫০/-  দৈনিক ।  পারমিট ৫০০/- । ৪ জনের দলের কলকাতা থেকে জনপ্রতি  খরচ ১০০০০/- । আমাদের ৮০০০/- পড়েছিল ।

উৎসব – ২০১৩ জুলাই-অগস্টে নন্দাদেবী রাজ জাট যাত্রা । প্রতি ১২ বছর অন্তর হয় । ওয়ান থেকে রূপকুণ্ড হয়ে হোমকুণ্ড পর্যন্ত ।

সঠিক সময় – মে’র শেষ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ।

ছবি – সৌজন্যে দীপঙ্কর রায় ও সোমনাথ দে ক্যামেরা – নিকন কুলপিক্স এল-২৪ ও এল-২০ । 

লেখক পরিচয় – বেসরকারি হাসপাতালের একাউন্টস বিভাগের প্রধান ( DGM , Accounts of Phenomenal Hospital & Research Centre, Latur ) , লাতুর , মহারাষ্ট্র কলকাতাকে কেন্দ্র করে বড় হয়ে উঠলেও গত ১০ বছর বাংলার বাইরে আছি । ঘুরতে ভালবাসি ।  একটা শেষ করে এসে পরেরটা নিয়ে ভাবতে শুরু করি ।  পূজায় ভার্সে-সিঙ্গালিলা-ফালুট এর তথ্য সংগ্রহ নিয়ে এখন ব্যস্ত ।




হাম্পির অন্দরমহলে ....


শীঘ্রই  আসিতেছে