ঘুরতে ভালবাসি - একটি বাংলা ভ্রমন বৃত্তান্ত ।

Tuesday, July 24, 2012

শায়িত বুদ্ধের কোলে সান্দাকফু তে .....

 < শায়িত বুদ্ধের কোলে  সান্দাকফু তে  >

বিঃদ্রঃ > নীচের ছবিতে ক্লিক করলে ছবিগুল বড় আকারে ও পরপর দেখা যাবে । 



ভূমিকা :- ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল সান্দাকফু যাব । কিন্তু হয়ে ওঠেনি । তার আগেই পায়েখড়ি হয়ে যায় তারকেশ্বর বা অযোধ্যা কিমবা  বক্সা পাহাড়ে । বছর দশেক আগে আমার বাল্যবন্ধু বাপ্পা র সাথে প্লান করেছিলাম, ট্রেকার্স হাটও  বুক হয়ে গেছিল। শেষ মুহুর্তে বাপ্পার কোনো অসুবিধার কারণে সেবার আর যাওয়া হয়নি । তাই মনের মধ্যে খিধে টা  থেকেই গেছিল । ইতিমধ্যে আমরা অনেক আধুনিক হয়েছি , সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আড্ডা মারতে শিখেছি । অর্কুটের  "ঘুড়তে  ভালোবাসি " নামে একটা কম্যুনিটি তে আমরা আলোচনা করতাম । ২০১১ মে মাসে আমি প্রস্তাব রাখি পুজোর সময় সান্দাকফু যাবার । আমার ভাগ্নে - বন্ধু - ভ্রমন সঙ্গী সুব্রত ছাড়াও আরো অনেকে সাড়া দেয় । কলকাতায় তারা নন্দনে মিলিতও হয় । আমাদের  আর এক বন্ধু শিল্পী কদিন আগেই সান্দাকফু ঘুরে এসেছিল, সেও শিখা সহ সবাইকে উৎসাহ ও ভরসা যোগায় ।  আমি লাতুর থেকেই সব খেয়াল রাখছিলাম । প্রিন্স টিকিট কাটার  মুহুর্তে সরে যায় , বাড়ি থেকে ছাড়বেনা বলে । শিখা ও তার বন্ধু দীপাঞ্জন আর জয়দীপ টাকা জমা দেয় । সুব্রত আমাদের সবার টিকিট কাটে । তারপর থেকে আমাদের অন লাইন  আড্ডাও বাড়তে থাকে । ঠিক হয় আমি যেদিন কলকাতা পৌঁছাব সেদিন আমরা মিলিত হব । সেটা দোসরা অক্টোবর , রবিবার ।আর আমরা বেরোব সাতই অক্টোবর , একাদশীর দিন ।


আমাদের পরিকল্পিত সূচী 

০৭/১০/১১  : রাত্রে দার্জিলিং মেল
০৮/১০/১১ : চিত্রে 
০৯/১০/১১ : তুমলিং 
১০/১০/১১ : কালাপোখরী  
১১/১০/১১ : সান্দাকফু 
১২/১০/১১ : ফালুট 
১৩/১০/১১ : গোর্খ্যে 
১৪/১০/১১ : শ্রীখোলা 
১৫/১০/১১ : অতিরক্ত দিন 
১৬/১০/১১ : রাত্রে দার্জিলিং মেল 
১৭/১০/১১ : সকালে কলকাতা 

টিকিট কাটার  পরবর্তী তিন মাসে আরো অনেক কিছু ঘটে গেছে ।আমি নেট ঘেঁটে বা বন্ধুদের কাছ থেকে খবর সংগ্রহ করেছি । মানেভঞ্জনের মাস্টারজী  জীবনদার সাথে কথা বলি । ঘড়ের ব্যাপারে  একটু চিন্তায় ফেলে দিলেও চলে আসতে বললেন ।সান্দাকফু রুটে ট্রেকার দের কাছে অতি পরিচিত এই জীবনদা । এর কথা আমি জানতে পারি আমার নেট এর বন্ধু সাম্য রায় এর ব্লগ থেকে । ওদের গাইড পিটার কেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করি , কিন্তু পাইনি । দোসরা অক্টোবর এ নির্দিষ্ট সময়েই আমরা মোহরকুঞ্জে মিলিত হই । তার আগে ওখানেই "আড্ডাবাজ বাঙ্গালী " দেরও জমায়েত ছিল, দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ায় আসতে দেরী করে ফেলি, তবুও যার সাথে আমার বেশী বন্ধুত্ব সেই  জবা অপেক্ষা করে ছিল, আর যারা চলে গেছিল তাদের মধ্যে হেমু আর লোপার সাথে পরে একদিন জবার বাড়িতে লাঞ্চে দেখা হয়েছিল । আমরা ৫ জন ছাড়াও আরো অনেকে এসেছিল। শিবদার  বাড়িতে বসে নৈশ আহার দিয়ে যার শেষ হয় । ইতিমধ্যে মতবিরোধ হওয়ায় সুব্রত রাগ করে চলে যায় , আর সন্দাকফুতেও যাবে কিনা অনিশ্চিত । আমার সাথে বাক্যালাপ বন্ধ । পরদিন আমাদের বাংরিপশি বা অন্য কোথাও  বেড়াতে যাবার কথা ছিল, কিন্তু হলনা । তার বদলে আমি  শিবদার দলে ঢুকে গেলাম । সেই  রাতেই সুব্রতর বাড়ি থেকে আমার মালপত্র নিয়ে চলে এলাম শিবদার  বাড়িতে । সপ্তমীর সাতসকালে আমরা বেরোলাম, সাথে সোমনাথ ছাড়াও তাদের দুজন বন্ধু প্রলয় আর পানদা । আমরা যাব বিষ্ণুপুর - মুকুটমনিপুর - মাইথন । সে অন্য গল্প । পুজো কাটিয়ে এরপর আমাদের দেখা হবে একাদশীর দিন দার্জিলিং মেলে।

                                     # মোহরকুঞ্জের মিলনমেলায় #
সৌজন্যে ঃ জয়দীপ রায়

০৭/১০/১১ ঃ আমরা যথা সময়ে শিয়ালদা ষ্টেশনে পৌঁছে দার্জিলিং মেল ধরি । একমাত্র শিখার মা ও এক বন্ধু ছাড়তে এসেছিল । শিবদাও এসেছিল ছাড়তে । সবাই খেয়েই এসেছিল, আমি যথারীতি বাঙ্গালীর ট্রেনের খাবার লুচি - আলুরদম বার করে খেলাম। ইতিমধ্যে আমাদের ৫ জনের সম্পর্ক একটা জটিল অবস্থায় পৌঁছায় । তাই ট্রেনের আড্ডা তেমন জমল না । আমরা সবাই শুয়ে পড়ি । কেওই হয়ত ঘুমায়নি । কারন রাত ১২ টায় আমার জন্মদিন । কেও কেও শুভেচ্ছা জানালেও রাত টা তেমন ভাল ভাবে উদযাপিত হলনা । কেক কাটা না হোক ট্রেক করা তো হচ্ছে । আর কে না জানে এই দুটো ব্যাপার পরস্পর বিপরীত মুখে অবস্থান করে । 

সৌজন্যে ঃ শিবশঙ্কর সাহা 

 # মানেভঞ্জনে যাত্রা শুরুতে , সৌজন্যে - দীপাঞ্জন বসু  # 
০৮/১০/১১ - সকাল ৮ টায়  পৌঁছে গেলাম নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে । শুরু হয়ে যায় গাড়ীর খোঁজ । বুথ থেকে ন্যায্যমূল্যে গাড়ি পাওয়া যায়না  অথচ পাশেই প্রচুর গাড়ি যারা বেশী ভাড়া নিচ্ছে । মানেভঞ্জন পর্যন্ত ৩৫০০/- চাইছে । রাজ্যপাটে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসলেও নাগরিক দুর্দশা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে । শেয়ার গাড়িতে আমরা   জংশন চলে গেলাম। সেখান থেকে ১৫০/- করে দার্জিলিং এর জীপ ধরলাম । রাস্তায় মাঝে নাস্তা করা হল , সুব্রতর আনা কেক ও ছিল । রাস্তার অবস্থা শোচনীয় , এ যেন নরকে  যাবার রাস্তা । মন কেমন করা ঘুম এই আমাদের  নামতে হলো । সোজা রাস্তা টা দার্জিলিং চলে গেছে , আমরা যাব বাঁদিকের মিরিকের রাস্তায় । জীপ বুক করতে  হলো ৫০০/- য় । লেপচাজগত , সুখিয়াপোখরী হয়ে আমরা মানেভঞ্জন পৌছলাম দুপুর ২ টো  নাগাদ । বাজার এলাকাটা খুব ঘিঞ্জি আর নোংরা , তার উপর বৃষ্টি ভেজা কর্দমাক্ত । একটা সাদামাটা চেহারার লোক আমাদের জীবনদার  হোটেল এক্সোটিকা নিয়ে গেল । জীবনদার এটা পারিবারিক ব্যবসা । হাতমুখ ধুয়ে লাঞ্চ করে নিলাম। ডাল , আলুভাজা ডিমের ঝোল ভাত ৮০/- করে নিল । আমাদের ট্রেকের  ব্যাপারেও আলোচনা হল । কিন্তু উনি খুব বেশী আগ্রহ দেখালেন না , এও বললেন সান্দাকফু তে জায়গা পাওয়া যাবেনা , তবে ফালুট এ পেয়ে যাব । আর ওই লোকটিকেই দেখিয়ে দিলেন , ওই আমাদের নিয়ে যাবে । যাকে দেখে প্রথম থেকেই আমার বিন্দুমাত্র ভক্তি হচ্ছিলনা । নাম  শান্তা । তাকে নিয়ে গাইড  অফিসে গিয়ে পরচি কাটালাম । কিছু টাকা দিতে হলো আর বাকিটা ট্যুর শেষ হবার পরে দিতে হবে । শান্তাই বলল আমরা চিত্রে তে জায়গা পেয়ে যাব , ও পরের দিন আমাদের সাথে যোগ দেবে । বিকাল ৪ টে নাগাদ আমরা রওনা দিলাম । ২ কিমি রাস্তা , কিন্তু খাড়াই। ট্রেকারদের প্রথমেই এখানে জিব  বেরিয়ে যায় । মাঝপথে আবার বৃষ্টি শুরু হল , কিছুটা ভিজতেই হল । যেখান থেকে মানেভঞ্জন টা দেখা যায় , আমি সেখান থেকে শর্টকার্ট ধরি , আর পৌঁছে যাই ঝোপ - জঙ্গল আর জোঁকের  রাজত্বে । জোঁকের  কবলে পরলাম। আর আমি এই দুনিয়ায় সবথেকে বেশী ঘেন্না আর ভয় করি এই জোঁক । এই প্রথম আমার ভূগোল  জ্ঞান আমাকে ঘোল খাইয়ে ছাড়ল । ঘন্টা খানেক সময় নষ্ট করে আবার সেখানেই ফিরে এলাম আর ঝকঝকে সোজা রাস্তা দিয়ে উঠে যখন চিত্রে পৌছলাম তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। আর আমার এই আ্যডভেঞ্চারের জন্য আমি দুর্লভ দ্বৈত রামধনুর দৃশ্য মিস করি । ঠান্ডাটা ভালই লাগছিল , তাই বেশী  ধোয়াধুয়ি করা গেলনা, বাইরেও বেরোতে ইচ্ছা করলনা। আমাদের একটা বড় ঘর দিয়েছিল। আমরা ফ্রেশ হয়ে নিয়ে দু দুবার অমলেটের অর্ডার দিয়ে যে যার বোতল বের করে পেগ বানিয়ে বসে গেলাম । জাস্ট দু পেগ । শিখা মনের দুঃখ্যে র' মেরে দিল , আর তারপর সারারাত নাটক করে গেল । ডিনার টাও ভক্তি করে খাওয়া গেলনা । বাইরের ঠান্ডায় কিছুক্ষণ ঘুরলাম , কিন্তু বিশেষ কিছু দেখা গেলনা। রাতভর কারোরই ঠিকমত ঘুম হলনা ।  
 # মানেভন্জনে  যাত্রার শুরুতে  #        

