ভূমিকা :- ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল সান্দাকফু যাব । কিন্তু হয়ে ওঠেনি । তার আগেই পায়েখড়ি হয়ে যায় তারকেশ্বর বা অযোধ্যা কিমবা বক্সা পাহাড়ে । বছর দশেক আগে আমার বাল্যবন্ধু বাপ্পা র সাথে প্লান করেছিলাম, ট্রেকার্স হাটও বুক হয়ে গেছিল। শেষ মুহুর্তে বাপ্পার কোনো অসুবিধার কারণে সেবার আর যাওয়া হয়নি । তাই মনের মধ্যে খিধে টা থেকেই গেছিল । ইতিমধ্যে আমরা অনেক আধুনিক হয়েছি , সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আড্ডা মারতে শিখেছি । অর্কুটের "ঘুড়তে ভালোবাসি " নামে একটা কম্যুনিটি তে আমরা আলোচনা করতাম । ২০১১ মে মাসে আমি প্রস্তাব রাখি পুজোর সময় সান্দাকফু যাবার । আমার ভাগ্নে - বন্ধু - ভ্রমন সঙ্গী সুব্রত ছাড়াও আরো অনেকে সাড়া দেয় । কলকাতায় তারা নন্দনে মিলিতও হয় । আমাদের আর এক বন্ধু শিল্পী কদিন আগেই সান্দাকফু ঘুরে এসেছিল, সেও শিখা সহ সবাইকে উৎসাহ ও ভরসা যোগায় । আমি লাতুর থেকেই সব খেয়াল রাখছিলাম । প্রিন্স টিকিট কাটার মুহুর্তে সরে যায় , বাড়ি থেকে ছাড়বেনা বলে । শিখা ও তার বন্ধু দীপাঞ্জন আর জয়দীপ টাকা জমা দেয় । সুব্রত আমাদের সবার টিকিট কাটে । তারপর থেকে আমাদের অন লাইন আড্ডাও বাড়তে থাকে । ঠিক হয় আমি যেদিন কলকাতা পৌঁছাব সেদিন আমরা মিলিত হব । সেটা দোসরা অক্টোবর , রবিবার ।আর আমরা বেরোব সাতই অক্টোবর , একাদশীর দিন ।
 |
| # কোজাগরী পূর্নিমার রাতে কান্চন্জন্ঘা পরিবার যেন শায়িত বুদ্ধ ! সৌজন্যে - সুব্রত রায় # |
১২/১০/১১ - শেরপা চ্যালেটের রুটিগুলোর কথা নিশ্চই সবাই মনে রেখেছে । সেই গোল পাউরুটির মত রুটি আর না সেদ্ধ হওয়া আলুর তরকারী খেয়ে আমরা ৭ টা নাগাদ রওনা দিলাম। সকালে সুর্যোদয়ের দৃশ্য ভালো দেখা যায়নি । তবে পরে এভারেস্ট , কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল । পথেই সান্দাকফুর হায়েস্ট পয়েন্ট । সেখানে আমি আর জয়দীপ উঠলাম । জয়দীপ গত কালেই এখানে উঠেছিল । সত্যিকারের সান্দাকফু জয় করা হলো। ইতিমধ্যে আমাদের গাইড শান্তা সবার প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছে । ও বিশেষ করে শিখা বহিনের খুব খেয়াল রাখছিল । তাই শিখাও পাহাড়ি ফুল দিয়ে শান্তাকে তার কৃতজ্ঞতা অর্পণ করলো । শান্তা দীপাঞ্জনের ব্যাগটা বইছে , আর শিখার হালকা ব্যাগটা নিজেরা বইছে । আজকের খুব লম্বা পথ। যদিও ফালুটে রিস্ক না নিয়ে আজ আমাদের মোলেতে রাখবে । আর মোলে গিয়ে ফালুটের জন্য চেষ্টা করবে। লম্বা পথ হলেও সোজা পথ । শুরুতেই রডডেনড্রন করিডোরের মধ্যে দিয়ে যেতে