ঘুরতে ভালবাসি - একটি বাংলা ভ্রমন বৃত্তান্ত ।

Friday, August 3, 2012

বিষ্ণুপুর - মুকুটমনিপুর - মাইথন

রাঙা মাটির দেশে লো ......




ভূমিকা :- পুজোয় ছুটিতে বাড়ি গিয়ে অনেক আগে থেকেই নানা পরিকল্পনা ছিল । তারমধ্যে প্রধান ছিল পূজার পরে সান্দাকফু যাওয়া । আর আমার পূজো বলতে নবমী আর দশমী । তাই তার আগেও আমার ভাগ্নে - বন্ধু - ভ্রমণ সঙ্গীর সাথে বাংরিপশি যাবার প্ল্যান ছিল । আর ছিল অর্কুট এর নানা কম্যুনিটির গেট-টুগেদারে যোগ দেওয়া । আর তাই আমি লাতুর থেকে হায়দ্রাবাদ হয়ে কলকাতায় ফিরে আমার গ্রামের বাড়িতে না গিয়ে সোজা সুব্রতর বাড়িতে গিয়ে উঠি আগের বারের মতই । দুপুরে ভালোমন্দ বাঙ্গালী খাবার খেয়ে লম্বা ঘুমিয়ে পড়ি । শিবদা গাড়ি নিয়ে এসে ডাক দেয় । আমি, সুব্রত আর শিবদা রওনা দেই মোহরকুঞ্জের উদ্দেশ্যে । কিন্তু দেরী হয়ে যাওয়ায় আগের  "আড্ডাবাজ বাঙ্গালী " দের গেট-টুগেদার টা মিস করি । আমাদের " ঘুড়তে ভালবাসি " কম্যুনিটির  গেট-টুগেদার টা অবশ্য ভাল ভাবেই হল। সবার সাথেই আমার প্রথম বার দেখা হল । আড্ডা - খাওয়া হল । তারপর প্রিন্স আর অনুনয় চলে গেল । আমি, সুব্রত,দীপাঞ্জন ,শিখা আর আয়ুশ শিবদার গাড়িতে শিবদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । জয়দীপ ওর বাইকে করে আসছিল । রাস্তায় বিরিয়ানি তোলা হল । কিন্তু সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতে সুব্রত গাড়ি থেকে নেমে চলে গেল, অনেক অনুরোধেও আর এলনা । অগত্যা ওকে ছাড়াই আমরা এগিয়ে গেলাম । শিবদার কাছে  ব্ল্যাক ডার্ক ছিল। সেটা আমরা গলায় ঢালতে শুরু করলাম । সাথে বিরিয়ানি । ইতিমধ্যে ঠিক হয়ে গেছে কাল আমি শিবদাদের সাথেই বেরিয়ে যাব ঘুড়তে । শিবদা তারপর একে একে সবাইকে তাদের সুবিধা মত জায়গায় নামিয়ে আমাকে নিয়ে সুব্রতর বাড়ি গেল। তখন প্রায় রাত ১ টা বাজে । আমার মালপত্র নিয়ে শিবদার বাড়িতে চলে এলাম । রাতটা কোন রকমে কাটালাম । ঘুম তেমন হলনা, শুধু শরীর টা ফেলা গেল কিছুক্ষনের জন্য , এই যা । কারন ঘণ্টা খানেক পরেই আমাদের বেরিয়ে পরতে হবে ।
                                      # মোহর কুঞ্জের মিলন মেলায় # 