 # চিত্রে ওঠার পথ #
# ভিউ পয়েন্ট থেকে মেঘে ঢাকা মানেভঞ্জন  #
# চিত্রে গোম্ফা  #
# হক নেস্ট , চিত্রে #
# দ্বৈত রামধনু , সৌজন্যে - দীপাঞ্জন বসু  #
# হক নেস্টে নৈশাহার , সৌজন্যে - জয়দীপ রায় #


# সাতসকালে চিত্রে - সৌজন্যে - দীপাঞ্জন বসু #
০৯/১০/১১ - ভোর  বেলায় উঠে কিছু ছবি তোলা  হল । আংশিক কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা  যাচ্ছিল , উপরে উঠলে আরও বেশী দেখা যেত । শান্তাও চলে এল সময়মত । প্রাতরাশ সেরে বেরতে ৮ টা বেজে গেল । ততক্ষণে নিচে থেকেও অনেক ট্রেকার  চিত্রে চলে এসেছে । আপার চিত্রে হয়ে আমরা ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই লামেধুরা পৌঁছে গেলাম । দোকান গুল নেপালে আর রাস্তা টা ভারতে । এরকম এই রুটে প্রায়ই দেখা যায় । ডিমসেদ্ধ আর চা খাওয়া হল । বিশ্রাম নিয়ে আমরা মেঘমার দিকে এগতে থাকলাম । কুয়াশায় ঢাকা মেঘমার পথ । দীপাঞ্জন হাঁটু ধরে বসে পরল, আর তারপর থেকে খুঁড়িয়েই চলতে থাকল । মেঘমায় বসে আবার কিছু খাওয়া । এখানেও পাশেই নেপাল । এখান থেকে একটা পথ তুমলিং অন্যটা টংলু টপ এ গেছে ।  শিখা আর দীপাঞ্জন এর জন্য আমরা ধীরেই চলতে থাকলাম । তাতে অসুবিধা কিছু নেই । শান্তা শিখার কষ্ট দেখে ওর ব্যাগটা নিয়ে নেয় । প্রায় বিকালে আজকের গন্তব্য তুমলিং এ পৌঁছে গেলাম । প্রচুর ভিড় আর গাড়ি । জায়গাটা আমার খুব একটা ভাল লাগল না । তবে এখান থেকেও সুন্দর দৃশ্য দেখা যায় ।  গাড়িতে ধোত্রে এসে টংলু হয়েও তুমলিং পৌঁছানো যায় । নিলাদি আর শিখর লজের কথা অনেক পরেছিলাম , কিন্তু কোথাও আমাদের জায়গা হলনা । ৯ কিমি রাস্তা যেতে আমাদের প্রায় ৭ ঘণ্টা লেগে গেল । শান্তা আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে নিয়ে চলল । কিছুটা এগিয়েই সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কের গেট , পরচি কাটতে হল ।  আর তার পরেই বাঁদিকে একটা হোটেল । ভালই, কিন্তু আমাদের সবাই এখানে থাকার ব্যাপারে মত দিলনা । আমরা নুডুলস খেলাম । এখান থেকে ডান দিকের রাস্তাটা গেছে গৈরিবাসের দিকে আর বাঁদিকেরটা গেছে নেপালের জৌবারিতে । আমরা জৌবারির দিকেই এগোতে থাকলাম । আমি সবার শেষে হাঁটছিলাম । আজ প্রায় ১০ ঘণ্টার ট্রেক করতে হল । শান্তা আমাদের নিয়ে গেল ইন্দিরা লজে । সেটা প্রায় নরক । ঘরের মধ্যেই উপরের একটা কুঠুরিতে আমাদের জায়গা হল । সেখানে ওঠাও একটা চাপের ব্যাপার ।  কাঠের ছাদ মাথায় ঠেকে যায় । লাইট থাকলেও তা জ্বলছিলনা । বিছানায় বোটকা গন্ধ । ভীতরে আর বাইরের দুটো টয়লেট এর অবস্থাই নারকীয় । কিন্তু ট্রেক করতে আসলে এসবের সাথে মানিয়ে নিতেই হবে । যাইহোক আমরা ক্লান্তি কাটাতে যে যার পেগ বানিয়ে বসে গেলাম । ওরা যে খাবার দিয়ে গেল,   রুটি তরকারি ,  খুব কষ্ট করেও খুব বেশী খাওয়া গেলনা । শিখা আজও ভুল করে জয়দীপের  র' ভদকা খেয়ে ফেলল জল ভেবে, আর তার পর সারারাত তার শুস্রশা করেই কেটে গেল । এমনকি মধ্যরাতে জীপ ডেকে শিলিগুড়ি যাবার কথাও ভাবা হয়েছিল ।  সেই সময় লজের মালকিন সহ অন্যরা এবং আমাদের গাইড শান্তা এত সাহায্য করেছিল যা ভুলবার নয় । লজের অন্য যাত্রীরাও অসীম ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়ে বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ করেনি ।  একটা চরম দুশ্চিন্তার রাত একসময় ভোর হয়ে গেল । 
# চিত্রে থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা #
# চোর্তেনে চিত্রিত চিত্রে #
# চিত্রে  থেকে যাত্রার শুরুতে # 
# ওই দেখা যায় লামেধুরা #
#  লামেধুরা  #
#  লামেধুরা  #
# মেঘে ঢাকা মেঘমার পথে দীপাঞ্জনের পায়ে লাগা #
# ভারত - নেপাল সীমান্ত , সৌজন্যে - জয়দীপ রায়  #
# মেঘমা - তুম লিং এর পথে , সৌজন্যে - জয়দীপ রায় #             
#  তুমলিং  #
# তুমলিং এর পরে সেই হোটেলটা , যেখানে আমরা থাকিনি - সৌজন্যে - জয়দীপ রায়  # 
#  জৌবারি ঢোকার ঠিক আগে  #
# জৌবারিতে যাত্রাপালার আগে ও পরে , সৌজন্যে - সুব্রত রায়  #
# জৌবারিতে ইন্দিরা লজের মালকিনের সাথে  , সৌজন্যে - সুব্রত রায়  #
 # জৌবারিতে , সৌজন্যে - জয়দীপ রায় #
১০/১০/১১ - সকালটা বেশ ঝকঝকে ছিল । এভারেস্ট , কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল , কিন্তু পাহাড়ের মাথায় উঠে সে ছবি তোলার মত অবস্থা আমাদের ছিলনা । আমরা ঠিক করলাম , আমি আর জয়দীপ শান্তা কে নিয়ে ট্রেক জারি রাখব, ওরা একদিন বিশ্রাম নিয়ে পরদিন গাড়িতে হয় ফিরে যাবে  অথবা সান্দাকফুতে যাবে । আমরাও আজ কালাপোখরিতে কাটিয়ে পরদিন সান্দাকফু পৌঁছাব । আমাদের ট্রেক করাও হবে আর শিখাও সুস্থ হএ উঠবে আর পায়ে চোট পাওয়া দিপাঞ্জন বা পায়ে রড বসান সুব্রতর কাওকেই শেষ খাঁড়াইটা চড়তে হবেনা । যাইহোক আমরা ৮ টা নাগাদ রওনা দিলাম । প্রথমেই একটা বাজে উৎরাই রাস্তা, জলে ভেজা, ইতস্তত বোল্ডারে বিছান । আমার নামতে কোন কষ্ট নেই, জয়দীপের একটু আসুবিধা হচ্ছিল । ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই সবুজে ঘেরা গৈরিবাসে পৌঁছে গেলাম । এসএসবি ক্যাম্প আর গোটা কতক থাকা খাওয়ার জায়গা । এর পরেই একটা মারাত্মক চড়াই । আমরা খুব ধিরে উঠতে থাকলাম । শান্তা আমাদের একটা রুকস্যাক নিতে চাইলেও আমরা কেও দেইনি । ইজ্জত কা সওয়াল হ্যায় ! এই সময় প্রচুর ট্রেকার , অনেকের সাথে আলাপও হল । যেজন্য জায়গা পাওয়া নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা সবসময় ছিল । তবে শান্তা ই সব ব্যাবস্থা করছিল, আমরা ওর উপরেই ভরসা করে ছিলাম । চড়াইটা পার করার পর আরও কিছুটা সহজ পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম কয়াকাঁটায় । অমলেট আর চা সহ বিশ্রাম । এই পথে অমলেটটাই সস্তা আর সর্বত্র ১৫/-। একটা বড় দলের সাথে আলাপ হল । যাদের দুজন পুরুষ পঞ্চাশোর্ধ,  একজন স্লো বাট স্টেডি অন্যজন পাখির মত উড়ে যায় । আর মহিলাদের মধ্যে একজন অতিরিক্ত মোটা , কিন্তু লক্ষে স্থির । এদের দেখে আমরাও অনেকটা মনের জোর পেলাম । যদিও এদের সাথে পোর্টার ছিল ।  কয়াকাঁটা থেকে দুটো রাস্তা , একটা নতুন গাড়ির রাস্তা, অন্যটা বন্ধ করে দেওয়া গাড়ির রাস্তা , আমরা পরের টাই ধরলাম । ঘণ্টা খানেক হেঁটে পৌঁছে গেলাম কালাপোখরিতে । হটাৎ ঠাণ্ডায় আমরা কেঁপে উঠলাম । পাথরের আড়ালে গিয়ে গরম পোশাক পরে নিলাম । পুকুরটা তখন কুয়াশায় ঢাকা । আসলে একটা দিক খোলা , আর সেদিক থেকেই আসছিল ঠাণ্ডা হাওয়া । পুকুরটা পার করে উপরের দিকে যেতেই দেখি, শান্তাও এগিয়ে আসছে , কিন্তু আপাদমস্তক ঢেকে রাখা আমাদের প্রথমে চিনতে পারেনি । কিছুটা এগিয়েই প্রথম হোটেলটাই সিঙ্গালিলা , সেখানেই আমরা উঠলাম । ডাবল রুম ৩০০/- । ৭ ঘণ্টা হেঁটে বিকাল ৩ টায় পৌঁছলাম ।  ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করলাম । জয়দীপ ইয়াকের মাংস ট্রাই করল , কিন্তু চিবিয়ে সুবিধা করতে পারলনা । পরে জায়গাটা একটু চক্কর মারলাম, অনেক হোটেল আছে, জৌবারির মতই জমজমাট । ওদের সাথে যোগাযোগ করার কোন উপায় নেই । মোবাইল ফোন প্রায় অচল এই পথে । এখানে রাত্রে জেনারেটর চলে, চার্জ দিয়ে চার্জ দেওয়া যায় ! মালিকের মেয়ে পাসান্দ ই সর্বময়ী কর্তৃ । লম্বা চুল , সুশ্রী আরও সুন্দর তার ব্যবহার । রাত্রে অন্য গাইড আর ট্রেকাররা ভীর করেছিল পাসান্দের রান্নাঘরে । রস্কি খেতে খেতে তারা গান বাজনায় মেতে উঠেছিল । আমরা  একটু পরে  যোগ দিয়েছিলাম ।  সবারই লক্ষ পাসান্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করা । সে নিজে অভ্যস্ত হাতে রান্না আর পরিবেশনে ব্যস্ত । তার বাবা পরে আমাকে মেয়ের গল্প শোনায় । জানিনা কেন ,ওনার মনে হয় আমাকে পছন্দ হয়ে গেছিল কোনও কারনে । অবশ্য পাসান্দও আমার নজর কেরে নিয়েছিল ।  যাইহোক হোটেলটা এনার দাদার, এরা সেটা চালায় । পাসান্দ ওনার নিজের মেয়ে নয়, উনি যখন কলকাতায় কাজ করতেন তখন মা-বাবা মরা মেয়েটিকে দত্তক নিয়েছিলেন । পরে এখানে চলে আসেন ওকে নিয়ে । এখন সে রিম্বিকের স্কুলে ক্লাস টেনে পরে । আর সিজনে হোটেল চালাতে চলে আসে । ক্লাস টেন অনুযায়ী চেহারাটা বেশ বড় । সহজেই যুবকদের নজরে পরে যায় । চার্জের চার্জ আমার কাছ থেকে একটু কমই নিল । গত দুরাত ঘুম না হবার পর, আজ নিশ্চিন্তে ঘুমালাম । সবথেকে বিপদে পরেছিল জয়দীপ , ও না পারছিল গিলতে না পারছিল ফেলতে ! 