হলো। এপ্রিল মাসে এর শোভা দেখবার মত। এমনিতেও এই পথের শোভা খুবই মনোরম । তবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে এভারেস্ট আর কাঞ্চনজঙ্ঘাও মিলিয়ে গেছে। ছোট ছোট সবুজ পাহাড় , জঙ্গল , নীলাকাশ , সব মিলিয়ে দারুন ব্যাপার। জীপ গুল হিন্দী সিনেমার মত ছোট সবুজ পাহাড়ের উপর দিয়েই যাচ্ছিল , রাস্তা ছেড়ে । ড্রাই ফ্রুটস খাওয়া হল মাঝে। সোজা পথ হলেও ক্লান্তি ছিলই । তারমধ্যেও রড বসানো পা আর রুকস্যাক নিয়ে সুব্রত বেশ স্টেডী ছিল । দীপাঞ্জনকে নিয়েও চিন্তা ছিল , কিন্তু ও ও আস্তে আস্তে টেনে দিচ্ছে । শিখাও খুব বেশি হতাশ করছেনা । আমি আর জয়দীপ ঠিকই আছি । ঘন্টা সাতেক হাঁটার পর ১৫ কিমি দুরের সবরগ্রামের ফরেস্ট ক্যাম্পে পৌঁছলাম । সেখানে চা আর অদ্ভুত স্বাদের নুডুলস খাওয়া হল । এর পর মোলে ২ কিমি সহজ নামার পথ। শান্তা আগেভাগে চলে গেল থাকার জায়গা ম্যানেজ করতে । এসএসবির ক্যাম্পের লাগোয়া ট্রেকার্স হাট । সেখানে শান্তা অসাধ্য সাধন করে একটা রুম ম্যানেজ করেছে । পরে জানতে পারি সেটা অন্যদের বুক করা রুম ছিল। যদিও শিখা থাকায় কেও আর আমাদের বার করে দেয়নি। বাইরের হল ঘরটায় তখন ট্রেকার্স হাট এ সত্যিই ট্রেকার দের হাট বসেছে । যেটার উপর দিয়েই আমাদের বাইরে যেতে হচ্ছিল , যদিও টয়লেট টা ভিতরেই ছিল । শান্তার সাহায্যে আমরা বাঙালী কায়দায় মুড়ি মেখে বসলাম, সাথে চা। তারপর অবশ্য রামনামও করলাম । ২/৩ টা বাচ্চা কিছু ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে আসে । তাদের সাথে খানিক মজা করি । পরে দেখি হল ঘরে এসএসবির অফিসার সহ গোটা ২৫/৩০ ট্রেকার মিলে জমজমাট গানের আসর । ডিনার এর পর আমিও খানিকক্ষণ বসি সেখানে । সে যেন মিনি ইন্ডিয়া ! শিখারও থাকার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু তার পরামর্শ দাতারা তাকে নিষেধ করে। এতগুল ছেলে যদি খারাপ কিছু করে ! অথচ তারা পাহাড় প্রেমী , গানবাজনা করে ক্লান্তি কাটাচ্ছিল আর সেনাদের ও মনোরঞ্জন করছিল , তারা আমাদের মত মদ্যপ ছিলনা । আসলে পাহাড়ে এসেও অনেকে ক্লিশে শহুরে মানসিকতা ত্যাগ করতে পারেনা । ট্রেক রুটে এইসব সেনারাও কিন্তু মাঝে মধ্যেই সাহায্যের হাত বারিয়ে দেয় । বেশ ঠাণ্ডা ছিল মোলেতে । আমাকেই নিচে শুতে হল । ফালুটে জায়গা পাওয়া নিশ্চিত নয়, তবুও কাল আমরা সরাসরি গোর্খ্যে না গিয়ে আগে ফালুট যাব । শান্তার উপর আমাদের ভরসা ছিল ।
 |
# সান্দাকফু টপে #
# নিচে সান্দাকফু টপে জয়দীপ আর এভারেস্ট , সৌজন্যে - জয়দীপ রায় #
|
 |
| # সান্দাকফু টপ থেকে এভারেস্ট পরিবার # |
 |