০৩/১০/১১ - কাকভোরে উঠে আমি আর শিবদা বেরিয়ে পরলাম । শিবদার বাড়িটা যাদবপুরেরে এক গলিতে , সেখান থেকে হেঁটে মেন রাস্তায় গেলাম। কিন্তু কিছুই বুঝলাম না কারন কলকাতার এই দিকটা আমার ঠিক চেনা নয় । সোমনাথ , প্রলয় আর স্বপন দা ট্যাক্সি নিয়ে এসেগেল। আমরা হাওড়া গেলাম। তারপর ট্রেনে করে বিষ্ণুপুর । ক্লান্ত থাকায় আমি ঘুমিয়েই কাটালাম । স্টেশনে নেমে ফ্রেশ হয়ে এক দাদুর কাছ থেকে ঘোরার আইডিয়া নিয়ে নিলাম । এও টের পেলাম যে আমার ক্যামেরাটা আনিনি । হয়ত শিবদার বাড়িতে বা গাড়িতে ফেলে এসেছি । তাই সব ছবিই সোমনাথ আর প্রলয়ের ক্যামেরায় তোলা । তবে এখানে ওদের ক্যামেরায় আমার তোলা ছবিও দেওয়া আছে  । শিবদার চেনা হোটেলের উদ্দেশ্যে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু ভালই দূর ছিল । পথে কটকটির মোয়া খাওয়া হল। একটা বড় দিঘীর কাছেই আমাদের হোটেল টা ছিল । আলস্যে অনেকটা সময় কাটিয়ে তারপর স্নান খাওয়া করে আমরা একটা অটো তে করে ঘুরতে বেরলাম । একে একে আমরা বিষ্ণুপুরের সব ঐতিয্যশালী টেরাকোটার কারুকার্য খচিত মন্দির দেখলাম। সাথে দল মাদল কামান  , গুমটি ঘড় আর লালদিঘিও দেখলাম । তারপর হোটেলে ফিরে একটু মদ্যপান । তারপর ডিনার করে শুয়ে পরা । কারন পরেরদিনেই আবার সাত সকালে বেরতে হবে। 



# হাওড়া ষ্টেশনে # 
# বিষ্ণু পুর স্টেশনে #
# বিষ্ণুপুর স্টেশনে  দাদুর সাথে #
# বিষ্ণুপুর  হোটেলের পথে #
# বিষ্ণুপুরের মূল আকর্ষণ রাসমঞ্চ  #
# দলমাদল কামান আর প্রলয় #
# গুমটি ঘর নিয়ে ভয়াবহ গল্প আছে #
# পাড়ে দাঁড়িয়ে লালদিঘীর ইতিহাস শুনছি #
# জোরবাংলা মন্দির  #
# টেরাকোটার উপহার সামগ্রী  #