# জৌ বারি  থেকে নামার সময় দূরে কয়াকাঁটা ওঠার পথ #
#  গৈরিবাস # 
# কুয়াশায় ঢাকা কালাপোখরি  # 
# রান্নাঘরে পাসান্দ # 
# পালিত মা বাবার সাথে পাসান্দ # 
# পাসান্দ # 
# কালা পোখরি # 
# কালা পোখরি থেকে দূরে পাহাড়ের মাথায় সান্দাকফু # 

১১/১০/১১ - রাতে ভালই ঘুম হয়েছিল । পুকুরের উপরে একটা গুহা আর দেবতার থান আছে , সেখানে পুজো দিয়ে আমরা সকাল সকাল যাত্রা শুরু করলাম । কারন আগে গিয়ে থাকার জায়গা পাবার জন্য । কিছুটা যাবার পর পেলাম বিকেভঞ্জন । এখানেও একটা চেকপোস্ট আছে । পরে জানতে পারি এখানকার কর্মী পাসান্দ ও খুব বিখ্যাত । কারন বহুবছর আগে ছোট্টো পাসান্দ এক বাঙ্গালী ট্রেকারের মানিব্যাগ অনেকটা পথ গিয়ে ফেরত দিয়ে এসেছিল । তিনি আবার বিখ্যাত আর লেখক । তিনিই আপামর বাঙ্গালীকে এই পাসান্দ এর কথা শুনিয়েছিলেন । আমিও এই পাসান্দকে দেখেছি, এখন যুবতি । বিকে তে একটা ঝুপড়ি দোকানে আমরা নাস্তার অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম । ওই বড় দলটাও এসে এখানেই খাবার অর্ডার দিল। দোকান তখন সবে খুলে উনুন জ্বালান শুরু করল । এক লামা অজানা ভাষায় মিষ্টি সুরে ত্রিপিটক পাঠ করে যাচ্ছিল । দলটার সাথে কথায় কথায় জানতে পারলাম, ওই রাতে  ওনারাই ইন্দিরা লজে আমাদের নিচে ছিলেন, আর সারারাত ঘুমাতে পারেননি । আমি তার জন্য ওনাদের কাছে দুঃখ্য প্রকাশ করি । বিকে থেকে সান্দাকফু একটা চরম চড়াই । তাল গাছের শেষ আড়াই হাতের মত আরকি ! পথে আরও অনেক ছেলেমেয়ে চলে এল । আমরা খুব ধীরে উঠতে থাকলাম । শান্তা আগে চলে যায় , রুম দখল করার জন্য । মাঝপথে ওঠার পর দেখি শান্তা আবার ফিরে এসেছে । এবার জয়দীপ ওর ব্যাগটা শান্তাকে বইতে দিল । আমরা ঘণ্টা চারেক হেঁটে সান্দাকফু পৌঁছে গেলাম। আমার কৈশোরের স্বপ্ন সফল হল চল্লিশে পৌঁছে ! শেরপা চ্যালেটের নতুন বিল্ডিঙে আমরা দুটো ঘর বুক করে নিলাম । কিন্তু ওদের আসার কোন ঠিক ছিলনা, আবার ঘরেরও আকাল । ২৫০/- করে পার হেড জমা দিয়ে দিতে হল । ওরা না আসলে আমাদের আবার সান্দাকফুর মোড়ে গিয়ে দাঁড়াতে হত বেচার জন্য ! যাইহোক বেলা ১২ টা নাগাদ আমাদের আশঙ্কা দূর করে ওরা জিপে করে পৌঁছে গেল । আমি তার আগে ফ্রেঞ্চ কাট দাঁড়ি কেটে ক্লিন সেভ হয়ে গেছি । এখানেও স্নান করা গেলনা , হালকা করে গা হাত পা ধুয়ে খেতে বসলাম তখন প্রায় ৩ টে । বিকালে এদিক ওদিক ঘুরে বেরালাম। প্রচুর লোক । থাকার জায়গাও অনেক হয়েছে । কাঞ্চনজঙ্ঘা সামান্য উঁকি মারল, তাতে মন ভরলনা । এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পরিবারকে দেখে মনে হয় স্বয়ং বুদ্ধদেব শুয়ে আছেন। আজ পূর্ণিমা , কোজাগরী লক্ষ্মী পুজা । চাঁদনী রাতে রজতশুভ্র  শায়িত বুদ্ধকে দেখে মন ভরে গেল । আমাদের সবার ক্যামেরায় তা অবশ্য ঠিক  ভাবে  ধরা দেয়নি । ওরা তিনজন পাশের ঘরে ছিল । আজ শিখাকে ড্রিঙ্ক করতে বারন করলেও বাকি দুজনের উস্কানিতে আমাকে লুকিয়েই পরে খেয়েছিল । আসলে আগের দুদিন ওই কারনেই ও অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমি চাইছিলাম না আজ আবার খারাপ কিছু ঘটুক । আমি চাইছিলাম অতিরিক্ত দিনটা সান্দাকফুতেই কাটাই , কিন্তু সবার মত না থাকায় পরদিন আমরা  ফালুটের পথে রওনা দেব । 