| # বিষ ফুল # |
 |
| # ফালুটের পথে # |
 |
| # ফালুটের পথে বিশ্রাম ,
সৌজন্যে - জয়দীপ রায় # |
 |
| # আর পারিনা ! # |
 |
| # সামনের দুজনে টুর বই পড়ছে ! সৌজন্যে - জয়দীপ রায় # |
 |
| # ফালুটের পথে , সৌজন্যে - শিখা / দীপাঞ্জন বসু # |
 |
| #
ফালুটের পথে ইয়াক # |
 |
| # সবরগ্রামের ফরেস্ট ক্যাম্পে # |
 |
| # মোলে ট্রেকার্স হাট # |
 |
| # মোলেতে বাচ্চাদের সাথে শিখা # |
 |
| # মোলেতে গানের গু-গাঁ -মে -গ- করছি ! # |
১৩/১০/১২ - সকালে রুটি আলুভাজা খেয়ে বেরোতে ৮ টা বেজে গেল। তার আগে আশপাশটা একটু ঘুরে নিলাম । ক্যাম্পের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত বন্ধ থাকায় ট্রেকার্স হাটে আসা যাওয়ার জন্য নালা - নর্দমা পার হতে হয়। সবরগ্রাম হয়ে ফালুট ৯ কিমি হালকা চড়াই । ঘন্টা চারেকে আমরা পৌঁছে গেলাম। ফালুট সবুজ গালিচায় ঢাকা ন্যাড়া পাহাড়। দুটো থাকার জায়গা , ট্রেকার্স হাট আর ফরেস্ট বাংলো , ছাড়া আর কিছু নেই। প্রচন্ড হাওয়া। শান্তা কোথাও ম্যানেজ করতে পারলনা। ফরেস্টে একটা বেড ছিল , কিন্তু সেটাকে কেন্দ্র করে বা কিচেনে থাকার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলনা। তবে এখানে আমাদের দুপুরের খাওয়াটা হলো দারুন , ডাল - ভাত - অমলেট -সবজি , খিদের মুখে তা ছিল অমৃত সমান। শান্তা একটু তত্পর হলে বুকিং টা করতে পারত , কিন্তু ওর কাছে কেয়ার টেকারের নাম্বার ছিলনা। এই একবারই শান্তার উপরে আমাদের সন্দেহ হয়েছিল , ও ইচ্ছা করে করলনাত , কারন ওর ১৫ তারিখ অন্য গ্রুপ ধরার জন্য চিত্রে ফেরার তারা ছিল। নিরুপায় হয়ে আমরা বেলা দুটোর পর গোর্খ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ১৪ কিমি উতরাই পথ। এসএসবি ক্যাম্পের পাশ দিয়ে সহজ রাস্তা দিয়েই এগোতে থাকলাম। ক্রমশ উতরাই টাও বেশ কঠিন হতে থাকলো । দীপাঞ্জন আর শিখার জন্য বারবার বিশ্রাম নিতে হচ্ছিল। তবে পুরো পথটাই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে , বেশ রোমাঞ্চকর ছিল। সন্ধের মুখে আমরা গোর্খ্যে পৌছলাম । গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় বাংলায় লেখা থাকা - খাওয়ার সুবন্দোবস্তের বোর্ড ও দেখলাম। শান্তা আমাদের ব্যবস্থা করেছে ইডেন লজে , সেখানে পৌছাতে আরো কিছুটা সময় লাগলো। ৫ বোন মিলে লজটা চালায় শুনে উত্সুক হয়ে ছিলাম , কিন্তু কালা পোখরির মত খুশী হতে পারলাম না। আমাদের আলাদা একটা কটেজ দিল। ১০ ঘন্টা হাঁটার ক্লান্তি দূর করতে অনেকে গরম জলে স্নান করে নিল। সদ্যস্নাতা শিখার শরীর দিয়ে ফরেস্ট স্পাইস এর গন্ধে ঘরটা ম ম