০৪/১০/১১ - অষ্টমীর সকাল । আমি শুয়েই ছিলাম কেও কেও রাস্তায় বেরিয়ে ঘুরে আসে । যদিও বেশিক্ষণ শুয়ে থাকা গেলনা । কারণ আজ আমাদের লম্বা সফর । বাসের জন্য বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো তারপর দূর্গাপুর গামী বাসে চেপে আমরা দূর্গাপুর মোড়ে নামলাম । বাসে শিবদা গান বাজনা জুড়ে দিয়েছিল আমি ঘুমিয়েই কাটাই । এখানেই আমরা নাস্তা করলাম । একটা ছৌ নাচের দল যাচ্ছিল তাদের সরঞ্জাম দেখলাম । এখান থেকে একটা বাসের মাথায় চেপে আমাদের যাত্রা শুরু হলো দারুন উপভোগ করলাম বাপারটা । খাত্রায় নেমে আমাদের অন্য বাস ধরতে হলো এবার অবস্য বাসের মধ্যেই ছিলাম । ১১টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম মুকুটমনিপুর । লেকটা সামান্য ঘুরে , হোটেলে খাবার অর্ডার দিয়ে আমরা বিয়ার নিয়ে নেমে গেলাম কংসাবতীর কোলে ।বছর দশেক আগে আমার বন্ধু বাপ্পার সাথে এখানে এসেছিলাম । সেবার নদী খাতে নামা হয়নি , কিন্তু লেকটা ভালো ভাবে ঘুরেছিলাম । দুদিন ছিলাম আর কুমারী নদী ও কংসাবতীর সংগম পার করে বনপুকুরিয়া ডিয়ার পার্কেও গেছিলাম । তারপর পিয়ারলেস রিসর্টের পাশ দিয়ে ভ্যান এ চেপে একটা দারুন জায়গায় গেছিলাম, ছোট ছোট টিলা আর শাল-পিয়ালের জঙ্গলে ঘেরা । কোনও এক বাঙ্গালী নেতার বাড়িও ছিল , নামটা আজ আর মনে নেই । গেছিলাম খানিক দূরে গরাবারি এলাকায় । জমজমাট এলাকা সেটা , একটা মন্দির ও ছিল জৈনদের ।  যাইহোক বাস স্ট্যান্ড থেকে একটু ছোট্ট ট্রেক করে নদী খাতে পৌঁছলাম । প্রথমে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পরে পাথুরে পথে নেমে নদীখাতের একটা ঝর্ণায় বিয়ার খেতে খেতে ঘণ্টা খানেক স্নান করলাম । তারপর পাশের একটা রক ফেসে ক্লাইম্বিং করলাম সবাই মিলে। পান দা , মানে স্বপন দা সবসময় মুখে পান পুরে রাখত বলে অই নাম , আসেনি, খাবার হোটেলেই বসে ছিল । তারপর আমরা আবার খাতরা - বাঁকুড়া হয়ে আসানসোল পৌঁছলাম । প্রচুর অ্যাড শোনা বি এন ঘাঁটি র দোকানের পাশের গলিতে এক হোটেলে উঠলাম । ড্রাই ডের কবলে পড়ে আমি আর প্রলয় প্রায় সারা আসানসোল ঘুরে হাই রোডে গিয়ে হার্ড ড্রিঙ্ক নিয়ে আসি । বাঁকুড়া থেকে স্বপন দা চলে যাওয়ায় আমরা পঞ্চপাণ্ডব থেকে চারমূর্তি হয়ে যাই !
# হিরো নাম্বার ওয়ান বিষ্ণু পুরের হোটেলে #
  # অষ্টমীতে দণ্ডী কাটছে  বিষ্ণুপুরের রাস্তায় #
#  বিষ্ণু পুরের দিঘীর পাশে আমাদের অপেক্ষা #
# আর শিব দার কেরামতি  #
# দুর্গা পুর মোড়ে আমরা  #
#  ছহউ নাচের মুখোশ  #
# খাতরা র পথে বাসের মাথায় পান দার গান  #
# খাতরা র পথে  #
# এখন শুধু মুকুট মনিপুর  #
# সোমনাথ #
# শিবদাকে তুলছি আমি #
# আর এই সেই কেত মারা শিবদা  #
# প্রলয় #
# উপরে সবি মুকুট মনিপুর লেকের ছবি  #
# জঙ্গলের পথে আমরা #
# পাথুরে পথে আমরা #
# স্নানের দৃশ্যে আমরা ( এ ) #
# স্নানের পরে আমাদের পর্বতারোহণ  #
# একদম শেষ ধাপে আমি  #
# তারপর দিলাম ঝাঁপ ! #
# বাকিদের প্রচেষ্টা  #
# খাবার তেমন ভাল নয় #
# আদিবাসিদের পরব  #
# বাসের ছাদে তখন বাঁকুড়ায়  #