# কলাপোখরীর  গুহায়  #
# ইয়াক #
# বিকেভঞ্জনের  পথে  #
# বিকেভঞ্জনের আগে , দুরে পাহাড়ের মাথায় সান্দাকফু #
# ব্লূ লেগুনের বিষফল নয়, বাচ্চারা খায় #
# নজর কারা  পাহাড়ি ফুল #
# বিকে ভঞ্জন থেকে  #
# বিকে ভঞ্জন থেকে  #
# বিকে ভঞ্জন  #
# সান্দাকফুতে পাহাড়ি লঙ্কা #
# সান্দাকফু #
# সান্দাকফু সামিট  # 
# সান্দাকফু থেকে কান্কন্জন্ঘা  #
# কান্চন্জন্ঘা পরিবার , সৌজন্যে - জয়দীপ  রায় #
# এভারেস্ট  পরিবার , সৌজন্যে - জয়দীপ  রায় #
# তিন বোনের  পরিবার , সৌজন্যে - জয়দীপ  রায় #
# শেরপা চ্যালেত এ মহিষাসুর  মর্দিনী , সৌজন্যে - জয়দীপ  রায় # 
# সান্দাকফুতে শেরপা চ্যালেটে #
# কোজাগরী পূর্নিমার রাতে কান্চন্জন্ঘা  পরিবার যেন শায়িত বুদ্ধ ! সৌজন্যে - সুব্রত রায় #
১২/১০/১১ - শেরপা চ্যালেটের রুটিগুলোর কথা নিশ্চই সবাই মনে রেখেছে । সেই গোল পাউরুটির মত  রুটি আর না সেদ্ধ হওয়া আলুর তরকারী খেয়ে আমরা ৭ টা নাগাদ রওনা  দিলাম। সকালে সুর্যোদয়ের দৃশ্য ভালো দেখা যায়নি । তবে পরে এভারেস্ট , কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল । পথেই সান্দাকফুর হায়েস্ট পয়েন্ট । সেখানে আমি আর জয়দীপ উঠলাম । জয়দীপ গত কালেই এখানে উঠেছিল । সত্যিকারের সান্দাকফু জয় করা হলো। ইতিমধ্যে আমাদের গাইড  শান্তা সবার প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছে । ও বিশেষ করে শিখা বহিনের খুব খেয়াল রাখছিল । তাই শিখাও পাহাড়ি ফুল দিয়ে শান্তাকে তার কৃতজ্ঞতা অর্পণ করলো । শান্তা দীপাঞ্জনের ব্যাগটা বইছে , আর শিখার হালকা ব্যাগটা নিজেরা বইছে । আজকের খুব লম্বা পথ। যদিও ফালুটে রিস্ক না নিয়ে আজ আমাদের মোলেতে রাখবে । আর মোলে গিয়ে ফালুটের জন্য চেষ্টা করবে। লম্বা পথ হলেও সোজা পথ । শুরুতেই রডডেনড্রন করিডোরের মধ্যে দিয়ে যেতে হলো। এপ্রিল মাসে এর শোভা দেখবার মত। এমনিতেও এই পথের শোভা খুবই মনোরম । তবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে এভারেস্ট আর কাঞ্চনজঙ্ঘাও মিলিয়ে গেছে। ছোট ছোট সবুজ পাহাড় , জঙ্গল , নীলাকাশ , সব মিলিয়ে দারুন ব্যাপার। জীপ গুল হিন্দী সিনেমার মত ছোট সবুজ পাহাড়ের উপর দিয়েই যাচ্ছিল , রাস্তা ছেড়ে । ড্রাই ফ্রুটস খাওয়া হল মাঝে। সোজা পথ হলেও ক্লান্তি ছিলই । তারমধ্যেও রড বসানো পা আর রুকস্যাক নিয়ে সুব্রত বেশ স্টেডী  ছিল । দীপাঞ্জনকে নিয়েও চিন্তা ছিল , কিন্তু ও ও আস্তে আস্তে টেনে দিচ্ছে । শিখাও খুব বেশি হতাশ করছেনা । আমি আর জয়দীপ ঠিকই আছি । ঘন্টা সাতেক হাঁটার পর ১৫ কিমি দুরের সবরগ্রামের ফরেস্ট ক্যাম্পে পৌঁছলাম । সেখানে চা আর অদ্ভুত স্বাদের নুডুলস খাওয়া হল । এর পর মোলে ২ কিমি সহজ নামার পথ। শান্তা আগেভাগে চলে গেল থাকার জায়গা ম্যানেজ করতে । এসএসবির ক্যাম্পের লাগোয়া ট্রেকার্স  হাট । সেখানে শান্তা অসাধ্য সাধন করে একটা রুম ম্যানেজ করেছে । পরে জানতে পারি সেটা অন্যদের বুক করা রুম ছিল। যদিও শিখা থাকায় কেও আর আমাদের বার করে দেয়নি। বাইরের হল ঘরটায় তখন ট্রেকার্স  হাট এ সত্যিই ট্রেকার দের হাট  বসেছে । যেটার উপর দিয়েই আমাদের বাইরে যেতে হচ্ছিল , যদিও  টয়লেট টা  ভিতরেই ছিল ।  শান্তার সাহায্যে আমরা বাঙালী কায়দায় মুড়ি মেখে বসলাম, সাথে চা। তারপর অবশ্য রামনামও করলাম । ২/৩ টা বাচ্চা কিছু ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে আসে । তাদের সাথে খানিক মজা করি । পরে দেখি হল ঘরে এসএসবির অফিসার সহ গোটা ২৫/৩০ ট্রেকার মিলে জমজমাট গানের আসর । ডিনার এর পর আমিও খানিকক্ষণ বসি সেখানে । সে যেন মিনি ইন্ডিয়া ! শিখারও থাকার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু তার পরামর্শ দাতারা তাকে নিষেধ করে। এতগুল ছেলে যদি খারাপ কিছু করে ! অথচ তারা পাহাড় প্রেমী , গানবাজনা করে ক্লান্তি কাটাচ্ছিল আর সেনাদের ও মনোরঞ্জন করছিল , তারা আমাদের মত মদ্যপ ছিলনা । আসলে পাহাড়ে এসেও অনেকে ক্লিশে শহুরে মানসিকতা ত্যাগ করতে পারেনা । ট্রেক রুটে এইসব সেনারাও কিন্তু মাঝে মধ্যেই সাহায্যের হাত বারিয়ে দেয় । বেশ ঠাণ্ডা ছিল মোলেতে । আমাকেই নিচে শুতে হল । ফালুটে জায়গা পাওয়া নিশ্চিত নয়, তবুও কাল আমরা সরাসরি গোর্খ্যে না গিয়ে আগে ফালুট যাব । শান্তার উপর আমাদের ভরসা ছিল । 
#  সান্দাকফু টপে #
# নিচে  সান্দাকফু টপে জয়দীপ আর এভারেস্ট , সৌজন্যে - জয়দীপ রায় #
# সান্দাকফু টপ থেকে এভারেস্ট পরিবার # 
# বিষ ফুল #
# ফালুটের পথে # 
# ফালুটের পথে বিশ্রাম ,  সৌজন্যে - জয়দীপ রায়   #
# আর পারিনা ! #                
# সামনের দুজনে টুর বই পড়ছে ! সৌজন্যে - জয়দীপ রায় #
# ফালুটের পথে , সৌজন্যে - শিখা / দীপাঞ্জন বসু #
#  ফালুটের পথে ইয়াক #
# সবরগ্রামের  ফরেস্ট  ক্যাম্পে  #
# মোলে ট্রেকার্স হাট #
# মোলেতে বাচ্চাদের সাথে শিখা # 
# মোলেতে গানের গু-গাঁ -মে -গ- করছি ! # 

১৩/১০/১২ - সকালে রুটি আলুভাজা খেয়ে বেরোতে ৮ টা বেজে গেল। তার আগে আশপাশটা একটু  ঘুরে নিলাম । ক্যাম্পের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত বন্ধ থাকায়  ট্রেকার্স হাটে আসা যাওয়ার জন্য নালা - নর্দমা পার হতে হয়। সবরগ্রাম হয়ে ফালুট ৯ কিমি হালকা চড়াই । ঘন্টা চারেকে আমরা পৌঁছে গেলাম। ফালুট সবুজ গালিচায় ঢাকা ন্যাড়া পাহাড়। দুটো থাকার জায়গা , ট্রেকার্স হাট আর ফরেস্ট বাংলো , ছাড়া আর কিছু নেই। প্রচন্ড হাওয়া। শান্তা কোথাও ম্যানেজ করতে পারলনা। ফরেস্টে একটা বেড ছিল , কিন্তু সেটাকে কেন্দ্র করে বা কিচেনে থাকার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলনা। তবে এখানে আমাদের দুপুরের খাওয়াটা হলো দারুন , ডাল - ভাত - অমলেট -সবজি , খিদের মুখে তা ছিল অমৃত সমান। শান্তা একটু তত্পর হলে বুকিং টা করতে পারত , কিন্তু ওর কাছে কেয়ার টেকারের নাম্বার ছিলনা। এই একবারই শান্তার উপরে আমাদের সন্দেহ হয়েছিল , ও  ইচ্ছা করে করলনাত , কারন ওর ১৫ তারিখ অন্য গ্রুপ ধরার জন্য চিত্রে ফেরার তারা ছিল। নিরুপায় হয়ে আমরা বেলা দুটোর পর গোর্খ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ১৪ কিমি উতরাই পথ। এসএসবি ক্যাম্পের পাশ দিয়ে  সহজ রাস্তা দিয়েই এগোতে থাকলাম। ক্রমশ উতরাই টাও বেশ কঠিন হতে থাকলো । দীপাঞ্জন আর শিখার জন্য বারবার বিশ্রাম নিতে হচ্ছিল। তবে পুরো পথটাই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে , বেশ রোমাঞ্চকর ছিল। সন্ধের মুখে আমরা গোর্খ্যে পৌছলাম । গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় বাংলায় লেখা থাকা - খাওয়ার সুবন্দোবস্তের বোর্ড ও দেখলাম। শান্তা আমাদের ব্যবস্থা করেছে ইডেন লজে , সেখানে পৌছাতে আরো কিছুটা সময় লাগলো। ৫ বোন  মিলে লজটা চালায় শুনে উত্সুক হয়ে ছিলাম , কিন্তু কালা পোখরির মত খুশী হতে পারলাম না। আমাদের আলাদা একটা কটেজ দিল। ১০ ঘন্টা হাঁটার ক্লান্তি দূর করতে অনেকে গরম জলে স্নান করে নিল। সদ্যস্নাতা শিখার শরীর দিয়ে ফরেস্ট স্পাইস এর গন্ধে ঘরটা ম ম করে উঠলো। পায়ের ব্যথা সারাতে ঠান্ডা -গরম জলের স্যাঁক দেওয়া হল সবাই মিলে। শিখার অবস্থাই সবথেকে খারাপ ছিল। এখানেও শান্তা মুড়ি মাখার ব্যবস্থা করে দিল। জৌবারিতে  সন্ধ্যায় শান্তা আসায় অনেকে বিরক্ত হয়েছিল , ভেবেছিল ফ্রী তে মদ খেতে এসেছে । ওকে নানা কথায় ভাগিয়ে দেওয়া হযেছিল । যদিও রাতের ঘটনার পর থেকে ও আমাদের আপন হয়ে গেছিল। কালাপোখরী তে আমি ওকে অফার করলে জানতে পারি ও মদে অভ্যস্ত নয় , যখন অন্য গাইডরা তুরং মস্তি করছিল। শান্তা একটু ভদ্র শিষ্ট প্রকৃতির , ওর প্রতি শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেছিল। তারপর থেকে শান্তা সবসময়েই আমাদের সঙ্গী হয়ে গেছিল। গোর্খ্যেতে আমাদের আসর বেশ জমে উঠেছিল , শান্তাও নেপালী গান গেয়ে শোনায় । এদিকে সুব্রতর মাত্রা  বেশী হয়ে গেছিল , আর আমরা দেখতে পাই নতুন একটা যাত্রা পালা। শান্তা আমাদের খাবার রুমেই দিয়ে যায়। আমরা পরের দিনটা এখানেই কাটাব ঠিক করি। কোনরকমে রাত টা  একসাথেই কাটাই। 

# উপরে নিচে দুটোই  মোলে  থেকে ফালুটে  ওঠার পথ #

# উপরে নিচে দুটোই  ফালুট  ট্রেকার্স  হাটের  ছবি  #
# নিচের ছবিগুল ফালুট থেকে গোর্খ্যে যাবার পথের ছবি #
# আমাদের প্রিয় গাইড  শান্তা  #
#  উপরের লাল বর্ডারের ছবিগুলো বন্ধুদের তোলা  #

১৪/১০/১১ - সকাল সকাল ওঠার তাড়া ছিলনা । তবে সুব্রত সকালে উঠেই পাশের প্যারাডাইস হোটেলে চলে যায় , যাত্রা পালার জন্য ইডেনের মঞ্চ টা মনে হয় উপযুক্ত ছিলনা । ৬ দিন পর আজ সম্পূর্ণ বিশ্রাম । গোর্খ্যে থেকে ভিউ দেখা যায়না , কিন্তু এই ছোট গ্রামটা তার নিজের সৌন্দর্যেই মোহময়ী ।  গোর্খ্যে খোলা আর রাম্মাম খোলা মিলিত হয়েছে এখানে । এই রুটে গোর্খ্যেই আমার কাছে সবথেকে সুন্দর জায়গা । যে যার মত ঘুরছিলাম , ছবি তুলছিলাম । স্থানিও ভুট্টাও খাওয়া হল । আমি  ঘুরতে ঘুরতে একেবারে নদীর পারে গিয়ে পৌঁছলাম , ট্রেকার্স হাটের পাশ দিয়ে ।  জায়গাটা একদম নির্জন , বেশ গা ছমছমে রোমাঞ্চকর পরিবেশ । ফিরে এসে আমাদের লজের পাশের গোর্খ্যে খোলায় স্নান করলাম আমি আর জয়দীপ , বিয়ার খেতে খেতে । ৭ দিন পর স্নান করলাম, জলটা দারুন ঠাণ্ডা ছিল , তবে গোর্খ্যেতে অত ঠাণ্ডা ছিলনা । স্নান করে ফেরার পথে দেখি শিখা সবার জন্য গাঁদা ফুলের মালা গেঁথে রেখেছে । বিকালে শান্তা আমাদের রাম্মাম খোলা পার করে সিকিমের মধ্যে নিয়ে গেল, যেদিকে রিদভি যাবার রাস্তা চলে গেছে । কিন্তু বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বেশী ঘোরা গেলনা, একটা কাঠের পরিতক্ত বাংলোয় আশ্রয় নিতে হল অনেকক্ষণ । তারপর সোজা ঘরে ফিরে সন্ধ্যার আসরে মেতে উঠলাম । আজ যাত্রা শুরু করল জয়দীপ । শান্তা কে নিয়ে পরল ও । আর বারবার একি কথা বলতে লাগল । ওর অফিস যাবার সময় দ্বিতীয় হুগলী সেতুতে যদি বাইক খারাপ হয়ে যায় , এদিকে ৩ কিমি ওদিকে ৩ কিমি , শান্তা এসে ওকে সাহায্য করবে কিনা ! বেচারি শান্তা সাহায্য করতে যাবে বলেও পার পাচ্ছিলনা । আর খেতে বসে সেই নিয়ে আমাদের সবার অট্টহাস্য । সেই হাসি সামলাতে না পেরেই শিখার আবার অসুস্থ হয়ে পরা । একেবারে যাতা অবস্থা । আমিও একবার বাইরে হাত ধুতে গিয়ে দরজার দিকে না গিয়ে অন্যদিক দিয়ে বেরতে গিয়ে প্রায় ধাক্কা খাচ্ছিলাম । সবাই মিলে আবার হাসি, আর ভাবল আমি আউট হয়ে গেছি । যাইহোক পরদিন আমাদের সকাল সকাল বেরতে হবে, কারন শান্তা আমাদের শ্রীখোলা পৌঁছে দিয়ে মানেভঞ্জন চলে যাবে । 

                                # আমার ক্যামেরায় নানাভাবে গোর্খ্যে  #


১৫/১০/১১ - সকাল সকাল উঠে আমরা রওনা  দিলাম শ্রীখোলার উদ্দেশ্যে । সামান্য চড়াই পার করে ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌছে গেলাম সামানদেন ভ্যালি তে । ছোট্ট ছবির মত গ্রাম। তারপর শুধুই নামা , আর সেটা বেশ কঠিন ই ছিল। তবে জঙ্গল আর ঝোরার পাশ দিয়ে পথটা খুব সুন্দর। আরো ঘন্টা খানেক পর আমরা পৌছলাম রাম্মামে । রাস্তার ধারেই একমাত্র হোটেল। সেখানে প্রাতঃরাশ করার জন্য আমরা অনেকটা সময় কাটালাম। এখানে অনেক ফুলের ছবি তোলা হল ।এরপর আমরা এগোলাম শ্রীখোলার দিকে। পথে মাঝে মধ্যেই ঝোরা গুলো মন ভরিয়ে দিচ্ছিল। এছাড়াও নানা জংলি ফুল - ফল নজর করছিল। নামার শেষ দিকটা খুবই ঢালু ছিল। প্রায় ১৫ কিমি রাস্তা আমরা ঘন্টা ছয়েকে হেঁটে বেলা ১২টা নাগাদ শ্রীখোলাতে পৌঁছে গেলাম। এখানে রাম্মাম খোলা আর শ্রীখোলা মিলিত হয়েছে ।  নদীর এপারে ট্রেকার্স হাট থাকার মত অবস্হায় ছিলনা আর তার কেয়ার টেকারের হোটেল গোপারমা লজ বা ব্যানার্জী লজ আমাদের পোষালো না । শান্তা আমাদের সেতু পার করে কিছুটা এগিয়ে হোটেল শোভরাজে নিয়ে গেল। একেবারে নদীর ধরে সুন্দর পরিবেশে হোটেলটা। বাগুইহাটির শুভাশিস সেনগুপ্ত স্ত্রী পুত্র 
নিয়ে পারিবারিক ব্যবসা চালাচ্ছে। তবে আমরা কোনের যে ঘরটায় ঢুকলাম সেটা খুব একটা সুবিধার ছিলনা। এবার শান্তার বিদায়ের পালা। সবারই চোখ ছল ছল । শান্তাকে তার হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে আরো ১০০০/- অতিরিক্ত দেওয়া হলো। এক'দিনের ঘটনাবহুল ট্রেকে  শান্তার একটা বিশেষ ভূমিকা ছিল। আর ওর চলে যাওয়া দেখে আমাদের ও মনে পরে যায় যে ট্যুর টা শেষ হতে চলেছে। তাই বিদায় বেলায় একটা মর্মস্পর্শি আবেগ  তৈরী হলো। আর তাই দীপাঞ্জনের চোখ থেকে বিসমিল্লার করুন সুর অঝোরে  ঝোরে   পড়ল। মনটাকে তাজা করতে একটু বিয়ার পান। সবাই হোটেলের গরম জলের অলসতায় গা ডুবিয়ে দিলেও আমি পাশের নদীতেই স্নান করতে যাই। জলটা যেমন ঠান্ডা তেমনই খরস্রোতা ছিল ,তাই মন ভরে স্নান করা গেলনা। বাঙালী খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম। সন্ধ্যায় আবার মুড়ি - চানাচুর , সাথে রাম ! হোটেল থেকেই  পরদিন  সকালের শেয়ার জীপ বুক করে নিয়েছিলাম। শান্তাও রিম্বিকের জীপ বুকিঙ এর নাম্বার দিয়ে গেছিল। পরে জানতে পারি শান্তাও আর জীপ পায়নি অত বেলায় , রিম্বিকেই থেকে গেছে , পরদিন সকালে ফিরবে। ডিনার করার পরে  শিখা - সুব্রত মিলে একটা  নাটক শুরু  হয়ে যায় । সেই নাটক টা মনে হয় আজকের জন্য অপ্রতুল ছিল , তাই শোবার সময় সেটা সম্পূর্ণ করে দেয় দীপাঞ্জন। ওকে নিয়েই মাঝরাত হয়ে যায়। তাই মধ্যরাতে জয়্দীপের জন্মদিন টাও সেই ভাবে উদযাপন করা গেলনা। এদিকে পরদিন আবার একদম ভোরে বেরোতে হবে।
# গর্খ্যে  থেকে রাম্মামের পথে #
# সামানদেন  ভ্যালি  #
# সামানদেন  ভ্যালি  #
# সামানদেন  ভ্যালি  #
# গর্খ্যে  থেকে রাম্মামের পথে #
# রাম্মাম এর হোটেল  #
# রাম্মাম এর হোটেল  #
# রাম্মাম এর হোটেল  #
# রাম্মাম এর হোটেল এর ফুল  #
# রাম্মাম থেকে শ্রী খোলার পথে #
# রাম্মাম থেকে শ্রী খোলার পথে #
# রাম্মাম থেকে শ্রী খোলার পথে #
# রাম্মাম থেকে শ্রী খোলার পথে #
#  শ্রীখোলা ট্রেকার্স  হাট  #
# শ্রীখোলা সেতু #
#  শ্রীখোলা গোপারমা লজ #
#  শ্রীখোলা শোভরাজ  লজ #
# আমি আর শান্তা  #
# শোভরাজ লজের মালিকের সাথে #
# হে বন্ধু বিদায় #
# শ্রীখোলাতে স্নানের সময় #


১৬/১০/১১ - কাকভোরে উঠে আমরা তৈরি হয়ে নিলাম । ঠাণ্ডায় সকালে ওঠাটা খুবি কষ্টের । হোটেলের মালিক নিজে আমাদের সাথে সেপি এসে জীপে বসিয়ে দিলেন । শ্রীখোলা থেকে আধ ঘণ্টার মত হাঁটা পথ সেপি । রিম্বিক পর্যন্ত রাস্তা খুবি বাজে । তারপর ধত্রে তে অনেকক্ষণ দাঁড়াল । আমরাও টুকটাক কিছু খেলাম । এই ধত্রে থেকে হেঁটে তুম লিং পৌঁছান যায় । এরপর সুখিয়া বাজার , ঘুম হয়ে আমরা ১১ টা নাগাদ দার্জিলিং পৌঁছলাম । ম্যাল এ কিছুটা সময় কাটিয়ে , কিছু কেনাকাটা করে আমরা সাঙ্গগ্রিলা তে খেতে ঢুকি । স্বাভাবিক ভাবেই শিখা দেখে বেশী কেনে কম । তারমধ্যে জৌবারি তে মালকিনের পরা নেপালি পোশাক কিনতে চেয়েছিল , কিন্তু মনমত না পাওয়ায় কেনা হয়নি । সাঙ্গগ্রিলা তে আমাদের জন্মদিনের পার্টি হয়ে গেল । শিলিগুরির উদ্দেশ্যে বেরতে ৩ টে বেজে গেল । রাস্তায় গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়ে চিন্তা বারিয়ে দেয় সবার । আমি নিশ্চিন্তে গাড়িতেই বসে ছিলাম । সারানোর পরে গাড়ি আন্ধকারে পাহাড়ি পথে বিপদজনক ভাবে নামতে থাকল। সেই পথে আবার ট্র্যাফিক জ্যাম । যাইহোক , আমরা শেষ পর্যন্ত দার্জিলিং মেল পেলাম । তিন মাস ধরে জয়দীপ আর এ সি টিকিটের জন্য মাথা খেয়েছিল , সেই টিকিটও কনফার্ম হয়ে যায় । 
#  দার্জিলিং ম্যালে আমরা  # 
# দ্য লাস্ট ডিনার , সৌজন্যে - জয়দীপ রায়  #
# সেই দুশ্চিন্তার মুহূর্তে , সৌজন্যে - জয়দীপ রায়  #
#  দার্জিলিং মেলে আমরা  # 