করে উঠলো। পায়ের ব্যথা সারাতে ঠান্ডা -গরম জলের স্যাঁক দেওয়া হল সবাই মিলে। শিখার অবস্থাই সবথেকে খারাপ ছিল। এখানেও শান্তা মুড়ি মাখার ব্যবস্থা করে দিল। জৌবারিতে সন্ধ্যায় শান্তা আসায় অনেকে বিরক্ত হয়েছিল , ভেবেছিল ফ্রী তে মদ খেতে এসেছে । ওকে নানা কথায় ভাগিয়ে দেওয়া হযেছিল । যদিও রাতের ঘটনার পর থেকে ও আমাদের আপন হয়ে গেছিল। কালাপোখরী তে আমি ওকে অফার করলে জানতে পারি ও মদে অভ্যস্ত নয় , যখন অন্য গাইডরা তুরং মস্তি করছিল। শান্তা একটু ভদ্র শিষ্ট প্রকৃতির , ওর প্রতি শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেছিল। তারপর থেকে শান্তা সবসময়েই আমাদের সঙ্গী হয়ে গেছিল। গোর্খ্যেতে আমাদের আসর বেশ জমে উঠেছিল , শান্তাও নেপালী গান গেয়ে শোনায় । এদিকে সুব্রতর মাত্রা বেশী হয়ে গেছিল , আর আমরা দেখতে পাই নতুন একটা যাত্রা পালা। শান্তা আমাদের খাবার রুমেই দিয়ে যায়। আমরা পরের দিনটা এখানেই কাটাব ঠিক করি। কোনরকমে রাত টা একসাথেই কাটাই।
 |
| # উপরে নিচে দুটোই মোলে থেকে ফালুটে ওঠার পথ # |
 |
| # উপরে নিচে দুটোই ফালুট ট্রেকার্স হাটের ছবি # |
 |
| # নিচের ছবিগুল ফালুট থেকে গোর্খ্যে যাবার পথের ছবি # |
 |
# আমাদের প্রিয় গাইড শান্তা # # উপরের লাল বর্ডারের ছবিগুলো বন্ধুদের তোলা # |
১৪/১০/১১ - সকাল সকাল ওঠার তাড়া ছিলনা । তবে সুব্রত সকালে উঠেই পাশের প্যারাডাইস হোটেলে চলে যায় , যাত্রা পালার জন্য ইডেনের মঞ্চ টা মনে হয় উপযুক্ত ছিলনা । ৬ দিন পর আজ সম্পূর্ণ বিশ্রাম । গোর্খ্যে থেকে ভিউ দেখা যায়না , কিন্তু এই ছোট গ্রামটা তার নিজের সৌন্দর্যেই মোহময়ী । গোর্খ্যে খোলা আর রাম্মাম খোলা মিলিত হয়েছে এখানে । এই রুটে গোর্খ্যেই আমার কাছে সবথেকে সুন্দর জায়গা । যে যার মত ঘুরছিলাম , ছবি তুলছিলাম । স্থানিও ভুট্টাও খাওয়া হল । আমি ঘুরতে ঘুরতে একেবারে নদীর পারে গিয়ে পৌঁছলাম , ট্রেকার্স হাটের পাশ দিয়ে । জায়গাটা একদম নির্জন , বেশ গা ছমছমে রোমাঞ্চকর পরিবেশ । ফিরে এসে আমাদের লজের পাশের গোর্খ্যে খোলায় স্নান করলাম আমি আর জয়দীপ , বিয়ার খেতে খেতে । ৭ দিন পর স্নান করলাম, জলটা দারুন ঠাণ্ডা ছিল , তবে গোর্খ্যেতে অত ঠাণ্ডা ছিলনা । স্নান করে ফেরার পথে দেখি শিখা সবার জন্য গাঁদা ফুলের মালা গেঁথে রেখেছে । বিকালে শান্তা আমাদের রাম্মাম খোলা পার করে সিকিমের মধ্যে নিয়ে গেল, যেদিকে রিদভি যাবার রাস্তা চলে গেছে । কিন্তু বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বেশী ঘোরা গেলনা, একটা কাঠের পরিতক্ত বাংলোয় আশ্রয় নিতে হল অনেকক্ষণ । তারপর সোজা ঘরে ফিরে সন্ধ্যার আসরে মেতে উঠলাম । আজ যাত্রা শুরু করল জয়দীপ । শান্তা কে নিয়ে পরল ও । আর বারবার একি কথা বলতে লাগল । ওর অফিস যাবার সময় দ্বিতীয় হুগলী সেতুতে যদি বাইক খারাপ হয়ে যায় , এদিকে ৩ কিমি ওদিকে ৩ কিমি , শান্তা এসে ওকে সাহায্য করবে কিনা ! বেচারি শান্তা সাহায্য করতে যাবে বলেও পার পাচ্ছিলনা । আর খেতে বসে সেই নিয়ে আমাদের সবার অট্টহাস্য । সেই হাসি সামলাতে না পেরেই শিখার আবার অসুস্থ হয়ে পরা । একেবারে যাতা অবস্থা । আমিও একবার বাইরে হাত ধুতে গিয়ে দরজার দিকে না গিয়ে অন্যদিক দিয়ে বেরতে গিয়ে প্রায় ধাক্কা খাচ্ছিলাম । সবাই মিলে আবার হাসি, আর ভাবল আমি আউট হয়ে গেছি । যাইহোক পরদিন আমাদের সকাল সকাল বেরতে হবে, কারন শান্তা আমাদের শ্রীখোলা পৌঁছে দিয়ে মানেভঞ্জন চলে যাবে ।
# আমার ক্যামেরায় নানাভাবে গোর্খ্যে #
১৫/১০/১১ - সকাল সকাল উঠে আমরা রওনা দিলাম শ্রীখোলার উদ্দেশ্যে । সামান্য চড়াই পার করে ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌছে গেলাম সামানদেন ভ্যালি তে । ছোট্ট ছবির মত গ্রাম। তারপর শুধুই নামা , আর সেটা বেশ কঠিন ই ছিল। তবে জঙ্গল আর ঝোরার পাশ দিয়ে পথটা খুব সুন্দর। আরো ঘন্টা খানেক পর আমরা পৌছলাম রাম্মামে । রাস্তার ধারেই একমাত্র হোটেল। সেখানে প্রাতঃরাশ করার জন্য আমরা অনেকটা সময় কাটালাম। এখানে অনেক ফুলের ছবি তোলা হল ।এরপর আমরা এগোলাম শ্রীখোলার দিকে। পথে মাঝে মধ্যেই ঝোরা গুলো মন ভরিয়ে দিচ্ছিল। এছাড়াও নানা জংলি ফুল - ফল নজর করছিল। নামার শেষ দিকটা খুবই ঢালু ছিল। প্রায় ১৫ কিমি রাস্তা আমরা ঘন্টা ছয়েকে হেঁটে বেলা ১২টা নাগাদ শ্রীখোলাতে পৌঁছে গেলাম। এখানে রাম্মাম খোলা আর শ্রীখোলা মিলিত হয়েছে । নদীর এপারে ট্রেকার্স হাট থাকার মত অবস্হায় ছিলনা আর তার কেয়ার টেকারের হোটেল গোপারমা লজ বা ব্যানার্জী লজ আমাদের পোষালো না । শান্তা আমাদের সেতু পার করে কিছুটা এগিয়ে হোটেল শোভরাজে নিয়ে গেল। একেবারে নদীর ধরে সুন্দর পরিবেশে হোটেলটা। বাগুইহাটির শুভাশিস সেনগুপ্ত স্ত্রী পুত্র
নিয়ে পারিবারিক ব্যবসা চালাচ্ছে। তবে আমরা কোনের যে ঘরটায় ঢুকলাম সেটা খুব একটা সুবিধার ছিলনা। এবার শান্তার বিদায়ের পালা। সবারই চোখ ছল ছল । শান্তাকে তার হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে আরো ১০০০/- অতিরিক্ত দেওয়া হলো। এক'দিনের ঘটনাবহুল ট্রেকে শান্তার একটা বিশেষ ভূমিকা ছিল। আর ওর চলে যাওয়া দেখে আমাদের ও মনে পরে যায় যে ট্যুর টা শেষ হতে চলেছে। তাই বিদায় বেলায় একটা মর্মস্পর্শি আবেগ তৈরী হলো। আর তাই দীপাঞ্জনের চোখ থেকে বিসমিল্লার করুন সুর অঝোরে ঝোরে পড়ল। মনটাকে তাজা করতে একটু বিয়ার পান। সবাই হোটেলের গরম জলের অলসতায় গা ডুবিয়ে দিলেও আমি পাশের নদীতেই স্নান করতে যাই। জলটা যেমন ঠান্ডা তেমনই খরস্রোতা ছিল ,তাই মন ভরে স্নান করা গেলনা। বাঙালী খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম। সন্ধ্যায় আবার মুড়ি - চানাচুর , সাথে রাম ! হোটেল থেকেই পরদিন সকালের শেয়ার জীপ বুক করে নিয়েছিলাম। শান্তাও রিম্বিকের জীপ বুকিঙ এর নাম্বার দিয়ে গেছিল। পরে জানতে পারি শান্তাও আর জীপ পায়নি অত বেলায় , রিম্বিকেই থেকে গেছে , পরদিন সকালে ফিরবে। ডিনার করার পরে শিখা - সুব্রত মিলে একটা নাটক শুরু হয়ে যায় । সেই নাটক টা মনে হয় আজকের জন্য অপ্রতুল ছিল , তাই শোবার সময় সেটা সম্পূর্ণ করে দেয় দীপাঞ্জন। ওকে নিয়েই মাঝরাত হয়ে যায়। তাই মধ্যরাতে জয়্দীপের জন্মদিন টাও সেই ভাবে উদযাপন করা গেলনা। এদিকে পরদিন আবার একদম ভোরে বেরোতে হবে।
 |
| # গর্খ্যে থেকে রাম্মামের পথে # |
 |
| # সামানদেন ভ্যালি # |
 |
| # সামানদেন ভ্যালি # |
 |
| # সামানদেন ভ্যালি # |
 |
| # গর্খ্যে থেকে রাম্মামের পথে # |
 |
| # রাম্মাম এর হোটেল # |
 |
| # রাম্মাম এর হোটেল # |
 |
| # রাম্মাম এর হোটেল # |
 |
| # রাম্মাম এর হোটেল এর ফুল # |
 |
| # রাম্মাম থেকে শ্রী খোলার পথে # |
 |
| # রাম্মাম থেকে শ্রী খোলার পথে # |
 |
| # রাম্মাম থেকে শ্রী খোলার পথে # |
 |
| # রাম্মাম থেকে শ্রী খোলার পথে #
|
 |
| # শ্রীখোলা ট্রেকার্স হাট # |
 |
| # শ্রীখোলা সেতু # |
 |
| # শ্রীখোলা গোপারমা লজ # |
 |
| # শ্রীখোলা শোভরাজ লজ # |
 |
| # আমি আর শান্তা # |
 |
| # শোভরাজ লজের মালিকের সাথে # |
 |
| # হে বন্ধু বিদায় # |
 |
| # শ্রীখোলাতে স্নানের সময় # |

১৬/১০/১১ - কাকভোরে উঠে আমরা তৈরি হয়ে নিলাম । ঠাণ্ডায় সকালে ওঠাটা খুবি কষ্টের । হোটেলের মালিক নিজে আমাদের সাথে সেপি এসে জীপে বসিয়ে দিলেন । শ্রীখোলা থেকে আধ ঘণ্টার মত হাঁটা পথ সেপি । রিম্বিক পর্যন্ত রাস্তা খুবি বাজে । তারপর ধত্রে তে অনেকক্ষণ দাঁড়াল । আমরাও টুকটাক কিছু খেলাম । এই ধত্রে থেকে হেঁটে তুম লিং পৌঁছান যায় । এরপর সুখিয়া বাজার , ঘুম হয়ে আমরা ১১ টা নাগাদ দার্জিলিং পৌঁছলাম । ম্যাল এ কিছুটা সময় কাটিয়ে , কিছু কেনাকাটা করে আমরা সাঙ্গগ্রিলা তে খেতে ঢুকি । স্বাভাবিক ভাবেই শিখা দেখে বেশী কেনে কম । তারমধ্যে জৌবারি তে মালকিনের পরা নেপালি পোশাক কিনতে চেয়েছিল , কিন্তু মনমত না পাওয়ায় কেনা