০৫/১০/১১ - সকাল সকাল আমরা রেডী হয়ে বেরলাম । বাস স্ট্যান্ডে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো । মিনি বাসে চেপে মাইথন পৌঁছতে ঘন্টা খানেক লাগলো । নৌকাবিহার না করলে এখানে বেশী ঘোরার সুযোগ নেই । দোকানে বসেই কাটালাম অনেকক্ষণ । নাস্তাও করা হলো । তারপর হেঁটেই ভান্ডার পাহাড়ে গেলাম আর ট্রেক করে পাহাড়ের মাথায় উঠলাম । বেশ ভালই খাড়াই ছিল । পাহাড়ের মাথায় অনেকক্ষন সময় কাটালাম । ড্যামের অনেকটা দেখা যায় পাহাড়ের মাথা থেকে । পাহাড় থেকে নামার পর আমরা বাস বা জিপের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম । প্রলয় আর সোমনাথ একটু এগিয়ে কল্যানেস্বরী মন্দিরে গেল । নবমীর দিনে মন্দিরে বলি হয়, লোকে লোকারন্য । আসানসোলে ফিরতে বেশ মেহনত করতে হলো । মাঝে কোথাও খেয়ে নিয়েছিলাম । তারপর দূর্গাপুর আর সেখান থেকে ঝড়ের   বেগে চলা বসে কলকাতা পৌঁছলাম । শিবদার  বাড়ি যেতেই হলো । ছবিগুলো ল্যাপি তে নিয়ে নিলাম । ক্যামেরাটাও পেয়ে গেলাম গাড়ির মধ্যে ।  তারপর  বাড়ি ফিরতে গিয়ে শিয়ালদায় আমার পার্স খোয়া গেল । পুজোটা তাই ভিখারীর মত কাটাতে হলো প্রায় । আর বাড়ি ফিরতে এত দেরী হয়ে গেল যে পুজো প্যান্ডেলে নবমীর নাচ  ধরতে পারলাম না। 

                   # আসানসোলের হোটেলে সোমনাথ , আমি আর প্রলয়  #
# আসানসোল বাস স্ট্যান্ডে #
# মাইথন ড্যাম  #
# ভাণ্ডার পাহাড়ের পথে  #
# ভাণ্ডার পাহাড় থেকে মাইথন  #
# ভাণ্ডার পাহাড়ে একে পেলাম  #
# ভাণ্ডার পাহাড় আর শিব দা   #
# ভাণ্ডার পাহাড় থেকে মাইথন  #
#  আমাদের ভাণ্ডার পাহাড় জয়   #
# কল্যানেস্বরি মন্দির  #
# দুরগাপুর সিটি সেন্টার  #
# কলকাতায় নবমির রাতে   #


অন্যান্য তথ্য  ঃ  -

ছবি - সৌজন্যে প্রলয় , সোমনাথ দে , দীপঙ্কর রায় । লাল বর্ডারের ফ্রেম সোমনাথের নিকন ক্যামেরায় আর কালো বর্ডারের ফ্রেম প্রলয়ের সনি ক্যামেরায় তোলা । 

কিভাবে যাবেন - বিষ্ণুপুর যাবার জন্য কলকাতা থেকে সরাসরি প্রচুর ট্রেন ও বাস পাওয়া যাবে । মুকুটমনিপুর যাবার জন্য সরাসরি বাস পাওয়া যাবে অথবা বাঁকুড়া পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে বাসে যাওয়া যেতে পারে । আর মাইথন যাবার জন্য বাসে বা ট্রেনে আসানসোল গিয়ে সেখান থেকে বাস ধরাই ভাল । 

কোথায় থাকবেন - বিষ্ণুপুরে থাকার জন্য প্রচুর বেসরকারি সাধারন মানের হোটেল আছে , আর আছে সুন্দর একটা ট্যুরিস্ট লজ । মুকুটমনিপুরে  ট্যুরিস্ট লজ , ইয়ুথ হোস্টেল , সরকারি বাংলো ছাড়াও নানা ধারনের বেসরকার হোটেল পাওয়া যাবে। মাইথনে বরং থাকার জায়গা অপ্রতুল । দু একটি থাকার জায়গা আছে । 

সঠিক সময় - গ্রীষ্ম কাল টা বাদে , বর্ষা ,শীত বা বসন্তে ভালই লাগবে । 

No comments:

Post a Comment