১৭/১০/১১ - সময়মত সকালেই আমরা শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে যাই । সবার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় বেশ খারাপ লাগছিল । আমাদের সফরে অনেক অনিশ্চয়তা ছিল , অনেক কষ্ট ছিল , অনেক ঘটনা ছিল , তবুও আমরা সবাই অপেক্ষা করে থাকব কবে আবার পাহাড়ের বুকে ফিরে যাবার জন্যে  । 


অন্যান্য  তথ্য  :- 
ম্যাপ - 




কিভাবে যাবেন – কলকাতা থেকে রাতের ট্রেনে সকালে নিউ জলপাইগুড়ি ।   সেখান থেকে বা শিলিগুড়ি জংশন থেকে শেয়ার  বা ভাড়া  করা জীপে মানেভঞ্জন । তারপর ৭ দিনের ৭০ কিমি ট্রেক ।


স্থানীয় ব্যবস্থা – গাইড এসোসিয়েসন প্রধান দেন্ডুপ  ভুটিয়া  - ৯৭৩৪০৫৬৯৪৪ / ৯৩৩৩৯৯৩৯১৩ / bhutiadendup@yahoo.com. , জীবনদা  - ৯৭৩৩০৪৪৫১২, গাইড  শান্তা  কুমার গোল্যে  - ৯৬৩৫২৮৮২৯২, সান্দাকফুতে শেরপা চ্যালেট  - ৯৯৩৩৪৮৮১৫৯, শ্রীখলা  শুভাশিস সেনগুপ্ত - ৯৯৩৩৪৮৮২৪৩ / ৯৯৩২২১৬১৯৭ / hotelshovraj@yahoo.com.  রিম্বিকে জীপ কাউন্টার  - প্রভু প্রধান - ৯৭৩৩১৭৭৮০৯.
     

আনুমানিক খরচ - গাইড ৩৫০/- ,  পোর্টার ৩৫০/- , ক্যামেরা চার্জ - ১০০/-, ফরেস্ট পারমিট  - ১০০/- .  কলকাতা থেকে জনপ্রতি ৬০০০/- খরচ  হবে  ।


উৎসব – বিভিন্ন সময়ে  বাইকিং , সাইক্লিং , ম্যারাথন  হয়  ।


সঠিক সময় – মার্চ থেকে মে , অক্টোবর   থেকে ডিসেম্বর  । 


ছবি – সৌজন্যে দীপঙ্কর রায়, শিবশঙ্কর সাহা ,সুব্রত রায় , জয়দীপ রায়, দীপাঞ্জন বসু   । ক্যামেরা - অলিম্পাস । 


লেখক পরিচয় – বেসরকারি হাসপাতালের একাউন্টস বিভাগের প্রধান ( DGM , Accounts of Phenomenal Hospital & Research Centre, Latur ) , লাতুর , মহারাষ্ট্র । কলকাতাকে কেন্দ্র করে বড় হয়ে উঠলেও গত ১০ বছর বাংলার বাইরে আছি । ঘুরতে ভালবাসি ।  একটা শেষ করে এসে পরেরটা নিয়ে ভাবতে শুরু করি । 

Wednesday, July 11, 2012

দেওরিয়া তাল - চোপতা - তুঙ্গনাথ - চন্দ্রশিলা

ভূমিকা - প্রথম পরিকল্পনা ছিল সতপন্থ তালের , লোক কমে যাবার কারণে সেটা বাস্তবায়িত হয়নি । আমি আর সোমনাথ দুজনে মিলে ৫ দিনে রূপকুণ্ড ঘুরে আসি দারুন ভাবে । আমাদের ধারণা ছিল পুরো ট্রেক টা করতে ৯/১০ দিন লাগবে , সেভাবে এখন করা গেলনা , মানে হোমকুণ্ড আর রন্টি স্যাডল সহ ।  তাই বারতি দিনগুলিতে আমরা সিদ্ধান্ত নেই  দেওরিয়া তাল , চোপতা আর তুঙ্গনাথ ঘোরার । সেই গল্পই এবার শোনাব । 

১০/০৬/১২ - সকালে লোহাজং থেকে বেরিয়ে দেবলে এসে নাস্তা সেরে প্রেসের গাড়িতে কর্ণপ্রয়াগ পৌঁছাই ভর  দুপুরে । আজ একটু ভালো লাঞ্চ করি গত কয়েকদিনের থোর - বরি - খাঁড়া খাওয়ার পর ! এক  অভিজ্ঞ দোকানদার আমাকে আ্যলকাইন ব্যাটারি দিল আর সেটা আমার ক্যামেরায় কাজ করলো । উখিমঠ যাবার কোনো বাস বা জীপ পাচ্ছিলাম না । একটা ভিড়ের বাসে উঠলাম জায়গাও হলো । এটা যাবে কেদারের পথে গৌরিকুণ্ড । আমরা কুণ্ডে নেমে  গেলাম । এখান থেকে উখিমথ ৬ কিমি  , দুরে পাহাড়ের মাথায় ভারত সেবাশ্রমের সুন্দর বিল্ডিং টা দেখা যাচ্ছিল । আমরা জিপেই গেলাম । উখিমঠ গিয়ে আর সারি যাবার কোনো জিপ পাচ্ছিলাম না । সবাই বুকিং এ যেতে রাজি । এখান থেকেও ৮ কিমি চড়াই ভেঙ্গে দেওরিয়াতাল পৌছানো যায় । কিন্তু রাতটা আমরা তালের ধারেই কাটাতে চাইছিলাম । অন্য একটা জিপে তালা পর্যন্ত গেলাম । তারপর ৩ কিমি সামান্য চড়াই গাড়ির রাস্তায় হেঁটে সারি গ্রামে পৌঁছলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা । একটা দোকানে চা অমলেট খেতে বসলাম  । তারাই উপরে টেন্টের ব্যবস্থা করে দেবে বলল , ৬০০/- চাইছিল , শেষে ২০০/- তে নামে । আমি তবুও রাজি হচ্ছিলাম না ।ততক্ষণে এক যুবক এসে নিজেকে বৃজমোহন বলে পরিচয় দেয় আর তার কথা ভ্রমন এ বেরিয়েছিল বলে দেখায় । একসময় খুব পরতাম এই পত্রিকা । তার সাথে কথা বলা শুরু করলাম ।এমনিতে এই জায়গা গুলো ঘোরার জন্য গাইডের দরকার হয়না  । কিন্তু আমি দুটো কারণে নিতে চাইলাম , এক আমরা দেওরিয়াতাল থেকে ট্রেক করেই চোপতা যাব যেটা আবার সারি নেমে এসে  গাড়িতে যাওয়া যেত । আর দুই যেহেতু দুজনেই ক্লান্ত আর সম্পূর্ণ ফিট ও নই , তাই স্যাক বইতে ইচ্ছে করছিলনা । আমরা ওকে  পোর্টার কাম গাইড  হিসেবে রাজি করাই দৈনিক ৪০০/-তে । ওর ভরসাতেই নিচ থেকে আর টেন্ট বুক করিনি । ২ কিমি চড়াই রাস্তা , ওঠার পথে বৃষ্টি নামল । আমি পথেই এক মন্দিরে আশ্রয় নিলাম ওরা আর একটু উপরে অপেক্ষা করছিল । তালে যখন পৌঁছলাম বেশ অন্ধকার , তাই বিশেষ কিছু বোঝা গেলনা । পাশাপাশি দুটো গুমটি দোকান । সুন্দর সিং এর দোকানে আমরা উঠলাম । কাছেই আমাদের টেন্টও লাগিয়ে দিল । অল্প অল্প ঠান্ডা ছিল ৮০০০ ফিট উচ্চতায় । ডিনার করে তারাতারি শুয়ে পরলাম । আর ঠিক করলাম কালকের দিনটাও এখানেই বিশ্রাম নেব ।

১১/০৬/১২ - ভোর বেলায় একবার উঠেছিলাম , কিন্তু রেঞ্জ ক্লিয়ার দেখা গেলনা বলে আবার শুয়ে পরি । বৃজমোহন এসে গেছিল , তাকে বলে দেই আমাদের না যাবার কথা । পরে হটাৎ আমাদের ইচ্ছে হয় আজ একটু মদ - মাংস খেতে । বৃজমোহনকেই দায়িত্ব দেওয়া হলো । সারি তে পাবার চান্স কম , না পেলে ওকে উখিমঠে যেতে হবে  । আমরা নাস্তা করে তাল টা চারিদিক দিয়ে ঘুরলাম , অনেক ছবি তুললাম একটা পাখি খুব দেখা যাচ্ছিল , আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম ওটা ম্যাগপাই , কিন্তু পরে জানতে পারি ওটা ব্ল্যাক হেডেড জয় । পরে অবশ্য ম্যাগপাই ও দেখি । আমরা ছাড়াও আরো টেন্ট লাগানো ছিল, কিছু ট্যুরিস্ট এসেও ঘুরে যাচ্ছিল।তেমনি এক দলের বাচ্চাদের সাথে ক্রিকেট খেলে কাটাই কিছুক্ষণ  । দিনের বেলায় বেশ গরম জুনে । এর পর আমরা দুজনে মগ বালতি নিয়ে এসে স্নান করলাম দেওরিয়া তালের জলে  । সাবান মাখায় পার থেকে দূরে বালতিতে জল ভরে এনে স্নান  করতে হলো । আমি একটু পুকুরে নেমে ডুব দিয়েছিলাম । ভয় লাগছিল অচেনা জল বলে আর পরের কাছে ভাঙ্গা কাঁচ সহ নানা জিনিস পরে থাকায় । বৃজমোহন ফেরেনি , তাই আমরা লাঞ্চ করে নিয়ে গাছ তলায় ম্যাট পেতে শুয়ে পরলাম, টেন্টের মধ্যে তখন আগুন । বাপারটা অনেকটা গ্রীষ্মের দুপুরে পারার পুকুর ধারের গাছ তলায় শুয়ে থাকার মতই ছিল । ভিউ না দেখা গেলে এই সময় দেওরিয়াতাল অতি সাধারণ । বিকালের দিকে বৃজমোহন মদ - মাংস নিয়ে হাজির হলো । সুন্দর সিং এর সাহায্যে আমিই শুরু করলাম রান্না । একবার সানসেট ভিউ দেখার জন্য বাইরে এসেছিলাম , যদিও তেমন কিছু দেখা যায়নি ,  তালের জলে যে প্রতিচ্ছবি দেখব বলে আজ থেকে গেলাম , তা আর দেখা হলনা , ফিরে দেখি আলুগুল কুচি কুচি করে কেটে ফেলেছে । লাতুরে আমার মারাঠি বন্ধুরাও প্রথমবার একই ভুল করেছিল । যাইহোক আবার আলু কাটা হলো । একেবারে বাঙালি কায়দায় মাখোমাখো গ্রেভির মুরগির মাংস রান্না হলো । তখন আলো আছে । আমরা  টেন্টের বাইরে বসে গেলাম । আর দেওরিয়াতাল কে এভাবেই স্মরণীয় করে রাখলাম । আমরা অবশ্য কিছুই বেশি খেতে পারলাম না । বৃজমোহনরাই মেরে দিল সবটা । টানা ১০ দিন পথ চলা আর ট্রেক থেকে আজ সম্পূর্ণ বিশ্রামে কাটালাম । কাল আবার ট্রেক শুরু তাই তারাতারি শুয়ে পরলাম আমরা । 

১২/০৬/১২ - আজ সকালেও মনমোহিনী দৃশ্য তেমন দেখা গেলনা । বৃজমোহন সময়মত চলে এসেছিল । রুটি আলুর তরকারী খেয়ে সকাল ৮ টা নাগাদ আমরা রওনা দিলাম । কাল মাঝরাতে প্রচুর লোক এসেছিল । তাদের চিত্কারে ঘুম ভেঙ্গে গেছিল । সুন্দর সিংহের খাবার বিল মটকা গরম করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল । ওই খাবারের এত দাম ! আমার পরামর্শ সর্বত্র দাম জেনে খাবার খান । পাহাড়ি মানুষের সততা এখন আর আগের মত প্রশ্নাতীত নয় । গাইড পোর্টাররাও আমাদের কম খরচে ঘুরতে সাহায্য করার থেকে আমাদের পকেট কাটতেই বেশি আগ্রহী । এদের পাল্টে যাবার অন্যতম কারণ কিছু ধনী - বিলাসী ট্রেকার আর ব্যবসায়ী ট্রেক অপারেটার । নন্দন থেকে যেমন চশমা আর হালকা দাঁড়ি সহ কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে পাজামা পাঞ্জাবির যুবকেরা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে , পাহাড় থেকেও তেমনি সত্যি কারের পাহাড় প্রেমী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে । কম খরচে ট্রেকিং করা কিছুদিনের মধ্যেই স্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে । তাল পার করে  বনবাংলোর পাশ দিয়ে আমরা উঠতে থাকলাম । আজকের পথটাও বেশ লম্বা , ১৮ কিমি লম্বা , তবে খুব বেশি চড়াই নেই । বৃজমোহন আমাদের দুজনের স্যাক বইছে আর আমরা তার ছোট ব্যাগটা বইছি । প্রথম পাহাড়টায় ওঠার পর নিচে সারি গ্রামটা দেখা গেল , লেকটা ঢাকা পরে যাওয়ায় আর দেখা যাচ্ছিলনা । বিজু পাথরের খাঁজে ডিম সহ পাখির বাসা দেখালো । সত্যি ই এখানে প্রচুর পাখি । পক্ষী প্রেমীরা শুধু এজন্যেই এখানে আসতে পারেন । যাইহোক এই পথে এমন বেশ কয়েকটা ছোট ছোট চড়াই ভেঙ্গে যেতে হচ্ছিল । ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই পথ ।ভাল্লুক বা চিতা থাকা অসম্ভব কিছু নয় । মাঝপথে বিজু একটা জায়গা দেখিয়ে বলল এটা তামাক দেবতার থান। স্থানীয় লোকেরা এখানে এসে দেবীকে তামাক জাতীয় জিনিস পুজো দিয়ে যায় ।সোমনাথও সিগারেট দিয়ে পুজো দিল ! এর পরে আমরা পৌঁছলাম রনি বুগিয়ালে । এখানেও অনেকে ক্যাম্প করে থাকে । আমরা দেখতে পেলাম অর্জুন মুকুট পাহাড় , পাহাড়ের মাথাটা একদম একটা মুকুটের মত ।  একটা মহিষ আমাদের পিছু নিল । ঘন্টা দুয়েক সে আমাদের পিছন পিছন এলো । মাঝে তার তারাহুরোয় আমরা ভয় পেয়ে যাচ্ছিলাম । আকাশগঙ্গা নদীতে আমরা অনেকক্ষণ বিশ্রাম নিলাম, হালকা স্রোতের পাহাড়ি ঝোরা যা বর্ষায় অন্য রূপ নেয় । আমি স্নান করলাম , জন্মদিনের পোশাকে ! এমন সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে একটু আদিমতাকে উপভোগ করার সুযোগ টা আমি সব জায়গাতেই নিয়ে থাকি । এখানে কিছু কোবরা লিলি দেখা গেল । ছাতু মেখে খাওয়া হলো, এটা আমার লাতুর থেকে নিয়ে যাওয়া ছাতু , ঠিক ছাতু নয় তবে খেতে ভালই লাগলো । এরপর একটা চড়াই পার করে ঘন্টা খানেক হাঁটার পর চোপতার গাড়ির রাস্তায় এসে পরলাম । চোপতা এখানে থেকে আরো ২ কিমি । বেশ ভিড় তখন কারণ অনেক চারধাম যাত্রীরাই এখানে এসে তুঙ্গনাথ দর্শন করে বেরিয়ে যায় । থাকার জন্য খুব কম লোক ই এসেছিল । বিকাল ৩ টের পর আমরা পৌঁছাই চোপতায় । একটু ভালোমন্দ লাঞ্চ করি । তারপর আবার একটা কঠিন ট্রেক । যদিও বাঁধানো রাস্তা , কিন্তু ভীষন চড়াই প্রায় ৩ কিমি পথ । বিজুর খুব কষ্ট হচ্ছিল । কিন্তু আমরা কেও ই স্যাক বইবার মত অবস্থায় ছিলাম না । হাঁটুর সাথে আমার লোয়ার ব্যাক পেন টাও ভোগাচ্ছিল আর সোমনাথেরো হাঁটুর ব্যথা শুরু হয়েছিল, যদিও ও রাস্তায় স্যাক টা  বয়েছিল । এই পথে মাঝে মধ্যেই দোকান , একপিঠের জন্য ৪০০/- তে ঘোড়াও পাওয়া যাচ্ছিল । প্রচুর লোক তখন নেমে আসছিল । আমরা আসতে আসতেই উঠছিলাম, বিজু আগে চলে গেছিল । যেতে যেতে সোমনাথ কয়েক'শ টাকা কুড়িয়ে পায় , কিন্তু কাওকে ফেরত দেবার কোনো উপায় নেই , তাই আমরা ঠিক করি তুঙ্গনাথের চরণেই ওটা দিয়ে দেব । এই পথে লেজহীন ইন্দুর দেখা যায় । তাদের ক্যামেরা বন্দী করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হলো । প্রায় শেষ দিকে আরাম চটিতে অপেক্ষা করছিল বিজু । সে হটাৎ তার টাকা হারানোর কথা বলে । আর ঠিকঠাক বলে দেয়ায় ওর টাকা ওকে আমরা দিয়ে দিলাম । ও চা খাওয়ালো আমাদের । সন্ধ্যায় তুঙ্গনাথে পৌঁছলাম যদিও এখানে অন্ধকার নামে দেরীতে, প্রায় ৭ টাতে ।  এখানে প্রচুর থাকার জায়গা । ২০০/- তে বিজু একটা ঘর ঠিক করেই রেখেছিল । আমরা ঘরে বিশ্রাম না নিয়ে মন্দিরের পথেই এগোলাম এবং ঠিক তখনি সন্ধ্যারতি হওয়ায় তা দেখার সৌভাগ্য হলো । পঞ্চকেদারের একটি হলো এই তুঙ্গনাথ, উচ্চতা প্রায় ১২০০০ ফিট । একটা সুন্দর সন্ধ্যা পেলাম দিনভর কষ্টের পর । রাতে আর বিশেষ কিছু করার ছিলনা ডিনার করে শুয়ে পরলাম ,কারন পরদিন ভোর বেলায় উঠে চন্দ্রশিলা যেতে হবে । 