হয়নি । সাঙ্গগ্রিলা তে আমাদের জন্মদিনের পার্টি হয়ে গেল । শিলিগুরির উদ্দেশ্যে বেরতে ৩ টে বেজে গেল । রাস্তায় গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়ে চিন্তা বারিয়ে দেয় সবার । আমি নিশ্চিন্তে গাড়িতেই বসে ছিলাম । সারানোর পরে গাড়ি আন্ধকারে পাহাড়ি পথে বিপদজনক ভাবে নামতে থাকল। সেই পথে আবার ট্র্যাফিক জ্যাম । যাইহোক , আমরা শেষ পর্যন্ত দার্জিলিং মেল পেলাম । তিন মাস ধরে জয়দীপ আর এ সি টিকিটের জন্য মাথা খেয়েছিল , সেই টিকিটও কনফার্ম হয়ে যায় ।
 |
| # দার্জিলিং ম্যালে আমরা # |
 |
| # দ্য লাস্ট ডিনার , সৌজন্যে - জয়দীপ রায় # |
 |
| # সেই দুশ্চিন্তার মুহূর্তে , সৌজন্যে - জয়দীপ রায় # |
 |
| # দার্জিলিং মেলে আমরা # |
১৭/১০/১১ - সময়মত সকালেই আমরা শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে যাই । সবার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় বেশ খারাপ লাগছিল । আমাদের সফরে অনেক অনিশ্চয়তা ছিল , অনেক কষ্ট ছিল , অনেক ঘটনা ছিল , তবুও আমরা সবাই অপেক্ষা করে থাকব কবে আবার পাহাড়ের বুকে ফিরে যাবার জন্যে ।
অন্যান্য তথ্য :-
ম্যাপ -
কিভাবে যাবেন – কলকাতা থেকে রাতের ট্রেনে সকালে নিউ জলপাইগুড়ি । সেখান থেকে বা শিলিগুড়ি জংশন থেকে শেয়ার বা ভাড়া করা জীপে মানেভঞ্জন । তারপর ৭ দিনের ৭০ কিমি ট্রেক ।
স্থানীয় ব্যবস্থা – গাইড এসোসিয়েসন প্রধান দেন্ডুপ ভুটিয়া - ৯৭৩৪০৫৬৯৪৪ / ৯৩৩৩৯৯৩৯১৩ / bhutiadendup@yahoo.com. , জীবনদা - ৯৭৩৩০৪৪৫১২, গাইড শান্তা কুমার গোল্যে - ৯৬৩৫২৮৮২৯২, সান্দাকফুতে শেরপা চ্যালেট - ৯৯৩৩৪৮৮১৫৯, শ্রীখলা শুভাশিস সেনগুপ্ত - ৯৯৩৩৪৮৮২৪৩ / ৯৯৩২২১৬১৯৭ / hotelshovraj@yahoo.com. রিম্বিকে জীপ কাউন্টার - প্রভু প্রধান - ৯৭৩৩১৭৭৮০৯.
আনুমানিক খরচ - গাইড ৩৫০/- , পোর্টার ৩৫০/- , ক্যামেরা চার্জ - ১০০/-, ফরেস্ট পারমিট - ১০০/- . কলকাতা থেকে জনপ্রতি ৬০০০/- খরচ হবে ।
উৎসব – বিভিন্ন সময়ে বাইকিং , সাইক্লিং , ম্যারাথন হয় ।
সঠিক সময় – মার্চ থেকে মে , অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ।
ছবি – সৌজন্যে দীপঙ্কর রায়, শিবশঙ্কর সাহা ,সুব্রত রায় , জয়দীপ রায়, দীপাঞ্জন বসু । ক্যামেরা - অলিম্পাস ।
লেখক পরিচয় – বেসরকারি হাসপাতালের একাউন্টস বিভাগের প্রধান ( DGM , Accounts of Phenomenal Hospital & Research Centre, Latur ) , লাতুর , মহারাষ্ট্র । কলকাতাকে কেন্দ্র করে বড় হয়ে উঠলেও গত ১০ বছর বাংলার বাইরে আছি । ঘুরতে ভালবাসি । একটা শেষ করে এসে পরেরটা নিয়ে ভাবতে শুরু করি ।