১৩/০৬/১২ - ভোরে চারটের সময় উঠে গেলাম । বাইরে তখন অন্ধকার । ঠান্ডাও বেশ । আপাদমস্তক মুড়ে নিয়ে আমরা চন্দ্রশিলার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । মন্দিরের পাশের রাস্তা দিয়ে আমরা এগোতে থাকলাম . হটাত একটা ভয় ভয় ভাব . মনে হয় কোনো বন্য পশু . পরে দেখা গেল কিছু এই দিককার পাহাড়ি হরিন ঘুরে বেড়াচ্ছে . দূর থেকে আবছা ভাবে তাদের দেখা গেল . ১.৫ কিমি রাস্তা পুরোটাই খারাই . ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে চন্দ্রশিলা তপে পৌছে গেলাম . সূর্যোদয় হলো , কিন্তু যে ভিউ দেখার জন্য লোকে এখানে আসে তার কিছুই দেখতে পেলাম না . একটা চত্ব মন্দির , যা প্রায় সব জায়গাতেই থাকে . তবে শীতকালে এই পথে ভরপুর বরফ থাকে তখন আসলে রোমাঞ্চ বেসি . আর ভিউ পেতে গেলে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর ভালো সময় . খুব সহজে বরফের উপর ট্রেক করতে চাইলে এখানে শীতকালে চলে আসা যেতে পারে . এমনকি এপ্রিল পর্যন্ত মনে হয় বরফ থাকে . যাইহোক আমরা নেমে এসে মন্দিরটা আর একবার ঘুরে হোটেলে ফিরে নাস্তা করলাম . এখানেও খাবারের বিল দেখে মাথা  গরম হয়ে যাবে . নামতে আমার কষ্ট হতনা কিন্তু এবার তের পেলাম আমি হুর হুর করে নামতে পারছিনা . এটাই বুরত্বের লক্ষণ ! সোমনাথ নামার সময় নিজের ব্যাগটা  বয়িল . চপ্তায় নেমে কোনো শেয়ার গাড়ি পাওয়া গেলনা , যাবে কিনা তার ও ভরসা দিচ্ছিলোনা বিজু . বারবার ইনসিস্ট করছিল গাড়ি বুক করার জন্য . আমরা প্রায় ঘন্টা পাঁচেক অপেক্ষা করি রাস্তার উপরে . তেমন বসার জায়গা নেই হোটেল গুলু তারাতারি খদ্দের দের উঠিয়ে দেয় . লাঞ্চ ও করিনি . বিজুও আমাদের সাথে ছিল . কানাঘুস শুনছিলাম ২.৩ তের পরে জীপ বা ভুখা হরতাল পাওয়া যেতে পারে . ভুখা হরতাল হলো বাসের নাম ! ইতিমধ্যে অন্য জিপের সাথেই কথা চলছিল . একটা আমাদের নিয়ে যাবে বলেও পরে অন্যলোক ভরে চলে যায় . যাইহোক শেয়ার জিপ ও এলো কিন্তু তাতে তিলধারণের জায়গা নেই . অথচ এই পথের গুরুত্ব কিছু কম নয় . এটা গপেস্ব্র হয়ে চলে গেছে জশিমথে . মানে কেদার থেকে বদরী বা উল্তপত্র্হের যাত্রীরা এই পথটাকেই ব্যবহার করে এখন . বৃজ্মহনের হিসেব চুকিয়ে দিলাম ৩ দিনের জায়গায় ৪ দিনেরই দিতে হলো আর দুদিনের তেন্তের ভার ১৫০/- করে , মোট ২০০০/- দেওয়া হলো . এ ছাড়াও নিজেদের শতকে যা ছিল তাও খালি করে দিয়ে দিলাম . শেষে এলো ভুখা হরতাল কোনরকমে তাতে জায়গা পেলাম . এটা যাবে গৌরিকুন্দ , তাই আমাদের সেই কুন্দেই নেমে যেতে হলো তখন বিকাল ৪ তে . গুটিকয়েক দোকান পাশেই বয়ে চলেছে মন্দাকিনী . কিন্তু খাবার দোকান তেমন নেই , একটা দোকানে  ম্যাগি আর চা খেলাম আমরা . খিদের মুখে ঝোলে ভেজা ম্যাগি যেন অমৃত সমান ! জিপের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম পাওয়া জজ্বে কিনা ঠিক নেই . হটাত একটা একদম খালি জীপ পেয়ে গেলাম . যেটা অগস্ত্যমুনি তে কলেজ ছাত্রীদের তুলে ভর্তি হয়ে গেল . সন্ধ্যার সময় রুদ্রপ্রযাগ এ পৌছে গেলাম . ব্রিজ পার করে আমরা আবার কেদারের পথেই কিছুটা গিয়ে কালিকম্লি ধরম্শালাতে গেলাম . একেবারে নদীর ধরেই .  কিন্তু খুব বাজে ব্যবহার পেলাম . আমাদের একটা ৬০০/- র ঘর অনেক দরদাম করে ৩০০/- তে দিতে চেয়েছিল আমরা ২০০/- তে আটকে ছিলাম আর এও বলছিলাম আমাদের ঘরের দরকার নেই কোনো হল ঘরে থাকতে দিলেই হবে , আর কিছু লাগবে না . দিল পাকা না  হওয়ায় , আমরা পিছনের বারান্দায় বসে গেলাম . আমি স্নান ও করে দিলাম . আমাদের ভাব গতিক দেখে বারান্দায় থাকা এক বৈষ্ণব জুটি ম্যানেজার কে কাঠি করে আসলো . তারা আবার আমাদের কে চলে যেতে বলল , কিন্তু আমি নর্ছিলাম না সোমনাথ একটু পুতু পুতু করছিল , তাই ওকে বললাম যা ৩০০/- তেই পাকা করে aআয় . oও আসার পর আমরা ঘরে ঢুকে গেলাম আর প্রায় সাথে সাথেই অন্য একটা দোল এসে বলল ঘরটা ওদের . ম্যানেজার ও এসে তাই বলল , আমাদের বেরিয়ে যেতে হলো ঘর থেকে . জানিনা সোমনাথ কিভাবে পাকা করে এসেছিল , অর কথা কেও সুন্লই না . আমরা বারান্দাতেই বসেছিলাম , হটাত কেয়ার টেকার তা এসে পাসের হল ঘরে ঢুকিয়ে দিল , সেখানে আর একজন ই ছিল , এর জন্য তাকে আমাদের ১০০/- দিতে হবে তখনি ব্যাটা মাল খেয়ে ছিল . এটাই যদি আমাদের প্রথমে দিয়ে দিত আমাদের এইহেনস্থা হতনা . বিখ্যাত কালিকম্লির লোকেরাও যে এত ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছে তা জানা ছিল না . এদের উপরে খাবার জায়গায় অবশ্য ৬০/- তে সাদা খানা তা বেশ ভালই . 

১৪/০৬/১২ - সকালে নাস্তা করেই বেরোলাম আমরা . ব্রিজ তা পার হয়েই হরিদ্বারের বাস পেয়ে গেলাম কিন্তু উল্টোদিকে হায়ে একটু অবাক ও হয়েছিলাম পরে দেখলাম ওটা কেদারের পথে কিছুটা এগিয়ে বাইপাস ধরে হরিদ্বারের রাস্তা ধরে . বেলা বাড়ার সাথে সাথে গরম ও বাড়তে লাগলো সমানে গ্লুকোম দি , নিম্বু পানি শসাএইএইসোব খেতে থাকলাম . আবার সেই শ্রীনগর , দেব প্রয়াগ পার করে হরিদ্বার পৌছাতে দুপুর ২ তো হয়ে গেল . রিক্সাবালা আমাদের একটা সস্তা হোটেলে নিয়ে গেল দুদিনের জন্য ৬০০/- . আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে দাদা বৌদির পাসের বৈষ্ণবী হোটেলে সামনি খেলাম . তারপর পরদিনের হরিদ্বার হৃষিকেশ দর্শনের বুকিং করলাম ৯০/০ করে .  সোমনাথের টিকিট কাটা ছিলনা . এখন কাতার ও কোনো মানে হয়না চালু টিকেট কেটেই যাবে ঠিক হলো . আমরা হর কি পুরি হেন্তেই গেলাম সন্ধ্যারতি দেখতে প্রচন্ড ভিড় . ভিড়ের পিছন থেকেই যা দেখা যায় তাই দেখলাম . তারপর গলির ভিতরে ঢুকে খুঁজে খুঁজে আসল পান্দেজির প্যানরা কিনলো  ২৪০/- করে  কিলো . ঘরে ফিরে আবার ভালো করে স্নান করলাম তারপর রাত্রে দাদা বৌদির হোটেলে খেয়ে স্টেসনে দেখতে গেলাম সোমনাথের ট্রেনের অবস্থা . বেগতিক দেখে সোমনাথ ঠিক করলোকাল সকালে উঠে ওয়েটিং লিস্ট টিকিট ই কেটে রাখবে . 

১৫/০৬/১২ - সকালে উঠেই সোমনাথ টিকিট কাট তে ছলে যায় । ফিরতে দেরী হচ্ছিল বলে আমি ই  ওকে দেকে পাঠাই । বলি সাইট সিন দেখে এসে বিকালে টিকিট কাট তে , তখন ফাঁকাই থাকে । কোন এক্তা স্কুল গ্রাউনড থেকে বাস ছাড়ার কথা । এখানেও সস্তার এক অবস্থা , ৯০/- তে জা হয় আর কি । সব লক ভরানোর জন্ন্য ঘণ্টা খানেক দেরি করল । তার উপর গরম। তাই সবারি মতকা গরম হয়ে গেল শুরুতেই । আনন্দময়ী আশ্রম , দক্ষের মন্দির ঘুরে সোজা হৃষীকেশ । গরমে অসজ্য অবস্থা । তারপর অনেকটা হাঁটাহাঁটিও ছিল । আদি বদ্রি , লক্ষ্মণ মন্দির , সুভেনির শপ হয়ে লক্ষ্মণ ঝোলা পার হয়ে লাঞ্চ । তারপরে জিপে কিছুটা গিয়ে স্বরগাশ্রম হয়ে রামঝলা পার হয়ে জিপে করে বাস স্ট্যান্ডে । ভারতমাতা মন্দিরে এসে আমরা আলাদা জিপে স্টেশনে চলে এলাম । লাইন ফাঁকাই ছিল , সোমনাথ টিকিট কেটে নিল । হোটেলে ফিরে আবার স্নান করলাম। তারপর দাদা বউদির হোটেলে খেয়ে সোমনাথ কে তুলে দিতাম গেলাম। কিন্তু ট্রেন অনেক আগেই দিয়ে  দেওয়ায় টয়লেটের পাশের জায়গাও ঝগড়া করে আদায় করতে হল । ওকে কুম্ভের পেটে বসিয়ে আমি হোটেলে ফিরে আসি । আমার পরদিন সকালে ট্রেন দিল্লীর , তারপর মুম্বাই হয়ে লাতুরে ফিরলাম ১৭ তারিখ সকালে, সোমনাথও সাতসকালে পৌঁছে বাড়ি পৌঁছে গেছিলো । সব ভাল যার শেষ ভাল !

হোননেমারাদুর নির্জন দ্বীপে ....

 হোননেমারাদুর নির্জন দ্বীপে ....শীঘ্রই  আসিতেছে 








ভূমিকা :- ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল সান্দাকফু যাব । কিন্তু হয়ে ওঠেনি । তার আগেই পায়েখড়ি হয়ে যায় তারকেশ্বর বা অযোধ্যা কিমবা  বক্সা পাহাড়ে । বছর দশেক আগে আমার বাল্যবন্ধু বাপ্পা র সাথে প্লান করেছিলাম, ট্রেকার্স হাটও  বুক হয়ে গেছিল। শেষ মুহুর্তে বাপ্পার কোনো অসুবিধার কারণে সেবার আর যাওয়া হয়নি । তাই মনের মধ্যে খিধে টা  থেকেই গেছিল । ইতিমধ্যে আমরা অনেক আধুনিক হয়েছি , সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আড্ডা মারতে শিখেছি । অর্কুটের  "ঘুড়তে  ভালোবাসি " নামে একটা কম্যুনিটি তে আমরা আলোচনা করতাম । ২০১১ মে মাসে আমি প্রস্তাব রাখি পুজোর সময় সান্দাকফু যাবার । আমার ভাগ্নে - বন্ধু - ভ্রমন সঙ্গী সুব্রত ছাড়াও আরো অনেকে সাড়া দেয় । কলকাতায় তারা নন্দনে মিলিত ও হয় । আমার আর এক বন্ধু শিল্পী কদিন আগেই সান্দাকফু ঘুরে এসেছহিল, সেও শিখা সহ সবাইকে উৎসাহ ও ভরসা যোগায় ।  আমি লাতুর থেকেই সব খেয়াল রাখছিলাম । প্রিন্স টিকিট কাটার  মুহুর্তে সরে যায় , বাড়ি থেকে ছাড়বেনা বলে । শিখা ও তার বন্ধু দীপাঞ্জন আর জয়দীপ টাকা জমা দেয় । সুব্রত আমাদের সবার টিকিট কাটে । তারপর থেকে আমাদের অন লাইন  আড্ডাও বাড়তে থাকে । ঠিক হয় আমি যেদিন কলকাতা পৌছাব সেদিন আমরা মিলিত হব । সেটা দোসরা অক্টোবার , রবিবার ।আর আমরা বেরোব সাতই অক্টোবার , একাদশীর দিন ।